ঐতরেয় উপনিষদ্‌। (Aitareya Upanishad in Bengali/Bangla language, with the original texts, word-word meanings, etymologies, and brief explanations.)

ঐতরেয় উপনিষদ্‌ ।  (মূল মন্ত্র, অর্থ, নিরুক্তি, এবং চিৎ বিজ্ঞানের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সহ । )

ভূমিকা এবং সারাংশ ।

ঐতরেয় মহীদাস হলেন ঐতরেয় উপনিষদের দ্রষ্টা বা ঋষি । এই উপনিষদ্‌টি ঋক্‌ বেদের ঐতরেয় আরণ্যকের অন্তর্গত । মহর্ষি মহীদাসের মাতার নাম 'ইতরা'। যে মহাশক্তি নিজেকে নিজের  থেকে 'ইতর' বা 'দ্বিতীয়' করে বহু হয়েছেন, এবং সেই বহু বহু অনন্ত আত্মখণ্ডকে নিজেতেই ধারণ করে নিজের মহত্ত্বকে, নিজের মহিমাকে, বা নিজের আত্মবিস্তারকে অনুভব করছেন, তিনি 'মহি'। মহি-র যে আত্যন্তিক প্রকাশ, তা মহী । ইতর শব্দের ব্যুৎপত্তি হল,—ই+তর; ই = চলা, প্রবাহিত হওয়া; তর = তারতম্য—যাঁর গতি থেকে 'তারতম্য' বা দ্বিতীয়তা সৃষ্টি হয় । স্থির, অবিচল, অদ্বৈত আত্মাই যখন চলেন, বা ক্রিয়াশীল হন, তখন তাঁর নাম হয় প্রাণ;  প্রাণই চলেছেন এবং বহু হচ্ছেন; আর এই প্রাণের শক্তি হচ্ছেন আত্মশক্তি 'বাক্‌' । এক-ই আত্মা, যিনি প্রাণ ও বাক্‌; যে চলছে সে প্রাণ, আর যে চালনা করছে সে বাক্‌ । 

 'প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম', এই মহাবাক্য এই উপনিষদে উক্ত হয়েছে। যে চেতনা, জ্ঞান বা বোধ, যিনি আমাদের মধ্যে দেখেন, শোনেন, আস্বাদন করেন, স্পর্শ করেন, এবং আঘ্রাণ করেন, যিনি আমাদের মর্ম্মের সকল অনুভূতি, আমাদের মনের সকল সংকল্প, যাঁর জ্ঞানে বা বোধে সবাই সৃষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত—তাঁর অদ্বৈত আত্মস্বরূপ থেকে ক্রমান্বয়ে লোক সকল, দেবতারা, পঞ্চ-মহাভূত এবং সমস্ত কিছু সৃষ্ট হয়েছে; এবং এই সৃষ্টির পরম্পরা পিতা-মাতা-সন্তানের আকারে কার্যকর হয়েছে । 

এক অদ্বিতীয় আত্মাই প্রাণ এবং প্রজ্ঞা হয়ে প্রকাশ পেয়েছেন । সেই অদ্বিতীয় জ্ঞানস্বরূপ আত্মা বা  প্রজ্ঞাত্মাই দর্শন, শ্রবণাদি বোধের আকারে নিজেকে প্রকাশ করেন, এবং নিজেই সর্ব্বত্র সেই বোধসকলের ভোক্তা বা দ্রষ্টা পুরুষ, বা ইন্দ্র (ইদং দ্রষ্টা) । 

বাক্‌, প্রাণ, ও মন— এই তিন (ত্রি) দেবতাকারে নিজেকে বিভক্ত করে এই আত্মা সবাইকে নির্ম্মাণ করেছেন, এবং আত্ম-গর্ভ থেকে বিশ্বকে প্রসব করেছেন, তাই এঁর নাম স্ত্রী । এই উপনিষদে, স্ত্রীর গর্ভ ধারণ এবং সন্তানকে গর্ভে নির্ম্মাণ করার বিষয়ে বলা হয়েছে। উক্ত হয়েছে যে এই স্ত্রী 'ভাবয়ত্রী', অর্থাৎ এঁর আত্ম-ভাবনায় সন্তান আকৃতি-সম্পন্ন হয়;  আত্মকৃতি—তাই আকৃতি । 

এই উপনিষদে পিতৃলোকের কথা প্রচ্ছন্নভাবে বলা হয়েছে; প্রথমে গর্ভ পুরুষেই হয় । সেই গর্ভ থেকে 'বীজ' বা 'শুক্র' স্ত্রীর গর্ভে প্রবেশ করে । 

আত্মাই আত্মশক্তি;  তাই এই শুক্র যখন পুরুষ থেকে স্ত্রীতে প্রবেশ করে, তা স্ত্রীর নিজের অঙ্গই হয়ে যায় (স্বম্‌ অঙ্গম্‌ ); এইভাবে স্বামী শব্দের তাৎপর্য উক্ত হয়েছে ।   

যে অদিতি ইন্দ্রের মা, তিনি সকলের মা; কেননা ইনি 'অদিতি'—দ্বিতীয়তা বিহীন, কেউ এঁকে  দ্বিতীয় বলে অনুভব করে না; আবার, ইনিই 'ইতরা' হয়ে দ্বিতীয় হচ্ছেন । এই বিশ্ব যখন সৃষ্ট হয়, তখন এই বিশ্বের দ্রষ্টা বা ভোক্তাও  সৃষ্ট হন । এই দ্রষ্টার নাম ইন্দ্র । এই ইন্দ্রের জন্মের কথা এই উপনিষদে উক্ত হয়েছে ।  (আধুনিক বিজ্ঞানও সৃষ্টি এবং দ্রষ্টার কথা তাদের মতো করে, জড় বিজ্ঞানের ভাষায়  বলে।) 

মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৫-১৯৪৫) এবং তাঁর প্রধান শিষ্য, মহর্ষি ত্রিদিবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯২৩-১৯৯৪) উপদেশ অবলম্বন করে ঐতরেয় উপনিষদের মূল মন্ত্র সহ অর্থ এবং সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বিবৃত করা হল।

ইতি : দেবকুমার লাহিড়ী।(debkumar.lahiri@gmail.com)

-----------------------------------------------------------------------------------

শান্তিপাঠ ।

ওঁ বাঙ্‌ মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা । 

মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্‌ ।

আবিরাবীর্ম্মএধি।

বেদস্য ম আণীস্থঃ ।

শ্রুতম্‌ মে মা প্রহাসীঃ ।

অনেনাধীতেনাহোরাত্রান্‌  সংদধামি ।

ঋতং বদিষ্যামি ।

সত্যং বদিষ্যামি ।

তন্মামবতু ।

তদ্বক্তারমবতু ।

অবতু মাম্‌  অবতু বক্তারম্‌ অবতু বক্তারম্‌ ।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ । 

অন্বয়।

ওঁ বাঙ্‌ মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা : ওঁ বাঙ্‌ (বাক্য) মে (আমার) মনসি (মনে) প্রতিষ্ঠিতা (প্রতিষ্ঠিত হোক)— ওঁ, আমার বাক্য মনে প্রতিষ্ঠিত হোক । 

মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্‌ : মনো মে (আমার মন) বাচি (বাক্যে) প্রতিষ্ঠিতম্‌ (প্রতিষ্ঠিত হোক— আমার মন বাক্যে প্রতিষ্ঠিত হোক ।

আবিরাবীর্ম্ম এধি : আবিঃ (আবির্ভাব-ময় হয়ে ; প্রকাশময় হয়ে) আবীঃ (হে আবির্ভূতি; হে প্রকাশবান্‌) ম/মে (আমার জন্য) এধি ([প্রকাশ] হও)—

বেদস্য ম আণীস্থঃ বেদস্য (বেদের— বেদের মধ্যে যা আছে ) ম (মে =আমার জন্য) আণীস্থঃ  ( আনয়ন-ইচ্ছুক /আনয়ন করতে কামময় হও)— বেদের মধ্যে যা আছে [তা] আমার জন্য আনয়ন-ইচ্ছুক (আনয়ন করতে কামময় হও) ।

শ্রুতম্‌ মে মা প্রহাসী :  মে (আমার) শ্রুত (অনুভূত) মা (না) প্রহাসী (পরিত্যাগ করে)—[যা] আমার শ্রুত/অনুভূত) [তা আমাকে যেন] পরিত্যাগ না করে ।

অনেনাধীতেনাহোরাত্রান্‌  সংদধামি : অনেন অধীতেন (এই যা অধীত, তার দ্বারা ) অহোরাত্রান্‌ (অহো এবং  রাত্রিকে—জীবন এবং মৃত্যুকে) সংদধামি (সম্‌ দধামি— একই সাম্যে ধারণ করব )—এই যা অধীত (বিজ্ঞাত হল) তার দ্বারা অহো এবং রাত্রিকে—জীবন এবং মৃত্যুকে একই সাম্যে ধারণ করি ।

ঋতং বদিষ্যামি : ঋ(গতিবান্‌) ত (স্থিত/ মূর্ত্ত) বদিষ্যামি (বলব)— [যিনি] গতিবান্‌ এবং মূর্ত্ত (স্থিত) [তাঁর কথা] বলব । 

সত্যং বদিষ্যামি : সত্যং বদিষ্যামি— সত্যং (সত্য-কে) বদিষ্যামি (বলব)—যিনি সত্য তাঁর কথা বলব । 

তন্মামবতু  : তৎ (সে-সেই তৎ পুরুষ) মাম্‌ (আমাকে) অবতু (পালন করুন)—সেই তৎ পুরুষ আমাকে পালন করুন 

তদ্বক্তারমবতু  : তৎ (সে-সেই তৎ পুরুষ) বক্তারম্‌ (বক্তাকে) অবতু (পালন করুন)—সেই তৎ পুরুষ বক্তাকে পালন করুন  ।

অবতু মাম্‌,  অবতু বক্তারম্‌, অবতু বক্তারম্‌ : আমাকে পালন করুন, বক্তাকে পালন করুন,  বক্তাকে পালন করুন 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ : ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি । 

অর্থ ।

ওঁ, আমার বাক্য মনে প্রতিষ্ঠিত হোক । আমার মন বাক্যে প্রতিষ্ঠিত হোক ।

হে আবির্ভূতি ( হে প্রকাশবান্‌ ) ! আবির্ভাবময় হয়ে ( প্রকাশময় হয়ে ) আমার জন্য প্রকাশিত হও ।

বেদের মধ্যে যা আছে (যে অনুভূতি/বেদন বা সোম আছে), তা আমার জন্য আনয়ন-ইচ্ছুক হও (আনয়ন করতে কামময় হও ) ।

যা আমার শ্রুত বা অনুভূত তা আমাকে যেন পরিত্যাগ না করে ।

এই যা অধীত (বিজ্ঞাত হল) তার দ্বারা অহো এবং রাত্রিকে—জীবন এবং মৃত্যুকে একই সাম্যে ধারণ করি ।

যিনি ঋত (গতিবান্‌ এবং মূর্ত্ত /স্থিত), তাঁর কথা] বলব । 

যিনি সত্য তাঁর কথা বলব ।  

সেই তৎ পুরুষ আমাকে পালন করুন 

সেই তৎ পুরুষ বক্তাকে পালন করুন 

আমাকে পালন করুন, বক্তাকে পালন করুন,  বক্তাকে পালন করুন 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ : ওঁ শান্তি শান্তি শান্তি । 


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ।

যা আমাদের বাইরে, বা বহির্বিশ্ব, তা আমাদের মনে শব্দ বা বাক্যের আকারে রয়েছে। মান বা যা পরিমাপ-যোগ্য, তাকে আমরা যেখানে নিজেতে পাচ্ছি, তা মন; আর মন মান-বিহীন— যাকে মাপা যায় না । আবার আমাদের  মন-ই, বাক্যের আকারে, এই বিশ্বরূপ সংজ্ঞার আকারে, আমাদের মধ্যে ফুটে রয়েছে । যে চিন্ময় আত্মস্বরূপ, তাঁর ক্রিয়াময়তার নাম প্রাণ; এই প্রাণ কামময়, অর্থাৎ বহু হবার যে তেজ, সেই তেজোময় । কামনা অনুসারে প্রাণ সংকল্প করছেন, আর সেই সংকল্পময় প্রাণ-ই মন। এই মন থেকে সুন্নির্দিষ্ট আকার সম্পন্ন, রূপময়, নাম বা শব্দ সকল, বা প্রাণের ভাব সকল প্রকাশ পাচ্ছে। আমাদের মনে বাক্য সকল প্রকাশ পাচ্ছে, যার দ্বারা আমরা চেতায়িত, এবং আমরা সঙ্কল্পময় হয়ে, ইন্দ্রিয়-যুক্ত কর্ম্মময়, শরীরী জীব হয়েছি। আর বিপুল যে মন, যা দৈব-মন (ব্রহ্মা), তাঁর মনন থেকে মূর্ত্ত-বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে, যা সত্য এবং ঋতের প্রকাশ । 

মন বাক্যে প্রতিষ্ঠিত, বাক্য মনে প্রতিষ্ঠিত, আর এইটি দেখলে, সেই মন এবং বাক্যের মূলে অবিনশ্বর আত্মার যে প্রাণময়তা, কামময়তা তা দৃষ্ট হয়। এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে যে দৈব মন এবং দৈব বাকের মিলনে যে জাত হয়, সে প্রাণ; সে অপ্রতিদ্বন্ধী ইন্দ্র । প্রাণ-ই ইন্দ্র, প্রাণ-ই ইন্দ্রিয়ময় হয়ে সর্ব্বত্র দর্শন, শ্রবণাদি-ময়।  এই আত্মার পুরষত্ব এবং ইন্দ্রত্ব, ঐতরেয় উপনিষদে বলা হয়েছে । এই আত্মাই, গুরুরূপে বক্তা এবং শিষ্য রূপে শ্রোতা। ইনি আমাদের রক্ষা করুন, আত্মবেদনের দ্বারা পালন করুন । যা বেদন, তাই শ্রুতি,— যা শ্রুত বা অনুভূত হয়; আত্মস্বরূপরে যে বার্ত্তা তাকে শোনা, তার দ্বারা  প্রাণবন্ত হওয়াই 'শ্রুতি'। এই শ্রুতি যেন আমাদের ত্যাগ না করে। যা অবিনশ্বর আত্মার, মৃত্যুহীন প্রাণের যে বার্ত্তা-সকল, তা শুনে, তা অধীত হয়ে, আমরা অহো-রাত্রকে— জীবন-মৃত্যুকে— এক করি। জীবন ও মৃত্যু এই চেতনারই দুই রূপ, যে চেতনা বা জ্ঞান আমাদের মন, প্রাণ, আত্মা; যে আত্মা অবিনশ্বর, যে প্রাণ অনন্ত, যে মন অনন্ত রূপ প্রকাশময় । 

----------------------------------------------------------------------------------

ঐতরেয় উপনিষদ্‌, প্রথম অধ্যায়, প্রথম খণ্ড। 

১। ১। ১। 

ওঁ।

আত্মা বা ইদমেক এবাগ্র আসীৎ। নান্যৎ কিঞ্চন মিষৎ।স ঈক্ষত লোকান্নু সৃজা ইতি।

১।১।১-১। অন্বয়।

আত্মা (আত্মা) বা (অথবা) ইদম্‌ (এই; এই বিশ্ব) এক এব (এক হয়ে; একীভূত হয়ে) অগ্র (অগ্রে;পূর্ব্বে) আসীৎ (ছিলেন)। ন (না) অন্যৎ (অন্য) কিঞ্চন (কিছুই) মিষৎ (স্পর্ধা করেছিল; প্রকাশ পেয়েছিল)। স (সে; সেই আত্মা) ঈক্ষত (ঈক্ষণ করেছিলেন—কামনা বা ইচ্ছা করেছিলেন; দৃষ্টি প্রকাশ করেছিলেন) লোকান্‌ (লোক সকল) নু (অনন্তর) সৃজা (সৃজৈ-সৃজন করি) ইতি।  

১।১।১-২। অর্থ।

অগ্রে এই বিশ্ব আত্মার সাথে একীভূত হয়ে ছিলেন । অন্য কিছু প্রকাশ পায়নি ।সেই আত্মা ঈক্ষণ করেছিলেন (কামনা করেছিলেন)—"অনন্তর লোকসকল সৃষ্টি করি"  

১।১।১-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি।

১।১।১-৩-১। আত্মা।

'আত্মা' শব্দটি 'আত্মন্‌' শব্দের কর্তৃবাচ্যের একবচনের রূপ। 'আত্মন্‌' শব্দটি, 'অত্‌' এবং 'অন্', এই দুই শব্দ থেকে হয়েছে। 'অত্‌' অর্থে 'চলতে থাকা', সকলকে অতিক্রম করে চলা; 'অন্' অর্থে প্রাণময় হওয়া। যিনি সকলকে অতিক্রম করে চলেছেন এবং যাঁর চলাই 'প্রাণ', বা 'কাল', তিনি 'আত্মা'। সুতরাং এঁর গতি বা ক্রিয়া থেকেই সবাই জাত হয়েছে, বা ইনি নিজেকে সর্ব্বাকারে জাত করেছেন। 

এঁকে সবাই 'নিজ' বলে বোধ করছে। এই নিজবোধের বুকে 'অহং' বা 'আমি' এই বোধ প্রকাশ পাচ্ছে। 'আমি' বা 'অহং' অনবরত পরিবর্ত্তিত হচ্ছে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধের দ্বারা আন্দোলিত হয়ে; বার বার জন্ম-মৃত্যুর দ্বারা, জাগরণ ও নিদ্রার দ্বারা ব্যক্ত ও অব্যক্ত হচ্ছে। কিন্তু আত্মবোধ (নিজবোধ) সদা অপরিণামী, স্থির, এবং সমস্ত জ্ঞান বা অনুভূতির মূলে বিদ্যমান। ইনি সবার আত্মা, এক-নিজবোধ স্বরূপ এবং ইনিই প্রাণ হয়ে নিজেকে সৃষ্টির আকারে প্রকাশ করে সেই সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন; অর্থাৎ এই আত্মাই ঈশ্বর। 

( ১।১।১-৩-২। ওঁ। 

চেতনা বা বোধের বা প্রাণের প্রথম প্রকাশ হয় শব্দের আকারে। নাম-রূপময় এই বিশ্ব, চেতনার শব্দ বা বাক্যের প্রকাশ। তাই সকল প্রকাশের আদিতে আছে চেতনার বাক্‌ বা শব্দাত্মক যে স্বরূপ, যাঁর নাম ওঁ । তাই আদিতে ওঁ উচ্চারিত হয় ।)

১।১।১-৩-৩। দমেক এবাগ্র আসীৎ। নান্যৎ কিঞ্চন মিষৎ।  

ইদম্‌ অর্থে 'ইহা' । উপনিষদে 'ইদম্‌' শব্দের দ্বারা প্রতীয়মান বিশ্বকে, বা পৃথিবীকে বোঝান হয়েছে ।

'এক এব (এক হয়ে; একীভূত হয়ে) অগ্র (অগ্রে;পূর্ব্বে) আসীৎ (ছিল) । ন (না) অন্যৎ (অন্য) কিঞ্চন (কিছুই) মিষৎ ( স্পর্ধা করেছিল; প্রকাশ পেয়েছিল)।'

