(* Look শব্দটি 'লোক্' ধাতু থেকে হয়েছে।)
১। ১। ২।
স ইমাঁল্লোকানসৃজত। অম্ভো মরীচীর্মরমাপো'দো'ম্ভঃ পরেণ দিবং দৌঃ প্রতিষ্ঠা'ন্তরিক্ষং মরীচয়ঃ। পৃথিবী মরো যা অধস্তাত্তা আপঃ।
১। ১। ২।-১। অন্বয়।
সঃ (তিনি) ইমাং (এই ) লোকান্ (লোক সকলকে) অসৃজত (সৃজন করলেন)। অম্ভঃ (অম্ভ) মরীচীঃ (মরীচী নামক লোক সকলকে) মরম্ (মর লোককে) আপঃ (অপ্ লোক সকলকে) । অদঃ (ঐ) অম্ভঃ (অম্ভ) পরেণ (পর—ঊর্ধ্বে) দিবং (দিব্-এর—দ্যুলোকের), দৌঃ (দৌ—দ্যুলোক) প্রতিষ্ঠাঃ (প্রতিষ্ঠা) ।অন্তরিক্ষং (অন্তরীক্ষ) মরীচয়ঃ (মরীচীগণ—মরীচীগণের লোক)। পৃথিবীঃ (পৃথিবী) মরঃ (মর-লোক; মর্ত্ত)। যা (যা ) অধস্তাৎ (অধে) তা (তা) আপঃ (অপ্* সকল— অপ্ বা জলের অধীন লোকসকল ) ।
(*অপ্ শব্দটি একবচন এবং বহুবচন, উভয়-ই । )
১। ১। ২।-২। অর্থ।
তিনি এই লোক সকলকে সৃজন করলেন — অম্ভ, মরীচী সকল, মরলোক, অপ্ (জলময়) লোক সকল। ঐ অম্ভ দ্যুলোকের ঊর্ধ্বে, দ্যুলোক প্রতিষ্ঠা । (যা) অন্তরীক্ষ (তা) মরীচীগণ (মরীচীগণের লোক) । পৃথিবী— মর-লোক (মর্ত্ত) । যা অধে তা অপ্ সকল— অপ্ বা জলময় লোকসকল ।১। ১।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি।
১। ১।২-৩-১। অম্ভ = অম্ + ভ ।
'অম্' অর্থে শব্দ করা, অথবা তেজোময়ী বাক্ । 'অম' এর শক্ত্যাত্মক বা তেজোময়ী স্বরূপই 'অম্'। 'অম্' বা বাঙ্ময়তা, বা তেজোময়তা যাঁর ধর্ম্ম,—তিনি 'অম'। 'অ' অর্থাৎ চেতনার যে স্বরূপ থেকে সবাই প্রকাশ পায়,— যিনি আত্মা; 'ম' অর্থে যাঁতে সবাই অব্যক্ত হয়। ম= মৃত্যু; ম= সর্ব্বশেষ স্পর্শ বর্ণ। স্পর্শ অর্থাৎ বায়ু— প্রাণ প্রবাহ বা কালপ্রবাহ; এই প্রবাহ যাঁতে সমাপ্ত হয়, তিনি 'ম'। যিনি একাধারে 'অ' এবং 'ম', তিনি 'অম'। যা আছে এবং যা নেই— সবই এঁতে রয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদে উক্ত হয়েছে—'অমো নামাসি অমা হি তে সর্ব্বং ইদং'—তোমার নাম 'অম', কেননা তোমাতেই এই সব—যা কিছু 'ইদং' পদবাচ্য। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৫।২।৬ দ্রষ্টব্য।)
১। ১।২-৩-২। অম্ভ ।
অম্ভ লোক অর্থে সেই লোক, যা 'অম'-এর তেজকে 'ভ' অর্থাৎ ভরণ করে । শব্দ যেমন ভাবকে বহন করে, গর্ভীণি স্ত্রী যেমন পুরুষের বীর্য্যকে বহন করে, তেমনই এই স্বয়ংপ্রকাশ, স্বয়ংশক্তি আত্মা নিজেই নিজের তেজকে বহন করেন। (এঁর এক নাম বাগাম্ভৃণী, এবং যে ঋষিকা এঁর দ্রষ্টা, তাঁর নামও বাগাম্ভৃণী ।)
১। ১।২-৩-৩। দিব্ এবং দ্যু ।
'দিব্' অর্থে দ্যুলোক । অম্ভ প্রতিষ্ঠিত দ্যুলোকে, এর অর্থ অম্ভের প্রকাশ দ্যুলোকে, বা দ্যুলোক অম্ভের মহিমা। (যেমন চন্দ্রের মহিমা তার জ্যোৎস্না ।)
'দ্যৌ' শব্দটি দ্যু শব্দের বৃদ্ধি। দ্যু শব্দের একটি অর্থ— যিনি দোহন করছেন । স্বয়ংশক্তি, স্বয়ংপ্রকাশ অম, নিজেকে নিজে দোহন করে সবাইকে সৃষ্টি করেন; সেই সৃজন ক্ষেত্রের নাম দিব বা দ্যু, এবং এই জন্য শ্রুতি এই বাঙ্ময়ী অমাকে 'দোগ্ধৃ' বলে সম্বোধন করেছেন।
এই দ্যু, দ্যোতনময়, বা আত্মদ্যুতিময়; এই দ্যুতির নাম 'বিদ্যুৎ' । বিদ্যমানতার যা উৎকৃষ্ট অবস্থা তা যেখানে অনুভূত হয়, তার নাম দ্যুলোক । যাঁরা এই দ্যুলোক-বাসী, তাঁরা কখনো নিজবোধ বা আত্মজ্ঞান থেকে বিচ্যুত হন না।
১। ১।২-৩-৪। অন্তরীক্ষ এবং মরীচি ।
দ্যুলোক প্রকাশাত্মক। আর সেই প্রকাশের ভোগ এবং ভোগ অনুযায়ী পরিণতি যে ক্ষেত্রে ঘটে, তার নাম অন্তরীক্ষ। এই অন্তরীক্ষে আমরা সবাই সবার সাথে প্রাণরূপ সূত্রের দ্বারা যুক্ত হয়ে আছি । পৃথিবীতে বা বাইরের আকাশে (বহির্বিশ্বে), একজন আর একজনের থেকে স্বতন্ত্র, কিন্তু এই অন্তরীক্ষে সকল কিছু নিজের অন্তরেই প্রত্যক্ষ হয় ।
অন্তরীক্ষ = অন্তঃ +ঈক্ষ (দেখা)—যে ঈক্ষণ বা দর্শন সকলের অন্তরে বা মধ্যে ক্রিয়াশীল। প্রাণ, আমাদের মধ্য দিয়ে দেখছেন; এবং এর নামই আমাদের 'প্রত্যক্ষতা', আমাদের 'চিন্ময়তা'। এই দেখা মানেই ভোগ, অনুভূতি ।
দ্যুলোকের যে সাক্ষাৎ প্রকাশ আমাদের এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত দৃষ্ট হয়, তা আমাদের বহিরাকাশের সূর্য্য (সূর্য) । ঐ সূর্য্যের (সূর্যের) থেকে আমাদের রূপময় এবং কালগতিময় বিশ্ব ফুটে উঠেছে । রূপ হল চিন্ময় আত্মার চোখ বা দর্শন, এবং আর কাল হল, তাঁর পা (পদ) বা গতি; আর, এই হল ঋক্ বেদে বর্ণিত বিষ্ণুর 'চক্ষু' আর 'পদ'। ঋক্ বেদে বলা হয়েছে : বিষ্ণুর সেই পরম পদ, যা দ্যুলোকের ন্যায় সর্ব্বব্যাপী চক্ষু, তাকে সূরগণ (সুরগণ) সর্ব্বদা দর্শন করেন। —ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ। দিবীব চক্ষুরাততম্।। (ঋক্ বেদ ১।২২।২০।)।
আর ঐ প্রকাশত্মক দ্যুলোক থেকে, অনবরত, শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধের আকারে অনুভূতি রাশি আমাদের অন্তরে আসছে, আমাদের অন্তরকে আলোকিত করছে, আমরা আপ্লুত হচ্ছি। এই অন্তর হলো সোমলোক বা চন্দ্রমার জায়গা, যার আলো আমাদের আপ্লুত করে, আমাদের সাথে মিশে আমাদের রঙ্ হয়। ঐ অনুভূতি রাশিই 'সোম'।এইখানে, এই অন্তরীক্ষে, যা কিছু ইন্দ্রিয়দের দ্বারা বাহিত হয়ে আমাদের মধ্যে আসছে, তা আমাদের সাথে মিশ্রিত হচ্ছে। পীত হলে, পান করলে, নিজের সাথে মিশলে যে বর্ণ হয়, তাই পীত বর্ণ । এই জন্য সোম বা চন্দ্রমার জ্যোতিকে পীত বলা হয়; কেননা চন্দ্রমার অধিকারেই, অন্তরীক্ষে আমাদের ভোগ সম্পন্ন হয়; মৃত্যুর পর এই চন্দ্রমার অন্তর্গত পিতৃলোকে আমরা পিতৃগণের সাথে একীভূত (পিণ্ডীভূত) হয়ে থাকি, তাই চন্দ্রমার বর্ণকে পীত বলা হয় ।
দ্যুলোক থেকে যা প্রকাশ পায়, তার নাম ঋক্; ঋক্ মানে যে গতিশীল (ঋ) এবং বর্ণ বিচ্ছুরণময় (ক্) । এই মাটি, জল, যা কিছু প্রতীয়মান, তা ঋক্, চেতনার প্রজ্বলিত রূপ, এক একটি দেবতা। এই ঋক্ সকল, আকাশে প্রতিষ্ঠিত; এইজন্য বলা হয়েছে : " ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্ যস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে নিষেধুঃ...."—ঋক্ সকলে, অক্ষরে (অবিনশ্বর আত্মাতে), (তাঁর) পরম-ব্যোম স্বরূপে,— যাঁর উপরে বিশ্বের দেবতারা আসীন।" (ঋক্ বেদ ১।১৬৪।৩৯।)
আর এই ঋক্ সকলই, আমাদের অন্তরে মরীচি। মরীচি = মম ঋচঃ—আমার ঋক্ সকল, আমার মন্ত্র-রূপ প্রকাশ সকল, আমার অর্চি সকল।
আত্মাদিত্য হলেন দেবগণের মধুস্বরূপ (দেবমধু), দ্যুলোক হল বক্র বংশ (তীরশ্চীন বংশ)—একটি মধুচক্রের সাথে অন্য মধুচক্রের সংযোজক অংশ সকল, অন্তরীক্ষ সমগ্র মধুচক্র বা মধুক্ষেত্র (অপূপ), মরীচিরা হলেন পুত্রগণ । (ছান্দোগ্য মন্ত্র ৩।১।১ দ্রষ্টব্য । ) সূর্য্যের (সূর্যের) থেকে যেমন সূর্য্যই (সূর্যই) সৌরকিরণ আকারে বিচ্ছুরিত হন, সেই রকম, এই আত্মাই মন্ত্র বা ঋকের আকারে বিচ্ছুরিত হন । তাই মরীচিরা আত্মখণ্ড বা আত্ম-কণা এবং আদিত্যের পুত্র সকল। বহিঃ বা অধিদৈব ক্ষেত্র থেকে যা কিছু অনুভূতিরাশি আমাদের মধ্যে আসছে, তারা ঋক্, এবং এরাই অন্তরে মরীচি। এই জন্য বলা হয়েছে— 'অন্তরিক্ষং মরীচয়ঃ'।
১। ১।২-৩-৫। পৃথিবী—মরলোক ।
পৃথক স্থিতি বোধ যেখানে প্রাধান্য করে, সেই ক্ষেত্রের নাম পৃথিবী । এই স্বাতন্ত্র্য বোধ এতই নিবিড়, যে আমরা প্রত্যেকে নিজের শরীরের বাইরের সকল কিছুকে ' বহিঃ ' বা ' বাইরে ' বলি ; অন্তরীক্ষ-ক্ষেত্র এর বিপরীত, সেখানে সবাই নিজের ভিতরে।
এই যে বিচ্ছিন্ন অবস্থা, এ মরলোক বা পৃথিবীর বৈশিষ্ঠ্য—আমরা আমাদের জন্মের পূর্ব্বে কি অবস্থায় ছিলাম তা জানিনা, আমরা মৃত্যুর পরে কোন অবস্থায় থাকবো, তাও জানিনা --আমাদের দুইদিকই কাটা ।
ভৌতিকতা বা স্থূল হওয়া,— চেতনার ধর্ম্ম । প্রকাশের যে সর্ব্বশেষ বা চরম স্তর, তা এই স্থূলত্ব। নিজের অসীম, চিন্ময় স্বরূপকে কে বিস্মৃত হয়ে নিজেকে একটি সুনির্দিষ্ট সসীম আয়তন-বদ্ধ অবস্থায় সৃষ্টি করে ইনি ভূত বা স্থূল হন; অসীমতা থেকে এই ভাবে সসীম হওয়া মানে— ' মূর্চ্ছিত ' হওয়া, ' মূর্ত্ত ' হওয়া। এই পৃথিবীতে বা মরলোকে তাই প্রধানতঃ সবাই মূর্ত্ত ।আত্মা অবিনশ্বর, এবং এই নশ্বরতা এবং ভৌতিকতার দ্বারা আবৃত; ইনি অসীম, অনন্ত, তাই নশ্বর জীব হয়েও, অবিনশ্বরই থাকেন।
১।১।২-৩-৬। অপ্ লোক, অধ ।
যা (যা ) অধস্তাৎ (অধে) তা (তা) আপঃ ( অপ্ সকল) । অপ্ শব্দের প্রথমার বহুবচন 'আপঃ'। অপ্ অর্থে জল, দৈবজল । যা আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে, যার দ্বারা আমাদের আপ্তি সাধিত হয়, তাই অপ্; চেতনার এই আপ্তি প্রদায়ী রূপ বা মহিমার নাম অপ্ । প্রাণ যখন আমাদের 'ভোগ' হয়ে প্রকাশ পান, তাঁর নাম হয় জল; এই জল যে তেজোময় প্রাণই, এই প্রকার দেখলে, এই জলই হয়ে যায় 'সোম'। বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৫।১৩ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে , " প্রাণের জ্যোতিরূপ হল চন্দ্রমা (সোম) এবং শরীর হল অপ্ ।" অধঃ হল সেই দিক, যে দিকে আমাদের প্রতিষ্ঠা । এই জন্য আমাদের পাদদ্বয় অধে বা নীচে, এবং পৃথিবীকে স্পর্শ করে আছে। জলের অধোদিকে যে গতি, তা প্রাণের এই প্রতিষ্ঠা করার, মূর্ত্ত করার গতি । যাকে আমরা জল বলে পৃথিবীতে জানি, তা পৃথিবীর আধার-শক্তি স্বরূপ। এই জন্য শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে :"আধারভূতা জগতস্তমেকা
মহীস্বরূপেণ যতঃ স্থিতাসি ।
অপাং স্বরূপস্থিতয়া ত্বয়ৈতৎ
আপ্যায্যতে কৃৎস্নম্ অলঙ্ঘ্যবীর্য্যে ।। " (চণ্ডী,
একাদশ অধ্যায়, ৪র্থ মন্ত্র। ) এই মন্ত্রটির অর্থ : "(দেবি ! আপনি) একাই জগতের সবার আধার-শক্তি স্বরূপা, যেহেতু এই মহী-স্বরূপে ( মহান মূর্ত্ত-ক্ষেত্র রূপে ) আপনি স্থিত । অপ্ স্বরূপে অবস্থিতা আপনার দ্বারা এই সকল কিছু ( সমগ্র সৃষ্টি ) আপ্যায়িত (সমৃদ্ধ); আপনি অলঙ্ঘ্যবীর্য্যা — আপনার শক্তিকে কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না ।" সুতরাং এই অপ্ বা জল রাশি, ধরিত্রীর ধারণশক্তির উৎস, এই যে প্রাণ যিনি অপ্ রূপে আধারশক্তি, তাঁর নাম 'অপান' । অপান = অপ্ (অপ) +অন । প্রশ্নোপনিষদের ৩।৮ মন্ত্রে বলা হয়েছে,—" পৃথিব্যাং যা দেবতা সা পুরুষস্যাপানমবষ্টভ্য—পৃথিবীতে যে দেবতা (দেবী) তিনি পুরুষের অপানকে অবশ করে (বশীভূত) রেখেছেন ।" অর্থাৎ, যা শরীরে অপান-বায়ু, যার দ্বারা আমরা শরীরে বিধৃত, তা এই পৃথিবীতে যে দেবী—ধরিত্রী—তিনি বা তাঁর অধীনে ।
চক্ষু বা দর্শন থেকে বিশ্বাসের জন্ম হয়। যা দেখা যায়, তাকে সত্য বলা হয়; তাতে সত্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই চক্ষু হল জ্ঞানেন্দ্রিয়, আর পা হল কর্ম্মেন্দ্রিয়, কেননা পায়ের উপর নির্ভর করে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি বা প্রতিষ্ঠিত বোধ করি । আর চোখের যে জল, তা এই অপ্ ।
তাই যা অধে, তা আধারশক্তি স্বরূপ অপ্ বা অপানের অধিকারে, বা অপান তার লোক।
স্বয়ংশক্তি আত্মার শক্তির নাম বাক্, আর তাঁর বহ্বাত্মক বা বহু বহু হবার যে প্রবণতাময় সত্তা তাই প্রাণ। আত্মাকে বাক্ বহু-বহু আত্ম-খণ্ডে বা বহু প্রাণময় সত্তা করে সৃষ্টি করেছেন। প্রতি প্রাণময় সত্তাটি হয়েছে 'আধেয়', এবং বাক্ হয়েছেন আধার; যেমন আমাদের প্রত্যেকটি ভাব বাক্যের আধারে ধরা থাকে। তাই এই পৃথিবীর, পৃথক-ক্ষেত্রের প্রতিটি সত্তাকে, বাক্ তাঁর বেষ্টন দিয়ে, তাকে রূপময় করে ফুটিয়েছেন। উপনিষদে বলা হয়েছে বাক্ই পৃথিবী এবং শরীর, আর প্রাণই অগ্নি,— পৃথিবীর অন্তরের অগ্নি । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র, ১।৩।১২, ১।৫।১১, ৩।৯।১০ দ্রষ্টব্য।)।
আর 'জল' ই আমাদের ভোগ্য, আমাদের বেঁচে থাকার তৃপ্তি, আপ্তি, অপ্ । এই অপের দ্বারাই আমাদের পার্থিব বা ভৌতিক স্থিতি পুষ্ট হয় । এই অপ্ বা দৈব জলই আমাদের বীর্য্য বা প্রজনন সংক্রান্ত সামর্থ্য । ( বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২।৫।২, মন্ত্র ২।১।৮, মন্ত্র ৩।২।১৩,মন্ত্র ৩।৯।২২, দ্রষ্টব্য।)
আর, যা ভৌতিকতার আধিক্য প্রকাশ করে তা 'আধিভৌতিক'। ভৌতিকতার দ্বারা এই আত্মস্বরূপ আমাদের বদ্ধ করে রেখেছেন, বা স্বীয় কর্ম্মফল হেতু আমরা দেহাত্ম বোধময় বা ভৌতিকতার দ্বারা অভিভূত। এই বদ্ধতাই 'নাগপাশ'। অগ্নি বা চেতনা যেখানে স্তিমিত হয়েছে ভৌতিকতার প্রভাবে, সেই স্থান পৃথিবীর অধে, যা নাগলোক; নাগ = ন + অগ্ (অগ্নি / প্রাণাগ্নি ) ।
অধঃ দিকের যিনি দেবতা, তাঁর নাম 'অনন্ত'। যতদূর অব্দি অগ্নি, ততদূর অব্দি বাক্, এবং ততদূর অব্দি পৃথিবী। অগ্নি অনন্ত, তাই বাক্ও অনন্ত, তাই পৃথিবী বা এই ভৌতিক বিশ্বও অনন্ত (বৃহদারণ্যক উপনিষদ মন্ত্র ১।৫।১১, ১।৫।১২, ১।৫।১৩ দ্রষ্টব্য।); অনন্তনাগ শব্দের এই হল তাৎপর্য। এই আধার শক্তির প্রকাশ হয় বসু-দেবগণের মধ্য দিয়ে, যাঁদের দ্বারা আমরা বসবাস করি। প্রাণই বসু, কেননা প্রাণের (বা বাকের) দ্বারাই আমরা বাস করি, বেঁচে থাকি । বস্তু জগৎ বা বস্তবিকতার উপর যাঁরা আধিপত্য করছেন, তাঁরা বসু। বাসুকি নাগরূপ এই বসুশক্তি দ্বারা আমরা বাস্তবায়িত হয়ে রয়েছি ।
১।১।৩।
স ঈক্ষতেমে নু লোকা লোকপালান্নু সৃজা ইতি । সো'দ্ভ্যঃ এব পুরুষং সমুদ্ধৃত্যামূর্ছয়ৎ।।
১।১।৩-১ অন্বয়।
সঃ (সে-সেই আত্মা) ঈক্ষত (ঈক্ষণ করলেন) ইমে নু লোকাঃ (এই লোকসকল [তো সৃষ্টি হল], লোকপালান্ (লোকপালদের) নু সৃজৈ (সৃষ্টি করি) ইতি (এই-এইটি) ।
সঃ (সে-সেই আত্মা) অদ্ভ্যঃ এব ( এই অপ্ সকল থেকেই; [অদ্ভ্যঃ শব্দটি অপ্ শব্দের পঞ্চমী-বিভক্তির বহুবচনের রূপ] ) পুরুষং (পুরুষকে) সমুদ্ধৃত্য (সম্যক রূপে উদ্ধার করে) অমূর্ছয়ৎ (মূর্ছিত করলেন; মূর্ত্ত করলেন।।
১।১।৩-২। অর্থ।
সেই আত্মা এই ঈক্ষণ করলেন— এই লোকসকল [তো সৃষ্টি হল], লোকপালদের সৃষ্টি করি ।
সেই আত্মা, এই অপ্ সকল থেকেই পুরুষকে সম্যক রূপে উদ্ধার করে মূর্ছিত (মূর্ত্ত) করলনে ।
১।১।৩-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি।
স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার যে প্রথম আলোক, তাতে লোক সকল সৃষ্টি হল । তারপর তাঁর ঈক্ষণ দ্বারা, বা অবলোকনে তিনি লোকপালদের সৃষ্টি করলেন ।
কাল গতি বা কালের ক্রিয়ার নাম কলন । আর সেই কালগতিতে আমরা যে ভোগ করছি, অনুভব করছি, বা সোম পান করছি, সেইটি পালন । 'পা' শব্দটি 'পানার্থক' । পাল =পা(পান) +অল্ (সক্ষম) —যার দ্বারা সোম পান বা ভোগ সম্ভব হয় । এই লোকপালগণই লোকের পালন করেন এবং কখন কোন কাল বা কিরকম সময় কোন একটি লোকের উপর প্রাধান্য করবে, তা নির্ধারণ করেন।
অপ্ বা চেতনার যে আপ্তিময়তা, সেই আপ্তির নিবিড়তা থেকেই স্থূলত্ব বা ভূতত্ব রচিত হয়। এই স্বয়ংপ্রকাশ চেতনা নিজেকে ''বৃক্ষ' বলে জেনে 'বৃক্ষ' হয়েছেন; এই বৃক্ষ হওয়াটা একটি 'আপ্তি । সেই বৃক্ষ নিজেকে বৃক্ষ বলেই জানে, সে যে বৃক্ষ হয়েও অসীম এবং সবার আত্মা, তা আর জানছে না। এর নাম মূর্ছিত হওয়া, মূর্ত্ত হওয়া, ভূত হওয়া । বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২।১।৮ উক্ত হয়েছে যে অপের মধ্যে যিনি আছেন, তাঁর নাম 'প্রতিরূপ', কেননা এঁর থেকে প্রতিরূপ সকল জাত হয় । তাই যেমন যেমন বোধক্রিয়া বা অনুভূতি, সেইরকমই, বা তদনুরূপ হয়ে পুরুষ জাত হয় । এই যে অপ্ বা চেতনার 'জল' রূপ মহিমা, এঁর থেকেই রূপ সকল বা ভূত সকল (ভৌতিক বিশ্ব) জাত হয়, এবং এঁতেই বিলীন হয়; পুনর্জন্ম এবং পুনর্মৃত্যুর কারণ এই 'জল', তাই এই অপ্-কে 'কারণবারি' বলা হয়।
(এই প্রসঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের মন্ত্র ৫।৫।১ দ্রষ্টব্য। )
১।১।৩-৪।পুরুষ।
পুরু শব্দের 'বহু', এবং 'ষ' দ্বারা 'খণ্ড' বা 'খণ্ডন' বোঝায় । একই আত্মা, নিজেকে খণ্ড-খণ্ড করে পুরুষ হয়েছেন । আত্মা খণ্ড-খণ্ড পুর-সকলে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে জীব হয়েছেন, সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থ হয়েছেন । এই খণ্ডিত, অনুপ্রবিষ্ট আত্মাই পুরুষ। এক আত্মাই বহু পুরুষ হয়ে প্রতিরূপময় হয়েছেন। পিতার অনুরূপ পুত্র হয়, বংশধারা হয়; রূপের অনুরূপ প্রতিরূপ হয় ।
যিনি প্রথম পুরুষ বা আদিপুরুষ, তিনি ব্রহ্মা । দেবগণের মধ্যে সর্ব্বপ্রথম ব্রহ্মা জাত হয়েছিলেন : "ব্রহ্মা দেবানাং প্রথমঃ সংবভূব " (মুণ্ডক উপনিষদ্ ১।১।১)।কারণবারিতে শায়িত বিষ্ণুর (প্রাণের) নাভি থেকে ব্রহ্মার উৎপত্তি। এই জল থেকে উদ্ধৃত পুরুষই ব্রহ্মা এবং তিনি জাত হলে, অন্যান্য দেবগণ জাত হন।
১।১।৪।
তমভ্যতপত্তস্যাভিতপ্তস্য মুখং নিরভিদ্যত যথা'ণ্ডং । মুখাদ্বাগ্বাচো'গ্নিঃ ।নাসিকে নিরভিদ্যেতং; নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ, প্রাণাদ্বায়ুঃ । অক্ষিণী নিরভিদ্যেতমক্ষীভ্যাং চক্ষুশ্চক্ষুষঃ আদিত্যঃ ।কর্ণৌ নিরভিদ্যেতাং; কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং, শ্রোত্রাদ্দিশঃ । ত্বঙ্ নিরভিদ্যত; ত্বচো লোমানি, লোমভ্য ওষধিবনস্পতয়ঃ । হৃদয়ং নিরভিদ্যত; হৃদয়ান্মনো মনশ্চন্দ্রমাঃ । নাভির্নিরভিদ্যত; নাভ্যা অপানো'পানান্মৃত্যুঃ ।শিশ্নং নিরভিদ্যত; শিশ্নাদ্রেতো, রেতসঃ আপঃ।।
১।১।৪-১।অন্বয়।
তম্ (তাকে; সেই অপ্ থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে) অভ্যতপৎ (অভিতপ্ত করেছিলেন) । তস্য (তার/সেই) অভিতপ্তস্য (অভিতপ্তের, অভিতপ্ত বা তপ্ত পুরুষের) মুখং (মুখ) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল), যথাঃ (যেমন) অণ্ডং (অণ্ড) । মুখাৎ বাক্ (মুখ হতে বাক্), বাচঃ অগ্নিঃ (বাক্ হতে অগ্নি) । নাসিকে (নাসাদ্বয়) নিরভিদ্যেতং (স্ফুটিত হল); নাসিকাভ্যাং (নাসাদ্বয় হতে) প্রাণঃ (প্রাণ), প্রাণাৎ (প্রাণ থেকে) বায়ুঃ (বায়ু) । অক্ষিণী (অক্ষিদ্বয়) নিরভিদ্যেতং (স্ফুটিত হল); অক্ষীভ্যাং (অক্ষিদ্বয় থেকে) চক্ষুঃ (চক্ষু), চক্ষুষঃ (চক্ষু থেকে) আদিত্যঃ (আদিত্য)। কর্ণৌ (কর্ণদ্বয়) নিরভিদ্যেতাং (স্ফুটিত হল); কর্ণাভ্যাং (কর্ণদ্বয় থেকে) শ্রোত্রং (শ্রোত্র), শ্রোত্রাদ্ (শ্রোত্র) দিশঃ (দিক সকল) । ত্বক্ (ত্বক) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); ত্বচো (ত্বক থেকে) লোমানি (লোম সকল), লোমভ্যঃ (লোম সকল থেকে) ওষধিবনস্পতয়ঃ (ওষধি ও বনস্পতি সকল) । হৃদয়ং (হৃদয়) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); হৃদয়াৎ (হৃদয় থেকে) মনঃ (মন) মনসঃ (মন থেকে) চন্দ্রমা (চন্দ্র) । নাভিঃ (নাভি) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); নাভ্যা (নাভি থেকে) অপানঃ (অপান), অপানাৎ (অপান থেকে) মৃত্যুঃ (মৃত্যু) । শিশ্নং ( শিশ্ন/জননেন্দ্রিয়) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); শিশ্নাৎ (শিশ্ন থেকে) রেতঃ (বীর্য্য) রেতসঃ ( বীর্য্য থেকে ) আপঃ (অপ্) ।
১।১।৪-২। অর্থ ।
তাকে,— সেই অপ্ থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে অভিতপ্ত করেছিলেন । সেই অভিতপ্ত পুরুষের মুখ স্ফুটিত হল, যেমন অণ্ড (যেমন অণ্ডকে বিদীর্ণ করে শাবক জাত হয়) । মুখ থেকে বাক্, এবং বাক্ থেকে অগ্নি (স্ফুটিত হল) ।
নাসাদ্বয় স্ফুটিত হল; নাসাদ্বয় থেকে প্রাণ, এবং প্রাণ থেকে বায়ু (স্ফুটিত হল)।
অক্ষিদ্বয় স্ফুটিত হল; অক্ষিদ্বয় থেকে চক্ষু, এবং চক্ষু থেকে আদিত্য (স্ফুটিত হল) ।
কর্ণদ্বয় স্ফুটিত হল; কর্ণদ্বয় থেকে শ্রোত্র, এবং শ্রোত্র থেকে দিক সকল (স্ফুটিত হল) ।
ত্বক স্ফুটিত হল; ত্বক থেকে লোম সকল, এবং লোম সকল থেকে ওষধি ও বনস্পতি সকল (স্ফুটিত হল) ।
হৃদয় স্ফুটিত হল; হৃদয় থেকে মন, এবং মন থেকে চন্দ্রমা (চন্দ্র) (স্ফুটিত হল) ।
নাভি স্ফুটিত হল; নাভি থেকে অপান, এবং অপান থেকে মৃত্যু (স্ফুটিত হল)।
শিশ্ন/জননেন্দ্রিয় স্ফুটিত হল; শিশ্ন থেকে রেত / বীর্য্য এবং রেত থেকে অপ্ (জল) (স্ফুটিত হল) ।
১।১।৪-৩।সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি।
কারণবারি থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে (যিনি ব্রহ্মা, —সৃষ্টির আদি পুরুষ,— তাঁকে) অভিতপ্ত করলেন এই স্বয়ংপ্রকাশ-স্বয়ংশক্তি আত্মা (যিনি সবার স্রষ্টা)। অভিতপ্ত করলেন অর্থে, নিজেতে নিজে তেজোময় হলেন,— সেই ব্রহ্মারূপ পুরুষের উদ্দেশ্যে সংকল্পময় হলেন। সেই তেজ বা তপ থেকে, পুরুষের (ব্রহ্মার) মুখ স্ফুটিত হল বা উদ্ভিন্ন হল ; যেমন অণ্ডকে বিদীর্ণ করে শাবক প্রকাশ পায়, তেমন-ই । মূল মন্ত্রে ' নিরভিদ্যত ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে; এই শব্দটি ' ভিদ্ ' ধাতু থেকে হয়েছে। ভিদ্ অর্থে ভেদ করা, বিভিন্ন হয়ে প্রকাশ পাওয়া । এই আত্মস্বরূপ, নিজেই নিজেকে নিজের দ্বারা বিভিন্ন করে, বিছিন্ন করে, সেই আত্মখণ্ডকে নিজেতেই ধারণ করেন; এবং তার অন্তরে অবিনাশী, অখণ্ড, অদ্বৈত আত্মা হয়ে বিরাজ করেন । এই ভেদ, বিচ্ছিন্নতা, খণ্ডনকে লক্ষ্য করে, এঁকে পুরুষ বলা হয়। আত্মশক্তি বা বাকের দ্বারাই ইনি নিজেকে খণ্ডিত করেন, তাই ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে ' পুরুষের রস বাক্ '। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ১।১।২ দ্রষ্টব্য । )
অণ্ড শব্দের অর্থ ' অম্+ড', অর্থাৎ যেমন তেজ বা 'অম্', সেইরকম-ই 'ড' বা শব্দ, সেইরকম বা তদনুরূপ প্রকাশ । 'ড' অর্থে অনুকারী শব্দ। যেমন তেজ, যেমন 'বাক্' এর ভঙ্গিমা, সেইরকম-ই বাক্য, সেইরকম-ই সৃষ্টি, সেইরকম-ই মুখ, সেইরকম-ই রূপ ।
১।১।৪-৩-১। মুখ এবং বাক্ । (মুখাদ্বাগ্বাচঃ) ।
মুখ অর্থে,— সেই উৎস, যেখান থেকে কোন সত্তা পৃথক হয়ে ফুটে বহির্গত হয়। যেমন করে চেতনা বা প্রাণ প্রকাশিত হচ্ছেন, সেইটাই তার, বা সেই সৃষ্ট সত্তার পরিচয়। তাই মুখই আমাদের পরিচয়।
মুখ = মু (মোচন; মুঞ্চ ধাতুর অর্থ মোচন করা, উদ্গিরণ করা )+খ (আকাশ)। যেখানে সকল শব্দ, তাদের প্রকাশ হারিয়ে একত্বে থাকে তার নাম আকাশ বা ব্যোম্ । আকাশ তত্ত্ব, শব্দ তন্মাত্রা । মুখের ভিতরে যে ফাঁক (বিবর), তা এই আকাশই । আর সেখান থেকে বাক্য বা শব্দ হয়ে চেতনা প্রকাশ পাচ্ছেন, পুরুষ নিজেকে প্রকাশ করছেন । তাই বলা হল 'মুখাৎ বাক্ '।
১।১।৪-৩-২। বাক্ ও অগ্নি । অগ্নি দেবতা। (বাচঃ অগ্নিঃ)।
আমাদের সকল অনুভূতি, 'শব্দ' বা 'নাম' বা বাক্যের আকারে আমাদের মধ্যে থাকে । যে কোন শব্দই বাক্; আত্মার শব্দাত্মক স্বরূপই বাক্ । তিনি বাক্ রূপে আমাদেরকে সকল কিছু 'জ্ঞাপন' করেন।(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৪।১।২ মন্ত্র দ্রষ্টব্য ।) আমরা যা কিছু জানি, যা কিছু অনুভব করি, তা শব্দাকারেই আমাদের চেতনায় থাকে । চেতনার এই শব্দাকার রূপগুলিকে 'নাম' বলে। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ১।৬।১ মন্ত্র দ্রষ্টব্য ।)বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে বাকের জ্যোতিরূপ হল অগ্নি। ( বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ১।৫।১১ মন্ত্র দ্রষ্টব্য ।) যে কোন প্রকাশই 'জ্যোতি'। তাই বাক্ যখন রূপের আকারে প্রকাশ পান, তা অগ্নি বা বাকের 'জ্যোতিরূপ' । সুতরাং যে কোন শব্দ বা বাক্য যা চেতনায় ফুটে উঠছে, তা অগ্নি, নিজের একটি প্রজ্বলিত রূপ। আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি, ততক্ষণ কথা বলি, বা শব্দ-ময় হয়ে থাকি; যখন নিদ্রিত হই , তখন আর কথা বলি না বা সকল শব্দ নীরব হয়। এই শব্দাত্মক বাকের দ্বারা আমরা জ্বলে আছি, সক্রিয় হয়েছি; এইটি বাকের 'অগ্নিত্ব' । এই জন্য আমরা উষ্ণ। আমাদের শরীরের উষ্ণতা, এই অগ্নি বা প্রাণাগ্নি আমাদের শরীরের মধ্যে রয়েছেন বলে। আমরা যখন ঘুমিয়ে পরি, তখনো এই প্রাণাগ্নি প্রজ্বলিত থেকে আমাদের শরীরের সকল কর্ম্মকে সাধন করেন, আমাদের পার্থিব স্থিতিকে বজায় রাখেন । এই জন্য প্রশ্নোপনিষদ্ উক্ত হয়েছে : প্রাণাগ্নয়ো এব এতস্মিন্ পুরে জাগ্রতি— (পুরুষ নিদ্রিত হলে) প্রাণাগ্নি-ই এই পুরে (শরীরে) জেগে থাকেন। (প্রশ্নোপনিষদ্ মন্ত্র ৪।৩ দ্রষ্টব্য ।) ঋক্ বেদে (মন্ত্র ১।১।১) অগ্নিকে 'পুরোহিত' বলা হয়েছে। যিনি পুরের হিতার্থে পুরে বা শরীরে নিহিত, তিনি পুরোহিত । সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম লোক সকল থেকে, এই স্থূল সৃষ্টি, বা ভৌতিক বিশ্ব যতদূর অব্দি, ততদূর অব্দি এই অগ্নি (প্রাণাগ্নি) বিস্তৃত হয়ে ক্রিয়াশীল হয়েছেন । তাই উপনিষদে বলা হয়েছে, —তস্যৈ (সেই) বাচঃ (বাকের) পৃথিবী (পৃথিবী) শরীরং (শরীর) জ্যোতীরূপম্ (জ্যোতিরূপ ) অয়ম্ (এই) অগ্নিঃ (অগ্নি) তৎ (তাই) যাবতী (যতদূর) এব (অব্দি) বাক্ (বাক্) তাবতী (ততদূর) পৃথিবী (পৃথিবী) তাবান্ (ততদূর) অয়ম্ (এই) অগ্নিঃ (অগ্নি)— সেই বাকের পৃথিবী শরীর, জ্যোতিরূপ এই অগ্নি; যতদূর অব্দি বাক্ ততদূর অব্দি পৃথিবী, ততদূর এই অগ্নি । প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে বৈদিক পরিভাষায় পৃথিবী এবং শরীর সমার্থক। আমাদের শরীর পৃথিবীর অংশ । পার্থিব যে অগ্নি, তা সাক্ষাৎ এই অগ্নি দেবতার পার্থিব রূপ ।
বাক্ ও অগ্নি ।
আত্মা যখন ক্রিয়াশীল হন, নিজেকে বহু করেন, তখন তাঁর নাম হয় 'প্রাণ' । আত্মশক্তি—যিনি আত্মাকে বা প্রাণকে বহু করেন, তাঁর নাম বাক্; আত্মাই আত্মার শক্তি । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা, যিনি প্রাণ রূপে প্রকাশ পেয়েছেন, বা প্রজ্বলিত হয়েছেন, তাঁর নাম অগ্নি। তাই প্রাণকে 'প্রাণাগ্নি' বলা হয় । এই প্রাণই বাকের দ্বারা বহু হয়ে বিরাজ করছেন । তাই বলা হল ' বাচঃ অগ্নিঃ '।
অগ্নি ।
অগ্নি = অগ্ +নি (নী)— যিনি অগ্রবর্ত্তী হয়ে সকলকে নিয়ে চলেন তিনি প্রাণ । (অগ্র = অগ্ + র [রহিত] ।) ঋক্বেদ (মন্ত্র ১।১।১) অগ্নিকে 'পুরোহিত' বলা হয়েছে। পুরোহিত = পুরস্ (পূর্ব্বে) হিত (স্থিত)।
আবার, 'পুরোহিত' অর্থে, 'পুরে নিহিত'; এই প্রাণ, প্রাণাগ্নি, সবার মধ্যে নিহিত।
এই প্রাণ, যিনি অন্তহীন, যিনি সবাইকে মৃত্যুর পরপারে নিয়ে যান, এঁকে বৃহদারণ্যক এবং ছান্দোগ্য উপনিষদে, 'মুখ্য প্রাণ', ' আয়াস্য প্রাণ', ইত্যাদি বলে বন্দনা করেছেন। সবার মধ্যে থাকেন, তাই এঁকে 'মধ্যম প্রাণ' বলা হয়েছে । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ২।২।১ দ্রষ্টব্য।)
যিনি থাকলে সবাই তাঁর সাথে থাকে, এবং যিনি উঠলে তাঁর সাথে সবাই উঠে যায়, তিনি প্রাণ। ইনি সবাইকে হৃদয়ের দ্বারা ধারণ করে ক্রমণ করেন বলে, এঁকে বেদ 'দধিক্রা' নামে অভিহিত করেছেন । ' দধ্ ' অর্থে 'ধারণ করা' , এবং ' ক্রা ' অর্থে 'ক্রমণ' করা । এই দধিক্রা 'বুকে হাঁটেন', ' হৃদয়ের দ্বারা ধারণ করে ক্রমণ করেন', তাই এঁর গতি সর্পবৎ । এঁর গতিতে আমরা দিক পরিবর্ত্তন করতে করতে জন্ম থেকে মৃত্যুতে এবং মৃত্যু থেকে জন্মে ক্রমণ করছি, এবং মৃত্যুর থেকে অমৃতে চলেছি । এই গতি অতীব বক্র, সর্পিল ।
'অগ্নি' শব্দটি 'অগ্' ধাতু থেকে হয়েছে; অগ্ ধাতুর অর্থ সর্পিল গতিতে চলা ।
অগ্নি দেবতা ।
এই যে স্বয়ং প্রকাশ চেতনা, যিনি অগ্নি, তিনি বাক্ রূপে আমাদেরকে সকল কিছু 'জ্ঞাপন' করেন। আমাদের সকল অনুভূতি, 'শব্দ' বা 'নাম' বা বাক্যের আকারে আমাদের মধ্যে থাকে । অগ্নি বা বাক্ই প্রজ্ঞা, বাক্যের আকারেই আমরা সকল কিছু জানি। এই জ্ঞাপক চেতনাই আমাতে অগ্নি দেবতা । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৪।১।২ মন্ত্র দ্রষ্টব্য । ) যা কিছু আমাদের চেতনায় উদ্বেলিত হচ্ছে, তাদেরকে সুনির্দিষ্ট আয়তন, রূপ বা সংজ্ঞাতে পরিণত করে, এই প্রাণাগ্নি আমাদেরকে চৈতন্যময় করে রেখেছেন ।
১।১।৪-৩-৩। নাসিকা ও প্রাণ । (নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ)
নাসিকা এবং নাসা শব্দদুটি 'নস্' ধাতু থেকে হয়েছে। 'নস্' ধাতুর অর্থ
' নিকটে আসা '। শব্দাত্মক আকাশ, যেখানে সবাই 'ন' বা 'নাস্তি' হয়ে থাকে, সেখান থেকে স্পর্শাত্মক বায়ু বা প্রাণ প্রবাহিত হয়ে, আমাদের মধ্যে এসে, শ্বাস-প্রশ্বাস রূপে ক্রিয়াশীল হয়েছেন। এই যে প্রাণ আসছেন, আকাশ থেকে বায়ু রূপে এইটি নাসা, বা যেখান দিয়ে প্রাণ আসছেন তা 'নাসা' বা 'নাসিকা', এবং এই ক্রিয়ার দ্বারা আমাদের প্রাণময় শারীরিক স্থিতি সম্ভবিত হচ্ছে।
১।১।৪-৩-৪। প্রাণ ও গন্ধ ।
বৈদিক পরিভাষায় ঘ্রাণেন্দ্রিয়কেও 'প্রাণ' বলা হয়। এই প্রাণ আমাদের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে যে স্থিতি বা স্থায়িত্ব বোধ দান করেন, তাই গন্ধের গন্ধত্ব । 'গম্' বা গতি বা প্রাণগতি যে ভাবে বিধৃত হয়েছে, সেইটি 'গন্ধ' (গম্ + ধ ) । আমাদের প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট 'গন্ধ' বা সৌরভ আছে। শরীরের দ্বারা বেষ্টিত এই যে প্রাণ, তা এই গন্ধেরই অভিব্যক্তি । যা পৃথিবী বা ক্ষিতিতত্ত্ব তার তন্মাত্রা গন্ধ । আমরা পূর্ব্বে বলেছি যে এই শরীর পৃথিবীর অন্তর্গত ।
(আমরা জানি, কুকুর— যাদের 'শ্বন্' ' বলা হয়, তারা এই গন্ধের দ্বারা সবাইকে চিহ্নিত করতে পারে । এদের মধ্যে 'শ্ব', অর্থাৎ কাল বা কালগতির প্রতি আনুগত্য বিশেষ ভাবে প্রকটিত,— প্রভুর (প্রভুত্বের) প্রতি আনুগত্য, এদের চরিত্রের একটি বিশেষ দিক । কালের (শ্ব=এর) শাসন বা নিয়ন্ত্রণই আমাদের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস আকারে ক্রিয়া করছে, এবং আমাদের শরীর বা স্থিতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। )
১।১।৪-৩-৫। বায়ু দেবতা । (প্রাণাদ্বায়ুঃ)।
বহিরাকাশে যিনি বায়ু, তিনি যখন আমাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে প্রবাহিত হন, তখন তাঁর নাম হয় আয়ু । বায়ু শব্দটি 'বা' ধাতু থেকে হয়েছে । 'বা' ধাতুর একটি অর্থ চলা বা প্রবাহিত হওয়া, অন্য একটি অর্থ হল 'বয়ন
করা '। এই বায়ুর নাম 'সূত্রাত্মা'; সূত্রের দ্বারা যেমন একটি মালার ফুলগুলি গ্রথিত থাকে, সেইরকম প্রাণ বা বায়ুরূপ সূত্রের দ্বারা ইনি বয়ন করেছেন, যার ফলে এই বিশ্বের প্রতিটি সত্তা প্রতিটি সত্তার সাথে সংযুক্ত । এই বায়ুর দ্বারাই আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরস্পরের সাথে সংযুক্ত, শৃঙ্খলিত, এই জন্য দেহত্যাগের পর , আমাদের শরীর প্রথমে শিথিল হয়ে যায় (primary flaccidity) । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৭।২ দ্রষ্টব্য । )
বায়ুর একটি নাম মরুৎ— ইনি মৃত্যুর ঊর্ধ্বে (মৃ +উৎ); ইনি প্রাণের প্রবহনময় স্বরূপ, যার দ্বারা সবাই সঞ্জীবিত । আমরা যখন মৃত হই, আমরা তৎক্ষণাৎ শরীর থেকে উৎক্রান্ত হয়ে অন্যত্র চলে যাই না। শরীরের নিকটেই