যা কিছুকে 'ইদম্‌' বা 'ইহ' এই শব্দের দ্বারা আখ্যাত করা যায়—অর্থাৎ সকল কিছু, সৃষ্টির পূর্ব্বে আত্মাতে একীভূত হয়ে ছিল। আত্মস্বরূপের সাথে একীভূত হয়ে থাকার অর্থ, থাকা এবং না থাকা—উভয়ই; কেননা থাকার বোধও আত্মবোধে বা স্বয়ং বোধে বিলীন হয়ে যায়। 
'মিষৎ' শব্দটি 'মিষ্‌' ধাতু থেকে হয়েছে। 'মিষ্‌' ধাতুর অর্থ হল 'জ্বলে ওঠা', 'স্পর্ধিত হওয়া'। 
------------------------------------------------------------
(এই জন্য 'মিষ্‌' ধাতুর অন্যান্য অর্থ হলো 'চোখ মেলা', 'চোখের পাতা ফেলা—অর্থাৎ অহোরাত্রময় হওয়া/দিন-রাতময় বা জাগরণ-নিদ্রাময় হওয়া—স্বতন্ত্র সত্তা হয়ে প্রকাশ পাওয়া বা জাত হওয়া, এবং মৃত হওয়া। কাল প্রকাশ মানেই জন্মান; তাই নিমেষ শব্দের একটি অর্থ 'ক্ষণ' বা 'মুহূর্ত্ত।')  
--------------------------------------------------- 
১।১।১-৩-৪। স ঈক্ষত লোকানুন্ন সৃজা 
'ঈক্ষ্‌' ধাতুর অর্থ 'দেখা', 'কামনা করা', 'কাল, বা কাল-ক্রম প্রকাশ করা'। 'ঈক্ষত ' অর্থে 'কামনা করেছিলেন, 'কাল প্রকাশ করেছিলেন', 'দেখেছিলেন, অবলোকন বা পর্যালোচনা করেছিলেন' ।
কামনা করা এবং কাল প্রকাশ করা একই । সেই কাম বা কাল প্রকাশে, প্রথমে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন 'লোক সকল'—'লোকান্‌ নু সৃজা' ।
যা দৃষ্টি বা দর্শন থেকে প্রকাশ পায়, তার সাধারণ নাম 'লোক' । 'লোক' শব্দটি 'লোক্‌' ধাতু থেকে হয়েছে।'লোক্‌' * অর্থে 'অবলোকন' করা বা দেখা । স্বয়ংপ্রকাশ, স্বাধীন যে আত্মা, তাঁর দেখা মানেই প্রকাশ, রূপ প্রকাশ, বা সৃষ্টি করা । রূপ প্রকাশ পেলেই, সে তার উৎসকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে—এর নাম 'কালাবর্ত্তন' ।
(* Look শব্দটি  'লোক্‌' ধাতু  থেকে হয়েছে।)

১। ১। ২।

স ইমাঁল্লোকানসৃজত। অম্ভো মরীচীর্মরমাপো'দো'ম্ভঃ পরেণ দিবং দৌঃ প্রতিষ্ঠা'ন্তরিক্ষং মরীচয়ঃ। পৃথিবী মরো যা অধস্তাত্তা আপঃ। 


১। ১। ২।-১। অন্বয়।

সঃ (তিনি) ইমাং (এই ) লোকান্‌ (লোক সকলকে) অসৃজত (সৃজন করলেন)। অম্ভঃ (অম্ভ) মরীচীঃ (মরীচী নামক লোক সকলকে) মরম্‌ (মর লোককে) আপঃ (অপ্‌ লোক সকলকে) । অদঃ (ঐ) অম্ভঃ (অম্ভ)  পরেণ (পর—ঊর্ধ্বে) দিবং (দিব্-এর—দ্যুলোকের), দৌঃ (দৌ—দ্যুলোক) প্রতিষ্ঠাঃ (প্রতিষ্ঠা) ।অন্তরিক্ষং (অন্তরীক্ষ) মরীচয়ঃ (মরীচীগণ—মরীচীগণের লোক)। পৃথিবীঃ (পৃথিবী) মরঃ (মর-লোক; মর্ত্ত)।  যা (যা ) অধস্তাৎ (অধে) তা (তা) আপঃ (অপ্‌* সকল— অপ্‌ বা জলের অধীন লোকসকল ) ।

(*অপ্‌ শব্দটি একবচন এবং বহুবচন, উভয়-ই । )

১। ১। ২।-২। অর্থ

তিনি এই লোক সকলকে সৃজন করলেন — অম্ভ, মরীচী সকল, মরলোক, অপ্‌ (জলময়) লোক সকল। ঐ অম্ভ দ্যুলোকের ঊর্ধ্বে, দ্যুলোক প্রতিষ্ঠা । (যা) অন্তরীক্ষ (তা) মরীচীগণ (মরীচীগণের লোক) । পৃথিবী— মর-লোক (মর্ত্ত) । যা অধে তা অপ্‌ সকল— অপ্‌ বা জলময় লোকসকল ।

১। ১।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি। 

১। ১।২-৩-১। অম্ভ = অম্‌ + ভ । 

'অম্‌' অর্থে শব্দ করা, অথবা তেজোময়ী বাক্‌ । 'অম' এর শক্ত্যাত্মক বা তেজোময়ী স্বরূপই 'অম্‌'। 'অম্‌' বা বাঙ্‌ময়তা, বা তেজোময়তা যাঁর ধর্ম্ম,—তিনি 'অম'। 'অ' অর্থাৎ চেতনার যে স্বরূপ থেকে সবাই প্রকাশ পায়,— যিনি আত্মা; 'ম' অর্থে যাঁতে সবাই অব্যক্ত হয়। ম= মৃত্যু; ম= সর্ব্বশেষ স্পর্শ বর্ণ। স্পর্শ অর্থাৎ বায়ু— প্রাণ প্রবাহ বা কালপ্রবাহ;  এই প্রবাহ যাঁতে সমাপ্ত হয়, তিনি 'ম'। যিনি একাধারে 'অ' এবং 'ম', তিনি 'অম'। যা আছে এবং যা নেই— সবই এঁতে রয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদে উক্ত হয়েছে—'অমো নামাসি অমা হি তে সর্ব্বং ইদং'—তোমার নাম 'অম', কেননা তোমাতেই এই সব—যা কিছু 'ইদং' পদবাচ্য। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৫।২।৬ দ্রষ্টব্য।)

১। ১।২-৩-২। অম্ভ ।

অম্ভ লোক অর্থে সেই লোক, যা 'অম'-এর তেজকে 'ভ' অর্থাৎ ভরণ করে । শব্দ যেমন ভাবকে বহন করে, গর্ভীণি স্ত্রী যেমন পুরুষের বীর্য্যকে বহন করে, তেমনই এই স্বয়ংপ্রকাশ, স্বয়ংশক্তি আত্মা নিজেই নিজের তেজকে বহন করেন। (এঁর এক নাম বাগাম্ভৃণী, এবং যে ঋষিকা এঁর দ্রষ্টা, তাঁর নামও বাগাম্ভৃণী ।)

১। ১।২-৩-৩। দিব্‌ এবং দ্যু ।

'দিব্‌' অর্থে দ্যুলোক । অম্ভ প্রতিষ্ঠিত দ্যুলোকে, এর অর্থ অম্ভের প্রকাশ দ্যুলোকে, বা দ্যুলোক অম্ভের মহিমা। (যেমন চন্দ্রের মহিমা তার জ্যোৎস্না ।)

'দ্যৌ' শব্দটি দ্যু শব্দের বৃদ্ধি। দ্যু শব্দের একটি অর্থ— যিনি দোহন করছেন । স্বয়ংশক্তি, স্বয়ংপ্রকাশ অম, নিজেকে নিজে দোহন করে সবাইকে সৃষ্টি করেন; সেই সৃজন ক্ষেত্রের নাম দিব বা দ্যু, এবং এই জন্য শ্রুতি এই বাঙ্‌ময়ী অমাকে 'দোগ্ধৃ' বলে সম্বোধন করেছেন।   

এই দ্যু, দ্যোতনময়, বা আত্মদ্যুতিময়; এই দ্যুতির নাম 'বিদ্যুৎ' । বিদ্যমানতার যা উৎকৃষ্ট অবস্থা তা যেখানে অনুভূত হয়, তার নাম দ্যুলোক । যাঁরা এই দ্যুলোক-বাসী, তাঁরা কখনো নিজবোধ বা আত্মজ্ঞান থেকে বিচ্যুত হন না। 

১। ১।২-৩-৪। অন্তরীক্ষ এবং মরীচি ।

দ্যুলোক প্রকাশাত্মক। আর সেই প্রকাশের ভোগ এবং ভোগ অনুযায়ী পরিণতি যে ক্ষেত্রে ঘটে, তার নাম অন্তরীক্ষ। এই অন্তরীক্ষে আমরা সবাই সবার সাথে প্রাণরূপ সূত্রের দ্বারা যুক্ত হয়ে আছি । পৃথিবীতে বা বাইরের আকাশে (বহির্বিশ্বে), একজন আর একজনের থেকে স্বতন্ত্র, কিন্তু এই অন্তরীক্ষে সকল কিছু নিজের অন্তরেই প্রত্যক্ষ হয় । 

অন্তরীক্ষ = অন্তঃ +ঈক্ষ (দেখা)—যে ঈক্ষণ বা দর্শন সকলের অন্তরে বা মধ্যে ক্রিয়াশীল। প্রাণ, আমাদের মধ্য দিয়ে দেখছেন; এবং এর নামই আমাদের 'প্রত্যক্ষতা', আমাদের 'চিন্ময়তা'। এই দেখা মানেই ভোগ, অনুভূতি । 

দ্যুলোকের যে সাক্ষাৎ প্রকাশ আমাদের এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত দৃষ্ট হয়, তা আমাদের বহিরাকাশের সূর্য্য (সূর্য) । ঐ সূর্য্যের (সূর্যের) থেকে আমাদের রূপময় এবং কালগতিময় বিশ্ব ফুটে উঠেছে । রূপ হল চিন্ময় আত্মার চোখ বা দর্শন, এবং আর কাল হল, তাঁর পা (পদ) বা গতি;  আর, এই হল ঋক্‌ বেদে বর্ণিত বিষ্ণুর 'চক্ষু' আর 'পদ'। ঋক্‌ বেদে বলা হয়েছে : বিষ্ণুর সেই পরম পদ, যা দ্যুলোকের ন্যায় সর্ব্বব্যাপী চক্ষু, তাকে সূরগণ (সুরগণ) সর্ব্বদা দর্শন করেন। —ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ। দিবীব চক্ষুরাততম্।। (ঋক্‌ বেদ ১।২২।২০।)। 

আর ঐ প্রকাশত্মক দ্যুলোক থেকে, অনবরত, শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধের আকারে অনুভূতি রাশি আমাদের অন্তরে আসছে, আমাদের অন্তরকে আলোকিত করছে, আমরা আপ্লুত হচ্ছি। এই অন্তর হলো সোমলোক বা চন্দ্রমার জায়গা, যার আলো আমাদের আপ্লুত করে, আমাদের সাথে মিশে আমাদের রঙ্‌ হয়। ঐ অনুভূতি রাশিই 'সোম'।

এইখানে, এই অন্তরীক্ষে, যা কিছু ইন্দ্রিয়দের দ্বারা বাহিত হয়ে আমাদের মধ্যে আসছে, তা আমাদের সাথে মিশ্রিত হচ্ছে। পীত হলে, পান করলে, নিজের সাথে মিশলে যে বর্ণ হয়, তাই পীত বর্ণ । এই জন্য সোম বা চন্দ্রমার জ্যোতিকে পীত বলা হয়; কেননা চন্দ্রমার অধিকারেই, অন্তরীক্ষে আমাদের ভোগ সম্পন্ন হয়;  মৃত্যুর পর এই চন্দ্রমার অন্তর্গত পিতৃলোকে আমরা পিতৃগণের সাথে একীভূত (পিণ্ডীভূত) হয়ে থাকি, তাই চন্দ্রমার বর্ণকে পীত বলা হয় ।  

দ্যুলোক থেকে যা প্রকাশ পায়, তার নাম ঋক্‌; ঋক্‌ মানে যে গতিশীল (ঋ) এবং বর্ণ বিচ্ছুরণময় (ক্‌) । এই মাটি, জল, যা কিছু প্রতীয়মান, তা ঋক্‌, চেতনার প্রজ্বলিত রূপ, এক একটি দেবতা। এই ঋক্‌ সকল, আকাশে প্রতিষ্ঠিত; এইজন্য বলা হয়েছে : " ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্‌ যস্মিন্‌ দেবা অধি বিশ্বে নিষেধুঃ...."—ঋক্‌ সকলে, অক্ষরে (অবিনশ্বর আত্মাতে), (তাঁর) পরম-ব্যোম স্বরূপে,— যাঁর উপরে বিশ্বের দেবতারা আসীন।" (ঋক্‌ বেদ ১।১৬৪।৩৯।) 

আর এই ঋক্‌ সকলই, আমাদের অন্তরে মরীচি। মরীচি = মম ঋচঃ—আমার ঋক্‌ সকল, আমার মন্ত্র-রূপ প্রকাশ সকল, আমার অর্চি সকল।

আত্মাদিত্য হলেন দেবগণের মধুস্বরূপ (দেবমধু), দ্যুলোক হল বক্র বংশ (তীরশ্চীন বংশ)—একটি মধুচক্রের সাথে অন্য মধুচক্রের সংযোজক অংশ সকল, অন্তরীক্ষ সমগ্র মধুচক্র বা মধুক্ষেত্র (অপূপ), মরীচিরা হলেন পুত্রগণ । (ছান্দোগ্য মন্ত্র ৩।১।১ দ্রষ্টব্য । ) সূর্য্যের (সূর্যের) থেকে যেমন সূর্য্যই (সূর্যই) সৌরকিরণ আকারে বিচ্ছুরিত হন, সেই রকম, এই আত্মাই মন্ত্র বা ঋকের আকারে বিচ্ছুরিত হন । তাই মরীচিরা আত্মখণ্ড বা আত্ম-কণা এবং আদিত্যের পুত্র সকল। বহিঃ বা অধিদৈব ক্ষেত্র থেকে যা কিছু অনুভূতিরাশি আমাদের মধ্যে আসছে, তারা ঋক্‌, এবং এরাই অন্তরে মরীচি। এই জন্য বলা হয়েছে— 'অন্তরিক্ষং মরীচয়ঃ'।

১। ১।২-৩-৫। পৃথিবী—মরলোক । 

পৃথক স্থিতি বোধ যেখানে প্রাধান্য করে, সেই ক্ষেত্রের নাম পৃথিবী । এই স্বাতন্ত্র্য বোধ এতই নিবিড়, যে আমরা প্রত্যেকে নিজের শরীরের বাইরের সকল কিছুকে ' বহিঃ ' বা ' বাইরে ' বলি ;  অন্তরীক্ষ-ক্ষেত্র এর বিপরীত, সেখানে সবাই নিজের ভিতরে। 

এই যে বিচ্ছিন্ন অবস্থা, এ মরলোক বা পৃথিবীর বৈশিষ্ঠ্য—আমরা  আমাদের জন্মের পূর্ব্বে কি অবস্থায় ছিলাম তা জানিনা,  আমরা  মৃত্যুর পরে কোন অবস্থায় থাকবো, তাও জানিনা --আমাদের দুইদিকই কাটা । 

ভৌতিকতা বা স্থূল হওয়া,— চেতনার ধর্ম্ম । প্রকাশের যে সর্ব্বশেষ বা চরম স্তর, তা এই স্থূলত্ব। নিজের অসীম, চিন্ময় স্বরূপকে কে বিস্মৃত হয়ে নিজেকে একটি সুনির্দিষ্ট সসীম আয়তন-বদ্ধ অবস্থায় সৃষ্টি করে ইনি ভূত বা স্থূল হন; অসীমতা থেকে এই ভাবে সসীম হওয়া মানে— ' মূর্চ্ছিত ' হওয়া, ' মূর্ত্ত ' হওয়া। এই পৃথিবীতে বা মরলোকে তাই প্রধানতঃ সবাই মূর্ত্ত ।আত্মা অবিনশ্বর, এবং এই নশ্বরতা এবং ভৌতিকতার দ্বারা আবৃত; ইনি অসীম, অনন্ত, তাই নশ্বর জীব হয়েও, অবিনশ্বরই থাকেন।   

১।১।২-৩-৬। অপ্‌ লোক, অধ । 

যা (যা ) অধস্তাৎ (অধে) তা (তা) আপঃ ( অপ্‌ সকল) । অপ্‌ শব্দের প্রথমার বহুবচন 'আপঃ'। অপ্‌ অর্থে জল, দৈবজল । যা আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে, যার দ্বারা আমাদের আপ্তি সাধিত হয়, তাই অপ্‌;  চেতনার এই আপ্তি প্রদায়ী রূপ বা মহিমার নাম অপ্‌ । প্রাণ যখন আমাদের 'ভোগ' হয়ে প্রকাশ পান, তাঁর নাম হয় জল; এই জল যে তেজোময় প্রাণই, এই প্রকার দেখলে, এই জলই হয়ে যায় 'সোম'। বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৫।১৩ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে , " প্রাণের জ্যোতিরূপ হল চন্দ্রমা (সোম) এবং শরীর হল অপ্‌ ।" অধঃ হল সেই দিক, যে দিকে আমাদের প্রতিষ্ঠা । এই জন্য আমাদের পাদদ্বয় অধে বা নীচে, এবং পৃথিবীকে স্পর্শ করে আছে। জলের অধোদিকে যে গতি, তা প্রাণের এই  প্রতিষ্ঠা করার, মূর্ত্ত করার গতি । যাকে আমরা জল বলে পৃথিবীতে জানি, তা পৃথিবীর আধার-শক্তি স্বরূপ। এই জন্য শ্রীশ্রী চণ্ডীতে বলা হয়েছে :
"আধারভূতা জগতস্তমেকা
মহীস্বরূপেণ যতঃ স্থিতাসি ।
অপাং স্বরূপস্থিতয়া ত্বয়ৈতৎ
আপ্যায্যতে কৃৎস্নম্‌ অলঙ্ঘ্যবীর্য্যে ।। "
(চণ্ডী, 
একাদশ অধ্যায়, ৪র্থ মন্ত্র। ) এই মন্ত্রটির অর্থ : "(দেবি ! আপনি) একাই জগতের সবার আধার-শক্তি স্বরূপা, যেহেতু এই মহী-স্বরূপে ( মহান মূর্ত্ত-ক্ষেত্র রূপে ) আপনি স্থিত । অপ্‌ স্বরূপে অবস্থিতা আপনার দ্বারা এই সকল কিছু ( সমগ্র সৃষ্টি ) আপ্যায়িত (সমৃদ্ধ); আপনি অলঙ্ঘ্যবীর্য্যা — আপনার শক্তিকে কেউ লঙ্ঘন করতে পারে না ।" সুতরাং এই অপ্‌ বা জল রাশি, ধরিত্রীর  ধারণশক্তির উৎস, এই যে প্রাণ যিনি অপ্‌  রূপে আধারশক্তি, তাঁর নাম 'অপান' । অপান = অপ্‌ (অপ) +অন । প্রশ্নোপনিষদের ৩।৮ মন্ত্রে বলা হয়েছে,—" পৃথিব্যাং যা দেবতা সা পুরুষস্যাপানমবষ্টভ্য—পৃথিবীতে যে দেবতা (দেবী) তিনি পুরুষের অপানকে অবশ করে (বশীভূত) রেখেছেন ।" অর্থাৎ, যা শরীরে অপান-বায়ু, যার দ্বারা আমরা শরীরে বিধৃত, তা এই  পৃথিবীতে যে দেবী—ধরিত্রী—তিনি বা তাঁর অধীনে । 
চক্ষু বা দর্শন থেকে বিশ্বাসের জন্ম হয়। যা দেখা যায়, তাকে সত্য বলা হয়; তাতে সত্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই চক্ষু হল জ্ঞানেন্দ্রিয়, আর পা হল কর্ম্মেন্দ্রিয়, কেননা পায়ের উপর নির্ভর করে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি বা প্রতিষ্ঠিত বোধ করি ।  আর চোখের যে জল, তা এই অপ্‌ ।
তাই যা অধে, তা আধারশক্তি স্বরূপ অপ্‌ বা অপানের অধিকারে, বা অপান তার লোক।   
স্বয়ংশক্তি আত্মার শক্তির নাম বাক্‌, আর তাঁর বহ্বাত্মক বা বহু বহু হবার যে প্রবণতাময় সত্তা তাই প্রাণ। আত্মাকে বাক্‌ বহু-বহু আত্ম-খণ্ডে বা বহু প্রাণময় সত্তা করে সৃষ্টি করেছেন। প্রতি প্রাণময় সত্তাটি হয়েছে 'আধেয়', এবং বাক্‌ হয়েছেন আধার; যেমন আমাদের প্রত্যেকটি ভাব বাক্যের আধারে ধরা থাকে। তাই এই পৃথিবীর, পৃথক-ক্ষেত্রের  প্রতিটি সত্তাকে, বাক্‌ তাঁর বেষ্টন দিয়ে, তাকে রূপময় করে ফুটিয়েছেন। উপনিষদে বলা হয়েছে বাক্‌ই পৃথিবী এবং শরীর, আর প্রাণই অগ্নি,— পৃথিবীর অন্তরের অগ্নি । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র, ১।৩।১২, ১।৫।১১,  ৩।৯।১০ দ্রষ্টব্য।)।
আর 'জল' ই আমাদের ভোগ্য, আমাদের বেঁচে থাকার তৃপ্তি, আপ্তি, অপ্‌ । এই অপের দ্বারাই আমাদের পার্থিব বা ভৌতিক স্থিতি পুষ্ট হয় । এই অপ্‌ বা দৈব জলই আমাদের বীর্য্য বা প্রজনন সংক্রান্ত সামর্থ্য । ( বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২।৫।২, মন্ত্র ২।১।৮, মন্ত্র ৩।২।১৩,মন্ত্র ৩।৯।২২,  দ্রষ্টব্য।)