বায়ুর দ্বারা একটি সূক্ষ্ম শরীর নির্ম্মিত হয়। আমাদের পার্থিব শরীর থেকে সমস্ত প্রাণশক্তি ঐ সূক্ষ্ম শরীরে প্রবেশ করে, অর্থাৎ ঐ শরীর বায়ুর দ্বারা স্ফীত হয়; এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই আমরা উৎক্রমণ করি । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।২।১১ দ্রষ্টব্য । )
বায়ুর একটি নাম মাতরিশ্বা । মাতরি—মাতাতে, বা যিনি মাত্রার দ্বারা পরিবর্ত্তন করেন তাঁতে, শ্বন্ (শ্বি=স্ফীত হওয়া) বা বর্ধন হচ্ছে, তাই ' মাতরিশ্বা'। মাতরি+শ্বন্= মাতরিশ্বন্ > মাতরিশ্বা। আমরা এই মাতৃস্বরূপ পরমাত্মার মাত্রাতে বর্ধিত হচ্ছি,পরিবর্ত্তিত হচ্ছি, ক্রমশঃ 'অহং ব্রহ্মাস্মি' বলে নিজেকে জানার দিকে চলেছি ।
'শ্বি' ধাতু থেকে 'শ্বন্' শব্দটি থেকে হয়েছে ।'শ্বি' ধাতুর অর্থ ' স্ফীত হওয়া, 'বর্ধিত হওয়া '। আত্মস্বরূপ, যিনি স্ব বা স্বয়ং, তাঁর 'শাসন' বা নিয়ন্ত্রণ প্রবাহই 'শ্ব'। সেই নিয়ন্ত্রণই শ্বাস-প্রশ্বাস, বা অন্তর-বহির্ম্ময় প্রাণগতি। এই যে বায়ু, যিনি 'মাতরিশ্বা', তিনি ঐ 'অপ্',— যিনি আমাদের প্রাণবন্ত ভোগ বা অনুভূতিময় আপ্তি; সেই অপ্ কে ধারণ করেন বায়ু বা মাতরিশ্বা; তস্মিন্ (তাঁতে) আপঃ (অপ্কে) মাতরিশ্বা দধাতি (ধারণ করেন)— সেই ঈশ্বরে (সেই ঈশিত্বের অনুশাসনে) মাতরিশ্বা অপ্কে ধারণ করেন (ঈশোপনিষদ্ ৪র্থ মন্ত্র দ্রষ্টব্য) । পার্থিব যে বায়ু তা এই বায়ু দেবতারই পার্থিব রূপ । বায়ুমণ্ডল রূপে তিনি এই পৃথিবীকে আচ্ছাদন করে রেখেছেন।
১।১।৪-৩-৬। অক্ষি, চক্ষু, এবং আদিত্য । ( অক্ষীভ্যাং চক্ষুঃ চক্ষুষঃ আদিত্যঃ ।)অক্ষ = অয়ম্ ক্ষরতি ---ইনি ক্ষরিত হচ্ছেন, ইনি বিচ্ছুরিত হচ্ছেন ।
অক্ষ = ন + ক্ষ = যিনি ক্ষরিত হন না, যিনি অক্ষর ।
এই আত্মা অবিনশ্বর, অক্ষয়, অক্ষর ; আবার ইনিই নিজেকে বহুরূপে, বহু বহু আত্মখণ্ডে ক্ষরিত করছেন,— যা এই সৃষ্টি ।
অক্ষি = অক্ষ + ই (গতি) = অক্ষ বা অক্ষরের গতি, যেখানে প্রতিষ্ঠিত, তাই অক্ষি । অক্ষি শব্দের সাধারণ অর্থ 'চক্ষু' । উপনিষদের নানা অংশে, আদিত্যে যে পুরুষ এবং যিনি অক্ষিগত পুরুষ, তাঁরা যে এক, এ কথা উক্ত হয়েছে ।
বৃহদারণ্যক উপনিষদ্, ৫।৫।২ মন্ত্রে বলা হয়েছে : তৎ যৎ তৎ (সেই যে) সত্যম্ (সত্য) তৎ (তা) অসৌ (ঐ) সঃ (সে /সেই) আদিত্যঃ (আদিত্য) । যঃ (যিনি) এষঃ (এই, এই আদিত্য) এতস্মিন্ মণ্ডলে (এই মণ্ডলে স্থিত) পুরুষঃ (পুরুষ) যঃ চ (এবং যিনি) অয়ম্ (এই) দক্ষিণে অক্ষণ্ (দক্ষিণ অক্ষিতে) পুরুষঃ (পুরুষ) তৌ এতৌ (এই দুজন) অন্যোন্যস্মিন্ (অন্য অন্যতে) প্রতিষ্ঠিতৌ (প্রতিষ্ঠিত) রশ্মিভিঃ (রশ্মি সকল দ্বারা) এষঃ (এই, এই আদিত্য) অস্মিন্ এঁতে, এই অক্ষিগত পুরুষে) প্রতিষ্ঠিতঃ প্রাণৈঃ (প্রাণ সকল দ্বারা) অয়ম্ (ইনি-অক্ষিগত পুরুষ) অমুষ্মিন্ (ওনাতে-আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষে [প্রতিষ্ঠিত] ) ।
সঃ (তিনি —যিনি এই বিজ্ঞানের দ্রষ্টা) যদা (যখন) উৎক্রমিষ্যন্ (উৎক্রমণ করেন) শুদ্ধম্ এব (শুদ্ধ——এক জনকেই, এক অদ্বিতীয় পুরুষকেই) এতৎ (এই) মণ্ডলং (এই মণ্ডলে, এই আদিত্য মণ্ডলে) পশ্যতি ন এনম্ এতে রশ্ময়ঃ প্রত্যয়ন্তি (এঁতে রশ্মি সকল আর প্রত্যাগমন করে না)— সেই যে সত্য তা ঐ সেই আদিত্য । এই আদিত্য মণ্ডলে যে পুরুষ, এবং যিনি দক্ষিণ অক্ষিতে পুরুষ, এই দুইজন একে অন্যতে প্রতিষ্ঠিত । রশ্মি সকল দ্বারা এই আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষ, এই অক্ষিগত পুরুষে প্রতিষ্ঠিত; প্রাণ সকল দ্বারা (প্রাণময়তার দ্বারা) এই অক্ষিগত পুরুষ আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষে প্রতিষ্ঠিত । যিনি এই বিজ্ঞানের দ্রষ্টা, তিনি উৎক্রমণ কালে (দেহত্যাগের সময়) যা শুদ্ধ (যিনি এক-অদ্বিতীয় পুরুষ) তাঁকেই দেখেন; (তাই —অদ্বিতীয়তা হেতু) এঁতে রশ্মি সকল আর প্রত্যাগমন করে না ।
আদিত্য বা সূর্য্য (সূর্য) থেকে কাল প্রকাশ পাচ্ছে । এই কাল আবর্ত্তনময়, চক্রগতি সম্পন্ন, এবং তার দ্বারা আমরা অহোরাত্রময় বা দিনরাতময় হয়েছি, সম্বৎসর- ময় (বর্ষ-চক্রময়) হয়েছি । আবার আদিত্য থেকে আলো বা রূপ প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা যা কিছু দেখছি তা আমাদের অক্ষি বা চক্ষু থেকে রূপ হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। আমাদের জাগ্রত এবং নিদ্রার যে কাল, তার উপর চক্ষুর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান এই বিষয়টিকে Circadian Cycle (অহো-রাত্র চক্র ) বলে আখ্যাত করে।
দক্ষিণ অক্ষ এই জন্য বলা হয়েছে, কেননা, দক্ষিণ দিক হল যম-দেবতার দিক, অর্থাৎ যে দিক দিয়ে প্রাণ আমাদের যমন বা সংযমন করেন; যে দিকের দ্বারা আমরা কর্ম্মময় হই।
চক্ষুই সত্য। আমাদের সত্য বোধ দর্শনে প্রতিষ্ঠিত। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৪।১।৪ দ্রষ্টব্য ।)। আমাদের সমস্ত অনুভূতি একত্র হয়ে যেখানে প্রজ্বলিত —তাই চক্ষু । সত্যতার যে বোধ, তার দ্বারা আমরা পরিচালিত হই এবং তাতেই আমরা প্রতিষ্ঠিত থাকি। তাই পা হল দৃষ্টির কর্ম্মেন্দ্রিয়। পা দিয়ে আমরা চলি এবং ধরাতে প্রতিষ্ঠিত থাকি। কালগতি বা কালচক্রের কেন্দ্র বা অক্ষ বলে, চক্ষুকে 'অক্ষি' বলা হয়।
রূপ প্রকাশ মানেই কাল প্রকাশ; এইজন্য যা অধ্যাত্মে অক্ষি, তাই অধিদৈবে বা বিরাটে আদিত্য । চক্ষু শব্দটি চক্ষ্ ধাতু থেকে হয়েছে; চক্ষ্ ধাতুর অর্থ 'প্রকাশ পাওয়া', 'দৃষ্টি গোচর হওয়া ' 'দেখা', — 'চাখা বা আস্বাদন করা'। যা প্রকাশ পাচ্ছে কালগতিতে বা প্রাণগতিতে, তাকে আস্বাদন বা ভোগ করা হচ্ছে।
১।১।৪-৩-৭। আদিত্য দেবতা ।
যে মহাপ্রাণ আমাদের সবাইকে নিয়ে একসাথে অদনময় বা ভোগময় হয়েছেন, তাঁর নাম আদিত্য। আমাদের বাইরের আকাশে যে সূর্য্য (সূর্য), আমাদের যা চক্ষু, আমাদের মধ্যে যে সত্য-বোধ, তা এই আদিত্য । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৯।১২ দ্রষ্টব্য।)
আদিত্য এবং অদিতি শব্দদুটি 'অদ্' ধাতু থেকে হয়েছে। 'অদ্' অর্থে 'অদন' করা , খাওয়া বা ভোগ করা । খাওয়া বা ভোগ করার অর্থ, যা খাদ্য
বা ভোগ্য, তাকে নিজের সাথে একসা করা, হজম বা জীর্ণ করা । এই জন্য অদিতি শব্দের একটি অর্থ হল, যিনি দিতি নন; অদিতি = অ+দিতি = অবিভক্ত, অখণ্ড । আমরা যা কিছু ভোগ করি, যা কিছু বোধ করি, তা আমাদের সমস্তটা নিয়ে, সমগ্র সত্তা নিয়েই করি, — এইটি অদিতির 'অদিতিত্ব ।
কালপ্রকাশ মানেই কামপ্রকাশ। এই কামনা / কাম, কাল প্রকাশের কেন্দ্র হল বিরাটে আদিত্য, এবং অধ্যাত্মে অক্ষি। আত্মাই কামময় হন, আর তার থেকেই সৃষ্টি হয়, সবাই সক্রিয় হয় । তাই এই আত্মাকে অক্ষিগত বা অক্ষিতে স্থিত পুরুষ বলা হয়েছে । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্, মন্ত্র ৪।৫।১১ দ্রষ্টব্য । )
আমরা যখন ভোগ করি, তখন প্রাণই ভোগ করেন; আর তাতে আমি এবং আমার শরীরস্থ সবাই তৃপ্ত হয়; যে দেবক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে আমি প্রকাশিত, সেই দেবতাদের যিনি জননী তিনি অদিতি, এবং সকল দেবতার সমগ্রত্ব নিয়ে যে অদিতির সন্তান, তাঁর নাম আদিত্য। ছন্দোগ্য উপনিষদের ৫।১৯।২ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে, প্রাণ তৃপ্ত হলে চক্ষু তৃপ্ত হন, চক্ষু তৃপ্ত হলে আদিত্য তৃপ্ত হন, আদিত্য তৃপ্ত হলে দ্যুলোক তৃপ্ত হয়, দ্যুলোক তৃপ্ত হলে যা কিছু দ্যুলোক এবং আদিত্যের অধিকারে আছে তারা তৃপ্ত হয়, এবং তাদের তৃপ্তিতে, অনাদ্য (অদনীয় অন্ন), তেজ এবং ব্রহ্ম-বর্চ্চস দ্বারা তৃপ্ত হয় প্রজারা, পশুরা।
১।১।৪-৩-৮। কর্ণ, শ্রোত্র এবং দিক । (কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং শ্রোত্রাদ্দিশঃ ।)
কর্ণ শব্দটি 'কৃত্' ধাতু থেকে হয়েছে । কৃত্ ধাতুর একটি অর্থ, 'সাপের মত আঁকা বাঁকা হওয়া বা বক্র করা । কর্ণ শব্দটি 'কোণ' শব্দের সাথে এবং ইংরাজি ভাষার corner শব্দটি সম্বন্ধ যুক্ত । প্রাণের যে দিঙ্ময়তা, তা কর্ণ, এবং তার বেদন বা অনুভূতিকে 'শ্রোত্র/ শ্রুতি/ শ্রবণ' বলা হয়। দিক পরিবর্ত্তিত হলে 'কোণ' রচনা হয়। আমরা যে একটি শব্দ শোনা থেকে বা একটি শ্রুতি থেকে, অন্য একটি শব্দ শোনা বা অন্য একটি শ্রুতিতে যাই, তা পরিচালিত করে প্রাণের দিক বা প্রবণতা। যে কোন অনুভূতিই 'শ্রুতি' বা 'শোনা'। যে কোন বোধ বা অনুভূতিই শব্দাত্মক—এ কথা আমরা আগে বলেছি। আমাদের প্রতিটি অনুভূতির সাথে, কোন না কোন শব্দ যুক্ত হয়ে থাকে; এর পারিভাষিক আখ্যা হল, — 'নাম'। আর সেই অনুভূতি বা জ্ঞান কে যে জানা, নিজের অন্তরে অনুভব করার নাম, শোনা বা শ্রুতি। যে ভাবে আমাদের শ্রুতি বা অনুভূতি হয় সেই ভাবে আমাদের দিক নির্ণয় হয়; অর্থাৎ আমরা কোন দিকে যাব তা ঠিক হয় আমাদের ভোগটা কিরকম অনুভূতি নিয়ে হল, আমরা কিভাবে শুনলাম তার দ্বারা । বাইরে যাকে আমরা দিক বলে অনুভব করি তা, আর অন্তরে যে দিকের কথা আলোচিত হল, এ উভয়ই এক; অর্থাৎ শ্রোত্র এবং দিক একই । যা বিরাটে দিক , তাই অধ্যাত্মে শ্রোত্র । এই জন্য বলা হয়েছে যে পুরুষ যখন প্রয়াত হয় তখন তার 'শ্রোত্র দিক-সমূহে গমন করে--দিশঃ শ্রোত্রম্ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ ৩।২। ১৩ মন্ত্র দ্রষ্টব্য) ।
আমাদের কানের মধ্যে যে জলীয় তরল পদার্থ আছে, তার দ্বারা আমাদের শরীরের ভারসাম্য বা দিক-সাম্য রক্ষা হয়; এই তরল পদার্থ বহিরাগত শব্দ তরঙ্গকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গে পরিণত করে, যা আমাদের মস্তিষ্কে গিয়ে শব্দাকারে গৃহীত হয়, বা শব্দের অনুভূতি হয়ে প্রকাশ পায়; সুতরাং, এই শারীর ক্রিয়াতেও, দিক, কর্ণ এবং শ্রুতিকে (শ্রোত্রকে) দেখা যায়। ঐ যে তরল, তা ঐ দিব্য অপ্-ই । আপ্তি অনুসারেই ভোগের পরিণতি হয়; সেই জন্য এক-ই কর্ম্ম থেকে এক এক জনের, এক এক রকম ফল হয় । যে, যে ভাবে যে অনুভূতি বা জ্ঞানে কর্ম্ম করে, তার সেই রকম দিক নির্ণয় বা পরিণতি হয়। বিপরীত ক্রমে, যার জন্য যে রকম ভাগ্য বা পরিণতি বা ভবিষ্যৎ নির্দ্ধারিত, তার উপর নিয়ন্ত্রণকারী প্রাণের প্রবণতা বা প্রাণের দিক-সকল (directives) সেই ভাবে ক্রিয়া করে । আমরা আগে দক্ষিণ দিক বা সংযমনের কথা বলেছি । উপনিষদে বলা হয়েছে যে— প্রাণই দিক সমূহ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৪।২।৪ দ্রষ্টব্য ।) । এই দক্ষিণদিকের অধিপতি যে প্রাণ, তাঁর নাম দক্ষিণাগ্নি, এবং অন্তরীক্ষ তাঁর লোক, চন্দ্রমা তাঁর জ্যোতির্ময় রূপ, নক্ষত্র-রাশিদের দ্বারা তিনি সংযমন করেন বা দিক-নির্ণয় করেন, অপ্ বা জলরাশির দ্বারাই আমাদের ভোগ সম্পন্ন হয় । এই জন্য দক্ষিণাগ্নির চারটি তনু হল : অপ্, দিক- সমূহ, নক্ষত্র, চন্দ্রমা । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৪।১২।১ দ্রষ্টব্য; এই মন্ত্রে দক্ষিণাগ্নিকে 'অন্বাহার্য-পচন অগ্নি' বলা হয়েছে ।)
১।১।৪-৩-৯। ত্বক, লোমসকল, ওষধি এবং বনস্পতি । ( ত্বচো লোমানি লোমভ্য ওষধিবনস্পতয়ো ।)
আকাশ তথা বায়ু যেমন পৃথিবী কে আবৃত করে রয়েছে, সেই রকমই ত্বক আমাদের শরীরকে আবৃত করে রেখেছে । 'ত্বক্' শব্দটিকে ত্বচ্ ও বলা হয়। ত্বচ্ ধাতুর অর্থ 'আবৃত' করা। আমাদের শরীরেরর ঊষ্মা-জনিত যে তাপমাত্রা, তা নিয়ন্ত্রিত হয় ত্বক এবং লোম সমূহের দ্বারা। আবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের যে তাপমাত্রা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করে 'ওষধি এবং বনস্পতিরা' , অর্থাৎ গাছ-পালা, লতা-গুল্ম-ভেষজ, বনানীরা । ভূমি, উদ্ভিদদের দ্বারা আবৃত হয়ে আছে, এবং মৃত্তিকার অন্তরে যে রস বা জল, তাকে শোষণ করে উদ্ভিদরা বেঁচে থাকে । সেইরকম, আমাদের ত্বক লোমের দ্বারা আবৃত, আবার আমাদের লোমকূপ থেকে ঘাম বেরিয়ে ত্বককে শীতল রাখে; একই ভাবে পাতার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ছিদ্রসকল থাকে তার ভিতর দিয়ে জল বাষ্পে পরিণত হয়ে বায়ুতে মিশে যায়, এবং এর ফলে গাছের নিকটবর্ত্তী পরিবেশ শীতল হয়।
ওষধি শব্দের অর্থ যা ওষ বা ঊষ্মা স্বরূপ প্রাণকে ধারণ করে আছে । ওষধি থেকে ঔষধ শব্দটি হয়েছে; যা ঊষ্মা বা প্রাণের তেজকে আমাদের মধ্যে বহন করে নিয়ে এসে, আমাদের রোগ থেকে মুক্ত করে, তা ঔষধ । এই জন্য এদের ভেষজ-ও বলা হয় । ভেষজ = ভ (ভরণ) + ইষ (তেজ-রসময়) + জ (জাত)— যা তজোরসময় সম্পন্ন হয়ে জাত।
'বন' অর্থে যিনি চিরপুরাতন, এবং যিনি 'নব' হয়ে নবীন হয়ে প্রকাশ পান । যা কিছু বনজ, বা বন থেকে জাত, তার উপর আধিপত্য করেন এই চিরপুরাতন পুরুষ । ইনি বনস্পতি, বা বনস্পতিরা তাঁরই প্রতিরূপ । এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে, —যথা (যেমন) বৃক্ষ বনস্পতি তথৈব (সেই রকমই) পুরুষঃ অমৃষাঃ (প্রত্যক্ষ) । তস্য (তাঁর) লোমানি (লোমসমূহ) পর্ণানি ( পত্র সকল ) ত্বক্ (ত্বক ) অস্য (ইঁহার) উৎপাটিকা (বল্কল) বহিঃ ( বাহিরে স্থিত) ।।, —যেমন) বনস্পতি বৃক্ষ, সেই রকমই প্রত্যক্ষ এই পুরুষ। তাঁর লোমসমূহই পত্র সকল, তাঁর ত্বক-ই বাহিরে স্থিত বল্কল । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৯।২৮ দ্রষ্টব্য ।)
যা অপ্ বা জল, তাই আমাদের মধ্যে প্রজনন, ডিম্বাণু ও সন্তান ধারণ সংক্রান্ত তরল রূপে অবস্থান করে ।
বয়ঃসন্ধি কালে মানুষের যৌনাঙ্গ, এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যে লোমরাজি উদ্গত হয়, তা এই রেত স্বরূপ অপ্ -দেবতার প্রভাবে হয় । বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২।৫।২ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে : এই অপ্ (জল-সমূহ) সর্ব্বভূতের মধু, সর্ব্বভূত এই অপের (জল-সমূহের ) মধু; এই জলে যে তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এই অধ্যাত্মে যে রৈতস তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এই-ই (এই উভয় পুরুষই ) তা, যিনি এই আত্মা; ইহাই অমৃত, ইহাই ব্রহ্ম, ইহাই সব । আমাদের স্পর্শ জ্ঞান মূলতঃ দ্বিতীয়তার বোধ; সমস্ত জ্ঞান বা অনুভূতির অন্তর্গত যে দ্বিতীয়তার অনুভূতি তা 'স্পর্শ'; আত্মা নিজেকে দ্বিতীয় করে, সেই দ্বিতীয় সত্তাকে নিজেতে অনুভব করেন। এই ভাবে আত্মা প্রাণ হয়ে বর্ধিত হন। এই একই প্রাণ দ্বিতীয় হন, এবং দ্বিতীয়তাকে কে নিজেরই বৃদ্ধি বলে জানেন; প্রাণের এই বর্ধন-ই, তাঁর বায়ু-রূপ প্রবাহ; এই প্রবাহে ইনি বর্ধিত হয়ে দ্বিতীয় হন, এবং দ্বিতীয়তা নিজেতেই সংলগ্ন থাকে, এবং তাই প্রাণ কে ১ হলেও ১-১/২ বলা হয়েছে। এই যে দ্বিতীয়তার সাথে সংলগ্নতা, এইটি স্পর্শ । প্রাণ যিনি বায়ুরূপে প্রবাহিত হন তাঁর বিষয়ে বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি অংশ নিম্নে উল্লেখ করা হল :
" ..............কতমঃ (কে ) অধি-অর্দ্ধঃ ( অধিঅর্দ্ধ-১-১/২ ) ইতি ; যঃ অয়ম্ (এই যিনি) পবত (প্রবাহিত হন) ইতি ।
তদাহুঃ (তাই বলে )— যৎ (যেহেতু) অয়ম্ (ইনি) এক ইব (একই) এব (এই ভাবে ) পবতে (প্রবাহিত হন), অথ (তা'হলে) কথম্ (কিভাবে ) অধি-অর্দ্ধঃ (অধিঅর্দ্ধ-১-১/২) ইতি । যৎ (যেহেতু) অস্মিন্ (এঁতে—এই প্রাণেতে) ইদং সর্ব্বং (এই সব) অধি-অর্ধ্নোৎ (বৃদ্ধি পায়) তেন (সেইহেতু) অধি-অর্দ্ধ (অধিঅর্দ্ধ-১-১/২ ) ইতি। কতম একঃ দেবঃ ইতি ; প্রাণঃ ইতি স ব্রহ্ম তৎ ইতি আচক্ষতে" —(প্রশ্ন) কে অধিঅর্দ্ধ (অধি-অর্ধ) (১-১/২) ?