আর, যা ভৌতিকতার আধিক্য প্রকাশ করে তা 'আধিভৌতিক'। ভৌতিকতার দ্বারা এই আত্মস্বরূপ আমাদের বদ্ধ করে রেখেছেন, বা স্বীয় কর্ম্মফল হেতু আমরা দেহাত্ম বোধময় বা ভৌতিকতার দ্বারা অভিভূত। এই বদ্ধতাই 'নাগপাশ'। অগ্নি বা চেতনা যেখানে স্তিমিত হয়েছে ভৌতিকতার প্রভাবে, সেই স্থান পৃথিবীর  অধে, যা নাগলোক; নাগ = ন + অগ্‌ (অগ্নি / প্রাণাগ্নি ) ।
অধঃ দিকের যিনি দেবতা, তাঁর নাম 'অনন্ত'। যতদূর অব্দি অগ্নি, ততদূর অব্দি বাক্‌, এবং ততদূর অব্দি পৃথিবী। অগ্নি অনন্ত, তাই বাক্ও অনন্ত, তাই পৃথিবী বা এই ভৌতিক বিশ্বও অনন্ত (বৃহদারণ্যক উপনিষদ মন্ত্র ১।৫।১১, ১।৫।১২, ১।৫।১৩ দ্রষ্টব্য।); অনন্তনাগ শব্দের এই হল তাৎপর্য। এই আধার শক্তির প্রকাশ হয় বসু-দেবগণের মধ্য দিয়ে, যাঁদের দ্বারা আমরা বসবাস করি। প্রাণই বসু, কেননা প্রাণের (বা বাকের) দ্বারাই আমরা বাস করি, বেঁচে থাকি । বস্তু জগৎ বা বস্তবিকতার উপর যাঁরা আধিপত্য করছেন, তাঁরা বসু। বাসুকি নাগরূপ এই বসুশক্তি দ্বারা আমরা বাস্তবায়িত হয়ে রয়েছি । 

১।১।৩। 
স ঈক্ষতেমে নু লোকা লোকপালান্নু সৃজা ইতি । সো'দ্ভ্যঃ এব পুরুষং সমুদ্ধৃত্যামূর্ছয়ৎ।। 

১।১।৩-১ অন্বয়।
সঃ (সে-সেই আত্মা)  ঈক্ষত (ঈক্ষণ করলেন) ইমে নু লোকাঃ (এই লোকসকল [তো সৃষ্টি হল], লোকপালান্‌ (লোকপালদের)  নু সৃজৈ (সৃষ্টি করি) ইতি (এই-এইটি) ।
সঃ (সে-সেই আত্মা) অদ্ভ্যঃ এব ( এই অপ্‌ সকল থেকেই; [অদ্ভ্যঃ শব্দটি অপ্‌ শব্দের পঞ্চমী-বিভক্তির বহুবচনের রূপ] ) পুরুষং (পুরুষকে) সমুদ্ধৃত্য (সম্যক রূপে উদ্ধার করে) অমূর্ছয়ৎ (মূর্ছিত করলেন; মূর্ত্ত করলেন।। 

১।১।৩-২। অর্থ
সেই আত্মা এই ঈক্ষণ করলেন— এই লোকসকল [তো সৃষ্টি হল], লোকপালদের সৃষ্টি করি ।
সেই আত্মা, এই অপ্‌ সকল থেকেই পুরুষকে সম্যক রূপে উদ্ধার করে মূর্ছিত (মূর্ত্ত) করলনে ।

১।১।৩-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি। 
স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার যে প্রথম আলোক, তাতে লোক সকল সৃষ্টি হল । তারপর তাঁর ঈক্ষণ দ্বারা, বা অবলোকনে তিনি লোকপালদের সৃষ্টি করলেন । 
কাল গতি বা কালের ক্রিয়ার নাম কলন । আর সেই কালগতিতে আমরা যে ভোগ করছি, অনুভব করছি, বা সোম পান করছি, সেইটি পালন । 'পা' শব্দটি 'পানার্থক' । পাল =পা(পান) +অল্‌ (সক্ষম) —যার দ্বারা সোম পান বা ভোগ সম্ভব হয় । এই লোকপালগণই লোকের পালন করেন এবং কখন কোন কাল বা কিরকম সময় কোন একটি লোকের উপর প্রাধান্য করবে, তা নির্ধারণ করেন। 
অপ্‌ বা চেতনার যে আপ্তিময়তা, সেই আপ্তির নিবিড়তা থেকেই স্থূলত্ব বা ভূতত্ব রচিত হয়। এই স্বয়ংপ্রকাশ চেতনা নিজেকে ''বৃক্ষ' বলে জেনে 'বৃক্ষ' হয়েছেন;  এই বৃক্ষ হওয়াটা একটি 'আপ্তি । সেই বৃক্ষ নিজেকে বৃক্ষ বলেই জানে, সে যে বৃক্ষ হয়েও অসীম এবং সবার আত্মা, তা আর জানছে না। এর নাম মূর্ছিত হওয়া,  মূর্ত্ত হওয়া, ভূত হওয়া । বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২।১।৮ উক্ত হয়েছে যে অপের মধ্যে যিনি আছেন, তাঁর নাম 'প্রতিরূপ', কেননা এঁর থেকে প্রতিরূপ সকল জাত হয় । তাই যেমন যেমন বোধক্রিয়া বা  অনুভূতি, সেইরকমই, বা তদনুরূপ হয়ে পুরুষ জাত হয় । এই যে অপ্‌ বা চেতনার 'জল' রূপ মহিমা, এঁর থেকেই রূপ সকল বা ভূত সকল (ভৌতিক বিশ্ব) জাত হয়, এবং এঁতেই বিলীন হয়; পুনর্জন্ম এবং পুনর্মৃত্যুর কারণ এই 'জল', তাই এই অপ্‌-কে   'কারণবারি' বলা হয়। 
(এই প্রসঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের মন্ত্র ৫।৫।১ দ্রষ্টব্য। )

১।১।৩-৪।পুরুষ। 
পুরু শব্দের 'বহু', এবং 'ষ' দ্বারা 'খণ্ড' বা 'খণ্ডন' বোঝায় । একই আত্মা, নিজেকে খণ্ড-খণ্ড করে পুরুষ হয়েছেন । আত্মা খণ্ড-খণ্ড পুর-সকলে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে জীব হয়েছেন, সৃষ্টির প্রতিটি পদার্থ হয়েছেন । এই খণ্ডিত, অনুপ্রবিষ্ট আত্মাই পুরুষ। এক আত্মাই বহু পুরুষ হয়ে প্রতিরূপময় হয়েছেন। পিতার অনুরূপ পুত্র হয়, বংশধারা হয়; রূপের অনুরূপ প্রতিরূপ হয় ।
যিনি প্রথম পুরুষ বা আদিপুরুষ, তিনি ব্রহ্মা । দেবগণের মধ্যে সর্ব্বপ্রথম ব্রহ্মা জাত হয়েছিলেন : "ব্রহ্মা দেবানাং প্রথমঃ সংবভূব " (মুণ্ডক উপনিষদ্‌ ১।১।১)।
কারণবারিতে শায়িত বিষ্ণুর (প্রাণের) নাভি থেকে ব্রহ্মার উৎপত্তি। এই জল থেকে উদ্ধৃত পুরুষই ব্রহ্মা এবং তিনি জাত হলে, অন্যান্য দেবগণ জাত হন। 

১।১।৪  
তমভ্যতপত্তস্যাভিতপ্তস্য মুখং নিরভিদ্যত যথা'ণ্ডং । মুখাদ্বাগ্বাচো'গ্নিঃ ।নাসিকে নিরভিদ্যেতং; নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ, প্রাণাদ্বায়ুঃ । অক্ষিণী নিরভিদ্যেতমক্ষীভ্যাং চক্ষুশ্চক্ষুষঃ আদিত্যঃ ।কর্ণৌ নিরভিদ্যেতাং; কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং, শ্রোত্রাদ্দিশঃ । ত্বঙ্‌ নিরভিদ্যত; ত্বচো লোমানি, লোমভ্য ওষধিবনস্পতয়ঃ । হৃদয়ং নিরভিদ্যত; হৃদয়ান্মনো মনশ্চন্দ্রমাঃ । নাভির্নিরভিদ্যত; নাভ্যা অপানো'পানান্মৃত্যুঃ ।শিশ্নং নিরভিদ্যত; শিশ্নাদ্রেতো, রেতসঃ আপঃ।।

১।১।৪-১অন্বয়। 

তম্‌ (তাকে; সেই অপ্‌ থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে) অভ্যতপৎ (অভিতপ্ত করেছিলেন) । তস্য (তার/সেই) অভিতপ্তস্য (অভিতপ্তের, অভিতপ্ত বা তপ্ত পুরুষের) মুখং (মুখ) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল), যথাঃ (যেমন) অণ্ডং (অণ্ড) । মুখাৎ বাক্‌ (মুখ হতে বাক্‌), বাচঃ অগ্নিঃ (বাক্‌ হতে অগ্নি) । নাসিকে (নাসাদ্বয়) নিরভিদ্যেতং (স্ফুটিত হল); নাসিকাভ্যাং (নাসাদ্বয় হতে) প্রাণঃ (প্রাণ), প্রাণাৎ (প্রাণ থেকে) বায়ুঃ (বায়ু) । অক্ষিণী (অক্ষিদ্বয়) নিরভিদ্যেতং (স্ফুটিত হল); অক্ষীভ্যাং (অক্ষিদ্বয় থেকে) চক্ষুঃ (চক্ষু),  চক্ষুষঃ (চক্ষু থেকে) আদিত্যঃ (আদিত্য)। কর্ণৌ (কর্ণদ্বয়) নিরভিদ্যেতাং (স্ফুটিত হল); কর্ণাভ্যাং (কর্ণদ্বয় থেকে) শ্রোত্রং (শ্রোত্র), শ্রোত্রাদ্‌ (শ্রোত্র) দিশঃ (দিক সকল) । ত্বক্‌ (ত্বক) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); ত্বচো (ত্বক থেকে) লোমানি (লোম সকল), লোমভ্যঃ (লোম সকল থেকে) ওষধিবনস্পতয়ঃ (ওষধি ও বনস্পতি সকল) । হৃদয়ং (হৃদয়) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল);  হৃদয়াৎ (হৃদয় থেকে) মনঃ (মন) মনসঃ (মন থেকে) চন্দ্রমা (চন্দ্র) । নাভিঃ (নাভি)  নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); নাভ্যা (নাভি থেকে) অপানঃ (অপান), অপানাৎ (অপান থেকে) মৃত্যুঃ (মৃত্যু) । শিশ্নং ( শিশ্ন/জননেন্দ্রিয়) নিরভিদ্যত (স্ফুটিত হল); শিশ্নাৎ (শিশ্ন থেকে) রেতঃ (বীর্য্য) রেতসঃ ( বীর্য্য থেকে ) আপঃ (অপ্‌) ।

১।১।৪-২। অর্থ । 
তাকে,— সেই অপ্‌ থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে অভিতপ্ত করেছিলেন । সেই অভিতপ্ত পুরুষের মুখ স্ফুটিত হল, যেমন অণ্ড (যেমন অণ্ডকে বিদীর্ণ করে শাবক জাত হয়) । মুখ থেকে বাক্‌, এবং বাক্‌ থেকে অগ্নি (স্ফুটিত হল) ।
নাসাদ্বয় স্ফুটিত হল; নাসাদ্বয় থেকে প্রাণ, এবং প্রাণ থেকে বায়ু (স্ফুটিত হল)। 
অক্ষিদ্বয় স্ফুটিত হল; অক্ষিদ্বয় থেকে চক্ষু, এবং চক্ষু থেকে আদিত্য (স্ফুটিত হল) ।
কর্ণদ্বয় স্ফুটিত হল; কর্ণদ্বয় থেকে শ্রোত্র, এবং শ্রোত্র থেকে দিক সকল (স্ফুটিত হল) । 
ত্বক স্ফুটিত হল; ত্বক থেকে লোম সকল, এবং লোম সকল থেকে ওষধি ও বনস্পতি সকল (স্ফুটিত হল) । 
হৃদয় স্ফুটিত হল; হৃদয় থেকে মন, এবং মন থেকে চন্দ্রমা (চন্দ্র) (স্ফুটিত হল) । 
নাভি স্ফুটিত হল; নাভি থেকে অপান, এবং অপান থেকে মৃত্যু (স্ফুটিত হল)।
 শিশ্ন/জননেন্দ্রিয় স্ফুটিত হল; শিশ্ন থেকে রেত / বীর্য্য এবং রেত থেকে অপ্‌ (জল) (স্ফুটিত হল) ।

১।১।৪-৩সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি। 
কারণবারি থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে (যিনি ব্রহ্মা, —সৃষ্টির আদি পুরুষ,— তাঁকে) অভিতপ্ত করলেন এই স্বয়ংপ্রকাশ-স্বয়ংশক্তি আত্মা (যিনি সবার স্রষ্টা)। অভিতপ্ত করলেন অর্থে, নিজেতে নিজে তেজোময় হলেন,— সেই ব্রহ্মারূপ পুরুষের উদ্দেশ্যে সংকল্পময় হলেন। সেই তেজ বা তপ থেকে, পুরুষের (ব্রহ্মার) মুখ স্ফুটিত হল বা উদ্‌ভিন্ন হল ; যেমন অণ্ডকে বিদীর্ণ করে শাবক প্রকাশ পায়, তেমন-ই । মূল মন্ত্রে ' নিরভিদ্যত ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে; এই শব্দটি ' ভিদ্ ' ধাতু থেকে হয়েছে। ভিদ্ অর্থে ভেদ করা, বিভিন্ন হয়ে প্রকাশ পাওয়া । এই আত্মস্বরূপ, নিজেই নিজেকে নিজের দ্বারা বিভিন্ন করে, বিছিন্ন করে, সেই আত্মখণ্ডকে  নিজেতেই ধারণ করেন; এবং তার অন্তরে অবিনাশী, অখণ্ড, অদ্বৈত আত্মা হয়ে বিরাজ করেন । এই ভেদ, বিচ্ছিন্নতা,  খণ্ডনকে লক্ষ্য করে, এঁকে পুরুষ বলা হয়। আত্মশক্তি বা বাকের দ্বারাই ইনি নিজেকে খণ্ডিত করেন, তাই ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে ' পুরুষের রস বাক্‌ '। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।১।২ দ্রষ্টব্য । ) 

অণ্ড শব্দের অর্থ ' অম্‌+ড', অর্থাৎ যেমন তেজ বা 'অম্‌', সেইরকম-ই 'ড' বা শব্দ, সেইরকম বা তদনুরূপ প্রকাশ । 'ড' অর্থে অনুকারী শব্দ। যেমন তেজ, যেমন 'বাক্‌' এর ভঙ্গিমা, সেইরকম-ই বাক্য, সেইরকম-ই সৃষ্টি, সেইরকম-ই মুখ, সেইরকম-ই রূপ । 

১।১।৪-৩-১। মুখ এবং বাক্‌ । (মুখাদ্বাগ্বাচঃ) । 
মুখ অর্থে,— সেই উৎস, যেখান থেকে কোন সত্তা পৃথক হয়ে ফুটে বহির্গত হয়। যেমন করে চেতনা বা প্রাণ প্রকাশিত হচ্ছেন, সেইটাই তার, বা সেই সৃষ্ট সত্তার পরিচয়। তাই মুখই আমাদের পরিচয়। 
মুখ = মু (মোচন; মুঞ্চ ধাতুর অর্থ মোচন করা, উদ্গিরণ করা )+খ (আকাশ)। যেখানে সকল শব্দ, তাদের প্রকাশ হারিয়ে একত্বে থাকে তার নাম আকাশ বা ব্যোম্‌ । আকাশ তত্ত্ব, শব্দ তন্মাত্রা । মুখের ভিতরে যে ফাঁক (বিবর), তা এই আকাশই । আর সেখান থেকে বাক্য বা শব্দ হয়ে  চেতনা প্রকাশ পাচ্ছেন, পুরুষ নিজেকে প্রকাশ করছেন । তাই বলা হল 'মুখাৎ বাক্‌ '। 

১।১।৪-৩-২ বাক্‌ ও অগ্নি ।  অগ্নি দেবতা। (বাচঃ অগ্নিঃ)। 
আমাদের সকল অনুভূতি, 'শব্দ' বা 'নাম' বা বাক্যের আকারে আমাদের মধ্যে থাকে । যে কোন শব্দই বাক্‌; আত্মার শব্দাত্মক স্বরূপই বাক্‌ । তিনি বাক্‌ রূপে আমাদেরকে সকল কিছু 'জ্ঞাপন' করেন।
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ৪।১।২ মন্ত্র দ্রষ্টব্য ।) আমরা যা কিছু জানি, যা কিছু অনুভব করি, তা শব্দাকারেই আমাদের চেতনায় থাকে । চেতনার এই শব্দাকার রূপগুলিকে 'নাম' বলে। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৬।১ মন্ত্র দ্রষ্টব্য ।)
বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে বাকের জ্যোতিরূপ হল অগ্নি।  ( বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৫।১১ মন্ত্র দ্রষ্টব্য ।) যে কোন প্রকাশই 'জ্যোতি'। তাই বাক্‌ যখন রূপের আকারে প্রকাশ পান, তা অগ্নি বা বাকের 'জ্যোতিরূপ' । সুতরাং যে কোন শব্দ বা বাক্য যা চেতনায় ফুটে উঠছে, তা অগ্নি, নিজের একটি প্রজ্বলিত রূপ। আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি, ততক্ষণ কথা বলি, বা শব্দ-ময় হয়ে থাকি; যখন নিদ্রিত হই , তখন আর কথা বলি না বা সকল শব্দ নীরব হয়। এই শব্দাত্মক বাকের দ্বারা আমরা জ্বলে আছি, সক্রিয় হয়েছি; এইটি বাকের 'অগ্নিত্ব' । এই জন্য আমরা উষ্ণ। আমাদের শরীরের উষ্ণতা, এই অগ্নি বা প্রাণাগ্নি আমাদের শরীরের মধ্যে রয়েছেন বলে। আমরা যখন ঘুমিয়ে পরি, তখনো এই প্রাণাগ্নি প্রজ্বলিত থেকে আমাদের শরীরের সকল কর্ম্মকে সাধন করেন, আমাদের পার্থিব স্থিতিকে বজায় রাখেন । এই জন্য প্রশ্নোপনিষদ্‌ উক্ত হয়েছে : প্রাণাগ্নয়ো এব এতস্মিন্‌ পুরে জাগ্রতি— (পুরুষ নিদ্রিত হলে) প্রাণাগ্নি-ই এই পুরে (শরীরে) জেগে থাকেন। (প্রশ্নোপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।৩ দ্রষ্টব্য ।)  ঋক্‌ বেদে (মন্ত্র ১।১।১) অগ্নিকে 'পুরোহিত' বলা হয়েছে। যিনি পুরের হিতার্থে পুরে বা শরীরে নিহিত, তিনি পুরোহিত । সূক্ষ্মাতি-সূক্ষ্ম লোক সকল থেকে, এই স্থূল সৃষ্টি, বা ভৌতিক বিশ্ব যতদূর অব্দি, ততদূর অব্দি এই অগ্নি (প্রাণাগ্নি) বিস্তৃত হয়ে ক্রিয়াশীল হয়েছেন । তাই উপনিষদে বলা হয়েছে, —তস্যৈ (সেই) বাচঃ (বাকের) পৃথিবী (পৃথিবী) শরীরং (শরীর) জ্যোতীরূপম্‌ (জ্যোতিরূপ ) অয়ম্‌ (এই) অগ্নিঃ (অগ্নি) তৎ (তাই) যাবতী (যতদূর) এব (অব্দি) বাক্‌ (বাক্‌) তাবতী (ততদূর) পৃথিবী (পৃথিবী) তাবান্‌ (ততদূর) অয়ম্‌ (এই) অগ্নিঃ (অগ্নি)— সেই বাকের পৃথিবী শরীর, জ্যোতিরূপ এই অগ্নি; যতদূর অব্দি বাক্‌ ততদূর অব্দি পৃথিবী, ততদূর এই অগ্নি । প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে বৈদিক পরিভাষায় পৃথিবী এবং শরীর সমার্থক। আমাদের শরীর পৃথিবীর অংশ । পার্থিব যে অগ্নি, তা সাক্ষাৎ এই অগ্নি দেবতার পার্থিব রূপ ।  

বাক্‌ ও অগ্নি ।
আত্মা যখন ক্রিয়াশীল হন, নিজেকে বহু করেন, তখন তাঁর নাম হয় 'প্রাণ' । আত্মশক্তি—যিনি আত্মাকে বা প্রাণকে বহু করেন, তাঁর নাম বাক্‌;  আত্মাই আত্মার শক্তি । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা, যিনি প্রাণ রূপে প্রকাশ পেয়েছেন, বা প্রজ্বলিত হয়েছেন, তাঁর নাম অগ্নি। তাই প্রাণকে 'প্রাণাগ্নি' বলা হয় । এই প্রাণই বাকের দ্বারা বহু হয়ে বিরাজ করছেন । তাই বলা হল ' বাচঃ অগ্নিঃ '। 

অগ্নি । 
অগ্নি = অগ্‌ +নি (নী)— যিনি অগ্রবর্ত্তী হয়ে সকলকে নিয়ে চলেন তিনি প্রাণ । (অগ্র = অগ্‌ + র [রহিত] ।) ঋক্‌বেদ (মন্ত্র ১।১।১) অগ্নিকে 'পুরোহিত' বলা হয়েছে। পুরোহিত = পুরস্‌ (পূর্ব্বে) হিত (স্থিত)। 
আবার, 'পুরোহিত' অর্থে, 'পুরে নিহিত'; এই প্রাণ, প্রাণাগ্নি, সবার মধ্যে নিহিত। 
এই প্রাণ, যিনি অন্তহীন, যিনি সবাইকে মৃত্যুর পরপারে নিয়ে যান, এঁকে বৃহদারণ্যক এবং ছান্দোগ্য উপনিষদে, 'মুখ্য প্রাণ', ' আয়াস্য প্রাণ', ইত্যাদি বলে বন্দনা করেছেন। সবার মধ্যে থাকেন, তাই এঁকে 'মধ্যম প্রাণ'  বলা হয়েছে । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ২।২।১ দ্রষ্টব্য।)
যিনি থাকলে সবাই তাঁর সাথে থাকে, এবং যিনি উঠলে তাঁর সাথে সবাই উঠে যায়, তিনি প্রাণ। ইনি সবাইকে হৃদয়ের দ্বারা ধারণ করে ক্রমণ করেন বলে, এঁকে বেদ 'দধিক্রা'  নামে অভিহিত করেছেন । ' দধ্‌ ' অর্থে 'ধারণ করা' , এবং ' ক্রা ' অর্থে 'ক্রমণ' করা । এই দধিক্রা 'বুকে হাঁটেন', ' হৃদয়ের দ্বারা ধারণ করে ক্রমণ করেন', তাই এঁর গতি সর্পবৎ । এঁর গতিতে আমরা দিক পরিবর্ত্তন করতে করতে জন্ম থেকে মৃত্যুতে এবং মৃত্যু থেকে জন্মে ক্রমণ করছি, এবং মৃত্যুর থেকে অমৃতে চলেছি । এই গতি অতীব বক্র, সর্পিল । 
'অগ্নি' শব্দটি 'অগ্‌' ধাতু থেকে হয়েছে; অগ্‌ ধাতুর অর্থ সর্পিল গতিতে চলা

অগ্নি দেবতা । 
এই যে স্বয়ং প্রকাশ চেতনা, যিনি অগ্নি, তিনি বাক্‌ রূপে আমাদেরকে সকল কিছু 'জ্ঞাপন' করেন। আমাদের সকল অনুভূতি, 'শব্দ' বা 'নাম' বা বাক্যের আকারে আমাদের মধ্যে থাকে । অগ্নি বা বাক্‌ই প্রজ্ঞা, বাক্যের আকারেই আমরা সকল কিছু জানি। এই জ্ঞাপক চেতনাই আমাতে অগ্নি দেবতা ।   (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ৪।১।২ মন্ত্র দ্রষ্টব্য । ) যা কিছু আমাদের চেতনায় উদ্বেলিত হচ্ছে, তাদেরকে সুনির্দিষ্ট আয়তন, রূপ বা সংজ্ঞাতে পরিণত করে, এই প্রাণাগ্নি আমাদেরকে চৈতন্যময় করে রেখেছেন । 

১।১।৪-৩-৩। নাসিকা ও প্রাণ ।  (নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ)  
নাসিকা এবং নাসা শব্দদুটি 'নস্‌' ধাতু থেকে হয়েছে। 'নস্' ধাতুর অর্থ 
' নিকটে আসা '।  শব্দাত্মক আকাশ, যেখানে সবাই 'ন' বা 'নাস্তি' হয়ে থাকে,  সেখান থেকে স্পর্শাত্মক বায়ু বা প্রাণ প্রবাহিত হয়ে, আমাদের মধ্যে এসে, শ্বাস-প্রশ্বাস রূপে ক্রিয়াশীল হয়েছেন। এই যে প্রাণ আসছেন, আকাশ থেকে বায়ু রূপে এইটি নাসা, বা যেখান দিয়ে প্রাণ আসছেন তা 'নাসা' বা 'নাসিকা', এবং এই ক্রিয়ার দ্বারা আমাদের প্রাণময়  শারীরিক স্থিতি সম্ভবিত   হচ্ছে। 

১।১।৪-৩-৪। প্রাণ ও গন্ধ । 
বৈদিক পরিভাষায় ঘ্রাণেন্দ্রিয়কেও 'প্রাণ' বলা হয়। এই প্রাণ আমাদের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে যে স্থিতি বা স্থায়িত্ব বোধ দান করেন, তাই গন্ধের গন্ধত্ব । 'গম্' বা গতি বা প্রাণগতি যে ভাবে বিধৃত হয়েছে, সেইটি 'গন্ধ' (গম্ + ধ ) । আমাদের প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট 'গন্ধ' বা সৌরভ আছে। শরীরের দ্বারা বেষ্টিত এই যে প্রাণ, তা এই গন্ধেরই অভিব্যক্তি । যা পৃথিবী বা ক্ষিতিতত্ত্ব তার তন্মাত্রা গন্ধ । আমরা পূর্ব্বে বলেছি যে এই শরীর পৃথিবীর অন্তর্গত ।

(আমরা জানি, কুকুর— যাদের 'শ্বন্‌' ' বলা হয়, তারা এই গন্ধের দ্বারা সবাইকে চিহ্নিত করতে পারে । এদের মধ্যে 'শ্ব', অর্থাৎ কাল বা কালগতির প্রতি আনুগত্য বিশেষ ভাবে প্রকটিত,— প্রভুর (প্রভুত্বের) প্রতি আনুগত্য, এদের চরিত্রের একটি বিশেষ দিক । কালের (শ্ব=এর) শাসন বা নিয়ন্ত্রণই আমাদের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস আকারে ক্রিয়া করছে, এবং আমাদের শরীর বা স্থিতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। )

১।১।৪-৩-৫। বায়ু দেবতা । (প্রাণাদ্বায়ুঃ)।
বহিরাকাশে যিনি বায়ু, তিনি যখন আমাদের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে প্রবাহিত হন, তখন তাঁর নাম হয় আয়ু । বায়ু শব্দটি 'বা' ধাতু থেকে হয়েছে । 'বা' ধাতুর একটি অর্থ চলা বা প্রবাহিত হওয়া, অন্য একটি অর্থ  হল  'বয়ন 
করা '। এই বায়ুর নাম 'সূত্রাত্মা';  সূত্রের দ্বারা যেমন একটি মালার ফুলগুলি গ্রথিত থাকে, সেইরকম প্রাণ বা বায়ুরূপ সূত্রের দ্বারা ইনি বয়ন করেছেন, যার ফলে এই বিশ্বের প্রতিটি সত্তা প্রতিটি সত্তার সাথে সংযুক্ত । এই বায়ুর দ্বারাই আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরস্পরের সাথে সংযুক্ত, শৃঙ্খলিত, এই জন্য দেহত্যাগের পর , আমাদের শরীর প্রথমে শিথিল হয়ে যায় (primary flaccidity) । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৭।২ দ্রষ্টব্য । )
বায়ুর একটি নাম মরুৎ— ইনি মৃত্যুর ঊর্ধ্বে (মৃ +উৎ); ইনি প্রাণের প্রবহনময় স্বরূপ, যার দ্বারা সবাই সঞ্জীবিত ।  আমরা যখন মৃত হই, আমরা তৎক্ষণাৎ শরীর থেকে উৎক্রান্ত হয়ে অন্যত্র চলে যাই না। শরীরের নিকটেই
বায়ুর দ্বারা একটি সূক্ষ্ম শরীর নির্ম্মিত হয়। আমাদের পার্থিব শরীর থেকে সমস্ত প্রাণশক্তি ঐ সূক্ষ্ম শরীরে প্রবেশ করে, অর্থাৎ ঐ শরীর বায়ুর দ্বারা স্ফীত হয়; এই প্রক্রিয়া শেষ  হলেই আমরা উৎক্রমণ করি । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।২।১১  দ্রষ্টব্য । )  

বায়ুর একটি নাম মাতরিশ্বা । মাতরি—মাতাতে, বা যিনি মাত্রার দ্বারা পরিবর্ত্তন করেন তাঁতে, শ্বন্‌ (শ্বি=স্ফীত হওয়া) বা বর্ধন হচ্ছে, তাই ' মাতরিশ্বা'। মাতরি+শ্বন্‌= মাতরিশ্বন্‌ > মাতরিশ্বা। আমরা এই মাতৃস্বরূপ পরমাত্মার মাত্রাতে বর্ধিত হচ্ছি,পরিবর্ত্তিত হচ্ছি, ক্রমশঃ 'অহং ব্রহ্মাস্মি' বলে নিজেকে জানার দিকে চলেছি ।
'শ্বি' ধাতু থেকে 'শ্বন্‌' শব্দটি থেকে হয়েছে ।'শ্বি' ধাতুর অর্থ ' স্ফীত হওয়া, 'বর্ধিত হওয়া '। আত্মস্বরূপ, যিনি স্ব বা স্বয়ং, তাঁর  'শাসন' বা নিয়ন্ত্রণ প্রবাহই 'শ্ব'। সেই নিয়ন্ত্রণই শ্বাস-প্রশ্বাস, বা অন্তর-বহির্ম্ময় প্রাণগতি। এই যে বায়ু, যিনি 'মাতরিশ্বা', তিনি ঐ 'অপ্‌',— যিনি আমাদের প্রাণবন্ত ভোগ বা অনুভূতিময় আপ্তি; সেই অপ্‌ কে ধারণ করেন বায়ু বা মাতরিশ্বা; তস্মিন্‌ (তাঁতে) আপঃ (অপ্‌কে) মাতরিশ্বা দধাতি (ধারণ করেন)— সেই ঈশ্বরে (সেই ঈশিত্বের অনুশাসনে) মাতরিশ্বা অপ্‌কে ধারণ করেন   (ঈশোপনিষদ্ ৪র্থ মন্ত্র দ্রষ্টব্য) । পার্থিব যে বায়ু তা এই বায়ু দেবতারই পার্থিব রূপ । বায়ুমণ্ডল রূপে তিনি এই পৃথিবীকে আচ্ছাদন করে রেখেছেন। 

১।১।৪-৩-৬। অক্ষি, চক্ষু, এবং আদিত্য । ( অক্ষীভ্যাং চক্ষুঃ চক্ষুষঃ আদিত্যঃ ।)

অক্ষ = অয়ম্‌ ক্ষরতি ---ইনি ক্ষরিত হচ্ছেন, ইনি বিচ্ছুরিত হচ্ছেন । 

অক্ষ = ন + ক্ষ = যিনি ক্ষরিত হন না, যিনি অক্ষর । 

এই আত্মা অবিনশ্বর, অক্ষয়, অক্ষর ; আবার ইনিই নিজেকে বহুরূপে, বহু বহু আত্মখণ্ডে  ক্ষরিত করছেন,— যা এই সৃষ্টি । 

অক্ষি = অক্ষ + ই (গতি) = অক্ষ বা অক্ষরের গতি, যেখানে প্রতিষ্ঠিত, তাই অক্ষি । অক্ষি শব্দের সাধারণ অর্থ 'চক্ষু' । উপনিষদের নানা অংশে, আদিত্যে যে পুরুষ এবং যিনি অক্ষিগত পুরুষ, তাঁরা যে এক, এ কথা উক্ত হয়েছে । 

বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌, ৫।৫।২ মন্ত্রে বলা হয়েছে : তৎ যৎ তৎ (সেই যে) সত্যম্‌ (সত্য) তৎ (তা) অসৌ (ঐ) সঃ (সে /সেই) আদিত্যঃ (আদিত্য) । যঃ (যিনি) এষঃ (এই, এই আদিত্য) এতস্মিন্‌ মণ্ডলে (এই মণ্ডলে স্থিত) পুরুষঃ (পুরুষ) যঃ চ (এবং যিনি) অয়ম্‌ (এই) দক্ষিণে অক্ষণ্‌ (দক্ষিণ অক্ষিতে) পুরুষঃ (পুরুষ) তৌ এতৌ (এই দুজন) অন্যোন্যস্মিন্‌ (অন্য অন্যতে)  প্রতিষ্ঠিতৌ (প্রতিষ্ঠিত) রশ্মিভিঃ (রশ্মি সকল দ্বারা) এষঃ (এই, এই আদিত্য) অস্মিন্‌ এঁতে, এই অক্ষিগত পুরুষে)  প্রতিষ্ঠিতঃ  প্রাণৈঃ (প্রাণ সকল দ্বারা)  অয়ম্‌ (ইনি-অক্ষিগত পুরুষ) অমুষ্মিন্‌ (ওনাতে-আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষে [প্রতিষ্ঠিত] ) ।
সঃ (তিনি —যিনি এই বিজ্ঞানের দ্রষ্টা) যদা (যখন) উৎক্রমিষ্যন্‌ (উৎক্রমণ করেন)  শুদ্ধম্‌ এব  (শুদ্ধ——এক জনকেই, এক অদ্বিতীয় পুরুষকেই) এতৎ (এই)  মণ্ডলং (এই মণ্ডলে, এই আদিত্য মণ্ডলে) পশ্যতি  ন এনম্‌ এতে রশ্ময়ঃ প্রত্যয়ন্তি (এঁতে রশ্মি সকল আর প্রত্যাগমন করে না)— সেই যে সত্য তা ঐ সেই আদিত্য । এই আদিত্য মণ্ডলে যে পুরুষ, এবং যিনি দক্ষিণ অক্ষিতে পুরুষ, এই দুইজন একে অন্যতে প্রতিষ্ঠিত । রশ্মি সকল দ্বারা এই আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষ, এই অক্ষিগত পুরুষে প্রতিষ্ঠিত; প্রাণ সকল দ্বারা (প্রাণময়তার দ্বারা) এই অক্ষিগত পুরুষ আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষে প্রতিষ্ঠিত । যিনি এই বিজ্ঞানের দ্রষ্টা, তিনি উৎক্রমণ কালে (দেহত্যাগের সময়) যা শুদ্ধ (যিনি এক-অদ্বিতীয় পুরুষ) তাঁকেই দেখেন; (তাই —অদ্বিতীয়তা হেতু) এঁতে রশ্মি সকল আর প্রত্যাগমন করে না ।

আদিত্য বা সূর্য্য (সূর্য) থেকে কাল প্রকাশ পাচ্ছে । এই কাল আবর্ত্তনময়, চক্রগতি সম্পন্ন, এবং তার দ্বারা আমরা অহোরাত্রময় বা দিনরাতময় হয়েছি, সম্বৎসর- ময় (বর্ষ-চক্রময়) হয়েছি । আবার আদিত্য থেকে আলো বা রূপ প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা যা কিছু দেখছি তা  আমাদের অক্ষি বা চক্ষু থেকে রূপ হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। আমাদের জাগ্রত এবং নিদ্রার যে কাল, তার উপর চক্ষুর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান এই বিষয়টিকে Circadian Cycle (অহো-রাত্র চক্র ) বলে আখ্যাত করে। 
দক্ষিণ অক্ষ এই জন্য বলা হয়েছে, কেননা, দক্ষিণ দিক হল যম-দেবতার দিক, অর্থাৎ যে দিক দিয়ে প্রাণ আমাদের যমন বা সংযমন করেন; যে দিকের দ্বারা আমরা কর্ম্মময় হই। 
চক্ষুই সত্য। আমাদের সত্য বোধ দর্শনে প্রতিষ্ঠিত। (বৃহদারণ্যক  উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।১।৪ দ্রষ্টব্য ।)। আমাদের সমস্ত অনুভূতি একত্র হয়ে যেখানে প্রজ্বলিত —তাই চক্ষু । সত্যতার যে বোধ, তার দ্বারা আমরা পরিচালিত হই এবং তাতেই আমরা প্রতিষ্ঠিত থাকি। তাই পা হল দৃষ্টির কর্ম্মেন্দ্রিয়। পা দিয়ে আমরা চলি এবং ধরাতে প্রতিষ্ঠিত থাকি। কালগতি বা কালচক্রের কেন্দ্র বা অক্ষ বলে, চক্ষুকে 'অক্ষি' বলা হয়। 
রূপ প্রকাশ মানেই কাল প্রকাশ; এইজন্য যা অধ্যাত্মে অক্ষি, তাই অধিদৈবে বা বিরাটে আদিত্য । চক্ষু শব্দটি চক্ষ্‌ ধাতু থেকে হয়েছে; চক্ষ্‌ ধাতুর অর্থ 'প্রকাশ পাওয়া', 'দৃষ্টি গোচর হওয়া ' 'দেখা', — 'চাখা বা আস্বাদন করা'। যা প্রকাশ পাচ্ছে কালগতিতে বা প্রাণগতিতে, তাকে আস্বাদন বা ভোগ করা হচ্ছে। 