(উত্তর) এই যিনি প্রবাহিত হন । যেহেতু এঁতে—এই প্রাণেতে এই সব বৃদ্ধি পায়, সেই হেতু অধিঅর্দ্ধ ((অধি-অর্ধ; ১-১/২ ) । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৯।৮ এবং ৩।৯।৯ দ্রষ্টব্য । ) যে স্পর্শ জ্ঞান আমাদের অধরোষ্ঠ এবং ত্বকে প্রতিষ্ঠিত, তাই বিরাটে প্রবহমান প্রাণ বা বায়ু ।
[ কেশ = ক + ঈশ = কোথায় ইশ্বর । শরীরে যা মস্তিষ্ক তা ঈশ্বর ক্ষেত্র), আর তাকে আবৃত বা যেন গুপ্ত করে রেখেছে মস্তিষ্কের কেশরাশি ।
শ্মশ্রু = শম + শ্রু = যে শমন বা শাসন-মূলক বাক্য সকল পুরুষ থেকে প্রকাশ পায়, যা শ্রুত হলে জীব শমিত হয়, তা শ্মশ্রু । মুখ থেকে যে বাক্ প্রকাশ পাচ্ছে, তারই শমন-সক্ষমতা রূপায়িত হয়েছে গণ্ডদেশের শ্মশ্রুরাজিতে ।
হৃদয়ই যজ্ঞের বেদি, এবং পুরুষের শরীরের মধ্যদেশের (হৃদয়ের) যে লোমরাজি তাই এই যজ্ঞর বেদিতে আস্তীর্ণ কুশাসন বা বর্হি ।
নখ = ন (নাস্তি)+খ (আকাশ)= আকাশ (অন্তরাকাশ) অর্থাৎ নিজের অধ্যাত্মবোধ, যার পর আর নেই, তার নাম 'নখ'। নখ, আমাদের শরীরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত । ত্বক, কেশ এবং নখ,—এর পর বহিরাকাশ। বাইরেটাও যে আমার অংশ, এ বোধ আমাদের এখনো ফোটেনি । ]
১।১।৪-৩-১০। হৃদয়, মন, এবং চন্দ্রমা (চন্দ্র) । (হৃদয়ান্মনো মনশ্চন্দ্রমা) ।
আত্মা বা প্রাণের দ্বারা যেখানে দান-আহরণ (গ্রহণ) এবং যমন (নিয়ন্ত্রণ)
ক্রিয়া চলছে, সেই চিৎ-ক্ষেত্রের নাম 'হৃদয়'। হৃদয় = হৃ (আহরণ) + দ (দান) + য (যমন) । একই আত্মা প্রেরক বা দাতা এবং গ্রহীতা। আমরা যা কিছু ভোগ করছি, যা কিছু অনুভব করছি, তা তিনিই প্রেরণ করছেন । এই প্রেরণ যেখান থেকে হয়, তার নাম 'ঊর্দ্ধ হৃদয়', এবং আমাদের শরীরে সেই জায়গার নাম মস্তিষ্ক । আর ভোক্তা আত্মার শরীর-গত যে অবস্থান, সেই জায়গার নাম 'নিম্ন হৃদয়', যা শরীরের মধ্যদেশ (নাভির ঊর্দ্ধে এবং কণ্ঠের নিম্নের অংশ ) । যাই হোক, আমরা জ্ঞানে বা বোধেই ভোগ করি, এবং জ্ঞানস্বরূপ, বোধস্বরূপ আত্মাই আমাদের ভোগ-সকলের 'প্রেরক' বা দাতা এবং গ্রহীতা। এই দুই-হৃদয়, আত্মার বোধে বা জ্ঞানে বিধৃত এবং তাঁরই জ্ঞান মূর্ত্তি । যিনি প্রেরক, তিনিই গ্রহীতা এবং ভোক্তা, এবং সে ভোগের যে পরিণতি তা তাঁরই যমন বা নিয়ন্ত্রণের দ্বারা নির্দিষ্ট হচ্ছে। আমরা সুখ, দুঃখ, ঈর্ষা প্রেম ইত্যাদি হৃদয়েই অনুভব করি। এই হৃদয়ের নাম বরুণালয়। এখানে প্রাণ, আমাদের ভোগ্য হচ্ছেন; প্রাণের এই ভোগ্য হওয়ার নাম অপ্(জল) । আধারশক্তি স্বরূপ অপের দ্বারা হৃদয় দিয়ে আমরা সবাইকে ধরে আছি; 'আমার' বা 'মম' এই মমত্ব বোধে, আমরা আমাদের যা কিছু প্রিয় তাকে জরিয়ে ধরেছি হৃদয়ের দ্বারা । এই অপ্-এর থেকেই স্থূল ভূত বা পৃথিবী জাত হয় । বৃহদারণ্যক উপনিষদের মন্ত্র ১।২।১ এ উক্ত হয়েছে যে "অপ্ই অর্ক। সেই যে অপের শরবৎ অংশ ছিল তা সম্যক রূপে কঠিন হয়েছিল ।" (নীচে পরিশিষ্ট অংশে বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।২।১ এবং ১।২।২ মন্ত্র অর্থ সহ উদ্ধৃত করা হয়েছে) ।
হৃদয়ে যে দান, আহরণ (গ্রহণ) কর্ম্ম হচ্ছে তার দ্বারা আমরা পরিণত হচ্ছি, আমাদের পরিবর্ত্তন সাধিত হচ্ছে, সেই অনুসারে আমাদের সংকল্পও পরিবর্ত্তিত হচ্ছে । সংকল্প এবং বিকল্প করাই মনের ধর্ম্ম । মনের সংকল্প অনুসারে আমরা কর্ম্ম করছি, ভৌতিক বিশ্বের সাথে যুক্ত হচ্ছি। 'মন' যখন আকৃতি নেয়, তখন তা 'মান' বা পরিমাপ-যোগ্য হয়; এই পরিমাপযোগ্য অবস্থাই 'ভৌতিকতা'। মন, মান-বিহীন । এই যে মন, তা সর্ব্বদা আমাদের যে 'ভৌতিক স্থিতি' যার অন্য নাম শরীর বা পৃথিবী, তাকে প্রভাবিত
করছে, যেমন চন্দমা বা চন্দ্রের দ্বারা পৃথিবী সর্ব্বদা প্রভাবিত । চন্দ্রমার দ্বারা পৃথিবীর জলরাশি যেমন উত্তাল, যাকে জোয়ার-ভাঁটা বলে, এই রকমই মনের দ্বারাই আমরা সংকল্প-বিকল্পময়, এবং আমাদের ইন্দ্রিয় সকল পরিচালিত । এই যা আমাদের অধ্যাত্মে মন, তাই বিরাটে চন্দ্রমা, এবং এই পার্থিব আকাশে আমাদের চন্দ্র । চন্দ্র = চম্ (চমন /পান )+ দ্র (দ্রষ্টৃ / ভোক্তা); সোমময় যে ভোগক্ষেত্র তার নাম চন্দ্র; সোমপান এবং তার দর্শন বা ভোগের কেন্দ্র হল চন্দ্র ।
১।১।৪-৩-১১। চন্দ্রমা, সোম এবং দক্ষিণাগ্নি ।
দক্ষিণাগ্নির বিষয়ে আমরা আগেও উল্লেখ করেছি । এই দক্ষিণাগ্নিকে, বা প্রাণের এই স্বরূপকে, 'অন্বাহার্য-পচন অগ্নি'-ও বলা হয়। যা কিছু হৃদয়ে ভোগের নিমিত্ত আহৃত হয়, তাকে পাচন-ক্ষম করে ভোক্তাতে জীর্ণ করা হয়, বা ভোক্তার সাথে তাকে সম্যক রূপে মিশ্রিত করা হয়। এর নাম 'যমন', এর দ্বারা সেই ভোক্তার ভোগ এবং তজ্জনিত যে পরিণতি তা হয়। আমাদের বিবর্ত্তন এবং অভুয়দয় এই দক্ষিণাগ্নির ক্রিয়াতে হয়। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, যিনি চন্দ্রমাতে দৃষ্ট হন, তিনি এই অন্বাহার্য-পচন অগ্নি বা দক্ষিণাগ্নি। এই ভোগ মিশ্রিত হয়, ভোক্তার সাথে সমান বা সম হয়, তাই এর নাম 'সোম'। এই মিশ্রণে ভোক্তা যে জ্যোতির্ম্ময় হয়, তাই তার সোমের বা চন্দ্রমার জ্যোতি বা জ্যোৎস্না । চন্দ্র যেমন আদিত্য-রশ্মিকে শোষণ করে, এবং জ্যোতির্ম্ময় হয়ে আলোক প্রতিফলন করে, সেইরকম-ই ভোক্তাতে সোমের শোষণ বা মিশ্রণ হয়, এবং ভোক্তা তার দ্বারা জ্যোতির্ম্ময় হয় । এই সোম পানের দ্বারা যে বর্ণ হয় তার মূল নাম পীত; এই জন্য চন্দ্রের বর্ণকে পীত বলা হয়, এবং পিত্তের বর্ণকেও পীত বলা হয় । পৃথিবীর এবং আমাদের শরীরের সমস্ত রসময়তা, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই চন্দ্রমার দ্বারা। এই সোম, রস বা অপ্-রূপে আকাশ থেকে বর্ষিত হয় বৃষ্টি হয়ে, এই রস বা অপ্ মৃত্তিকার অন্তরে গিয়ে সমস্ত উদ্ভিদ্ জগৎকে জীবন দান করে, ধরাতলের অধে স্থিত হয়ে জল-জীব এবং পাতালস্থ প্রাণীদের ধারণ করে; এই অপ্ সবার মধ্যে প্রজনন-শক্তি স্বরূপা এবং সন্তান ধারকশক্তি স্বরূপা; ইনি আমাদের আস্বাদনের অনুভূতি, আমাদের মধ্যে তৃপ্তি-স্বরূপা, সকল-তৃষ্ণাহারিণী এবং নির্ম্মলতা-প্রদায়িনী । তেজোময়ী যে অপ্, তাই সোম। তেজ-ই জলকে নিয়ে আসে (ছান্দোগ্য উপনিষদ মন্ত্র ৬।৮।৫ দ্রষ্টব্য । ); তেজ-ই অপ্ হয়ে আমাদের ভোগ্যা হন; তেজোময় আত্মাই 'প্রাণাগ্নি', এবং আত্মার / প্রাণের এই তেজ বা শক্তি-ই 'বাক্' ।
১।১।৪-৩-১২। নাভি-অপান-মৃত্যু । (নাভির্নিরভিদ্যত নাভ্যা অপানো'পানান্মৃত্যুঃ)।
ঋক্বেদ অন্তর্গত ঐতরেয় ব্রাহ্মণে 'নাভি' শব্দের অর্থ উক্ত হয়েছে। 'নাভি' কে 'বেন' বলা হয়েছে*। বেন্ ধাতুর অর্থ 'বেনন করা' বা 'বিচরণ করা'। যেখান থেকে, বা যে কেন্দ্র থেকে প্রাণাবর্ত্তন প্রসৃত হয়ে সর্ব্বাঙ্গে সঞ্চরিত হচ্ছে তার নাম 'নাভি'। এই জন্য আমাদের শরীরের মধ্যভাগ— নাভি এবং তৎ সংলগ্ন অঞ্চলকে, 'সৌর কেন্দ্র', মণিপুর (solar plexus) বলা হয়। বহিরাকাশের সূর্য্যের (সূর্যের) সাথে নাভির সাক্ষাৎ সম্বন্ধ রয়েছে। গর্ভস্থ ভ্রূণের নাভি যেমন নাড়ির দ্বারা গর্ভ-ধাত্রী মা-র সাথে সংযুক্ত থেকে প্রাণশক্তি আহরণ করে, সেই রকমই, ভূমিষ্ঠ বা জন্ম হবার পর, আমাদের নাভি কেন্দ্র, বহিরাকশের ঐ সূর্য্যের (সূর্যের) সাথে যুক্ত থাকে। এই জন্য মৃত্যুকালে পৃথিবী থেকে আমাদের উৎক্রমণ করার সময় যখন হয়, তখন বলা হয় 'নাভিশ্বাস উঠছে'; শরীরের সাথে এই সৌর-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । এই যে প্রাণ, যাঁর দ্বারা আমরা শরীরে প্রতিষ্ঠিত, বা যাঁর দ্বারা আমরা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত, তাঁর নাম 'অপান',— এ কথা আমরা আগেও বলেছি । এই অপানের দ্বারা মাতৃ-গর্ভস্থ জল বা অপ্ থেকে আমরা মূর্ত্ত হই, এবং পৃথিবীও অপ্ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ।( ১।১।৪-৩-১০ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য ।) মৃত হওয়ার একটি অর্থ হল, মূর্ত্ত হওয়া, নিজের অসীমতাকে বিসর্জ্জন করে, নিজেকে সসীম এবং আয়তনবান্ করে মূর্ত্ত করা ।
এই জন্য বলা হল : নাভ্যা (নাভি থেকে) অপানো (অপান), অপানাৎ (অপান থেকে) মৃত্যুঃ (মৃত্যু) । এখানে 'মৃত্যু' শব্দের তাৎপর্য, (১) মূর্ত্ত হওয়া, (২) অমূর্ত্ত (অশরীরী) হওয়া।
(* ঐতরেয় ব্রাহ্মণ প্রথম পঞ্চিকা, তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য---<https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.339572/page/n85/mode/2up> )
১।১।৪-৩-১৩। নাভি ।
নাভি শব্দের নিরুক্তি ঐতরেয় ব্রাহ্মণে উক্ত হয়েছে । ঋক্ বেদের একটি মন্ত্র (ঋক্ বেদ ১০।১২৩।১),—'অয়ং বেনশ্চোদয়েৎ পৃশ্নিগর্ভাঃ......' প্রসঙ্গে ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ঋষি 'নাভি' শব্দের ব্যখ্যা করেছেন। শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাশয় প্রণীত ঐতরেয় ব্রাহ্মণের বঙ্গানুবাদ থেকে এই অংশটি উদ্ধৃত করলাম : " অয়ং বেনশ্চোদয়ৎ পৃশ্নিগর্ভাঃ' এই মন্ত্রে যে বেন শব্দ আছে, সেই (নাভি) হইতে ঊর্দ্ধে কতিপয় প্রাণ (বায়ু) এবং অধোদিকে অন্য কতিপয় প্রাণ (বায়ু) বেনন (বিচরণ) করে; এই জন্য [ইহার নাম] বেন । এই নাভি আবার প্রাণস্বরূপ হইয়া [ঊর্দ্ধবর্ত্তী ও অধোবর্ত্তী অন্য প্রাণসকলকে] 'নাভেঃ' (না ভৈষীঃ—ভয় করিও না) বলে' এই জন্য ইহা নাভি; ইহাই নাভির নাভিত্ব । এই হেতু উক্ত মন্ত্র দ্বারা এই প্রবর্গ্যে প্রাণকেই স্থাপন করা হয় । "
প্রশ্নোপনিষদে (মন্ত্র ২।৬ ) উক্ত হয়েছে, — যথা অরা ইব রথ নাভৌ প্রাণে সর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতম্ ", যেমন রথ চক্রের অরা-সকল (spoke) [চক্রের কেন্দ্রে যুক্ত হয়ে থাকে) [সেই রকম-ই] প্রাণে সবাই প্রতিষ্ঠিত । এই কেন্দ্রই নাভি, এবং ইনি প্রাণ; ইনি সেই প্রাণ যিনি সকলকে মৃত্যুর পরপারে নিয়ে যান, যাঁকে উপনিষদ্ মুখ্য প্রাণ এবং 'আয়াস্য প্রাণ' বলে বন্দনা করেছেন। তাই ইনি অভয় দাতা; আবার এঁর থেকেই সবাই মূর্ত্ত হয়, এবং ইনি যখন শরীর থেকে উৎক্রমণ করেন, এঁর সাথেই সবাই উৎক্রমণ করে; ইহাই নাভির নাভিত্ব ।
১।১।৪-৩-১৪। শিশ্ন-রেত-অপ্ (শিশ্নাৎ রেতো রেতসঃ আপঃ) । শিবলিঙ্গ ।
শিশ্ন শব্দের সাধারণ অর্থ হল 'পুরুষের লিঙ্গ', যা বীর্য বা রেত-কে যোনির অভ্যন্তরে সিঞ্চন করে। 'শিশুম্ নয়তি' ইতি শিশ্ন। যে শিশুকে মাতৃগর্ভে নিয়ে আসে সে 'শিশ্ন'।
[বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ২।২।১), মধ্যমপ্রাণ, অর্থাৎ যিনি আমাদের মধ্যে প্রাণস্বরূপ, সর্ব্বেন্দ্রিয়ময়, তাঁকে শিশু বলা হয়েছে ।]
শিশ্ন শব্দটি শ্নথ্ ধাতু থেকে হয়েছে; শ্নথ্ অর্থে 'ভেদ' করা; এই শব্দটি 'শি' ধাতুর থেকেও হতে পারে, যার অর্থ 'প্রদান করা'; যা সন্তানকে গর্ভে প্রদান করে, তা শিশ্ন ।
যিনি পরম-আত্মস্বরূপ, তাঁকে ' বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং ' বলা হয়েছে। ইনি শিব-লিঙ্গ, কেননা বিশ্ববীজ এঁতে নিহিত ।
এই বিশ্ববীজকে যিনি জীব বা সত্তার আকারে প্রকাশ করেন, স্বয়ং-শক্তি আত্মার সেই শক্তির নাম হল বাক্ । প্রাণ এবং বাকের মিলনে সকলকিছু জাত হয়েছে। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ১।১।৫ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৫।৮।১ দ্রষ্টব্য ।)
বাক্ এবং প্রাণ যে উভয় উভয়ে রত হন, ইহাই রতি। এই রতি থেকে প্রাণের যে বীর্য্যকে, বাক্ জাত করেন, তার নাম 'রেত'। যা অধ্যাত্মে 'রেত' তাই অধিদৈবে 'অপ্'। জলের মধ্যে যেমন 'প্রতিফলন হয়', সে রকম এই দিব্যজলের নাম 'অপ্', যার থেকে প্রতিরূপ সৃষ্টি হচ্ছে । আমার সবাই এই আত্মস্বরূপের প্রতিরূপ । সন্তান, পিতার প্রতিরূপ । ঘুমের পর, পরের দিনকে আমরা আগের মতই ফিরে পাই, ইহাও প্রতিরূপ । এই জন্য প্রলয়ের পর যখন পুনঃ-সৃষ্টি হয়, তার সম্বন্ধে ঋক্ বেদে বলা হয়েছে, —'যথা পূর্ব্বম্ অকল্পয়ৎ',— যেমনটা পূর্বে ছিল, সেইরকম ভাবে কল্পিত (সৃষ্ট) হল। (ঋক্ বেদ মন্ত্র ১।১৯০।৩ দ্রষ্টব্য । ) এই অপ্ স্বরূপ চেতনার দৈব-ব্যক্তিত্ব হলেন 'বরুণ", এঁরই আবরণে প্রলয়ে প্রলীন জগৎ আবৃত হয়ে থাকে। এই অপ্ কে প্রাণের শরীর বলা হয়েছে; অথ এতস্য প্রাণস্য আপঃ শরীরম্ জ্য্যতিরূপম্ অসৌ চন্দ্রমা— আর, এই প্রাণের শরীর হল 'অপ্' এবং চন্দ্রমা তার জ্য্যতির্ম্ময় রূপ । ( বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ১।৫।১৩ দ্রষ্টব্য । ) আর যখন, পুনরায় সৃষ্টি হয়, তখন এই চেতনা/প্রাণ, যিনি বরুণ, তিনি মিত্র (সূর্য্য/সূর্য/দিবা) হয়ে আবার জগৎকে প্রকাশ করেন। ইনি বেদের মিত্রা-বরুণ । এই অপ্ প্রাণের শরীর, প্রাণকে ইনি আবৃত করে রেখেছেন । পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুর ইনি কারণ স্বরূপ; এঁকে জানলে পুনঃ পুনঃ যে বাধ্যতামূলক জন্মমৃত্যুর আবর্ত্তন, তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় । এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ১।২।৭) বলা হয়েছে,— অপ পুনর্মৃত্যুম্ জয়তি ---অপের দ্বারা পুনর্মৃত্যু জয় করে । এই অপের মধ্যে রয়েছেন প্রাণ, প্রাণাগ্নি, রয়েছে সকল রোগমুক্তির ভেষজ* ।
( * হয়ত এই বিজ্ঞানের ভিত্তিতে, Homeopathy চিকিৎসা প্রচলিত হয়েছিল।)
এই প্রসঙ্গে ঋক্ বেদের একটি মন্ত্র (ঋক্বেদ ১।২৩।২০) উদ্ধৃত করলাম : অপ্সু (অপেতে) মে (আমাকে) সোমো (সোম—সোমদেব) অব্রবীৎ (বলেছিলেন) অন্তঃ (অন্তরে) বিশ্বানি (সকল; সমগ্র) ভেষজা (ভেষজ) [আছে] । অগ্নিং চ (এবং অগ্নি) বিশ্ব (সকল বিশ্বের; সকলের) শম্ভুবম্ (শান্তি [শম] প্রদায়ী) আপঃ চ (এবং অপ্ সকল) বিশ্বভেষজী (সকল ভেষজ-সম্পন্ন)—আমাকে সোম-[দেব] বলেছিলেন, সকল ভেষজ অপের অন্তরে রয়েছে এবং রয়েছেন অগ্নি (প্রাণাগ্নি) যিনি সকলের শম (শান্তি) প্রদায়ী, এবং সর্ব্ব ভেষজ-সম্পন্ন অপ্-সমূহ ।
ঐতরেয় উপনিষদ্, প্রথম অধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ড।
১।২।১।
তা এতা দেবতাঃ সৃষ্ট্বা অস্মিন্মহত্যর্ণবে প্রাপতন্। তমশনায়াপিপাসাভ্যামন্ববার্জ্জৎ। তা এনমব্রুবন্নায়তনং নঃ প্রজানীহি যস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতা অন্নমদামেতি।।
১।২।১-১ অন্বয় ।