১।১।৪-৩-৭। আদিত্য দেবতা ।
যে মহাপ্রাণ আমাদের সবাইকে নিয়ে একসাথে অদনময় বা ভোগময় হয়েছেন, তাঁর নাম আদিত্য। আমাদের বাইরের আকাশে যে সূর্য্য (সূর্য), আমাদের যা চক্ষু, আমাদের মধ্যে যে সত্য-বোধ, তা এই আদিত্য । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৯।১২ দ্রষ্টব্য।)
আদিত্য এবং অদিতি  শব্দদুটি  'অদ্‌' ধাতু থেকে হয়েছে।  'অদ্‌' অর্থে 'অদন' করা , খাওয়া বা ভোগ করা । খাওয়া বা ভোগ করার অর্থ, যা খাদ্য 
 বা ভোগ্য, তাকে নিজের সাথে একসা করা, হজম বা জীর্ণ করা । এই জন্য অদিতি শব্দের একটি অর্থ হল, যিনি দিতি নন;  অদিতি =  অ+দিতি = অবিভক্ত, অখণ্ড । আমরা যা কিছু ভোগ করি, যা কিছু বোধ করি, তা আমাদের সমস্তটা নিয়ে, সমগ্র সত্তা নিয়েই করি, — এইটি অদিতির 'অদিতিত্ব । 
কালপ্রকাশ মানেই কামপ্রকাশ।  এই কামনা / কাম, কাল প্রকাশের কেন্দ্র হল বিরাটে  আদিত্য, এবং অধ্যাত্মে অক্ষি। আত্মাই কামময় হন, আর তার থেকেই সৃষ্টি হয়, সবাই সক্রিয় হয় ।  তাই এই আত্মাকে অক্ষিগত বা অক্ষিতে স্থিত পুরুষ বলা হয়েছে  । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌, মন্ত্র ৪।৫।১১ দ্রষ্টব্য । )  
আমরা যখন ভোগ করি, তখন প্রাণই ভোগ করেন; আর তাতে আমি এবং আমার শরীরস্থ সবাই তৃপ্ত হয়; যে দেবক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে আমি প্রকাশিত, সেই দেবতাদের যিনি জননী তিনি অদিতি, এবং সকল দেবতার সমগ্রত্ব নিয়ে যে অদিতির সন্তান, তাঁর নাম আদিত্য।  ছন্দোগ্য উপনিষদের ৫।১৯।২ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে, প্রাণ তৃপ্ত হলে চক্ষু তৃপ্ত হন,  চক্ষু তৃপ্ত হলে আদিত্য তৃপ্ত হন, আদিত্য তৃপ্ত হলে দ্যুলোক তৃপ্ত হয়,  দ্যুলোক তৃপ্ত হলে যা কিছু দ্যুলোক এবং আদিত্যের অধিকারে আছে তারা তৃপ্ত হয়, এবং তাদের তৃপ্তিতে, অনাদ্য (অদনীয় অন্ন), তেজ এবং ব্রহ্ম-বর্চ্চস দ্বারা  তৃপ্ত হয়  প্রজারা, পশুরা।  

১।১।৪-৩-৮। কর্ণ, শ্রোত্র এবং দিক । (কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং শ্রোত্রাদ্দিশঃ ।)

কর্ণ শব্দটি 'কৃত্‌'  ধাতু থেকে হয়েছে । কৃত্ ধাতুর একটি অর্থ,  'সাপের মত আঁকা বাঁকা হওয়া বা বক্র করা । কর্ণ শব্দটি 'কোণ' শব্দের সাথে এবং ইংরাজি ভাষার corner শব্দটি সম্বন্ধ যুক্ত । প্রাণের যে দিঙ্‌ময়তা, তা কর্ণ, এবং তার বেদন বা অনুভূতিকে 'শ্রোত্র/ শ্রুতি/ শ্রবণ' বলা হয়। দিক পরিবর্ত্তিত হলে 'কোণ' রচনা হয়।  আমরা যে একটি  শব্দ শোনা থেকে বা একটি শ্রুতি থেকে, অন্য একটি শব্দ শোনা বা অন্য একটি শ্রুতিতে যাই, তা পরিচালিত করে প্রাণের দিক বা প্রবণতা। যে কোন অনুভূতিই 'শ্রুতি' বা 'শোনা'। যে কোন বোধ বা অনুভূতিই শব্দাত্মক—এ কথা আমরা আগে বলেছি। আমাদের প্রতিটি অনুভূতির সাথে, কোন না কোন শব্দ যুক্ত হয়ে থাকে; এর পারিভাষিক আখ্যা হল, — 'নাম'। আর সেই অনুভূতি বা জ্ঞান কে যে জানা, নিজের অন্তরে অনুভব করার নাম, শোনা বা শ্রুতি। যে ভাবে আমাদের শ্রুতি বা অনুভূতি হয় সেই ভাবে আমাদের দিক নির্ণয় হয়; অর্থাৎ আমরা কোন দিকে যাব তা ঠিক হয় আমাদের ভোগটা কিরকম অনুভূতি নিয়ে হল,  আমরা কিভাবে শুনলাম তার দ্বারা । বাইরে যাকে আমরা দিক বলে অনুভব করি তা, আর অন্তরে যে দিকের কথা আলোচিত হল, এ উভয়ই এক; অর্থাৎ শ্রোত্র এবং দিক একই । যা বিরাটে দিক , তাই অধ্যাত্মে শ্রোত্র ।  এই জন্য বলা হয়েছে যে পুরুষ যখন প্রয়াত হয় তখন তার 'শ্রোত্র দিক-সমূহে গমন করে--দিশঃ শ্রোত্রম্‌  (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ৩।২। ১৩ মন্ত্র দ্রষ্টব্য) ।
আমাদের কানের মধ্যে যে জলীয় তরল পদার্থ আছে, তার দ্বারা আমাদের শরীরের ভারসাম্য বা দিক-সাম্য রক্ষা হয়; এই তরল পদার্থ বহিরাগত শব্দ তরঙ্গকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গে পরিণত করে, যা আমাদের মস্তিষ্কে গিয়ে শব্দাকারে গৃহীত হয়, বা শব্দের অনুভূতি হয়ে প্রকাশ পায়; সুতরাং, এই শারীর ক্রিয়াতেও, দিক, কর্ণ এবং শ্রুতিকে (শ্রোত্রকে) দেখা যায়। ঐ যে তরল, তা ঐ দিব্য অপ্‌-ই । আপ্তি অনুসারেই ভোগের পরিণতি হয়; সেই জন্য এক-ই কর্ম্ম থেকে এক এক জনের, এক এক রকম ফল হয় ।  যে, যে ভাবে যে অনুভূতি বা জ্ঞানে কর্ম্ম করে,  তার সেই রকম দিক নির্ণয় বা পরিণতি হয়। বিপরীত ক্রমে, যার জন্য যে রকম ভাগ্য বা পরিণতি বা ভবিষ্যৎ নির্দ্ধারিত, তার উপর নিয়ন্ত্রণকারী প্রাণের প্রবণতা বা প্রাণের দিক-সকল (directives) সেই ভাবে ক্রিয়া করে । আমরা আগে দক্ষিণ দিক বা সংযমনের কথা বলেছি । উপনিষদে বলা হয়েছে যে— প্রাণই দিক সমূহ (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।২।৪ দ্রষ্টব্য ।) । এই দক্ষিণদিকের অধিপতি যে প্রাণ, তাঁর নাম দক্ষিণাগ্নি, এবং অন্তরীক্ষ তাঁর লোক, চন্দ্রমা তাঁর জ্যোতির্ময় রূপ, নক্ষত্র-রাশিদের দ্বারা তিনি সংযমন করেন বা দিক-নির্ণয় করেন, অপ্‌ বা জলরাশির দ্বারাই আমাদের ভোগ সম্পন্ন হয় । এই জন্য দক্ষিণাগ্নির চারটি তনু হল : অপ্‌, দিক- সমূহ, নক্ষত্র, চন্দ্রমা । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।১২।১ দ্রষ্টব্য; এই মন্ত্রে দক্ষিণাগ্নিকে 'অন্বাহার্য-পচন অগ্নি' বলা হয়েছে ।)

১।১।৪-৩-৯। ত্বক, লোমসকল, ওষধি এবং বনস্পতি । ( ত্বচো লোমানি  লোমভ্য ওষধিবনস্পতয়ো ।)

আকাশ তথা বায়ু  যেমন পৃথিবী কে আবৃত করে রয়েছে, সেই রকমই ত্বক আমাদের শরীরকে আবৃত করে রেখেছে । 'ত্বক্‌' শব্দটিকে ত্বচ্‌ ও বলা হয়। ত্বচ্‌ ধাতুর অর্থ 'আবৃত' করা। আমাদের শরীরেরর ঊষ্মা-জনিত যে তাপমাত্রা, তা নিয়ন্ত্রিত হয় ত্বক এবং লোম সমূহের দ্বারা। আবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের যে তাপমাত্রা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করে 'ওষধি এবং বনস্পতিরা' , অর্থাৎ গাছ-পালা, লতা-গুল্ম-ভেষজ, বনানীরা । ভূমি,  উদ্ভিদদের দ্বারা আবৃত হয়ে আছে, এবং মৃত্তিকার অন্তরে যে রস বা জল, তাকে শোষণ করে উদ্ভিদরা বেঁচে থাকে । সেইরকম, আমাদের ত্বক লোমের দ্বারা আবৃত, আবার আমাদের লোমকূপ থেকে ঘাম বেরিয়ে  ত্বককে শীতল রাখে; একই ভাবে পাতার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ছিদ্রসকল থাকে তার ভিতর দিয়ে জল বাষ্পে পরিণত হয়ে বায়ুতে মিশে যায়, এবং এর ফলে গাছের নিকটবর্ত্তী পরিবেশ শীতল হয়।   
ওষধি শব্দের অর্থ যা ওষ বা ঊষ্মা স্বরূপ প্রাণকে ধারণ করে আছে । ওষধি থেকে ঔষধ শব্দটি হয়েছে; যা ঊষ্মা বা প্রাণের তেজকে আমাদের মধ্যে বহন করে নিয়ে এসে, আমাদের রোগ থেকে মুক্ত করে, তা ঔষধ  । এই জন্য এদের ভেষজ-ও বলা হয় । ভেষজ = ভ (ভরণ) + ইষ (তেজ-রসময়) + জ (জাত)— যা তজোরসময় সম্পন্ন হয়ে জাত। 
'বন' অর্থে যিনি চিরপুরাতন, এবং যিনি 'নব' হয়ে নবীন হয়ে প্রকাশ পান ।  যা কিছু বনজ, বা বন থেকে জাত, তার উপর আধিপত্য করেন এই চিরপুরাতন পুরুষ । ইনি বনস্পতি, বা বনস্পতিরা তাঁরই প্রতিরূপ । এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে, —যথা (যেমন) বৃক্ষ বনস্পতি তথৈব (সেই রকমই) পুরুষঃ অমৃষাঃ (প্রত্যক্ষ) । তস্য (তাঁর) লোমানি (লোমসমূহ) পর্ণানি ( পত্র সকল )  ত্বক্‌ (ত্বক ) অস্য (ইঁহার) উৎপাটিকা (বল্কল) বহিঃ ( বাহিরে স্থিত) ।।, —যেমন) বনস্পতি বৃক্ষ, সেই রকমই প্রত্যক্ষ এই পুরুষ। তাঁর লোমসমূহই  পত্র সকল,  তাঁর ত্বক-ই  বাহিরে স্থিত বল্কল । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৯।২৮ দ্রষ্টব্য ।) 
যা অপ্‌ বা জল, তাই আমাদের মধ্যে প্রজনন, ডিম্বাণু ও সন্তান ধারণ সংক্রান্ত তরল রূপে অবস্থান করে । 
বয়ঃসন্ধি কালে মানুষের যৌনাঙ্গ, এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যে লোমরাজি  উদ্গত হয়, তা এই রেত স্বরূপ অপ্‌ -দেবতার প্রভাবে হয় । বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২।৫।২ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে : এই অপ্‌ (জল-সমূহ) সর্ব্বভূতের মধু, সর্ব্বভূত এই অপের  (জল-সমূহের ) মধু; এই জলে যে তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এই অধ্যাত্মে যে রৈতস তেজোময় অমৃতময় পুরুষ, এই-ই (এই উভয় পুরুষই ) তা, যিনি এই আত্মা; ইহাই অমৃত, ইহাই ব্রহ্ম, ইহাই সব । আমাদের স্পর্শ জ্ঞান মূলতঃ দ্বিতীয়তার বোধ; সমস্ত জ্ঞান বা অনুভূতির অন্তর্গত যে দ্বিতীয়তার অনুভূতি তা 'স্পর্শ'; আত্মা নিজেকে দ্বিতীয় করে, সেই দ্বিতীয় সত্তাকে নিজেতে অনুভব করেন। এই ভাবে আত্মা প্রাণ হয়ে বর্ধিত হন। এই একই প্রাণ দ্বিতীয় হন, এবং দ্বিতীয়তাকে কে নিজেরই বৃদ্ধি বলে জানেন; প্রাণের এই বর্ধন-ই, তাঁর বায়ু-রূপ প্রবাহ; এই প্রবাহে ইনি বর্ধিত হয়ে দ্বিতীয় হন, এবং  দ্বিতীয়তা নিজেতেই সংলগ্ন থাকে, এবং তাই প্রাণ কে ১ হলেও ১-১/২ বলা হয়েছে। এই যে দ্বিতীয়তার সাথে সংলগ্নতা, এইটি স্পর্শ  । প্রাণ যিনি বায়ুরূপে প্রবাহিত হন তাঁর বিষয়ে বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি অংশ নিম্নে উল্লেখ করা হল :
" ..............কতমঃ (কে অধি-অর্দ্ধঃ ( অধিঅর্দ্ধ-১-১/২ ) ইতি ;  যঃ অয়ম্‌ (এই যিনি) পবত (প্রবাহিত হন) ইতি ।                            
তদাহুঃ (তাই বলে )— যৎ (যেহেতু) অয়ম্‌ (ইনি) এক ইব (একই) এব (এই ভাবে ) পবতে (প্রবাহিত হন), অথ (তা'হলে) কথম্‌ (কিভাবে )  অধি-অর্দ্ধঃ (অধিঅর্দ্ধ-১-১/২)  ইতি । যৎ (যেহেতু) অস্মিন্‌ (এঁতে—এই প্রাণেতে) ইদং সর্ব্বং (এই সব)  অধি-অর্ধ্নোৎ (বৃদ্ধি পায়) তেন (সেইহেতু) অধি-অর্দ্ধ (অধিঅর্দ্ধ-১-১/২ ) ইতি। কতম একঃ দেবঃ ইতি ; প্রাণঃ ইতি স ব্রহ্ম তৎ ইতি আচক্ষতে" —(প্রশ্ন) কে  অধিঅর্দ্ধ (অধি-অর্ধ) (১-১/২) ?
(উত্তর) এই যিনি প্রবাহিত হন । যেহেতু এঁতে—এই প্রাণেতে এই সব  বৃদ্ধি পায়, সেই হেতু অধিঅর্দ্ধ ((অধি-অর্ধ; ১-১/২ ) । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৯।৮ এবং ৩।৯।৯ দ্রষ্টব্য । ) যে স্পর্শ জ্ঞান আমাদের অধরোষ্ঠ এবং ত্বকে প্রতিষ্ঠিত, তাই বিরাটে প্রবহমান প্রাণ বা বায়ু । 

[ কেশ = ক + ঈশ = কোথায় ইশ্বর । শরীরে যা মস্তিষ্ক তা ঈশ্বর ক্ষেত্র), আর তাকে আবৃত বা যেন গুপ্ত করে রেখেছে মস্তিষ্কের কেশরাশি । 
শ্মশ্রু = শম + শ্রু = যে শমন বা শাসন-মূলক বাক্য সকল পুরুষ থেকে প্রকাশ পায়, যা শ্রুত হলে জীব শমিত হয়, তা শ্মশ্রু । মুখ থেকে যে বাক্‌ প্রকাশ পাচ্ছে, তারই শমন-সক্ষমতা রূপায়িত হয়েছে গণ্ডদেশের শ্মশ্রুরাজিতে  ।  
হৃদয়ই যজ্ঞের বেদি, এবং পুরুষের শরীরের মধ্যদেশের (হৃদয়ের) যে লোমরাজি তাই এই যজ্ঞর বেদিতে আস্তীর্ণ কুশাসন বা বর্হি । 
নখ = ন (নাস্তি)+খ (আকাশ)= আকাশ (অন্তরাকাশ) অর্থাৎ নিজের অধ্যাত্মবোধ, যার পর আর নেই, তার নাম 'নখ'। নখ, আমাদের শরীরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত । ত্বক, কেশ এবং নখ,—এর পর বহিরাকাশ। বাইরেটাও যে আমার অংশ, এ বোধ আমাদের এখনো ফোটেনি ।  ]

১।১।৪-৩-১০। হৃদয়, মন, এবং চন্দ্রমা (চন্দ্র)  (হৃদয়ান্মনো মনশ্চন্দ্রমা) ।

আত্মা বা প্রাণের দ্বারা যেখানে দান-আহরণ (গ্রহণ) এবং যমন (নিয়ন্ত্রণ)
ক্রিয়া চলছে, সেই চিৎ-ক্ষেত্রের নাম 'হৃদয়'। হৃদয় = হৃ (আহরণ) + দ (দান) + য (যমন) । একই আত্মা প্রেরক বা দাতা এবং গ্রহীতা। আমরা যা কিছু ভোগ করছি, যা কিছু অনুভব করছি, তা তিনিই  প্রেরণ করছেন । এই প্রেরণ যেখান থেকে হয়, তার নাম 'ঊর্দ্ধ হৃদয়', এবং আমাদের শরীরে সেই জায়গার নাম মস্তিষ্ক । আর ভোক্তা আত্মার শরীর-গত যে অবস্থান, 
সেই জায়গার নাম 'নিম্ন হৃদয়', যা শরীরের মধ্যদেশ (নাভির ঊর্দ্ধে এবং কণ্ঠের নিম্নের অংশ ) । যাই হোক, আমরা জ্ঞানে বা বোধেই ভোগ করি, এবং জ্ঞানস্বরূপ, বোধস্বরূপ আত্মাই আমাদের ভোগ-সকলের 'প্রেরক' বা দাতা এবং গ্রহীতা।  এই দুই-হৃদয়, আত্মার বোধে বা জ্ঞানে বিধৃত এবং তাঁরই জ্ঞান মূর্ত্তি । যিনি প্রেরক, তিনিই গ্রহীতা এবং ভোক্তা, এবং সে ভোগের যে পরিণতি তা তাঁরই যমন বা নিয়ন্ত্রণের দ্বারা নির্দিষ্ট হচ্ছে। আমরা সুখ, দুঃখ, ঈর্ষা প্রেম ইত্যাদি হৃদয়েই অনুভব করি। এই হৃদয়ের নাম বরুণালয়। এখানে প্রাণ, আমাদের ভোগ্য হচ্ছেন; প্রাণের এই ভোগ্য হওয়ার নাম অপ্‌(জল) । আধারশক্তি স্বরূপ অপের দ্বারা হৃদয় দিয়ে আমরা সবাইকে ধরে আছি; 'আমার' বা 'মম' এই মমত্ব বোধে, আমরা আমাদের যা কিছু প্রিয় তাকে জরিয়ে ধরেছি হৃদয়ের দ্বারা । এই অপ্‌-এর থেকেই স্থূল ভূত বা পৃথিবী জাত হয় । বৃহদারণ্যক উপনিষদের মন্ত্র ১।২।১ এ উক্ত হয়েছে যে "অপ্‌ই অর্ক। সেই যে অপের শরবৎ অংশ ছিল তা সম্যক রূপে কঠিন হয়েছিল ।"  (নীচে পরিশিষ্ট অংশে বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।২।১ এবং ১।২।২ মন্ত্র অর্থ সহ উদ্ধৃত করা হয়েছে) । 
হৃদয়ে যে দান, আহরণ (গ্রহণ) কর্ম্ম হচ্ছে তার দ্বারা আমরা পরিণত হচ্ছি, আমাদের পরিবর্ত্তন সাধিত হচ্ছে, সেই অনুসারে আমাদের সংকল্পও পরিবর্ত্তিত হচ্ছে । সংকল্প এবং বিকল্প করাই মনের ধর্ম্ম । মনের সংকল্প অনুসারে আমরা কর্ম্ম করছি, ভৌতিক বিশ্বের সাথে যুক্ত হচ্ছি। 'মন' যখন আকৃতি নেয়, তখন তা 'মান' বা পরিমাপ-যোগ্য হয়; এই পরিমাপযোগ্য অবস্থাই 'ভৌতিকতা'। মন, মান-বিহীন । এই যে মন, তা সর্ব্বদা আমাদের যে 'ভৌতিক স্থিতি' যার অন্য নাম শরীর বা পৃথিবী, তাকে প্রভাবিত 
করছে, যেমন চন্দমা বা চন্দ্রের দ্বারা পৃথিবী সর্ব্বদা প্রভাবিত । চন্দ্রমার দ্বারা পৃথিবীর জলরাশি যেমন উত্তাল, যাকে জোয়ার-ভাঁটা বলে, এই রকমই মনের দ্বারাই আমরা সংকল্প-বিকল্পময়, এবং আমাদের ইন্দ্রিয় সকল পরিচালিত । এই যা আমাদের অধ্যাত্মে মন, তাই বিরাটে চন্দ্রমা, এবং এই পার্থিব আকাশে আমাদের চন্দ্র । চন্দ্র = চম্‌ (চমন /পান )+ দ্র (দ্রষ্টৃ / ভোক্তা); সোমময় যে ভোগক্ষেত্র তার নাম চন্দ্র; সোমপান এবং তার দর্শন বা ভোগের কেন্দ্র হল চন্দ্র । 

১।১।৪-৩-১১। চন্দ্রমা, সোম এবং দক্ষিণাগ্নি ।      
দক্ষিণাগ্নির বিষয়ে আমরা আগেও উল্লেখ করেছি । এই দক্ষিণাগ্নিকে, বা প্রাণের এই স্বরূপকে, 'অন্বাহার্য-পচন অগ্নি'-ও  বলা হয়। যা কিছু হৃদয়ে ভোগের  নিমিত্ত আহৃত হয়, তাকে পাচন-ক্ষম করে ভোক্তাতে জীর্ণ করা হয়,  বা ভোক্তার সাথে তাকে সম্যক রূপে মিশ্রিত করা হয়। এর নাম 'যমন', এর দ্বারা সেই ভোক্তার ভোগ এবং তজ্জনিত যে পরিণতি তা হয়। আমাদের বিবর্ত্তন এবং অভুয়দয় এই দক্ষিণাগ্নির ক্রিয়াতে হয়।  ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, যিনি চন্দ্রমাতে দৃষ্ট হন, তিনি এই অন্বাহার্য-পচন অগ্নি বা দক্ষিণাগ্নি। এই ভোগ মিশ্রিত হয়, ভোক্তার সাথে সমান বা সম হয়, তাই এর নাম 'সোম'। এই মিশ্রণে ভোক্তা যে জ্যোতির্ম্ময় হয়, তাই তার সোমের বা চন্দ্রমার জ্যোতি বা জ্যোৎস্না । চন্দ্র যেমন আদিত্য-রশ্মিকে শোষণ করে, এবং জ্যোতির্ম্ময় হয়ে আলোক প্রতিফলন করে, সেইরকম-ই  ভোক্তাতে সোমের শোষণ বা মিশ্রণ হয়, এবং ভোক্তা তার দ্বারা জ্যোতির্ম্ময় হয় ।  এই সোম পানের দ্বারা যে বর্ণ হয় তার মূল নাম পীত; এই জন্য চন্দ্রের বর্ণকে  পীত বলা হয়, এবং পিত্তের বর্ণকেও পীত বলা হয় । পৃথিবীর এবং আমাদের শরীরের সমস্ত রসময়তা, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই চন্দ্রমার দ্বারা। এই সোম, রস বা  অপ্‌-রূপে আকাশ থেকে বর্ষিত হয় বৃষ্টি হয়ে, এই রস বা অপ্‌ মৃত্তিকার অন্তরে গিয়ে সমস্ত উদ্ভিদ্‌ জগৎকে জীবন দান করে,  ধরাতলের অধে স্থিত হয়ে জল-জীব এবং পাতালস্থ প্রাণীদের ধারণ করে;  এই অপ্‌ সবার মধ্যে প্রজনন-শক্তি স্বরূপা এবং সন্তান ধারকশক্তি স্বরূপা; ইনি আমাদের  আস্বাদনের অনুভূতি, আমাদের মধ্যে তৃপ্তি-স্বরূপা, সকল-তৃষ্ণাহারিণী এবং নির্ম্মলতা-প্রদায়িনী । তেজোময়ী যে অপ্‌, তাই সোম। তেজ-ই জলকে নিয়ে আসে (ছান্দোগ্য উপনিষদ মন্ত্র ৬।৮।৫ দ্রষ্টব্য । ); তেজ-ই অপ্‌ হয়ে আমাদের ভোগ্যা হন; তেজোময় আত্মাই 'প্রাণাগ্নি', এবং আত্মার / প্রাণের এই তেজ বা শক্তি-ই 'বাক্‌' ।  

১।১।৪-৩-১২। নাভি-অপান-মৃত্যু । (নাভির্নিরভিদ্যত নাভ্যা অপানো'পানান্মৃত্যুঃ)।
ঋক্‌বেদ অন্তর্গত ঐতরেয় ব্রাহ্মণে 'নাভি' শব্দের অর্থ উক্ত হয়েছে। 'নাভি' কে 'বেন' বলা হয়েছে*। বেন্‌ ধাতুর অর্থ 'বেনন করা' বা 'বিচরণ করা'। যেখান থেকে, বা যে কেন্দ্র থেকে প্রাণাবর্ত্তন প্রসৃত হয়ে সর্ব্বাঙ্গে সঞ্চরিত হচ্ছে তার নাম 'নাভি'। এই জন্য আমাদের শরীরের মধ্যভাগ— নাভি এবং তৎ সংলগ্ন অঞ্চলকে, 'সৌর কেন্দ্র', মণিপুর (solar plexus) বলা হয়। বহিরাকাশের সূর্য্যের (সূর্যের) সাথে নাভির সাক্ষাৎ সম্বন্ধ রয়েছে। গর্ভস্থ ভ্রূণের নাভি যেমন নাড়ির দ্বারা গর্ভ-ধাত্রী মা-র সাথে সংযুক্ত থেকে প্রাণশক্তি আহরণ করে, সেই রকমই, ভূমিষ্ঠ বা জন্ম হবার পর, আমাদের নাভি কেন্দ্র, বহিরাকশের ঐ সূর্য্যের (সূর্যের) সাথে যুক্ত থাকে। এই জন্য মৃত্যুকালে পৃথিবী থেকে আমাদের উৎক্রমণ করার সময় যখন হয়, তখন বলা হয় 'নাভিশ্বাস উঠছে'; শরীরের সাথে এই সৌর-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । এই যে প্রাণ, যাঁর দ্বারা আমরা শরীরে প্রতিষ্ঠিত, বা যাঁর দ্বারা আমরা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত, তাঁর নাম 'অপান',— এ কথা আমরা আগেও বলেছি । এই অপানের দ্বারা মাতৃ-গর্ভস্থ জল বা অপ্‌ থেকে আমরা মূর্ত্ত হই, এবং পৃথিবীও অপ্‌ থেকে  সৃষ্টি হয়েছে ।( ১।১।৪-৩-১০ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য ।) মৃত হওয়ার একটি অর্থ হল, মূর্ত্ত হওয়া, নিজের অসীমতাকে বিসর্জ্জন করে, নিজেকে সসীম এবং আয়তনবান্‌ করে মূর্ত্ত করা ।   
এই জন্য বলা হল : নাভ্যা (নাভি থেকে) অপানো (অপান), অপানাৎ (অপান থেকে) মৃত্যুঃ (মৃত্যু) । এখানে 'মৃত্যু' শব্দের তাৎপর্য, (১) মূর্ত্ত হওয়া, (২) অমূর্ত্ত (অশরীরী) হওয়া।          

(* ঐতরেয় ব্রাহ্মণ প্রথম পঞ্চিকা, তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য---<https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.339572/page/n85/mode/2up> )

১।১।৪-৩-১৩। নাভি ।
নাভি শব্দের নিরুক্তি ঐতরেয় ব্রাহ্মণে উক্ত হয়েছে । ঋক্‌ বেদের একটি মন্ত্র (ঋক্‌ বেদ ১০।১২৩।১),—'অয়ং বেনশ্চোদয়েৎ পৃশ্নিগর্ভাঃ......' প্রসঙ্গে ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ঋষি 'নাভি' শব্দের ব্যখ্যা করেছেন। শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাশয় প্রণীত ঐতরেয় ব্রাহ্মণের বঙ্গানুবাদ থেকে এই অংশটি উদ্ধৃত করলাম : " অয়ং বেনশ্চোদয়ৎ পৃশ্নিগর্ভাঃ' এই মন্ত্রে যে বেন শব্দ আছে, সেই (নাভি) হইতে ঊর্দ্ধে কতিপয় প্রাণ (বায়ু) এবং অধোদিকে অন্য কতিপয় প্রাণ (বায়ু) বেনন (বিচরণ) করে; এই জন্য [ইহার নাম] বেন । এই নাভি আবার প্রাণস্বরূপ হইয়া [ঊর্দ্ধবর্ত্তী ও অধোবর্ত্তী অন্য প্রাণসকলকে] 'নাভেঃ' (না ভৈষীঃ—ভয় করিও না) বলে' এই জন্য ইহা নাভি; ইহাই নাভির নাভিত্ব । এই হেতু উক্ত মন্ত্র দ্বারা এই প্রবর্গ্যে প্রাণকেই স্থাপন করা হয় । " 
প্রশ্নোপনিষদে (মন্ত্র ২।৬ ) উক্ত হয়েছে, — যথা অরা ইব রথ নাভৌ প্রাণে সর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতম্‌ ", যেমন রথ চক্রের অরা-সকল (spoke) [চক্রের কেন্দ্রে যুক্ত হয়ে থাকে) [সেই রকম-ই] প্রাণে সবাই প্রতিষ্ঠিত । এই কেন্দ্রই নাভি, এবং ইনি প্রাণ; ইনি সেই প্রাণ যিনি সকলকে মৃত্যুর পরপারে নিয়ে যান, যাঁকে উপনিষদ্‌ মুখ্য প্রাণ এবং 'আয়াস্য প্রাণ' বলে বন্দনা করেছেন। তাই ইনি অভয় দাতা; আবার এঁর থেকেই সবাই মূর্ত্ত হয়, এবং ইনি যখন শরীর থেকে উৎক্রমণ করেন, এঁর সাথেই সবাই উৎক্রমণ করে; ইহাই নাভির নাভিত্ব  

১।১।৪-৩-১৪। শিশ্ন-রেত-অপ্‌ (শিশ্নাৎ রেতো রেতসঃ আপঃ) । শিবলিঙ্গ ।

শিশ্ন শব্দের সাধারণ অর্থ হল  'পুরুষের লিঙ্গ', যা বীর্য বা রেত-কে যোনির অভ্যন্তরে সিঞ্চন করে। 'শিশুম্‌ নয়তি' ইতি শিশ্ন। যে শিশুকে মাতৃগর্ভে নিয়ে আসে সে 'শিশ্ন'। 
[বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ২।২।১), মধ্যমপ্রাণ, অর্থাৎ যিনি আমাদের মধ্যে প্রাণস্বরূপ, সর্ব্বেন্দ্রিয়ময়, তাঁকে শিশু বলা হয়েছে ।]

শিশ্ন শব্দটি শ্নথ্‌ ধাতু থেকে হয়েছে; শ্নথ্‌ অর্থে 'ভেদ' করা; এই শব্দটি 'শি' ধাতুর থেকেও হতে পারে, যার অর্থ 'প্রদান করা'; যা সন্তানকে গর্ভে প্রদান করে, তা শিশ্ন । 
যিনি পরম-আত্মস্বরূপ, তাঁকে ' বিশ্বাদ্যং  বিশ্ববীজং ' বলা হয়েছে। ইনি শিব-লিঙ্গ, কেননা বিশ্ববীজ এঁতে নিহিত ।
এই বিশ্ববীজকে যিনি জীব বা সত্তার আকারে প্রকাশ করেন, স্বয়ং-শক্তি আত্মার সেই শক্তির নাম হল বাক্‌ । প্রাণ এবং বাকের মিলনে সকলকিছু জাত হয়েছে। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।১।৫ এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৫।৮।১ দ্রষ্টব্য ।)
বাক্‌ এবং প্রাণ যে উভয় উভয়ে রত হন, ইহাই রতি। এই রতি থেকে প্রাণের যে বীর্য্যকে, বাক্‌ জাত করেন, তার নাম 'রেত'। যা অধ্যাত্মে 'রেত' তাই অধিদৈবে 'অপ্‌'। জলের মধ্যে যেমন 'প্রতিফলন হয়', সে রকম এই দিব্যজলের নাম 'অপ্‌', যার থেকে প্রতিরূপ সৃষ্টি হচ্ছে । আমার সবাই এই আত্মস্বরূপের প্রতিরূপ । সন্তান, পিতার প্রতিরূপ । ঘুমের পর, পরের দিনকে আমরা আগের মতই ফিরে পাই, ইহাও প্রতিরূপ । এই জন্য প্রলয়ের  পর যখন পুনঃ-সৃষ্টি হয়, তার সম্বন্ধে ঋক্‌ বেদে বলা হয়েছে, —'যথা পূর্ব্বম্‌ অকল্পয়ৎ',— যেমনটা পূর্বে ছিল, সেইরকম ভাবে কল্পিত (সৃষ্ট) হল। (ঋক্‌ বেদ মন্ত্র ১।১৯০।৩ দ্রষ্টব্য । ) এই অপ্‌ স্বরূপ চেতনার দৈব-ব্যক্তিত্ব হলেন 'বরুণ", এঁরই আবরণে প্রলয়ে প্রলীন জগৎ আবৃত হয়ে থাকে। এই অপ্‌ কে প্রাণের শরীর বলা হয়েছে; অথ এতস্য প্রাণস্য আপঃ শরীরম্‌  জ্য্যতিরূপম্‌ অসৌ চন্দ্রমা— আর, এই প্রাণের শরীর হল 'অপ্‌' এবং চন্দ্রমা তার জ্য্যতির্ম্ময় রূপ । ( বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।৫।১৩ দ্রষ্টব্য । ) আর যখন, পুনরায় সৃষ্টি হয়, তখন এই চেতনা/প্রাণ, যিনি বরুণ, তিনি মিত্র (সূর্য্য/সূর্য/দিবা) হয়ে আবার জগৎকে প্রকাশ করেন। ইনি বেদের মিত্রা-বরুণ । এই অপ্‌ প্রাণের শরীর, প্রাণকে ইনি আবৃত করে রেখেছেন । পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুর ইনি কারণ স্বরূপ; এঁকে জানলে পুনঃ পুনঃ যে বাধ্যতামূলক জন্মমৃত্যুর আবর্ত্তন, তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় । এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ১।২।৭) বলা হয়েছে,— অপ পুনর্মৃত্যুম্‌ জয়তি ---অপের দ্বারা পুনর্মৃত্যু জয় করে । এই অপের মধ্যে রয়েছেন প্রাণ, প্রাণাগ্নি, রয়েছে সকল রোগমুক্তির ভেষজ* ।
( * হয়ত এই বিজ্ঞানের ভিত্তিতে, Homeopathy চিকিৎসা প্রচলিত হয়েছিল।)
এই প্রসঙ্গে ঋক্‌ বেদের একটি মন্ত্র (ঋক্‌বেদ ১।২৩।২০)  উদ্ধৃত করলাম : অপ্সু (অপেতে) মে (আমাকে) সোমো (সোম—সোমদেব) অব্রবীৎ (বলেছিলেন) অন্তঃ (অন্তরে) বিশ্বানি (সকল; সমগ্র) ভেষজা (ভেষজ) [আছে] । অগ্নিং চ (এবং অগ্নি) বিশ্ব (সকল বিশ্বের; সকলের) শম্ভুবম্‌ (শান্তি [শম] প্রদায়ী) আপঃ চ (এবং অপ্‌ সকল) বিশ্বভেষজী (সকল ভেষজ-সম্পন্ন)—আমাকে সোম-[দেব] বলেছিলেন, সকল ভেষজ অপের অন্তরে রয়েছে এবং রয়েছেন অগ্নি (প্রাণাগ্নি) যিনি সকলের শম (শান্তি) প্রদায়ী, এবং সর্ব্ব ভেষজ-সম্পন্ন অপ্‌-সমূহ  ।  

ঐতরেয় উপনিষদ্‌,  প্রথম অধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ড। 

১।২।১। 

তা এতা দেবতাঃ সৃষ্ট্বা অস্মিন্মহত্যর্ণবে প্রাপতন্‌। তমশনায়াপিপাসাভ্যামন্ববার্জ্জৎ। তা এনমব্রুবন্নায়তনং নঃ প্রজানীহি যস্মিন্‌ প্রতিষ্ঠিতা অন্নমদামেতি।।  

১।২।১-১ অন্বয় ।

তাঃ (সেই) এতাঃ (এই সকল) দেবতাঃ (দেবতারা) সৃষ্ট্বাঃ (সৃষ্ট হয়ে) অস্মিন্‌ (এই) মহতী (মহৎ; বিপুল) অর্ণবে (চিৎ-সমুদ্রে; বর্ণ-সমুদ্রে) প্রাপতন্‌ (পতিত হলেন)। তম্‌ (তাকে-সেই মুর্ত্তিকে / সেই সৃষ্ট দেবসমূহকে) অশনায়া (ভোজনেচ্ছার সাথে ; ক্ষুধার সাথে) পিপাসাভ্যাম্‌ (পিপাসার সাথে) অন্ববার্জ্জৎ (অনু+অব+অর্জ্জৎ---সম্পন্ন করলেন; যুক্ত করলেন) তাঃ ( তাঁরা; সেই দেবতারা) এনম্‌ (এঁকে; স্রষ্টাকে) অব্রুবন্‌ (বললেন) আয়তনং (আয়তন) নঃ (আমাদের জন্য) প্রজানীহি* (জানুন; প্রজাত করুন; সৃষ্টি করুন) যস্মিন্‌ (যাতে)  প্রতিষ্ঠিতা (প্রতিষ্ঠিত হয়ে) অন্নম্‌ (অন্নকে) অদাম (ভক্ষণ করব) ইতি।। 

প্রজানীহি শব্দটি 'প্র-জ্ঞা' ধাতুর রূপ। 'জ্ঞা' বা জানা মানেই সৃষ্টি করা— যা জানছে বা বোধ করছে, তাই হয়ে যাচ্ছে । সুতরাং, প্রজানীহি অর্থে 'প্রজাত করুন, সৃষ্টি করুন ।' 

১।২।১-২ অর্থ। 

সেই এই সকল দেবতারা সৃষ্ট হয়ে এই মহৎ (বিপুল) অর্ণবে (চিৎ-সমুদ্রে; বর্ণ-সমুদ্রে পতিত হলেন । তাকে (সেই মুর্ত্তিকে / সেই সৃষ্ট দেবসমূহকে) ভোজনেচ্ছার সাথে (ক্ষুধার সাথে) [এবং] পিপাসার সাথে সম্পন্ন করলেন (ক্ষুৎ-পিপাসার সাথে যুক্ত করলেন) তাঁরা (সেই দেবতারা) এঁকে (স্রষ্টাকে) বললেন— "আমাদের জন্য আয়তন প্রজাত করুন (সৃষ্টি করুন), যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্নকে ভক্ষণ করব" । 