তাঃ (সেই) এতাঃ (এই সকল) দেবতাঃ (দেবতারা) সৃষ্ট্বাঃ (সৃষ্ট হয়ে) অস্মিন্ (এই) মহতী (মহৎ; বিপুল) অর্ণবে (চিৎ-সমুদ্রে; বর্ণ-সমুদ্রে) প্রাপতন্ (পতিত হলেন)। তম্ (তাকে-সেই মুর্ত্তিকে / সেই সৃষ্ট দেবসমূহকে) অশনায়া (ভোজনেচ্ছার সাথে ; ক্ষুধার সাথে) পিপাসাভ্যাম্ (পিপাসার সাথে) অন্ববার্জ্জৎ (অনু+অব+অর্জ্জৎ---সম্পন্ন করলেন; যুক্ত করলেন) তাঃ ( তাঁরা; সেই দেবতারা) এনম্ (এঁকে; স্রষ্টাকে) অব্রুবন্ (বললেন) আয়তনং (আয়তন) নঃ (আমাদের জন্য) প্রজানীহি* (জানুন; প্রজাত করুন; সৃষ্টি করুন) যস্মিন্ (যাতে) প্রতিষ্ঠিতা (প্রতিষ্ঠিত হয়ে) অন্নম্ (অন্নকে) অদাম (ভক্ষণ করব) ইতি।।
* প্রজানীহি শব্দটি 'প্র-জ্ঞা' ধাতুর রূপ। 'জ্ঞা' বা জানা মানেই সৃষ্টি করা— যা জানছে বা বোধ করছে, তাই হয়ে যাচ্ছে । সুতরাং, প্রজানীহি অর্থে 'প্রজাত করুন, সৃষ্টি করুন ।'
১।২।১-২ অর্থ।
সেই এই সকল দেবতারা সৃষ্ট হয়ে এই মহৎ (বিপুল) অর্ণবে (চিৎ-সমুদ্রে; বর্ণ-সমুদ্রে পতিত হলেন । তাকে (সেই মুর্ত্তিকে / সেই সৃষ্ট দেবসমূহকে) ভোজনেচ্ছার সাথে (ক্ষুধার সাথে) [এবং] পিপাসার সাথে সম্পন্ন করলেন (ক্ষুৎ-পিপাসার সাথে যুক্ত করলেন) তাঁরা (সেই দেবতারা) এঁকে (স্রষ্টাকে) বললেন— "আমাদের জন্য আয়তন প্রজাত করুন (সৃষ্টি করুন), যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্নকে ভক্ষণ করব" ।
১।২।১-৩।সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি।
১।২।১-৩-১। অর্ণব এবং বর্ণ ।
সেই এই সকল দেবতারা সৃষ্ট হয়ে এই মহৎ (বিপুল) অর্ণবে ( চিৎ-সমুদ্রে; বর্ণ-সমুদ্রে) পতিত হলেন : 'অর্ণব' অর্থে যার প্রকাশ হল 'বর্ণ' বা পরিস্ফুট অক্ষর সকল, চেতনার বর্ণময় স্ফুট সকল। এই বর্ণগুলি পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে অর্থময় অবয়ব, ভাষা, রূপময় বিশ্বকে সৃষ্টি করে। যেখানে অব্যক্ত বাক্, সেখানে 'অর্ণব', আর যেখানে ব্যক্ত বাক্, সেখানে 'বর্ণ' । আমরা, ১।১।৩-৪ এবং ১।১।৪-৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি যে দেবতাদের মধ্যে প্রথম যিনি সৃষ্টি হয়েছিলেন, তিনি ব্রহ্মা, এবং ইনি দৈব মন। এঁর থেকে মান সম্পন্ন, পরিমাপ-যোগ্য বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই ব্যক্ত বিশ্ব, বা ভৌতিক বিশ্বের মূলে রয়েছেন ব্রহ্মা বা দৈব-মন, এবং এঁর শক্তি হলেন ব্যক্ত-বাক্,—বাক্দেবী সরস্বতী ।
১।২।১-৩-২। অশনায়া-পিপাসা (ক্ষুৎ-পিপাসা) ।
বাক্ ও প্রাণের যে মিথুন, তা প্রথম মিথুন। স্বয়ংপ্রকাশ-স্বয়ংশক্তি আত্মা নিজেকে বাক্, ও প্রাণরূপে দ্বিধা করে, একে অপরে রত হন, এর নাম মিথুন। এই দৈবী-বাক্ এবং দৈবী প্রাণ থেকে যিনি জাত হন, তিনি দৈব-মন ।
বৃহদারণ্যক উপনিষদের ৫।৮।১ মন্ত্রে বলা হয়েছে, প্রাণ হলেন ঋষভ (বৃষ), বাক্ হলেন ধেনু (গাভী) এবং মন হলেন বৎস ।
আবার সেই দৈব মন এবং বাকের মিলনে মান-সম্পন্ন, পরিমাপযোগ্য বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে, এ কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি।
ব্বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে অশনা (অশনায়া) রূপ মৃত্যু, মন এবং বাক্ হয়ে ছিলেন, এবং সেই মন এবং বাকের মিথুনে তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন বা যা কিছু সব সৃষ্টি হয়েছিল। 'অশনা' অর্থে 'খাওয়া' । 'অশনায়য়া' অর্থে 'ভোজনেচ্ছা'। যেহেতু সৃষ্টির পূর্ব্বে সবকিছু অব্যক্ত ছিল, বা মৃত্যুর দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তাই বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ১।২।১), স্রষ্টাকে মৃত্যু রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আত্মা নিজেকে দ্বিতীয় করে, সেই দ্বিতীয়তা কে ভোগ করছেন, ভোজন করছেন । এই জন্য বলা হয়েছে অশনায়া-রূপ মৃত্যুর থেকে 'সৃষ্টি' হয়েছে । যা কিছু ইনি সৃষ্ট করেছেন, তাকে আবার নিজেতে ফিরিয়ে আনছেন; খাওয়া মানেই নিজেতে খাদ্যকে একসা করা। এই যে নিজেতে একসা করছেন,— ভোগের দ্বারা, ভোজনের দ্বারা, তার ফলস্বরূপ আমরা বিবর্ত্তিত হচ্ছি, আমাদের মুক্তির পথে অভ্যুদয় হচ্ছে ।
সঃ (তিনি) অকাময়ত (কামনা করেছিলেন) দ্বিতীয় ম (আমার দ্বিতীয়) আত্মা (আত্মা—সত্তা) জায়েত (জাত হোক) ইতি । সঃ (তিনি) মনসা (মনের দ্বারা) বাচম্ (বাকের সাথে) মিথুনম্ (মিথুন) সমভবৎ (করলেন) অশনায়া মৃত্যুঃ (অশনায়া রূপ মৃত্যু).—তিনি (অশনায়া রূপ মৃত্যু) কামনা করেছিলেন— "আমার দ্বিতীয় সত্তা (রূপ) জাত হোক" । তিনি মনের দ্বারা বাকের সাথে মিথুন করলেন । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ১।২।৪ থেকে উদ্ধৃত ।)
পিপাসা অর্থে তৃষ্ণা; পিপাসার প্রকৃত অর্থ 'তেজ বা বাক্', যা প্রাণ বা জলকে নিজেতে নিয়ে আসে এবং যার দ্বারা (অর্থাৎ পিপাসার্ত্ত হলে) আমরা জল বা অপ্-কামী হই, এবং জলকে বা প্রাণকে পেয়ে তৃপ্ত হই । ( যেমন খুব যখন গরম পড়ে, তারপর বৃষ্টি হয়। )
আবার জল বা রস 'অন্ন'কে নিজেতে নিয়ে আসে । আমার রসময়, আস্বাদনময় হতে চাইলে, আমরা অন্ন-কামী হই । অন্ন মানে, প্রাণের পোষণ-ময় রূপ সকল,—যার দ্বারা প্রাণ আমাদের পোষণ করছেন । আর ভুক্ত অন্ন, রসময় হয়ে আমাদের সাথে একীভূত হয় ।
বাক্-ই তেজ, প্রাণ-ই জল, এবং মন-ই অন্ন। বাক্, প্রাণ এবং মন আত্মার তিনটি স্বরূপ, যা সকল কিছুর উপাদান । ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বিশেষ ভাবে 'ত্রিবিৎ' বা বাক্, প্রাণ, এবং মনের বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হয়েছে।
এই জন্য ঐতরেয় উপনিষদে বলা হল যে সৃষ্টি, অশনায়া এবং পিপাসার দ্বারা যুক্ত হল । অশনায়া (মৃত্যু—যা প্রাণের আবরণ/প্রাণ) এবং পিপাসা (তেজ/বাক্) এই দুই-এর দ্বারাই মন (অন্ন/মূর্ত্ত বিশ্ব) সৃজিত হয় । বাক্ ও প্রাণের মিথুনের কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি।
অশনা এবং পিপাসার বিষয়ে ছান্দোগ্যে যা উক্ত হয়েছে, তা উদ্ধৃত করলাম :
অশনাপিপাসে (অশনা এবং পিপাসার বিষয়ে') মে (আমার থেকে) সোম্য (সৌম্য) বিজানীহি (বিজ্ঞাত হও) ইতি।
যত্র (যখন) এতৎ (এই) পুরুষঃ (পুরুষের) অশিশিষতি (ভোজন-ইচ্ছুক; ক্ষুধার্ত্ত) নাম [হয়] আপ (অপ্) তদ্ (তখন) অশিতং (ভুক্ত খাদ্যকে; ভুক্ত অন্নকে ) নয়ন্তে (নিয়ে চলে) তদ্ (তা) যথা (যেমন) গোনায়ঃ
(রাখাল; গোপালক) অশ্বনায়ঃ (অশ্বপালক) পুরুষনায় (জননেতা) ইতি এবং (এই রকম-ই) তৎ (তখন) অপঃ (অপ্-কে) আচক্ষতেঃ ([লোকে] বলে) অশনায়/অশনায়া (অশনায়) ইতি । তত্র (সেই কারণে) এতৎ শুঙ্গম্ (এই যে শুঙ্গ/ এই যে অঙ্কুর—শরীর/মূর্ত্তি) উৎপতিতম্ (উৎপাদিত) সোম্য (সৌম্য) বিজানীহি ([ইহা] জান) ন (না) এতৎ (ইহা/এই শরীর/এই ভূতত্ব) অমূলং (মূল বিহীন) ভবিষ্যতি (হতে পারে ) ইতি—যখন এই পুরুষের নাম [হয়] ভোজন-ইচ্ছুক [বা ক্ষুধার্ত্ত ], অপ্ তখন ভুক্ত খাদ্যকে (ভুক্ত অন্নকে ) নিয়ে চলে [আনয়ন করে ],— তা যেমন গো-পালক (গো সকলকে পরিচালনা করে), অশ্বপালক ( অশ্ব সকলকে পরিচালনা করে) জননেতা ( লোক সকলকে পরিচালনা করে ) এই রকম-ই , [এবং] তখন অপ্-কে (জল-কে) [লোকে] বলে 'অশনায়া' (যে 'অশন' বা খাদ্যকে পরিচালনা করে) । সেই কারণে সৌম্য [ইহা] জান, এই যে শুঙ্গ (/ এই যে অঙ্কুর/ এই যে শরীর বা মূর্ত্তি বা অন্ন ) [যা] উৎপাদিত, ইহা (এই শরীর/এই ভূতত্ব) মূল-বিহীন হতে পারে না। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৬।৮।৩।)
(ভৌতিকতার/ শরীরের বা অন্নের কারণ বা মূল হল 'অপ্'।)
আমরা আগেও উল্লেখ করেছি যে ভৌতিকতার মূলে রয়েছে চেতনার অপ্ বা 'জল স্বরূপ' । আমরা যা খাই, তাকে ইনি (এই অপ্) রসময় করে, আস্বাদনময় করে, আমাদের সাথে, প্রাণের সাথে একসা করেন। এই খাদ্যকে ইনি-ই পরিচালনা করেন। আমাদেরকে আস্বাদন-অভিলাষী করে, ক্ষুধার্ত্ত করে, ইনি-ই অন্ন বা খাদ্যকে আমাদের সাথে মিশ্রিত করছেন, এবং অন্নকে আমাদের অঙ্গরসে পরিণত করছেন ।
যত্র (যখন) এতৎ (এই) পুরুষঃ (পুরুষ) অশিষতি (পিপাসিত) নাম (নাম হয়) তেজঃ এব (তেজ-ই) তৎ (তখন) পীতং (যা পীত হয়েছে) নয়তে (নিয়ে চলে) তদ্ (তা) যথা (যেমন) গোনায়ঃ ( রাখাল; গোপালক) অশ্বনায়ঃ (অশ্বপালক) পুরুষনায় (জননেতা) ইতি এবং (এই রকম-ই) তৎ (তখন) তেজঃ (তেজকে) আচষ্ট ([লোকে] বলে) উদন্যা (উদন্যা) ইতি । তত্র (সেইকারণে) এতৎ শুঙ্গম্ (এই যে শুঙ্গ/ এই যে তেজ) উৎপতিতম্ (উৎপাদিত) সোম্য (সৌম্য) বিজানীহী ([ইহা] জান) ন (না) এতৎ (ইহা) অমূলং (মূল বিহীন) ভবিষ্যতি ( হতে পারে ) — যখন এই পুরুষের নাম [হয়] পিপাসিত [বা তৃষ্ণার্ত্ত ], তেজ তখন পীত [অপ্/জল/রস] কে নিয়ে চলে [আনয়ন করে ],— তা যেমন গো-পালক (গো সকলকে পরিচালনা করে), অশ্বপালক ( অশ্ব সকলকে পরিচালনা করে) জননেতা ( লোক সকলকে পরিচালনা করে ) এই রকম-ই , [এবং] তখন তেজ-কে [লোকে] বলে উদন্যা । সেই কারণে সৌম্য [ইহা] জান এই যে শুঙ্গ (/ এই যে অঙ্কুর/ এই যে অপ্) [যা] উৎপাদিত, তা মূল-বিহীন হতে পারে না। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৬।৮।৫।)
(অপ্-এর /রসের/ জলের কারণ বা মূল হল 'তেজ'।)
আমরা যখন তৃষ্ণার্ত্ত বা পিপাসিত হয়ে জল পান করি, তখন তেজ-ই জলকে আনয়ন করে, — যেমন সৌর তেজ-ই বৃষ্টির কারণ স্বরূপ । তেজোময় বা পিপাসিত হই বলেই 'অপ্' কে ভোগ করতে পারি, রসময় হতে পারি । আমরা তেজের দ্বারাই কাম্যর দিকে যাই বা গতিময় হই । আবার ,যখন জল পান করি, অথবা আমরা যখন আহার করে তৃপ্ত হই, সেই পীত জল, সেই তৃপ্তি তেজেই নীত হয়; এই জন্য ভুক্ত অন্নের দ্বারা আমাদের তেজ বর্ধিত হয় ।
ভুক্ত-আমি, যাই ভোগ করি, তা আত্ম-তেজেই উপনীত হয় ; তা এই আত্মস্বরূপে সংস্কারাকারে বিধৃত থাকে, এবং পুনরায় এই তেজের দ্বারা সে (সেই আত্ম-কণা) অপ্ বা জলেই পরিচালিত হয়ে ভোগময় হয়। এই তেজের নাম উদন্যা,— ইনি তেজোময়ী বাক্ । ইনি উদন্যা, কেননা হৃদয়ে—অপে/রসে, যেখানে আমরা ভোগ করি, সেখান থেকে ইনি আমাদের উঠিয়ে (উৎ) নিয়ে যান। প্রশ্নোপনিষদে এঁকে উদান বলা হয়েছে—প্রাণের, চেতনার 'উদানরূপ' । উদন্যা এই উদানের শক্তি । বাক্ই প্রাণের শক্তি; তাই উদন্যা বাকের-ই নাম। আমরা যখন প্রয়ানকেলে প্রাণের সাথে শরীর থেকে উত্থিত হই, সেই প্রাণের নাম উদান । (প্রশ্নোপ্নিষদ্ মন্ত্র ৩।৭ দ্রষ্টব্য ।) যেমন করে আমরা ভোগের পর এঁতে, এই তেজেতে আহৃত হই, তদনুসারে, আমাদের দেহত্যাগের পর কোথায় আমাদের উদান নিয়ে যাবেন, তা নির্দ্ধারিত হয় ।
১।২।১-৩-৩।"আমাদের জন্য আয়তন প্রজাত করুন (সৃষ্টি করুন), যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্নকে ভক্ষণ করব"।
উপড়ে যে বাক্ (তেজ/পিপাসা), প্রাণ (জল/অশনা), এবং মন (অন্ন), আত্মার এই তিনটি স্বরূপের কথা উল্লেখ করা হল, এই তিন হলেন প্রধান দেবত্রয়, যাঁদের সমাসে, সর্ব্ব দেবগণ এবং সমস্ত কিছু সৃষ্টি হয়েছে। ( ছান্দোগ্য ষষ্ঠ অধ্যায় দ্রষ্টব্য । ) মন-ই অন্ন, এবং দৈব মন থেকে মূর্ত্ত, ব্যক্ত বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। দৈব মন-ই ব্রহ্মা । মনের ধর্ম্ম-ই হল আয়তনময় হওয়া । যা কিছু দৈব মন থেকে প্রকাশ পেয়েছে, তা অন্ন, তা মূর্ত্তি; ফুল, ফল, আকাশ, নদী, সব-ই অন্ন, এবং এদের থেকে যে বেদ বা বোধ বা অনুভূতি আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে, তার দ্বারা আমরা চেতায়িত হচ্ছি, জেগে আছি । আমরা নিজেরাও অন্ন, এবং একে অপরকে পুষ্ট করছি, বেদনময় করছি ।
১।২।১-৩-৪। অন্ন।ইনি, এই স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা, নিজেতে নিজে আরোহিত হয়ে, নিজেতে নিজের এক-একটি রূপকে আরোপিত করে, মূর্ত্ত হয়েছেন । অন্ বা প্রাণ, এই ভাবে মন হয়ে, নিজেতে আরূড় হয়ে মূর্ত্ত হন বলে, ইনি 'অন্ন'। 'ন্ন' যুক্তাক্ষরটি এই 'আরূড়' অবস্থাকে বোঝায়; এর নাম 'রোহিত' রূপ; এই জন্য ব্রহ্মার বর্ণ রোহিত বা লোহিত । যা কিছু, দৈব মন বা ব্রহ্মার থেকে প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে ব্রহ্মা-সহ সর্ব্ব দেবগণ আরূড় । আমরা সবাই দেবতাদের বাহন এবং অন্ন ।
তাই সৃষ্টি-কালে দেবতারা স্রষ্টাকে বললেন, আমাদের জন্য আয়তন সৃষ্টি করুন, যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্ন ভক্ষণ করব ।
অন্ন = অন্+অন্,—অর্থাৎ 'অন' বা প্রাণ, 'অন' বা প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত । অন্ন শব্দের অর্থ তৈত্তরীয় উপনিষদে করা হয়েছে । সেখানে উক্ত হয়েছে, অন্ন অন্নতেই প্রতিষ্ঠিত । যেমন, তৈত্তরীয় উপনিষদের সপ্তম অনুবাকে (মন্ত্র ৩।৭) উক্ত হয়েছে : প্রাণো বা অন্নম্ (প্রাণ-ই অন্ন) শরীরম্ (শরীর) অন্নাদম্ (অন্ন ভোক্তা) । প্রাণে শরীরম্ (প্রাণে শরীর) প্রতিষ্ঠিতম্ (প্রতিষ্ঠিত) । শরীরে প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিতঃ ( শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত) । তদেতদন্নম্ (তৎ[তাই] এতদ্ [এই রূপে] অন্নম্ [অন্ন] অন্নে [অন্নে] প্রতিষ্ঠিতম্ [প্রতিষ্ঠিত]—প্রাণ-ই অন্ন; শরীর অন্নাদ (অন্ন ভোক্তা) । প্রাণে শরীর প্রতিষ্ঠিত, শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত । তাই, এই রূপে অন্ন অন্নে প্রতিষ্ঠিত ।
এই শরীর বা ভৌতিক অস্তিত্ব প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত বা প্রাণকেই আশ্রয় করে রয়েছে। প্রাণের থেকেই শরীর বা ভৌতিকতা প্রকাশ পেয়ে প্রাণেরই আশ্রিত হয়ে আছে, বা প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত। আবার প্রাণই ভূত বা আয়তন-ময় হয়েছেন এবং প্রতি আয়তনে প্রাণের নিয়ন্ত্রণ বা ক্রিয়া সক্রিয় । তাই প্রাণ শরীরে প্রতিষ্ঠিত। এই ভাবে প্রাণে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর নাম অন্ন । (তৈত্তরীয় উপনিষদ মন্ত্র ৩।৭, ৩।৮, ৩।৯ দ্রষ্টব্য । )
১।২।১-৩-৫। আয়তন ।
আয়তন = আ (ব্যাপ্তি, বিস্তার) + যত (নিয়ন্ত্রিত) । বিস্তার বা ব্যাপ্তি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা সীমিত হলে, তখন আয়তন রচিত হয়। আয়তনের বাহিরে বহিরাকাশ, যেখানে আর সেই আয়তন-সম্পন্ন পুরুষ নিজেকে অনুভব করতে পারে না । সুতরাং আয়তন-ময় হওয়া মানে সীমাবদ্ধ হওয়া; এর নাম বা 'ব্যষ্টি' । এই জন্য উপনিষদে বলা হয়েছে প্রাণ বা বায়ু-ই ব্যষ্টি এবং বায়ু-ই সমষ্টি । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৩।২ দ্রষ্টব্য । ) ব্যষ্টি যাঁতে সমাপ্ত হয়, সকল আয়তন যাঁতে 'সম' হয়ে অনায়তন হয়ে থাকে, তিনি 'সমষ্টি'। ছান্দোগ্য উপনিষদে বায়ুকে 'অশরীরী' বলা হয়েছে।
১।২।২।
তাভ্যো গামানায়ৎ । তা অব্রুবন্ ন বৈ নো'য়মলমিতি । তাভ্যো'শ্বমানয়ৎ । তা অব্রুবন্ ন বৈ নো'য়মলমিতি ।
১।২।২-১। অন্বয় ।
তাভ্যঃ (তাদের জন্য) গাম্ (গো/গরুকে) আনয়ৎ (আনয়ন করলেন; নিয়ে আসলেন) । তাঃ (তারা—সেই দেবতারা) অব্রুবন্ (বলল) ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্ (এইটি) অলম্ (পর্য্যাপ্ত) ইতি। তাভ্যঃ (তাদের জন্য) অশ্বম্ (অশ্বকে) আনয়ৎ (আনলেন); তাঃ (তারা—সেই দেবতারা) অব্রুবন্ (বলল) ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্ (এইটি) অলম্ (পর্য্যাপ্ত) ইতি ।
১।২।২-২। অর্থ ।
তাদের জন্য গো-কে [গো-রূপ আয়তনকে] নিয়ে আসলেন । তাঁরা—সেই দেবতারা বললেন, "আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় ।" তাঁদের জন্য অশ্বকে [অশ্ব-রূপ আয়তনকে] নিয়ে আসলেন; তাঁরা—সেই দেবতারা বললেন, "আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় ।"
১।২।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি।
মনের সংকল্পের দ্বারা ইন্দ্রিয়রা পরিচালিত হচ্ছে, এবং তাই আমরা কর্ম্মময়। 'গো' অর্থে ইন্দ্রিয়, যাদের দ্বারা এবং যাদের সাথে আমরা বিচরণ করি। ইন্দ্রিয়-সম্পন্ন আমরা ইন্দ্রিয়ময় হয়ে সর্ব্ববিষয়ে গমন করছি। গো শব্দটি গম্ ধাতু থেকে হয়েছে; গম্ অর্থে চলা, গমন করা। এই বিচরণের দ্বারাই আমরা পুষ্ট হই, চেতায়িত হই । গরুরা যেমন বিচরণ করতে করতে তৃণাদি ভক্ষণ করে, সেই-রকমই আমরা ইন্দ্রিয়ময় হয়ে জগতে বা আমাদের মন-ভূমিতে বিচরণ করছি, এবং এর নাম বেঁচে থাকা। গোদুগ্ধ যেমন পুষ্টি দেয়, সেই রকম, শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ রূপে সোম বা অনুভূতি রাশি ইন্দ্রিয় মাধ্যমে আমাদের অনবরত পুষ্ট করছে ।
প্রতি জীবের যে মনোময় বিশ্ব, যাতে অনন্ত বৈচিত্র্য প্রকাশ পাচ্ছে, তা যে দেবতাদের অধীনে, বা সেই প্রকাশ যে চিন্ময় দিব্য পুরুষদের থেকে প্রকাশ পাচ্ছে, তাঁরা 'গো-আয়তনে' প্রতিষ্ঠিত দেবগণ বা দেবশক্তি । প্রকাশের দ্বারাই দেবগণ ভোগ করেন । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার এক একটি মহিমা দেবতারা বহন করছেন।কিন্তু, মাত্র এই মানস-ভূমিতে প্রতিষ্ঠা দেবতাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই স্রষ্টা যখন গো-কে আনলেন তাঁরা বললেন,— " ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্ (এইটি) অলম্ (পর্য্যাপ্ত)— আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় ।
প্রাণগতির নাম অশ্ব । এই অশ্ব-ই আমাদের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের আকারে গতি-ময় । প্রাণ মানেই কাল । প্রাণের চলাই আয়ু, এবং এই চলাই কাল-রূপ রথে আমাদের পরিক্রমণ । যেখানটা আমাদের অন্তর, আমাদের মর্ম্ম, সেইখানে আমরা প্রাণময় । প্রাণময় মানেই কামময়; কামময় মানেই সংকল্পময় বা মনোময় । মনের গতির মূলে রয়েছে প্রাণ । কামনা, সুখ, দুঃখ, ঈর্ষা, ভালবাসা, ইত্যাদি হৃদয়ের বিভিন্ন বৃত্তি এই প্রাণ-ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল। এই প্রাণ বা হৃদয় ক্ষেত্রের উপর যে দেবতারা আধিপত্য করছেন, তাঁরা ঐ অশ্ব-রূপ আয়তনে প্রতিষ্ঠিত । কিন্তু এই অশ্ব এবং গো, এই দুই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়াও সেই দেবতাদের কাছে পর্য্যাপ্ত নয়। তাই স্রষ্টা যখন অশ্বকে আনলেন, তখনো তাঁরা বললেন,— " ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্ (এইটি) অলম্ (পর্য্যাপ্ত)— আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় ।
১।২।৩
তাভ্যঃ পুরুষমানয়ৎ । তা অব্রুবন্—সুকৃতং বতেতি । পুরুষো বাব সুকৃতম্। তা অব্রবীদ্—যথায়তনং প্রবিশতেতি ।
১।২।৩-১। অন্বয় ।
তাভ্যঃ (তাদের জন্য) পুরুষম্ (পুরুষকে) আনয়ৎ (আনয়ন করলেন; নিয়ে আসলেন) । তা (তারা—সেই দেবতারা) অব্রুবন্ (বলল)—সুকৃতং বত ইতি (সুকৃতং ইতি -সুকৃত-ই; বত-বটে) । পুরুষঃ বাব (পুরুষ-ই) সুকৃতম্ (সুকৃত) । তাঃ (তাদেরকে) অব্রবীদ্ (বললেন—স্রষ্টা বললেন) যথা আয়তনং (এই যে আয়তন তাতে) প্রবিশত (প্রবেশ করো) ইতি ।
১।২।৩-২। অর্থ ।
তাদের জন্য পুরুষকে আনয়ন করলেন । তাঁরা—সেই দেবতারা বললেন— "সুকৃত-ই বটে । পুরুষ-ই সুকৃত ।" তাঁদেরকে [স্রষ্টা] বললেন— "এই যে আয়তন তাতে প্রবেশ করো ।"
১।২।৩-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
পুরুষ এবং সুকৃত ।
১।১।৩-৪ অনুচ্ছেদে 'পুরুষ' শব্দের ব্যখা করা হয়েছে । প্রতি সত্তায়, প্রতি আয়তনে, এই এক অদ্বিতীয় আত্মা বিরাজ করছেন। নিজেকে খণ্ডন করে, একই নিজবোধ-স্বরূপ আত্মা, প্রতি সত্তায়, প্রতি আয়তনে বা প্রতি পুরে বিরাজ করছেন। এই খণ্ডিত ('ষ'), এবং পুরস্থ আত্মাই 'পুরুষ' । আবার এই পুরুষের থেকে প্রাণের ঊষ্মা প্রকাশ পাচ্ছে; পুর+উষ্/ঊষ্মা = পুরুষ; উষ্ ধাতুর অর্থ 'দগ্ধ করা'। এই ঊষ্মা বা প্রাণের দ্বারা, সমস্ত পাপকে বা মৃত্যুকে ইনি 'পূর্ব্বেই দগ্ধ (পূর্ব্বম্ ঔষৎ)' করেছিলেন বলেও এঁর নাম 'পুরুষ'। বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৪।১ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে : আত্মা বা ইদম্ অগ্র আসীৎ পুরুষবিধঃ — 'ইদম্' বা সৃষ্টির অগ্রে (পূর্ব্বে) আত্মাই পুরুষ রূপে ছিলেন । এই মন্ত্রের পরবর্ত্তী অংশে ( বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৪।১ মন্ত্র) বলা হয়েছে — সঃ (তিনি) যৎ (যেহেতু) পূর্ব্বঃ (পূর্ব্ববর্ত্তী হয়ে) অস্মাৎ (এই সকলের থেকে), সর্ব্বস্মাৎ (এই সমূদয় থেকে ) সর্ব্বান্ (সমস্ত) পাপ্মনঃ (পাপসকলকে) ঔষৎ ( দগ্ধ করেছিলেন), তস্মাৎ (সেই হেতু) পুরুষঃ (পুরুষ; পুরুষ নাম) ভবতি (হয়)— যেহেতু তিনি এই সকলের থেকে পূর্ব্ববর্ত্তী হয়ে, এই সমূদয় থেকে সমস্ত পাপসকলকে দগ্ধ করেছিলেন, সেই হেতু [এঁর] নাম হয় পুরুষ ।
ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, ভূত-সকল অর্থাৎ যা কিছু মূর্ত্ত বা স্থূল, তার রস পৃথিবী বা চিন্ময়-আত্মস্বরূপের পৃথক-পৃথক মূর্ত্ত প্রকাশের ব্যক্তিত্ব; পৃথিবীর (বা ভৌতিকতার) রস অপ্, অপের রস ওষধি, ওষধির রস পুরুষ । (ছন্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ১।১।২।) এই যে ওষধি, তা পুরুষের যে প্রাণময়তা—তার-ই ঊষ্মা, বা ঊষ্মাকে বহন করে ।
এই পুরুষই সুকৃত । সুকৃত শব্দের একটি অর্থ, — যা সুন্দর ভাবে কৃত ।
সুকৃত = সু + কৃত । সোম-লতাকে থেঁতলে, পেষণ করে, সোম-রসকে বের করার নাম 'সু' । সকল সোম, বা প্রাণের সকল রসময়তা, যাঁতে 'কৃত', তিনি 'সুকৃত'।
এই যে ভৌতিক বিশ্ব বা পৃথিবী থেকে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং গন্ধ, যা আমাদের মধ্যে আসছে, তা আমাদের অনুভূতি বা সোম-ই । এই ভৌতিক বিশ্বরূপ যে সোমলতা, তাকে থেঁতলে আমাদের মধ্যে যে অপ্ /আপ্তি বা অনুভূতি-রাশি ভোগ হচ্ছে, তার থেকে জাত হচ্ছে বা নির্গত হচ্ছে ওষধি বা প্রাণের ঊষ্মা, আর তা যাচ্ছে পুরুষে । পুরুষ-ই ভোক্তা; অসঙ্গ অথচ ভোক্তা। এ-সবই হচ্ছে চেতনায়, জ্ঞানক্ষেত্রে । এই যে সোম কৃত হচ্ছে, এবং পুরুষে নিবেদিত হচ্ছে, তাই পুরুষ 'সুকৃত' । যা বহির্বিশ্ব, তা আত্মার দেবময় প্রকাশ; আর সেখান থেকে 'সোম' এসে, অধ্যাত্মে সেই পুরুষ-রূপী একই আত্মায় নিবেদিত হচ্ছে । গো-অশ্ব-গতি-সম্পন্ন বা অন্তর্বহি গতিময় এই যে আমরা, সেই আমাদের মধ্যে বা আমাদের আয়তনে এই পুরুষই সুকৃত রূপে দৃষ্ট হচ্ছেন ।
১।২।৪।
অগ্নির্ব্বাগ্ভূত্বা মুখং প্রাবিশৎ, বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা নাসিকে প্রাবিশৎ, আদিত্যশ্চক্ষুর্ভূত্বা'অক্ষিণী প্রাবিশৎ দিশঃ শ্রোত্রং ভূত্বা কর্ণৌ প্রাবিশন্ ওষধিবনস্পতোয়ঃ লোমানি ভূত্বা ত্বচং প্রাবিশন্, চন্দ্রমা মনো ভূত্বা হৃদয়ং প্রাবিশৎ, মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশৎ, আপো রেতো ভূত্বা শিশ্নং প্রাবিশৎ।
১।২।৪-১। অন্বয় ।
অগ্নিঃ (অগ্নি) বাক্ (বাক্) ভূত্বা (হয়ে) মুখম্ (মুখের অভ্যন্তরে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন) , বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা (বায়ু প্রাণ হয়ে) নাসিকে (নাসিকাতে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন) , আদিত্যঃ চক্ষুঃ ভূত্বা (আদিত্য চক্ষু হয়ে) অক্ষিণী (অক্ষিদ্বয়ে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন), দিশঃ (দিক সকল) শ্রোত্রং ভূত্বা (শ্রোত্র/শ্রুতি হয়ে ) কর্ণৌ (কর্ণদ্বয়ে) প্রাবিশন্ (প্রবেশ করলেন), ওষধিবনস্পতোয়ো (ওষধিবনস্পতি সকল) লোমানি ভূত্বা (লোমসমূহ হয়ে) ত্বচং (ত্বকে) প্রাবিশন্ (প্রবেশ করলেন), চন্দ্রমা মনো ভূত্বা (চন্দ্রমা মন হয়ে) হৃদয়ং (হৃদয়ে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন), মৃত্যুঃ অপানো ভূত্বা (মৃত্যু অপান হয়ে) নাভিং (নাভিতে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন), আপো রেতো ভূত্বা (অপ্ রেত হয়ে শিশ্নং (শিশ্নতে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন) ।
১।২।৪-২। অর্থ ।
অগ্নি বাক্ হয়ে (বাক্রূপে) মুখের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন, বায়ু প্রাণ হয়ে (প্রাণরূপে)) নাসিকাতে প্রবেশ করলেন, আদিত্য চক্ষু হয়ে (চক্ষুরূপে) অক্ষিদ্বয়ে প্রবেশ করলেন, দিক সকল শ্রোত্র/শ্রুতি হয়ে (শ্রুতিরূপে) কর্ণদ্বয়ে প্রবেশ করলেন, ওষধি-বনস্পতি সকল লোমসমূহ হয়ে (লোমসমূহ রূপে) ত্বকে প্রবেশ করলেন, চন্দ্রমা মন হয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, মৃত্যু অপান হয়ে নাভিতে প্রবেশ করলেন, অপ্ রেত হয়ে শিশ্নতে প্রবেশ করলেন ।
১।২।৪-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
এই উপনিষদের ১।১।৪ মন্ত্রে ঋষি বলেছেন যে কি ভাবে প্রথমে অপ্ থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা মূর্ত্ত করেছিলেন। সেই মূর্ত্তি প্রকাশের পর ক্রমান্বয়ে দেবগণ জাত হয়েছিলেন ।
আর ১।২।৪ মন্ত্রে বলা হল, কি ভাবে সৃষ্ট দেবগণ আবার প্রতি আয়তনে অনুপ্রবিষ্ট হলেন। আমাদের মধ্যে দর্শন, শ্রবণাদি রূপে এই দেবগণই অনুপ্রবিষ্ট হয়েছেন,— ঐ অধিদৈব-ই অধ্যাত্মে বর্ত্তমান রয়েছেন ।
যখন প্রথম পুরুষকে স্রষ্টা মূর্ত্ত করেছিলেন, তখন প্রথমে মুখ, তার থেকে 'বাক্', এবং তার থেকে 'অগ্নি' প্রকাশ পেয়েছিলেন ।
আর যখন স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে পুরুষে দেবতারা অনুপ্রবিষ্ট হলেন, তখন তা হল বিপরীত ক্রমে; অর্থাৎ অগ্নি বাক্ হয়ে মুখে প্রবেশ করলেন, এবং অন্যান্য দেবতারা একই ভাবে পুরুষে অনুপ্রবিষ্ট হলেন।
এই যে বর্ণনা যা এই (১।২।৪) মন্ত্রে উক্ত হল, তাতে অনুপ্রবিষ্ট পুরুষ বা আত্মা সর্ব্ব দেবগণ সহ কিভাবে প্রতি জীবে, প্রতি সত্তায় অনুপ্রবিষ্ট হয়েছেন, বা নিজেকে তদাকারে সৃষ্টি করেছেন, তা উপদিষ্ট হয়েছে ।
এই আমরা সবাই, এই যে জগতের প্রতিটি সত্তা, তা এই আত্মারই অনুপ্রবিষ্ট স্বরূপ বা প্রতিরূপ ।
১।২।৫।
তমশনায়াপিপাসে অব্রুতাম্ —আবাভ্যামভি প্রজানিহীতি । স তে'ব্রবীৎ এতাস্বেব বাং দেবতাস্বাভজাম্যেতাসু ভাগিন্যৌ করোমীতি । তস্মাদ্ যস্মৈ কস্মৈ চ দেবতায়ৈ হবির্গৃহ্যতে ভাগিন্যাবেবাস্যামশনায়াপিপাসে ভবতঃ ।
১।২।৫-১। অন্বয় ।
তম্ (তাঁকে-সেই স্রষ্টাকে) অশনায়া পিপাসে (অশনা এবং পিপাসা) অব্রুতাম্ (বললেন) —আবাভ্যাম্ (আমাদের দুইজনের জন্য) অভিপ্রজানিহী (জানুন—বিধান করুন) ইতি । সঃ (সে -সেই স্রষ্টা) তেঃ (তাঁদেরকে) অব্রবীৎ (বললেন) এতাসু এব (এদের সাথেই) বাম্ (তোমাদের দুই জনকে) দেবতাসু (দেবতাদের সাথেই) আভজামি (বিভক্ত করব) এতাসু (এদের সাথেই) ভাগিন্যৌ (ভাগ-যুক্ত) করোমি (করছি) ইতি। তস্মাদ্ (সেই হেতু) যস্মৈ কস্মৈ চ (যে কোনও) দেবতায়ৈ (দেবতার উদ্দেশ্যে) হবিঃ (হবি/আহুতি) গৃহ্যতে (গৃহীত হয়) ভাগিন্যৌ এব ( ভাগ পায় বা ভোক্তা হয়) অস্যাম্ (এই দুই জন) অশনায়া পিপাসে (অশনায়া- পিপাসা) ভবতঃ (হয়) ।
১।২।৫-২। অর্থ ।
তাঁকে—সেই স্রষ্টাকে অশনা এবং পিপাসা বললেন — আমাদের দুইজনের জন্য জানুন—বিধান করুন । সে—সেই স্রষ্টা, তাঁদেরকে বললেন এদের সাথেই, [এই] দেবতাদের সাথেই তোমাদের দুই জনকে ভাগ দিচ্ছি (অন্ন/হবির অংশীদার) করছি । সেই হেতু যে কোনও দেবতার উদ্দেশ্যে [যখন] (হবি/আহুতি) গৃহীত হয়, এই দুই জন—অশনা ও পিপাসা, তার ভাগ পায় বা ভোক্তা হয় ।
১।২।৫-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
স্বয়ংশক্তি-স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার থেকে দ্যুলোক সৃষ্টি হয়েছে। দ্যু-লোকের ধর্ম্ম হল নিজের থেকে সকল কিছুকে দোহন করে প্রকাশ করা । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার যা প্রকাশ-ধর্ম্ম, তা বহন করছেন দ্যু, আর এই দ্যু প্রতিষ্ঠিত দেবগণে । আমরা, বা সমগ্র সৃষ্টি এই দেবগণের সমাসে রচিত, বা এই দেবগণের প্রকাশ ।
প্রকাশ মানেই জ্ঞান বা বোধপ্রকাশ । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা নিজেকে নিজে জানতে জানতে সকল কিছু প্রকাশ করেন, এবং যা প্রকাশ করেন, বা যা হন, সেই প্রকাশকে বা সেইটিকে জানেন বা বোধ করেন। জানা (বেদ) এবং হওয়া (জাত) এইটি চেতনার ধর্ম্ম, এবং এই জন্য এঁর নাম 'জাতবেদা (জাতবেদস্)' । দেবতাদেরও ভোগ হয় প্রকাশের দ্বারা । আর আমরা, যা প্রকাশ পেয়েছে, তাকে ভোগ বা অনুভব করি । এই যে আমাদের ভোগ, তা ঐ দেবতাদের ভোগের-ই অন্তর্গত— জানা, হওয়া, এবং 'হওয়াটাকে' জানা । এই জন্য, আমরা যা কিছু ভোগ করছি, তা, এবং ভোক্তা-আমরা সকলে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত বা আহুত হবি। যা স্বয়ংপ্রকাশের প্রকাশ, তা 'বহি', আর সেই 'বহি'কে বা দ্বিতীয়তাকে সৃষ্টি করে তাকে নিজেতেই ফিরিয়ে নিচ্ছেন, এইটি 'হবি'। 'জাত' হওয়া মানে 'বহি' হচ্ছেন, নিজেকে ব্যক্ত করছেন, কথা বলছেন; আর সেইটিকে যে জানছেন/অনুভব করছেন, তার নাম 'বেদ/শ্রুতি/শোনা' এবং তাই হবি।