১।২।১-৩সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি। 

১।২।১-৩-১ অর্ণব এবং বর্ণ । 

সেই এই সকল দেবতারা সৃষ্ট হয়ে এই মহৎ (বিপুল) অর্ণবে ( চিৎ-সমুদ্রে; বর্ণ-সমুদ্রে) পতিত হলেন : 'অর্ণব' অর্থে যার প্রকাশ হল 'বর্ণ' বা পরিস্ফুট অক্ষর সকল, চেতনার বর্ণময় স্ফুট সকল। এই বর্ণগুলি পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে অর্থময় অবয়ব, ভাষা, রূপময় বিশ্বকে সৃষ্টি করে। যেখানে অব্যক্ত বাক্‌, সেখানে 'অর্ণব', আর যেখানে ব্যক্ত বাক্‌, সেখানে 'বর্ণ' । আমরা, ১।১।৩-৪ এবং ১।১।৪-৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি যে দেবতাদের মধ্যে প্রথম যিনি সৃষ্টি হয়েছিলেন, তিনি ব্রহ্মা, এবং ইনি দৈব মন। এঁর থেকে মান সম্পন্ন, পরিমাপ-যোগ্য বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই ব্যক্ত বিশ্ব, বা ভৌতিক বিশ্বের মূলে রয়েছেন ব্রহ্মা বা দৈব-মন, এবং এঁর শক্তি হলেন ব্যক্ত-বাক্‌,—বাক্‌দেবী সরস্বতী ।  
১।২।১-৩-২অশনায়া-পিপাসা (ক্ষুৎ-পিপাসা) । 
বাক্‌ ও প্রাণের যে মিথুন, তা প্রথম মিথুন। স্বয়ংপ্রকাশ-স্বয়ংশক্তি আত্মা নিজেকে বাক্‌, ও প্রাণরূপে দ্বিধা করে, একে অপরে রত হন, এর নাম মিথুন। এই দৈবী-বাক্‌ এবং দৈবী প্রাণ থেকে যিনি জাত হন, তিনি দৈব-মন । 
বৃহদারণ্যক উপনিষদের ৫।৮।১ মন্ত্রে বলা হয়েছে, প্রাণ হলেন ঋষভ (বৃষ), বাক্‌ হলেন ধেনু (গাভী) এবং মন হলেন বৎস । 
আবার সেই দৈব মন এবং বাকের মিলনে মান-সম্পন্ন, পরিমাপযোগ্য বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে, এ কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি। 
ব্বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে অশনা (অশনায়া) রূপ মৃত্যু, মন এবং বাক্‌ হয়ে ছিলেন, এবং সেই মন এবং বাকের মিথুনে তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন বা যা কিছু সব সৃষ্টি হয়েছিল। 'অশনা' অর্থে 'খাওয়া' । 'অশনায়য়া' অর্থে  'ভোজনেচ্ছা'। যেহেতু সৃষ্টির পূর্ব্বে সবকিছু অব্যক্ত ছিল, বা  মৃত্যুর দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল, তাই বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ১।২।১), স্রষ্টাকে মৃত্যু রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আত্মা নিজেকে দ্বিতীয় করে, সেই দ্বিতীয়তা কে ভোগ করছেন, ভোজন করছেন । এই জন্য বলা হয়েছে অশনায়া-রূপ মৃত্যুর থেকে 'সৃষ্টি' হয়েছে । যা কিছু ইনি সৃষ্ট করেছেন, তাকে আবার নিজেতে ফিরিয়ে আনছেন; খাওয়া মানেই নিজেতে খাদ্যকে একসা করা। এই যে নিজেতে একসা করছেন,— ভোগের দ্বারা, ভোজনের দ্বারা, তার ফলস্বরূপ আমরা বিবর্ত্তিত হচ্ছি, আমাদের মুক্তির পথে অভ্যুদয় হচ্ছে । 

সঃ (তিনি) অকাময়ত (কামনা করেছিলেন) দ্বিতীয় ম (আমার দ্বিতীয়) আত্মা (আত্মা—সত্তা) জায়েত (জাত হোক) ইতি । সঃ (তিনি) মনসা (মনের দ্বারা) বাচম্‌ (বাকের সাথে) মিথুনম্‌ (মিথুন) সমভবৎ (করলেন) অশনায়া  মৃত্যুঃ (অশনায়া রূপ মৃত্যু).—তিনি (অশনায়া রূপ মৃত্যু) কামনা করেছিলেন— "আমার দ্বিতীয় সত্তা (রূপ) জাত হোক" । তিনি মনের দ্বারা বাকের সাথে মিথুন করলেন । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।২।৪ থেকে উদ্ধৃত ।) 


পিপাসা অর্থে তৃষ্ণা; পিপাসার প্রকৃত অর্থ 'তেজ বা বাক্‌', যা প্রাণ বা জলকে নিজেতে নিয়ে আসে এবং যার দ্বারা (অর্থাৎ পিপাসার্ত্ত হলে) আমরা জল বা অপ্‌-কামী হই, এবং জলকে বা প্রাণকে পেয়ে তৃপ্ত হই । ( যেমন খুব যখন গরম পড়ে, তারপর বৃষ্টি হয়। )
আবার জল বা রস 'অন্ন'কে নিজেতে নিয়ে আসে । আমার রসময়, আস্বাদনময় হতে চাইলে, আমরা অন্ন-কামী হই । অন্ন মানে, প্রাণের পোষণ-ময় রূপ সকল,—যার দ্বারা প্রাণ আমাদের পোষণ করছেন । আর ভুক্ত অন্ন, রসময় হয়ে আমাদের সাথে একীভূত হয় । 
বাক্‌-ই তেজ, প্রাণ-ই জল, এবং মন-ই অন্ন। বাক্‌, প্রাণ এবং মন আত্মার তিনটি স্বরূপ, যা সকল কিছুর উপাদান । ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বিশেষ ভাবে 'ত্রিবিৎ' বা বাক্‌, প্রাণ, এবং মনের বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। 
এই জন্য ঐতরেয় উপনিষদে বলা হল যে সৃষ্টি, অশনায়া এবং পিপাসার দ্বারা যুক্ত হল । অশনায়া (মৃত্যু—যা প্রাণের আবরণ/প্রাণ) এবং পিপাসা (তেজ/বাক্‌) এই দুই-এর  দ্বারাই মন (অন্ন/মূর্ত্ত বিশ্ব) সৃজিত হয় । বাক্‌ ও প্রাণের মিথুনের কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি। 
অশনা এবং পিপাসার বিষয়ে ছান্দোগ্যে  যা উক্ত হয়েছে, তা উদ্ধৃত করলাম :

অশনাপিপাসে (অশনা এবং পিপাসার বিষয়ে') মে (আমার থেকে) সোম্য (সৌম্য) বিজানীহি (বিজ্ঞাত হও)  ইতি। 
যত্র (যখন) এতৎ (এই) পুরুষঃ (পুরুষের) অশিশিষতি (ভোজন-ইচ্ছুক; ক্ষুধার্ত্ত) নাম [হয়] আপ (অপ্‌) তদ্‌  (তখন) অশিতং (ভুক্ত খাদ্যকে; ভুক্ত অন্নকে ) নয়ন্তে (নিয়ে চলে) তদ্‌ (তা) যথা (যেমন) গোনায়ঃ 
(রাখাল; গোপালক) অশ্বনায়ঃ (অশ্বপালক) পুরুষনায় (জননেতা) ইতি এবং (এই রকম-ই) তৎ (তখন) অপঃ (অপ্‌-কে) আচক্ষতেঃ ([লোকে] বলে) অশনায়/অশনায়া (অশনায়) ইতি । তত্র (সেই কারণে) এতৎ  শুঙ্গম্‌ (এই যে শুঙ্গ/ এই যে অঙ্কুর—শরীর/মূর্ত্তি) উৎপতিতম্‌ (উৎপাদিত) সোম্য (সৌম্য) বিজানীহি ([ইহা] জান) ন (না) এতৎ (ইহা/এই শরীর/এই ভূতত্ব) অমূলং (মূল বিহীন) ভবিষ্যতি (হতে পারে ) ইতি—যখন এই পুরুষের নাম [হয়] ভোজন-ইচ্ছুক [বা  ক্ষুধার্ত্ত ], অপ্‌ তখন ভুক্ত খাদ্যকে (ভুক্ত অন্নকে ) নিয়ে চলে [আনয়ন করে ],—  তা  যেমন গো-পালক (গো সকলকে পরিচালনা করে), অশ্বপালক ( অশ্ব সকলকে পরিচালনা করে)  জননেতা ( লোক সকলকে পরিচালনা করে ) এই রকম-ই , [এবং] তখন অপ্‌-কে (জল-কে) [লোকে] বলে 'অশনায়া' (যে 'অশন' বা খাদ্যকে পরিচালনা করে) । সেই কারণে সৌম্য [ইহা] জান, ই যে শুঙ্গ (/ এই যে অঙ্কুর/ এই যে শরীর বা মূর্ত্তি বা অন্ন ) [যা]  উৎপাদিত, ইহা (এই শরীর/এই ভূতত্ব) মূল-বিহীন হতে পারে না। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৬।৮।৩।) 
(ভৌতিকতার/ শরীরের বা অন্নের কারণ বা মূল হল 'অপ্‌'।)
আমরা আগেও উল্লেখ করেছি যে ভৌতিকতার মূলে রয়েছে চেতনার অপ্‌ বা 'জল স্বরূপ' । আমরা যা খাই, তাকে ইনি (এই অপ্‌) রসময় করে, আস্বাদনময় করে, আমাদের সাথে, প্রাণের সাথে একসা করেন। এই খাদ্যকে ইনি-ই পরিচালনা করেন। আমাদেরকে আস্বাদন-অভিলাষী করে, ক্ষুধার্ত্ত করে, ইনি-ই অন্ন বা খাদ্যকে আমাদের সাথে মিশ্রিত করছেন, এবং অন্নকে আমাদের অঙ্গরসে পরিণত করছেন । 
যত্র (যখন) এতৎ (এই) পুরুষঃ (পুরুষ) অশিষতি (পিপাসিত) নাম (নাম হয়) তেজঃ এব (তেজ-ই) তৎ (তখন) পীতং (যা পীত হয়েছে) নয়তে (নিয়ে চলে)  তদ্‌ (তা)  যথা (যেমন) গোনায়ঃ ( রাখাল; গোপালক) অশ্বনায়ঃ (অশ্বপালক) পুরুষনায় (জননেতা) ইতি এবং (এই রকম-ই) তৎ (তখন) তেজঃ (তেজকে) আচষ্ট ([লোকে] বলে) উদন্যা (উদন্যা) ইতি । তত্র (সেইকারণে) এতৎ  শুঙ্গম্‌ (এই যে শুঙ্গ/ এই যে তেজ)  উৎপতিতম্‌ (উৎপাদিত) সোম্য (সৌম্য) বিজানীহী ([ইহা] জান) ন (না) এতৎ (ইহা) অমূলং (মূল বিহীন) ভবিষ্যতি ( হতে পারে ) — যখন এই পুরুষের নাম [হয়] পিপাসিত [বা তৃষ্ণার্ত্ত ], তেজ তখন পীত [অপ্‌/জল/রস] কে নিয়ে চলে [আনয়ন করে ],— তা যেমন গো-পালক (গো সকলকে পরিচালনা করে), অশ্বপালক ( অশ্ব সকলকে পরিচালনা করে) জননেতা ( লোক সকলকে পরিচালনা করে ) এই রকম-ই , [এবং] তখন তেজ-কে [লোকে] বলে উদন্যা । সেই কারণে সৌম্য [ইহা] জান এই যে শুঙ্গ (/ এই যে অঙ্কুর/ এই যে অপ্‌) [যা] উৎপাদিত, তা মূল-বিহীন হতে পারে না। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৬।৮।৫।)
(অপ্-এর /রসের/ জলের কারণ বা মূল হল 'তেজ'।)
আমরা যখন তৃষ্ণার্ত্ত বা পিপাসিত হয়ে জল পান করি, তখন তেজ-ই জলকে আনয়ন করে, — যেমন সৌর তেজ-ই  বৃষ্টির কারণ স্বরূপ । তেজোময় বা পিপাসিত হই বলেই 'অপ্‌' কে ভোগ করতে পারি, রসময় হতে পারি । আমরা তেজের দ্বারাই কাম্যর দিকে যাই বা গতিময় হই । আবার ,যখন জল পান করি, অথবা আমরা যখন আহার করে তৃপ্ত হই, সেই পীত জল, সেই তৃপ্তি তেজেই নীত হয়; এই জন্য ভুক্ত অন্নের দ্বারা আমাদের তেজ বর্ধিত হয় । 
ভুক্ত-আমি, যাই ভোগ করি, তা আত্ম-তেজেই উপনীত হয় ; তা এই আত্মস্বরূপে সংস্কারাকারে বিধৃত থাকে, এবং পুনরায় এই তেজের দ্বারা সে (সেই আত্ম-কণা)  অপ্‌ বা জলেই পরিচালিত হয়ে ভোগময় হয়। এই তেজের নাম উদন্যা,— ইনি তেজোময়ী বাক্‌ ।  ইনি উদন্যা, কেননা হৃদয়ে—অপে/রসে, যেখানে আমরা ভোগ করি, সেখান থেকে ইনি আমাদের উঠিয়ে (উৎ) নিয়ে যান। প্রশ্নোপনিষদে এঁকে উদান বলা হয়েছে—প্রাণের, চেতনার 'উদানরূপ' । উদন্যা এই উদানের শক্তি । বাক্‌ই প্রাণের শক্তি; তাই উদন্যা বাকের-ই নাম। আমরা যখন প্রয়ানকেলে প্রাণের সাথে শরীর থেকে উত্থিত হই, সেই প্রাণের নাম উদান । (প্রশ্নোপ্নিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৭ দ্রষ্টব্য ।) যেমন করে আমরা ভোগের পর এঁতে, এই তেজেতে আহৃত হই,  তদনুসারে,  আমাদের দেহত্যাগের পর কোথায় আমাদের উদান নিয়ে যাবেন, তা নির্দ্ধারিত হয় ।   

১।২।১-৩-৩"আমাদের জন্য আয়তন প্রজাত করুন (সৃষ্টি করুন), যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্নকে ভক্ষণ করব"। 

উপড়ে যে বাক্‌ (তেজ/পিপাসা), প্রাণ (জল/অশনা), এবং মন (অন্ন), আত্মার এই তিনটি স্বরূপের কথা উল্লেখ করা হল, এই তিন হলেন প্রধান দেবত্রয়, যাঁদের সমাসে, সর্ব্ব দেবগণ এবং সমস্ত কিছু সৃষ্টি হয়েছে। ( ছান্দোগ্য ষষ্ঠ অধ্যায় দ্রষ্টব্য । )  মন-ই অন্ন, এবং দৈব মন থেকে মূর্ত্ত, ব্যক্ত বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। দৈব মন-ই  ব্রহ্মা । মনের ধর্ম্ম-ই হল আয়তনময় হওয়া । যা কিছু দৈব মন থেকে প্রকাশ পেয়েছে, তা অন্ন, তা মূর্ত্তি; ফুল, ফল, আকাশ, নদী, সব-ই অন্ন, এবং এদের থেকে যে বেদ বা বোধ বা অনুভূতি আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে, তার দ্বারা আমরা চেতায়িত হচ্ছি, জেগে আছি । আমরা নিজেরাও অন্ন, এবং একে অপরকে পুষ্ট করছি, বেদনময় করছি । 
১।২।১-৩-৪। অন্ন।
ইনি, এই স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা, নিজেতে নিজে আরোহিত হয়ে, নিজেতে  নিজের এক-একটি রূপকে আরোপিত করে, মূর্ত্ত হয়েছেন । অন্ বা প্রাণ, এই ভাবে মন হয়ে, নিজেতে আরূড় হয়ে মূর্ত্ত হন বলে, ইনি 'অন্ন'। 'ন্ন' যুক্তাক্ষরটি এই 'আরূড়' অবস্থাকে বোঝায়;  এর নাম 'রোহিত' রূপ; এই জন্য ব্রহ্মার বর্ণ রোহিত বা লোহিত । যা কিছু, দৈব মন বা ব্রহ্মার থেকে প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে ব্রহ্মা-সহ সর্ব্ব  দেবগণ আরূড় । আমরা সবাই দেবতাদের বাহন এবং অন্ন  । 
তাই সৃষ্টি-কালে দেবতারা স্রষ্টাকে বললেন, আমাদের জন্য আয়তন সৃষ্টি করুন, যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্ন ভক্ষণ করব । 
অন্ন = অন্+অন্,—অর্থাৎ 'অন' বা প্রাণ, 'অন' বা প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত ।  অন্ন শব্দের অর্থ  তৈত্তরীয় উপনিষদে করা হয়েছে । সেখানে উক্ত হয়েছে, অন্ন অন্নতেই প্রতিষ্ঠিত । যেমন, তৈত্তরীয় উপনিষদের সপ্তম অনুবাকে (মন্ত্র ৩।৭) উক্ত হয়েছে : প্রাণো বা অন্নম্‌ (প্রাণ-ই অন্ন) শরীরম্‌ (শরীর) অন্নাদম্‌ (অন্ন ভোক্তা) । প্রাণে শরীরম্‌ (প্রাণে শরীর) প্রতিষ্ঠিতম্‌ (প্রতিষ্ঠিত) । শরীরে প্রাণঃ প্রতিষ্ঠিতঃ ( শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত) ।  তদেতদন্নম্‌ (তৎ[তাই] এতদ্‌ [এই রূপে]  অন্নম্‌ [অন্ন]  অন্নে [অন্নে]  প্রতিষ্ঠিতম্‌  [প্রতিষ্ঠিত]—প্রাণ-ই অন্ন; শরীর অন্নাদ (অন্ন ভোক্তা) । প্রাণে শরীর প্রতিষ্ঠিত, শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত । তাই, এই রূপে অন্ন অন্নে প্রতিষ্ঠিত । 

এই শরীর বা ভৌতিক অস্তিত্ব প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত বা প্রাণকেই আশ্রয় করে রয়েছে। প্রাণের থেকেই শরীর বা ভৌতিকতা প্রকাশ পেয়ে প্রাণেরই আশ্রিত হয়ে আছে, বা প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত। আবার প্রাণই ভূত বা আয়তন-ময় হয়েছেন এবং প্রতি আয়তনে প্রাণের নিয়ন্ত্রণ বা ক্রিয়া সক্রিয় । তাই প্রাণ শরীরে প্রতিষ্ঠিত। এই ভাবে প্রাণে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর নাম  অন্ন । (তৈত্তরীয় উপনিষদ মন্ত্র ৩।৭, ৩।৮, ৩।৯ দ্রষ্টব্য । ) 

।২।১-৩-৫ আয়তন । 
আয়তন = আ (ব্যাপ্তি, বিস্তার) + যত (নিয়ন্ত্রিত) । বিস্তার বা ব্যাপ্তি নিয়ন্ত্রণের দ্বারা সীমিত হলে, তখন আয়তন রচিত হয়। আয়তনের বাহিরে বহিরাকাশ, যেখানে আর সেই আয়তন-সম্পন্ন পুরুষ নিজেকে অনুভব করতে পারে না ।  সুতরাং আয়তন-ময় হওয়া মানে সীমাবদ্ধ হওয়া; এর নাম  বা 'ব্যষ্টি'  ।  এই জন্য উপনিষদে বলা হয়েছে প্রাণ বা বায়ু-ই ব্যষ্টি এবং বায়ু-ই সমষ্টি । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৩।২ দ্রষ্টব্য । ) ব্যষ্টি যাঁতে সমাপ্ত হয়, সকল আয়তন যাঁতে 'সম' হয়ে  অনায়তন হয়ে থাকে, তিনি 'সমষ্টি'। ছান্দোগ্য উপনিষদে বায়ুকে 'অশরীরী' বলা হয়েছে। 

১।২।২
তাভ্যো গামানায়ৎ । তা অব্রুবন্‌ ন বৈ নো'য়মলমিতি । তাভ্যো'শ্বমানয়ৎ । তা অব্রুবন্‌ ন বৈ নো'য়মলমিতি ।

১।২।২-১ অন্বয় । 
তাভ্যঃ (তাদের জন্য) গাম্‌ (গো/গরুকে) আনয়ৎ (আনয়ন করলেন; নিয়ে আসলেন) । তাঃ (তারা—সেই দেবতারা)  অব্রুবন্‌ (বলল) ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্‌ (এইটি) অলম্‌ (পর্য্যাপ্ত) ইতি। তাভ্যঃ (তাদের জন্য) অশ্বম্‌ (অশ্বকে) আনয়ৎ (আনলেন); তাঃ (তারা—সেই দেবতারা) অব্রুবন্‌ (বলল) ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্‌ (এইটি) অলম্‌ (পর্য্যাপ্ত) ইতি ।

১।২।২-২ অর্থ ।
তাদের জন্য গো-কে [গো-রূপ আয়তনকে] নিয়ে আসলেন । তাঁরা—সেই দেবতারা  বললেন, "আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় ।" তাঁদের জন্য অশ্বকে [অশ্ব-রূপ আয়তনকে] নিয়ে আসলেনতাঁরা—সেই দেবতারা  বললেন, "আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় ।"