এই হবিতে দেবগণ সহ সর্ব্ব সৃষ্টি তৃপ্ত হচ্ছে; সবাই বিবর্ত্তিত হয়ে আত্মনির্ব্বাণের পথে চলেছে । সর্ব্ব দেবগণ যে হবিতে তৃপ্ত হচ্ছেন, তাতে তৃপ্ত হচ্ছেন 'অশনা' এবং 'পিপাসা' বা অপ্/জল এবং 'তেজ' । যার দ্বারা তৃপ্ত হচ্ছে সে 'হবি বা অন্ন' । তেজ -জল-অন্ন, বাক্-প্রাণ-মন, মহেশ্বর(রুদ্র)-বিষ্ণু-ব্রহ্মা, এই তিন প্রধান দেবতার সমাসে সমগ্র সৃষ্টি রচিত হয়েছে । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৬।৩।৩ এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ের অন্যান্য অংশ দ্রষ্টব্য ।) এই হবি বা অন্নকে দেবতা অভিমুখে, এবং দেবতা থেকে আত্মাভিমুখে নিয়ে চলেছেন 'অপ্', আর সেই অপ্ বা রসে যে অন্ন একীভূত হল, তাকে দেবতা বা আত্মাভিমুখে নিয়ে চলেন তেজ বা বাক্ । এই জন্য ছান্দোগ্য উপনিষদের ৬।৮।৬ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে 'পুরুষস্য প্রয়তো বাঙ্ মনসি সম্পদ্যতে, মনঃ প্রাণে, প্রাণঃ তেজসি, তেজঃ পরস্যাং দেবতায়াম্'— এই প্রয়াত পুরুষের (প্রয়াণের সময়ে পুরুষের) বাক্য (মনের মধ্যে জাত মূর্ত্তি বা মনের রূপ সকল) মনকে পায় বা মনে বিলীন হয়, মন প্রাণেতে, প্রাণ তেজে, এবং তেজ সেই পরম দেবতায় বিলীন হয়।
তাই যেখানেই দেবতারা হবি গ্রহণ করেন, সেখানে অশনা এবং পিপাসা বা অপ্ এবং তেজ তৃপ্ত হন; এবং সেই হবি পুরুষ বা আত্মাতেই নিবেদিত হয়।
ঐতরেয় উপনিষদ্, প্রথম অধ্যায়, তৃতীয় খণ্ড।
স ঈক্ষতেমে নু লোকাশ্চ লোকপালাশ্চ । অন্নমেভ্যঃ সৃজা ইতি ।
১।৩।১-১। অন্বয় ।
স (সে-সেই আত্মা) ঈক্ষত (ঈক্ষণ করলেন) ইমে (এই সকল) নু (এখন) লোকাঃ চ লোকপালাঃ চ (লোক এবং লোক-পাল সকল) [সৃষ্টি হল] ।অন্নম্ (অন্ন) এভ্যঃ (এদের জন্য) সৃজা (সৃজন করি) ইতি ।
১।৩।১-২। অর্থ ।
সে (সেই আত্মা) ঈক্ষণ করলেন (অবলোকন করলেন এবং কামনা করলেন)— "এই সকল লোক এবং লোক-পাল সকল এখন [সৃষ্টি হল] এদের জন্য অন্ন সৃজন করি ।"
১।৩।১-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
ঈক্ষণ শব্দের ব্যাখ্যা ১।১।১-৩-৪ অনুচ্ছেদে এবং অন্যান্য অংশে বলা হয়েছে।
'অন্ন' শব্দের অর্থ ১।২।১-৩-৪ অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১।৩।২।
স'পো'ভ্যতপৎ তাভ্যো'ভিতপ্তাভ্য মূর্ত্তিরজায়ত । যা বৈ সা মূর্ত্তিরজায়তান্নং বৈ তৎ ।
১।৩।২-১। অন্বয় ।
সঃ (সে-সেই আত্মা) অপঃ (অপ্-কে /অপ্ সকলকে) অভ্যতাপৎ (অভিতপ্ত করলেন) তাভ্যঃ অভিতপ্তাভ্য (অভিতপ্তাভ্য তাভ্যঃ—অভিতপ্ত তার থেকে) মূর্ত্তিঃ (মূর্ত্তি) অজায়ত (জাত হল) । যা বৈ সা (যা সেই) মূর্ত্তিঃ (মূর্ত্তি) অজায়ত (জাত হল) অন্নং বৈ তৎ (তা-ই অন্ন)।
১।৩।২-২। অর্থ ।
সে-সেই আত্মা অপ্-কে অভিতপ্ত করলেন। অভিতপ্ত তার থেকে (অভিতপ্ত যে অপ্ তার থেকে) মূর্ত্তি জাত হল। যা সেই মূর্ত্তি জাত হল, তা-ই অন্ন ।
১।৩।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
আমরা আগে বলেছি যে অপ্ থেকে বা দৈব-জল থেকে, এই মূর্ত্ত বা ভৌতিক বিশ্ব জাত হয়েছে। এই যে মূর্ত্ত বিশ্ব, তার থেকেই প্রাণের বা সোমের ধারা আমাদের মধ্যে অনবরত প্রবিষ্ট হচ্ছে। চেতনার জল/অপ্ বা সোম থেকেই মূর্ত্ত বিশ্ব বা অন্ন হয়েছে, আর সেই মূর্ত্ত চিন্ময় আত্মা, যিনি অন্ন-স্বরূপ, তিনি-ই প্রাণ হয়ে সোম হয়ে আমাদের রসময় এবং তেজোময় করছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদে উক্ত হয়েছে, সোম-ই অন্ন এবং অগ্নি (প্রাণাগ্নি) অন্নাদ ( অন্ন অত্তা, অন্ন ভোক্তা)— সোম এব অন্নম্ অগ্নিঃ অন্নাদঃ। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ১।৪।৬ দ্রষ্টব্য । )
১।৩।৩।
তদেতদভিসৃষ্টং পরাঙত্যজিঘাংসৎ । তদবাচাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোদ্বাচা গ্রহীতুম্ । স যদ্ধৈনদ্বাচাগ্রহৈষ্যদভিব্যাহৃত্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।
১।৩।৩-১। অন্বয় ।
তৎ (সেই) এতৎ (এই) অভিসৃষ্টং (সৃষ্ট—সৃষ্ট অন্ন) পরাঙ্ (পশ্চাৎ; বিপরীত) অতি (অতিক্রম করতে গেল) অজিঘাংসৎ (হনন করার ইচ্ছা থেকে/হিংসা বা ভক্ষণ করার ইচ্ছা থেকে )* । তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) বাচা (বাক্যের দ্বারা/বাগিন্দ্রিয়ের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন) তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সমর্থ হলেন না) বাচা (বাক্যের দ্বারা) গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) বাচা (বাক্যের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) অভিব্যাহৃত্য হ এব অন্নম্ (অন্ন উচ্চারণ করেই—অন্নের বিষয়ে কথা বলেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
(*'অজিঘাংসৎ; শব্দটি 'হন্' ধাতু থেকে হয়েছে। হন্ অর্থে 'হনন করা'।)
১।৩।৩-২। অর্থ ।
সেই এই সৃষ্টি (সৃষ্ট অন্ন)পশ্চাৎ (বিপরীত) দিকে ধাবিত হল (স্রষ্টার ভক্ষণ করার ইচ্ছা থেকে পরিত্রাণ পেতে )। তাকে (সৃষ্ট অন্নকে) বাক্যের দ্বারা (বাগিন্দ্রিয়ের দ্বারা) গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে (সৃষ্ট অন্নকে) গ্রহণ করতে সমর্থ হলেন না । তিনি যদি একে (এই অন্নকে) বাক্যের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] উচ্চারণ করেই (অন্নের বিষয়ে কথা বলেই) তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।৪
তৎ প্রাণেনাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোৎ প্রাণেন গ্রহীতুম্ । স যদ্ধৈনৎ প্রাণেনাগ্রহৈষ্যদভিপ্রাণ্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।
১।৩।৪-১। অন্বয় ।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) প্রাণেন (প্রাণ অর্থাৎ আঘ্রাণের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন), তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) প্রাণেন (আঘ্রাণের দ্বারা) গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে)। সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) প্রাণেন (আঘ্রাণের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) অভিপ্রাণ্য হ এব অন্নম্ (অন্নকে আঘ্রাণ করেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
১।৩।৪-২। অর্থ ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, আঘ্রাণের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে আঘ্রাণের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে আঘ্রাণের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে আঘ্রাণ করেই তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।৫
তচ্চক্ষুষা'জিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোচক্ষুষা গ্রহীতুম্ । স যদ্ধৈনচ্চক্ষুষা'গ্রহৈষ্যদ্ দৃষ্ট্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।
১।৩।৫-১। অন্বয় ।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) চক্ষুষা ( চক্ষুর দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন), তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) চক্ষুষাঃ ( চক্ষুর দ্বারা) গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) চক্ষুষা ( চক্ষুর দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) দৃষ্ট্বা হ এব অন্নম্ (অন্নকে দর্শন করেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
১।৩।৫-২। অর্থ ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, চক্ষুর দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে চক্ষুর দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে চক্ষুর দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে দর্শন করেই তৃপ্ত হতেন।
১।৩।৬
তচ্ছ্রোত্রেণাজিঘৃক্ষৎ, তন্নাশক্নোচ্ছ্রোত্রেণ গ্রহীতুম্ । স যদ্ধৈনচ্ছ্রোত্রেণাগ্রহৈষ্যচ্ছ্রুত্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।
১।৩।৬-১ । অন্বয় ।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) শ্রোত্রেণ ( শ্রোত্রের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন) , তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) শ্রোত্রেণ ( শ্রোত্রের দ্বারা) গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) শ্রোত্রেণ ( শ্রোত্রের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) শ্রুত্বা হ এব অন্নম্ (অন্নকে শ্রবণ করেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে শ্রোত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে শ্রোত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে শ্রোত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে শ্রবণ করেই তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।৭
তত্ত্বচাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোৎ ত্বচা গ্রহীতুম্ । স যদ্ধৈনৎ ত্বচা গ্রহৈষ্যৎ স্পৃষ্ট্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।
১।৩।৭-১ । অন্বয় ।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) ত্বচা ( ত্বকের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন), তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) ত্বচা ( ত্বকের দ্বারা) গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) ত্বচা ( ত্বকের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) স্পৃষ্ট্বা হ এব অন্নম্ (অন্নকে স্পর্শ করেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
১।৩।৭-2 । অর্থ ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, ত্বকের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে ত্বকের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে ত্বকের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে স্পর্শ করেই তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।৮।
তন্মনসাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোন্মনসা গ্রহীতুম্ ।স যদ্ধৈনন্মনসাগ্রহৈষ্যদ্ ধ্যাত্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।
১।৩।৮-১ । অন্বয় ।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) মনসা ( মনের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন), তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) মনসা ( মনের দ্বারা) গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) মনসা ( মনের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) ধ্যাত্বা হ এব অন্নম্ (অন্নকে ধ্যান করেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
১।৩।৮-২ । অর্থ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে,মনের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে মনের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না) । তিনি যদি একে—এই অন্নকে, মনের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে ধ্যান করেই (অন্নের কথা মনে করেই) তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।৯ ।
তচ্ছিশ্নেনাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোচ্ছিশ্নেন গ্রহীতুম্ ।স যদ্ধৈনচ্ছিশ্নেনাগ্রহৈষ্যদ্ বিসৃজ্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।
১।৩।৯-১ । অন্বয় ।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) শিশ্নেন ( শিশ্নের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন), তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) শিশ্নেন ( শিশ্নের দ্বারা গ্রহীতুম্ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) শিশ্নেন ( শিশ্নের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) বিসৃজ্য হ এব (সিঞ্চন করেই; বীর্য্য স্খলন করেই) অন্নম্ (অন্নকে) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।
১।৩।৯-২ । অর্থ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, শিশ্নের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে শিশ্নের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে, শিশ্নের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে স্খলন করেই তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।১০।
তদপানেনাজিঘৃক্ষৎ তদাবয়ৎ । সৈষো'ন্নস্য গ্রহো যদ্বায়ুঃ । অন্নায়ুর্ব্বা এষঃ যদ্বায়ুঃ ।
১।৩।১০-১ । অন্বয়।
তৎ (তাকে—সৃষ্ট অন্নকে) অপানেন (অপানের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন), তৎ (তাকে) আবয়ৎ (নিজেতে বইয়ে দিলেন; তাকে নিজেতে গ্রহণ করলেন) । সঃ এষঃ অন্নস্য (এষঃ [এই] অন্নস্য [অন্নের] সঃ [সে] ) গ্রহঃ (গ্রহ) যৎ (যা) বায়ুঃ (বায়ু) । অন্নায়ুঃ (অন্নায়ু) বৈ এষঃ (ইনি-ই) যৎ (যা) বায়ুঃ (বায়ু) ।
১।৩।১০-২। অর্থ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে অপানের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন, তাকে নিজেতে বইয়ে দিলেন— তাকে নিজেতে গ্রহণ করলেন । এই অন্নের সে গ্রহ যা বায়ু । (যে এই বায়ু [অপান], তা এই অন্নের গ্রহ/গ্রাহক।) ইনি-ই অন্নায়ু, যা বায়ু ।
১।৩।(৩-১০)-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
যা কিছু অন্ন সৃষ্টি হল, তা এই প্রত্যক্ষ সৃষ্টি । সেই সৃষ্ট অন্ন সকল, স্রষ্টার থেকে পিছন ফিরে (পরাঙ্) পলায়ন করতে লাগল—বহির্মুখী হয়ে স্রষ্টার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল।
আত্মস্বরূপ যে স্রষ্টা, তাঁর থেকে দূরে যাওয়া মানেই, 'অনাত্ম' হওয়া, মৃত্যুদ্বারা আবিষ্ট হওয়া বা মূর্ত্ত হওয়া । এই উপনিষদের ঋষি বলেছেন, যে অভিতপ্ত অপ্ থেকে যে মূর্ত্তি জাত হল, তার নাম অন্ন ।
স্রষ্টা যখন পুরুষকে মূর্ত্ত করেছিলেন, তখন প্রথমে মুখ, মুখ থেকে বাক্, এবং বাক্ থেকে অগ্নি উৎপন্ন হয়েছিলেন। আবার যখন অগ্নি দেবতা পুরুষে অনুপ্রবিষ্ট হলেন, বা প্রতিষ্ঠিত হলেন, তখন অগ্নি প্রথমে বাক্ রূপে সেই পুরুষের মুখ-স্থ হলেন । এক-ই ভাবে প্রাণ (গন্ধ/নাসিকা), চক্ষু, শ্রোত্র ইত্যাদি রূপে, অন্যান্য দেবতারা পুরুষে প্রতিষ্ঠিত হলেন । এই বিষয়ে পূর্ব্বে বর্ণনা করা হয়েছে। তার পর, যখন অন্ন সৃষ্টি হল, পুরুষ তখন ইন্দ্রিয় দেবগণের দ্বারা, বা বাক্, নাসিকা, চক্ষু ইত্যাদির দ্বারা অন্নকে (পুষ্টি দাত্রী প্রাণকে) গ্রহণ করতে গেলেন । কিন্তু তাঁরা কেউ অন্নকে গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না। প্রাণ যতক্ষণ না গ্রহণ করেন, ততক্ষণ আর কেউ গ্রহণ করতে পারে না । আগে প্রাণ-রূপী আত্মা দেখেন; আমাদের দর্শন সেই দেখার অন্তর্গত । প্রাণের যে দেখা, তার থেকে দ্রষ্টা, দৃশ্য এবং দর্শন বা দর্শন-শক্তি প্রকাশ পায়। তিনি স্বাধীন ভাবে নিজের থেকে এই দর্শন ক্রিয়াকে প্রকাশ করে, নিজেতেই আবার তাকে সমাপ্ত করেন । আমাদের সকল অনুভূতি, ভোগ্য বা অন্ন এই ভাবেই আমরা ভোগ করি ।
সমস্ত দেবতারা বা ইন্দ্রিয় দেবগণরা যখন অন্নকে গ্রহণ করতে পারলেন না, তখন পুরুষ প্রাণের অপান রূপ মহিমার দ্বারা সেই অন্যকে গ্রহণ করলেন।যা আমাতে গৃহীত হয়, তা প্রাণের-ই 'গ্রহ' রূপ মহিমার দ্বারা । প্রাণের যে 'অপান' নামক স্বরূপ তার দ্বারা এই 'গ্রহণ' রূপ কর্ম্ম সাধিত হয় । নিজেতে প্রাপ্তি না হলে, গৃহীত হয় না,আপ্তি হয় না । এই আপ্তি-রূপ চেতনা বা প্রাণ-ই অপ্ । অপ্ থেকেই আপ্তি হয়, তাই প্রাণের এই মহিমার নাম অপান (অপ্/অপ+ অন) ।
'অত্রপ্স্যৎ' এবং 'আবয়ৎ' । পিতৃ তর্পণ । অবনী ।
উপরে, ১।৩।৩ মন্ত্রে এবং তার পরবর্ত্তী মন্ত্রগুলিতে 'অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতে পারতেন)', এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে । 'অত্রপ্স্যৎ' শব্দটি 'তৃপ্' ধাতু থেকে হয়েছে। 'তৃপ্' অর্থে 'তৃপ্ত হওয়া' বা 'তৃপ্ত করা' । 'ত' অর্থে যা মর্ত্ত বা মূর্ত্ত; 'ঋ' অক্ষরটিতে 'গতি' বোঝায়; 'প' অর্থে যা 'পয়স্' বা 'পেয়' বা যা 'অপ্'; সুতরাং, 'তৃপ্' অর্থে মর্ত্তকে বা মূর্ত্ত অন্নকে অপ্-এ, জলে বা প্রাণে নিয়ে যাওয়া । এতে তৃপ্তি হয় । (এতে, অপের অন্তরে যে তেজ আছে তা প্রকাশ পায়; তাই পিতৃগণকে যে জল দেওয়া হয়, তাতে এই তেজ বা সোম প্রকাশ পায়—এই জন্য বলা হয় 'তর্পণ' বা পিতৃ-তর্পণ ।)
এই যে অপানের দ্বারা অন্ন গৃহীত হল, তাকে ঋষি, 'আবয়ৎ' শব্দের দ্বারা বর্ণনা করলেন। আবয়ৎ শব্দটি 'অব্' ধাতুর থেকে হয়েছে। 'অব্' ধাতুর অর্থ, 'ত্রাণার্থে গ্রহণ করা, বা ' ত্রাণার্থে কাউকে নিজের মধ্যে নিয়ে নেওয়া।'
[এই জন্য 'অবন' শব্দের একটি অর্থ 'রক্ষা করা' ।আবার 'অবনী' শব্দের অর্থ 'পৃথিবী'— পৃথিব্যাং যা দেবতা সা পুরুষস্যাপানমবষ্টভ্য—পৃথিবীতে যে দেবতা (দেবী) তিনি পুরুষের অপানকে অবশ করে (বশীভূত) রেখেছেন ।" (প্রশ্নোপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৮) । ]
অন্ন এবং অন্নায়ু ।
এই ভাবে অপানের দ্বারা অন্ন মূর্ত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হল। এই ভাবে প্রতি পুরুষে, প্রতি সত্তায় অন্ন প্রতিষ্ঠিত হল। আমরা একে অপরের অন্ন । আমি যেমন কোন দৃশ্য দেখে, দর্শনাত্মক অন্নের ভোক্তা হচ্ছি, তেমনি অন্য কেউ আমাকে দেখে একটি অনুভূতি বা অন্নের ভোক্তা হচ্ছে। তাই আগে আমরা বলেছি যে অন্নের বৈশিষ্ঠ্য হল, 'অন্ বা প্রাণ অন্-এ বা প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত ।' এর নাম 'অন্নায়ু'। প্রাণ, যিনি বাহিরে 'বায়ু', তিনি প্রতি সত্তায় 'আয়ু' বা প্রাণ প্রবাহ ।
প্রাণ যেভাবে অন্নময় হয়েছেন, বা যে প্রকার অন্ন হয়েছেন, সেই রকমই পৃথিবী, বা সেই রকমই প্রতক্ষ্যতার ক্ষেত্র বা ভৌতিক ক্ষেত্র রচিত হয়েছে; সেই রকমই তার বায়ুমণ্ডল, সেই রকমই সেখানকার পদার্থ, সেখানকার প্রাণীরা । পৃথিবী মানে শুধু আমাদের বসুন্ধরাই নয়, অন্য বৈচিত্র্যে প্রাণ অপান হয়ে, মূর্ত্তি সকলকে বা মূর্ত্ত বিশ্ব সকলকে, ভৌতিক ক্ষেত্র সকলকে ধারণ করেছেন, ধরিত্রী হয়েছেন । আমরা মূর্ত্ত হলেও, দৃশ্যমান হলেও, অনেকের কাছে আবার অমূর্ত্ত, অদৃশ্য । আবার যারা আমাদের প্রত্যক্ষতার বাহিরে, তারা তাদের অপান ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছে প্রত্যক্ষ, মূর্ত্ত ।
পৃথিবীর বায়ু মণ্ডল এমন একটি বিশেষ পরিবেশ বা আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে, যা সমগ্র পার্থিব প্রাণীর অনুকূল, যার জন্য তারা পৃথিবীতে বেঁচে আছে; প্রাণ, অপান-রূপে, নিজেকে অর্থাৎ বায়ু বা প্রাণকে এমন ভাবে গ্রহণ করেছেন, যে এই পৃথিবীর সকল কিছু, আমাদের জীবন ধারণের অনুকূল । এই জন্য এই অপানের নাম 'অন্নায়ু' ।
প্রাণ-ব্যান-অপান—আহবনীয়-দক্ষিণ-গার্হপত্য অগ্নি ।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে প্রশ্নোপনিষদে, অপানকে 'গার্হপত্য' বা 'গৃহপতি' অগ্নি বলা হয়েছে— 'গার্হপত্যো হ বা এষ'পানো---- এই অপানই গার্হপত্য। (প্রশ্নোপনিষদ মন্ত্র ৪।৩। ) ।' যে অগ্নি, বা প্রাণের যে মহিমার দ্বারা আমরা আমাদের সংস্কার অনুযায়ী কর্ম্ম করি, ঘড় সংসার করি, তিনি গৃহপতি বা গার্হপত্য অগ্নি । সুতরাং, এই পার্থিব জীবন যাঁর অধিকারে তিনি গার্হপত্য অগ্নি । তাই ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, আদিত্যের অন্তরে যে পুরুষ রয়েছেন তিনি ঐ গার্হপত্য অগ্নি। পৃথিবী, অগ্নি , অন্ন এবং আদিত্য, — এই চার হল এঁর চারটি তনু । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৪।১১।১। দ্রষ্টব্য।) এখানে অগ্নি অর্থে, পৃথিবীর বা মূর্ত্তির অন্তরে বা শরীরের অন্তরে যিনি প্রাণ বা প্রাণাগ্নি; অনাদি অনন্ত বিশ্ব এঁর শরীর; ইনি বৈশ্বানর । যে প্রাণ মুক্ত, অসীম, অশরীরী, তিনি-ই মূর্ত্ত হয়েছেন । এই অসীম মুক্ত প্রাণ-ই আহবনীয় অগ্নি, যিনি আমাদের সবাইকে আবাহন করছেন, নিজেতে ফিরিয়ে নেবার জন্য ডাকছেন, আকর্ষণ করছেন । যা কিছু আহুত হয়, তা যে দেবতাতেই হোক, তা আহবনীয়তেই নিবেদিত হয় । প্রাণের যে ব্যান-রূপ মহিমা, তার দ্বারা সকল পাচন-ক্রিয়া সম্পন্ন হয়; আমরা যে খাদ্য হজম করি, তা এই ব্যানের দ্বারা হয় । এই জন্য এই অগ্নির নাম অন্ব-আহার্য-পচন অগ্নি; —অর্থাৎ আহার্য বা যা আমরা আহার করি, তার পাচন বা তা কিভাবে আমাদের সাথে এক হবে, কিরকম ফলপ্রসূ হবে, তা ব্যান রূপ প্রাণের অনুশাসনে হয়; এঁকে 'দক্ষিণাগ্নি-ও বলা হয় । ((ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ৪।১১।১, ৪।১২।১, ৪।১৩।১ মন্ত্র দ্রষ্টব্য । ) তাই এই প্রাণাগ্নি, যাঁর নাম ব্যান বা ব্যান বায়ু, তিনিই আমাদের অন্তরে অন্নরসকে সর্ব্বত্র সঞ্চালিত করেন, যার দ্বারা সবাই, সর্ব্বাঙ্গ তৃপ্ত হয় । এই জন্য-ও বলা হল :" সৈষো'ন্নস্য গ্রহো যদ্বায়ুঃ । অন্নায়ুর্ব্বা এষঃ যদ্বায়ুঃ—সে এই অন্নের গ্রহ, যা বায়ু । ইনি-ই অন্নায়ু, যা বায়ু ।"
বায়ু। ব্যষ্টি এবং সমষ্টি ।
আহবনীয় অগ্নির একটি তনু 'দ্যু' বা 'দ্যুলোক', এবং একটি তনু 'প্রাণ' । প্রাণ বা দ্যু-ই, এই অপান-রূপে ভূ-তে (পৃথিবীতে) প্রতিষ্ঠিত । আর এই যে প্রাণ, তিনি সর্ব্বত্র, সবাইকে আত্মসূত্রে যুক্ত করে রেখেছেন, ইনি ব্যান, এবং এঁকে বায়ু এবং সূত্রাত্মা বলা হয়। ( বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ মন্ত্র ৩।৭।২ দ্রষ্টব্য । )
প্রাণ হলেন দ্যু, অপান হলেন ভূ (মর্ত্ত); বায়ু বা ব্যান হলেন, প্রাণ এবং অপানের, বা দ্যু এবং ভূ-এর সংযোজক বা সন্ধি । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ১।৩।৩। দ্রষ্টব্য । ) তাই বায়ুর লোক হল অন্তরীক্ষ, যা দ্যু এবং ভূ-র মধ্যে বা অন্তরে; অন্তরীক্ষের মধ্য দিয়ে, এই প্রাণ স্বরূপ বায়ু সবাইকে একই সূত্রের দ্বারা যুক্ত করে রেখেছেন ।
আমাদের শরীরে যে অনবরত অসংখ্য ক্রিয়া সংঘবদ্ধ হয়ে সম্পন্ন হচ্ছে, তা এই ব্যানের দ্বারা । সংযুক্ততা, সংঘবদ্ধ-ক্রিয়া (coordinated actions), লক্ষ্যাভিমুখে চালনা করা, সংমিশ্রণ (মন্থন) করা ইত্যাদি সকল-ই ব্যানের ধর্ম্ম এবং সকল বিশ্বের সকল কর্ম্মে তা প্রযুক্ত হয়েছে । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্ মন্ত্র ১।৩।৫ দ্রষ্টব্য । )
ছান্দোগ্য উপনিষদের চতুর্থ অধ্যায়ের তৃতীয় খণ্ডে, বায়ু এবং প্রাণকে সংবর্গ বলা হয়েছে । বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ৩।৩।২) বায়ুকে ব্যষ্টি এবং সমষ্টি বলা হয়েছে। উপনিষদে, সংবর্গ শব্দের অর্থ 'সংবৃ' বলা হয়েছে। 'সংবৃ' অর্থে 'নিজের মধ্যে আবৃত করে রাখা'। এই প্রাণ, অপান রূপে, আমাদের আত্মগত করেছেন, নিজেতে ধারণ করেছেন ; এই হল ধরিত্রীর 'ধাতৃত্ব' । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আচ্ছাদন হয়ে, আমাদের অনবরত রক্ষা করছেন, প্রাণবন্ত করছেন।
বর্গ শব্দের একটি অর্থ 'প্রজাতি' (species)। নিজের থেকে নিজের অনুরূপ বা প্রতিরূপ সৃষ্টি করা প্রাণেরই ধর্ম্ম , কেননা প্রাণ, প্রাণকেই সৃষ্টি করেন । তাই সৃষ্টি তে সবসময় 'প্রজাতি' বা 'সমষ্টি' দৃষ্ট হয়। আবার প্রাণই ব্যষ্টি, বা প্রতিটি স্বতন্ত্র সত্তা ।
১।৩।১১
স ঈক্ষত কথং ন্বিদং মদৃতে স্যাদিতি । স ঈক্ষত কতরেণ প্রপদ্যা ইতি । স ঈক্ষত যদি বাচাভিব্যাহৃতং যদি প্রাণেনাভিপ্রাণিতং যদি চক্ষুষা দৃষ্টং যদি শ্রোত্রেণ শ্রুতং যদি ত্বচা পৃষ্টং যদি মনসা ধ্যাতং যদ্যপানেনাভ্যপানিতং যদি শিশ্নেন বিসৃষ্টমথ কো'হমিতি ।
১।৩।১১-১ । অন্বয় ।
সঃ (তিনি) ঈক্ষত (অবলোকন করলেন; পর্যালোচনা করলেন) কথং নু (কি ভাবে) ইদং (এই—সৃষ্টি; এই সৃষ্ট দেবতারা এবং অন্ন— এই দ্যু এবং ভূ-তে যা কিছু আছে তা ) মৎ ঋতে (আমাকে ছাড়া) স্যাৎ (থাকতে পারবে) ইতি । সঃ (তিনি) ঈক্ষত (অবলোকন করলেন; পর্যালোচনা করলেন) কতরেণ (কোনটি) প্রপদ্যা (অবলম্বন করি) ইতি । সঃ (তিনি) ঈক্ষত (অবলোকন করলেন) যদি বাচা (যদি বাকের দ্বারা) অভিব্যাহৃতম্ (বাক্য উচ্চারিত হয়), যদি প্রাণেন (যদি আঘ্রাণের দ্বারা) অভিপ্রাণিতম্ (আঘ্রাত হয়), যদি চক্ষুষা (যদি চক্ষুর দ্বারা) দৃষ্টম্ (দৃষ্ট হয়), যদি শ্রোত্রেণ (যদি শ্রোত্রের দ্বারা ) শ্রুতম্ (শ্রুত হয়), যদি ত্বচা (যদি ত্বকের দ্বারা ) পৃষ্টম্ (স্পৃষ্ট হয়), যদি মনসা (যদি মনের দ্বারা) ধ্যাতম্ (ধ্যাত হয়), যদি অপানেন (যদি অপানের দ্বারা) অভ্যপানিতম্* (অপান-কৃত হয়), যদি শিশ্নেন (শিশ্নের দ্বারা) বিসৃষ্টম্ (বিসর্জ্জন /স্খলন হয়), অথ (অনন্তর; তাহলে) কঃ (কে) অহম্ (আমি) ইতি ।
(* 'অভি' এবং 'অপ' এই দুইটি উপসর্গ 'অন্' ধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে 'অভি+অপ+√অন্' ধাতুটি হয় । 'অভ্যপানিতম্' শব্দটি 'অভি+অপ+√অন্' ধাতুর থেকে হয়েছে । 'অভি' শব্দের দ্বারা 'অভিমুখ' বোঝায়, এবং 'অপ' শব্দটির দ্বারা 'অপহরণ', 'নিয়ে নেওয়া', 'অপ বা 'অধোমুখ', 'অপান-সংক্রান্ত', ইত্যাদি বোঝায়। 'অন্' ধাতুর অর্থ, 'প্রাণময় হওয়া', 'নিশ্বাস নেওয়া' ইত্যাদি। 'অভ্যপানিতম্' শব্দটির অর্থ,—অপানের অধিকারে যে কর্ম্ম সকল সাধিত হয়। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী 'অভ্যপানিতম্' শব্দটি 'ভূতে-কৃদন্ত' শ্রেণীর শব্দ । )
১।৩।১১-২ । অর্থ।
তিনি অবলোকন করলেন/পর্যালোচনা করলেন: "কি ভাবে এই সৃষ্ট দেবতারা এবং অন্ন (অর্থাৎ এই দ্যু এবং ভূ-তে যা কিছু আছে ) তা আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে!"
তিনি অবলোকন করলেন/ পর্যালোচনা করলেন, —"কোনটি অবলম্বন করি!
তিনি অবলোকন করলেন/পর্যালোচনা করলেন, —যদি বাকের দ্বারা বাক্য উচ্চারিত হয়, যদি আঘ্রাণের দ্বারা আঘ্রাত হয়, যদি চক্ষুর দ্বারা দৃষ্ট হয়, যদি শ্রোত্রের দ্বারা শ্রুত হয়, যদি ত্বকের দ্বারা স্পৃষ্ট হয়, যদি মনের দ্বারা ধ্যাত হয় , যদি অপানের দ্বারা অপান-কৃত হয়, যদি শিশ্নের দ্বারা বিসর্জ্জন /স্খলন হয়, তাহলে কে আমি ?"
১।৩।১১-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
মূর্ত্তিতে বা আয়তনে দেবতারা প্রতিষ্ঠিত হলেন এবং অন্ন গৃহীত হল । অগ্নি দেবতা বাক্ হয়ে মুখে, বায়ু দেবতা ঘ্রাণ হয়ে নাসিকাতে, আদিত্য দৃষ্টি হয়ে চক্ষুতে, এবং এই ভাবে সকল দেবগণ প্রতিষ্ঠা পেলেন। মুখ, নাসিকা, চক্ষু ইত্যাদিরা দ্বার; এই দ্বার সকলের মধ্য দিয়ে দ্যুলোক বা দেবতারা, ভূ-তে বা মূর্ত্তিতে প্রবেশ করলেন; এবং অন্ন বা মূর্ত্ত বিশ্ব অপানের দ্বারা দেবক্ষেত্রে গৃহীত হল ।
যে কোন প্রকাশ-ই বোধ বা জ্ঞান প্রকাশ । এই বোধ বা জ্ঞান প্রকাশের সাধারণ নাম হল, 'ঈক্ষণ' বা 'দেখা—দর্শন করা'। মূলে আত্মবোধ বা নিজবোধ না থাকলে জ্ঞান প্রকাশ বা 'দেখা' হয় না । তাই পুরুষ বা আত্মাই দ্রষ্টা, অর্থাৎ সকল বোধ প্রকাশের জ্ঞাতা বা ভোক্তা । এই প্রকাশের আদিতে আছেন দেবতারা,— চিন্ময় আত্মার প্রকাশাত্মক ব্যক্তিত্ব সকল । আর আত্মাই মূল দ্রষ্টা বা ইন্দ্র,—ইদং দ্রষ্টা । সুতরাং, দেবতাদের সাথে আত্মাও যদি আয়তনে অনুপ্রবিষ্ট না হন, তাহলে মূর্ত্তি, বা আত্মস্বরূপের মূর্ত্ত অভিব্যক্তি সম্ভবিত হতে পারে না । এই জন্য ঐ আত্মপুরুষ বোধ করলেন বা ঈক্ষণ করলেন: "কতরেণ প্রপদ্যা — "কোনটি অবলম্বন করি — কোন দ্বার দিয়ে অনুপ্রবিষ্ট হব, আয়তনে প্রবেশ করব !"
প্রথমে আত্মবোধ; সেই আত্মবোধের বুকে সর্ব্বজ্ঞান প্রকাশ পাচ্ছে । জ্ঞান প্রকাশ পেল মানেই, আত্মবোধ 'অহং' এই বোধে জাগ্রত হয়ে, যে জ্ঞান বা বোধ প্রকাশ পেল, তার সাথে লিপ্ত হন । আবার, আত্মবোধ বা নিজবোধ রূপে তিনি নির্লিপ্ত বা অসঙ্গই থাকেন। যতক্ষণ এইটি না হয়, ততক্ষণ, জ্ঞান বা বোধ একটি সুনির্দিষ্ট রূপ হয়ে, বা মূর্ত্ত হয়ে প্রকাশ পায় না। এই জন্য বলা হল: " যদি বাকের দ্বারা বাক্য উচ্চারিত হয়, যদি আঘ্রাণের দ্বারা আঘ্রাত হয়, যদি চক্ষুর দ্বারা দৃষ্ট হয়.....,—তাহলে কে আমি (কো'হমিতি) ?"
১।৩।১২।
স এতমেব সীমানং বিদার্যৈতয়া দ্বারা প্রাপদ্যত । সৈষা বিদৃতির্নাম দ্বাঃ; তদেতদান্নান্দনম্ । তস্য ত্রয় আবাসথাস্ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ । অয়মাবসথো'য়মাবসথো'য়মাবসথ ইতি ।
১।৩।১২-১ । অন্বয় ।
সঃ (তিনি-সেই আত্মা) এতম্ এব (এই সেই) সীমানং (সীমাকে) বিদার্য (বিদারণ করে) এতয়া দ্বারা (এই দ্বার দিয়ে) প্রাপদ্যত (প্রবেশ করলেন) । সা* (সে -সেই [দেবী]) এষা (এই) বিদৃতিঃ (বিদৃতি) নাম (নামক) দ্বাঃ (দ্বার); তৎ (সে) এতৎ (এই) নান্দনম্ (আনন্দ ক্ষেত্র) । তস্য (তার-সেই আত্মার) ত্রয়ঃ (তিনটি) আবাসথাঃ (আবাস) ত্রয়ঃ (তিনটি) স্বপ্নাঃ (স্বপ্ন) । অয়ম্ (এই) আবসথঃ (আবাস) অয়ম্ (এই) আবসথঃ (আবাস) অয়ম্ (এই) আবসথঃ (আবাস) ইতি ।
( * সা = সে (স্ত্রীলিঙ্গ) । )
১।৩।১২-২ । অর্থ ।
তিনি ( সেই আত্মা ), এই সেই সীমাকে বিদারণ করে, এই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেন । সে (সেই (দেবী ), এই বিদৃতি নামক দ্বার; সে এই আনন্দ ক্ষেত্র । তার-সেই আত্মার, তিনটি আবাস, তিনটি স্বপ্ন । এই আবাস, এই আবাস, এই আবাস !
Comments
Post a Comment