১।২।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি। 
মনের সংকল্পের দ্বারা ইন্দ্রিয়রা পরিচালিত হচ্ছে, এবং তাই  আমরা কর্ম্মময়। 'গো' অর্থে ইন্দ্রিয়, যাদের দ্বারা এবং যাদের সাথে আমরা বিচরণ করি। ইন্দ্রিয়-সম্পন্ন আমরা ইন্দ্রিয়ময় হয়ে সর্ব্ববিষয়ে গমন করছি। গো শব্দটি গম্ ধাতু থেকে হয়েছে; গম্ অর্থে চলা, গমন করা। এই বিচরণের দ্বারাই আমরা পুষ্ট হই, চেতায়িত হই । গরুরা যেমন বিচরণ করতে করতে তৃণাদি ভক্ষণ করে, সেই-রকমই আমরা ইন্দ্রিয়ময় হয়ে জগতে বা আমাদের মন-ভূমিতে বিচরণ করছি, এবং এর নাম বেঁচে থাকা। গোদুগ্ধ যেমন পুষ্টি দেয়, সেই রকম, শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ রূপে সোম বা অনুভূতি রাশি ইন্দ্রিয় মাধ্যমে আমাদের অনবরত পুষ্ট করছে । 
প্রতি জীবের যে মনোময় বিশ্ব, যাতে অনন্ত বৈচিত্র্য  প্রকাশ পাচ্ছে, তা যে দেবতাদের অধীনে, বা সেই প্রকাশ যে চিন্ময় দিব্য পুরুষদের থেকে প্রকাশ পাচ্ছে, তাঁরা  'গো-আয়তনে' প্রতিষ্ঠিত দেবগণ বা দেবশক্তি । প্রকাশের দ্বারাই দেবগণ ভোগ করেন । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার এক একটি মহিমা দেবতারা বহন করছেন।কিন্তু, মাত্র এই মানস-ভূমিতে প্রতিষ্ঠা দেবতাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই স্রষ্টা যখন গো-কে আনলেন তাঁরা  বললেন,—  " ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্‌ (এইটি) অলম্‌ (পর্য্যাপ্ত)— আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় । 

প্রাণগতির নাম অশ্ব । এই অশ্ব-ই আমাদের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের আকারে গতি-ময় । প্রাণ মানেই কাল । প্রাণের চলাই আয়ু, এবং এই চলাই কাল-রূপ রথে আমাদের পরিক্রমণ । যেখানটা আমাদের অন্তর, আমাদের মর্ম্ম, সেইখানে আমরা প্রাণময় । প্রাণময় মানেই কামময়; কামময় মানেই সংকল্পময় বা মনোময় । মনের গতির মূলে রয়েছে প্রাণ । কামনা, সুখ, দুঃখ, ঈর্ষা, ভালবাসা,  ইত্যাদি হৃদয়ের বিভিন্ন বৃত্তি এই প্রাণ-ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল। এই প্রাণ বা হৃদয় ক্ষেত্রের উপর যে দেবতারা আধিপত্য করছেন, তাঁরা ঐ অশ্ব-রূপ আয়তনে প্রতিষ্ঠিত । কিন্তু এই অশ্ব এবং গো, এই দুই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়াও সেই দেবতাদের কাছে পর্য্যাপ্ত নয়। তাই স্রষ্টা যখন অশ্বকে আনলেন, তখনো তাঁরা  বললেন,—  " ন বৈ (না অবশ্যই) নঃ (আমাদের জন্য) অয়ম্‌ (এইটি) অলম্‌ (পর্য্যাপ্ত)— আমাদের জন্য অবশ্যই এইটি পর্য্যাপ্ত নয় । 

১।২।৩
তাভ্যঃ পুরুষমানয়ৎ । তা অব্রুবন্‌—সুকৃতং বতেতি । পুরুষো বাব সুকৃতম্‌। তা অব্রবীদ্—যথায়তনং প্রবিশতেতি । 

১।২।৩-১ অন্বয় ।
তাভ্যঃ (তাদের জন্য) পুরুষম্‌ (পুরুষকে) আনয়ৎ (আনয়ন করলেন; নিয়ে আসলেন) । তা (তারা—সেই দেবতারা) অব্রুবন্‌ (বলল)—সুকৃতং বত ইতি (সুকৃতং ইতি -সুকৃত-ই; বত-বটে) । পুরুষঃ বাব (পুরুষ-ই) সুকৃতম্‌ (সুকৃত) । তাঃ (তাদেরকে) অব্রবীদ্ (বললেন—স্রষ্টা বললেন) যথা আয়তনং (এই যে আয়তন তাতে) প্রবিশত (প্রবেশ করো) ইতি ।

১।২।৩-২ অর্থ ।
তাদের জন্য পুরুষকে আনয়ন করলেন । তাঁরা—সেই দেবতারা বললেন— "সুকৃত-ই বটে । পুরুষ-ই সুকৃত ।" তাঁদেরকে [স্রষ্টা] বললেন— "এই যে  আয়তন তাতে প্রবেশ করো ।" 

১।২।৩-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি । 

পুরুষ এবং সুকৃত ।
১।১।৩-৪ অনুচ্ছেদে 'পুরুষ' শব্দের ব্যখা করা হয়েছে । প্রতি সত্তায়, প্রতি আয়তনে, এই এক অদ্বিতীয় আত্মা বিরাজ করছেন। নিজেকে খণ্ডন করে, একই নিজবোধ-স্বরূপ আত্মা, প্রতি সত্তায়, প্রতি আয়তনে বা প্রতি পুরে বিরাজ করছেন। এই খণ্ডিত ('ষ'), এবং পুরস্থ আত্মাই 'পুরুষ' । আবার এই পুরুষের থেকে প্রাণের ঊষ্মা প্রকাশ পাচ্ছে; পুর+উষ্‌/ঊষ্মা = পুরুষ; উষ্‌ ধাতুর অর্থ 'দগ্ধ করা'। এই ঊষ্মা বা প্রাণের দ্বারা, সমস্ত পাপকে বা মৃত্যুকে ইনি 'পূর্ব্বেই দগ্ধ (পূর্ব্বম্‌ ঔষৎ)' করেছিলেন বলেও এঁর নাম 'পুরুষ'।  বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৪।১ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে : আত্মা বা ইদম্‌ অগ্র আসীৎ পুরুষবিধঃ — 'ইদম্‌' বা সৃষ্টির অগ্রে (পূর্ব্বে) আত্মাই পুরুষ রূপে ছিলেন । এই মন্ত্রের পরবর্ত্তী অংশে ( বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৪।১ মন্ত্র) বলা হয়েছে — সঃ (তিনি) যৎ (যেহেতু) পূর্ব্বঃ (পূর্ব্ববর্ত্তী হয়ে) অস্মাৎ (এই সকলের থেকে), সর্ব্বস্মাৎ (এই সমূদয় থেকে ) সর্ব্বান্‌ (সমস্ত) পাপ্‌মনঃ (পাপসকলকে) ঔষৎ ( দগ্ধ করেছিলেন), তস্মাৎ (সেই হেতু) পুরুষঃ (পুরুষ; পুরুষ নাম) ভবতি (হয়)— যেহেতু তিনি এই সকলের থেকে পূর্ব্ববর্ত্তী হয়ে, এই সমূদয় থেকে সমস্ত পাপসকলকে দগ্ধ করেছিলেন, সেই হেতু [এঁর] নাম হয় পুরুষ ।
ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, ভূত-সকল অর্থাৎ যা কিছু মূর্ত্ত বা স্থূল, তার রস পৃথিবী বা চিন্ময়-আত্মস্বরূপের পৃথক-পৃথক মূর্ত্ত প্রকাশের ব্যক্তিত্ব; পৃথিবীর (বা ভৌতিকতার) রস অপ্‌, অপের রস ওষধি, ওষধির রস পুরুষ । (ছন্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।১।২।) এই যে ওষধি, তা পুরুষের যে প্রাণময়তা—তার-ই ঊষ্মা, বা ঊষ্মাকে বহন করে । 

এই পুরুষই সুকৃত । সুকৃত শব্দের একটি অর্থ, — যা সুন্দর ভাবে কৃত । 
সুকৃত = সু + কৃত । সোম-লতাকে থেঁতলে, পেষণ করে, সোম-রসকে বের করার নাম 'সু' । সকল সোম, বা প্রাণের সকল রসময়তা, যাঁতে 'কৃত', তিনি 'সুকৃত'।    

এই যে ভৌতিক বিশ্ব বা পৃথিবী থেকে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস এবং গন্ধ, যা আমাদের মধ্যে আসছে, তা আমাদের অনুভূতি বা সোম-ই । এই ভৌতিক বিশ্বরূপ যে সোমলতা, তাকে থেঁতলে আমাদের মধ্যে যে অপ্‌ /আপ্তি বা অনুভূতি-রাশি ভোগ হচ্ছে, তার থেকে জাত হচ্ছে বা নির্গত হচ্ছে ওষধি বা প্রাণের ঊষ্মা, আর তা যাচ্ছে পুরুষে । পুরুষ-ই ভোক্তা; অসঙ্গ অথচ ভোক্তা। এ-সবই হচ্ছে চেতনায়, জ্ঞানক্ষেত্রে । এই যে সোম কৃত হচ্ছে, এবং পুরুষে নিবেদিত হচ্ছে, তাই পুরুষ 'সুকৃত' । যা বহির্বিশ্ব, তা আত্মার দেবময় প্রকাশ; আর সেখান থেকে 'সোম' এসে, অধ্যাত্মে সেই পুরুষ-রূপী একই আত্মায় নিবেদিত হচ্ছে ।  গো-অশ্ব-গতি-সম্পন্ন বা অন্তর্বহি গতিময় এই যে আমরা, সেই আমাদের মধ্যে বা আমাদের আয়তনে এই পুরুষই সুকৃত রূপে দৃষ্ট হচ্ছেন । 
 
১।২।৪।
অগ্নির্ব্বাগ্‌ভূত্বা মুখং প্রাবিশৎ, বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা নাসিকে প্রাবিশৎ, আদিত্যশ্চক্ষুর্ভূত্বা'অক্ষিণী প্রাবিশৎ দিশঃ শ্রোত্রং ভূত্বা কর্ণৌ প্রাবিশন্‌ ওষধিবনস্পতোয়ঃ লোমানি ভূত্বা ত্বচং প্রাবিশন্‌, চন্দ্রমা মনো ভূত্বা হৃদয়ং প্রাবিশৎ, মৃত্যুরপানো ভূত্বা নাভিং প্রাবিশৎ, আপো রেতো ভূত্বা শিশ্নং প্রাবিশৎ। 
১।২।৪-১। অন্বয় ।
অগ্নিঃ (অগ্নি) বাক্‌ (বাক্‌) ভূত্বা (হয়ে) মুখম্‌ (মুখের অভ্যন্তরে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন) , বায়ুঃ প্রাণো ভূত্বা (বায়ু প্রাণ হয়ে) নাসিকে (নাসিকাতে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন) , আদিত্যঃ চক্ষুঃ ভূত্বা (আদিত্য চক্ষু হয়ে) অক্ষিণী (অক্ষিদ্বয়ে)  প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন), দিশঃ (দিক সকল)  শ্রোত্রং ভূত্বা  (শ্রোত্র/শ্রুতি হয়ে ) কর্ণৌ (কর্ণদ্বয়ে) প্রাবিশন্‌ (প্রবেশ করলেন), ওষধিবনস্পতোয়ো (ওষধিবনস্পতি সকল) লোমানি ভূত্বা (লোমসমূহ  হয়ে)  ত্বচং (ত্বকে) প্রাবিশন্‌ (প্রবেশ করলেন), চন্দ্রমা মনো ভূত্বা (চন্দ্রমা মন হয়ে) হৃদয়ং (হৃদয়ে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন), মৃত্যুঃ অপানো ভূত্বা (মৃত্যু অপান হয়ে)  নাভিং (নাভিতে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন), আপো রেতো ভূত্বা (অপ্‌ রেত হয়ে শিশ্নং (শিশ্নতে) প্রাবিশৎ (প্রবেশ করলেন) । 

১।২।৪-২। অর্থ ।

অগ্নি বাক্‌ হয়ে (বাক্‌রূপে) মুখের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন, বায়ু প্রাণ হয়ে (প্রাণরূপে)) নাসিকাতে প্রবেশ করলেন, আদিত্য চক্ষু হয়ে (চক্ষুরূপে) অক্ষিদ্বয়ে প্রবেশ করলেন, দিক সকল শ্রোত্র/শ্রুতি হয়ে (শ্রুতিরূপে) কর্ণদ্বয়ে প্রবেশ করলেনওষধি-বনস্পতি সকল লোমসমূহ  হয়ে (লোমসমূহ রূপে) ত্বকে প্রবেশ করলেনচন্দ্রমা মন হয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করলেনমৃত্যু অপান হয়ে নাভিতে প্রবেশ করলেন, অপ্‌ রেত হয়ে শিশ্নতে প্রবেশ করলেন ।


১।২।৪-৩।  সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
এই উপনিষদের ১।১।৪ মন্ত্রে ঋষি বলেছেন যে কি ভাবে প্রথমে অপ্‌ থেকে উদ্ধৃত পুরুষকে স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা মূর্ত্ত করেছিলেন। সেই মূর্ত্তি প্রকাশের পর ক্রমান্বয়ে দেবগণ জাত হয়েছিলেন । 
আর ১।২।৪ মন্ত্রে বলা হল, কি ভাবে সৃষ্ট দেবগণ আবার প্রতি আয়তনে অনুপ্রবিষ্ট হলেন। আমাদের মধ্যে দর্শন, শ্রবণাদি রূপে এই দেবগণই অনুপ্রবিষ্ট হয়েছেন,— ঐ অধিদৈব-ই অধ্যাত্মে বর্ত্তমান রয়েছেন । 
যখন প্রথম পুরুষকে স্রষ্টা মূর্ত্ত করেছিলেন, তখন প্রথমে মুখ, তার থেকে 'বাক্‌', এবং তার থেকে 'অগ্নি' প্রকাশ পেয়েছিলেন । 
আর যখন স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে পুরুষে দেবতারা অনুপ্রবিষ্ট হলেন, তখন তা হল বিপরীত ক্রমে; অর্থাৎ অগ্নি বাক্‌ হয়ে মুখে প্রবেশ করলেন, এবং  অন্যান্য দেবতারা একই ভাবে  পুরুষে অনুপ্রবিষ্ট হলেন। 
এই যে বর্ণনা যা এই (১।২।৪) মন্ত্রে উক্ত হল, তাতে অনুপ্রবিষ্ট পুরুষ বা আত্মা সর্ব্ব দেবগণ সহ কিভাবে প্রতি জীবে, প্রতি সত্তায় অনুপ্রবিষ্ট হয়েছেন, বা নিজেকে তদাকারে সৃষ্টি করেছেন, তা উপদিষ্ট হয়েছে ।  
এই আমরা সবাই, এই যে জগতের প্রতিটি সত্তা, তা এই আত্মারই অনুপ্রবিষ্ট স্বরূপ বা প্রতিরূপ । 

১।২।৫।
তমশনায়াপিপাসে অব্রুতাম্‌ —আবাভ্যামভি প্রজানিহীতি । স তে'ব্রবীৎ এতাস্বেব বাং দেবতাস্বাভজাম্যেতাসু ভাগিন্যৌ করোমীতি । তস্মাদ্‌ যস্মৈ কস্মৈ চ দেবতায়ৈ হবির্গৃহ্যতে ভাগিন্যাবেবাস্যামশনায়াপিপাসে ভবতঃ । 

১।২।৫-১। অন্বয় ।
তম্‌ (তাঁকে-সেই স্রষ্টাকে) অশনায়া পিপাসে (অশনা এবং পিপাসা) অব্রুতাম্‌ (বললেন) —আবাভ্যাম্‌ (আমাদের দুইজনের জন্য) অভিপ্রজানিহী (জানুন—বিধান করুন) ইতি । সঃ (সে -সেই স্রষ্টা) তেঃ (তাঁদেরকে) অব্রবীৎ (বললেন) এতাসু এব (এদের সাথেই) বাম্‌ (তোমাদের দুই জনকে) দেবতাসু (দেবতাদের সাথেই) আভজামি (বিভক্ত করব) এতাসু (এদের সাথেই) ভাগিন্যৌ (ভাগ-যুক্ত) করোমি (করছি) ইতি। তস্মাদ্‌ (সেই হেতু) যস্মৈ কস্মৈ চ (যে কোনও) দেবতায়ৈ (দেবতার উদ্দেশ্যে) হবিঃ (হবি/আহুতি) গৃহ্যতে (গৃহীত হয়) ভাগিন্যৌ এব ( ভাগ পায় বা ভোক্তা হয়) অস্যাম্‌ (এই দুই জন) অশনায়া পিপাসে (অশনায়া- পিপাসা) ভবতঃ (হয়) । 

১।২।৫-২। অর্থ ।
তাঁকে—সেই স্রষ্টাকে অশনা এবং পিপাসা বললেন — আমাদের দুইজনের জন্য জানুন—বিধান করুন । সে—সেই স্রষ্টা, তাঁদেরকে বললেন এদের সাথেই, [এই] দেবতাদের সাথেই তোমাদের দুই জনকে ভাগ দিচ্ছি (অন্ন/হবির অংশীদার) করছি । সেই হেতু যে কোনও দেবতার উদ্দেশ্যে [যখন] (হবি/আহুতি) গৃহীত হয়, এই দুই জন—অশনা ও পিপাসা, তার ভাগ পায় বা ভোক্তা হয় ।   

১।২।৫-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।

স্বয়ংশক্তি-স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার থেকে দ্যুলোক সৃষ্টি হয়েছে। দ্যু-লোকের ধর্ম্ম হল নিজের থেকে সকল কিছুকে দোহন করে প্রকাশ করা । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার যা প্রকাশ-ধর্ম্ম, তা বহন করছেন দ্যু, আর এই দ্যু প্রতিষ্ঠিত দেবগণে । আমরা, বা সমগ্র সৃষ্টি এই দেবগণের সমাসে রচিত, বা এই দেবগণের প্রকাশ ।
প্রকাশ মানেই জ্ঞান বা বোধপ্রকাশ । স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা নিজেকে নিজে জানতে জানতে সকল কিছু প্রকাশ করেন, এবং যা প্রকাশ করেন, বা যা হন, সেই প্রকাশকে বা সেইটিকে জানেন বা বোধ করেন। জানা (বেদ) এবং হওয়া (জাত) এইটি চেতনার ধর্ম্ম, এবং এই জন্য এঁর নাম 'জাতবেদা (জাতবেদস্‌)' । দেবতাদেরও ভোগ হয় প্রকাশের দ্বারা । আর আমরা, যা প্রকাশ পেয়েছে, তাকে ভোগ বা অনুভব করি । এই যে আমাদের ভোগ, তা ঐ দেবতাদের ভোগের-ই অন্তর্গত— জানা, হওয়া, এবং 'হওয়াটাকে' জানা । এই জন্য, আমরা যা কিছু ভোগ করছি, তা, এবং ভোক্তা-আমরা সকলে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত বা আহুত হবি। যা স্বয়ংপ্রকাশের প্রকাশ, তা 'বহি', আর সেই 'বহি'কে বা দ্বিতীয়তাকে সৃষ্টি করে তাকে নিজেতেই ফিরিয়ে নিচ্ছেন, এইটি 'হবি'। 'জাত' হওয়া মানে 'বহি' হচ্ছেন, নিজেকে ব্যক্ত করছেন, কথা বলছেন; আর সেইটিকে যে  জানছেন/অনুভব করছেন, তার নাম 'বেদ/শ্রুতি/শোনা' এবং তাই হবি।  
এই হবিতে দেবগণ সহ সর্ব্ব সৃষ্টি তৃপ্ত হচ্ছে; সবাই বিবর্ত্তিত হয়ে আত্মনির্ব্বাণের পথে চলেছে । সর্ব্ব দেবগণ যে হবিতে তৃপ্ত হচ্ছেন, তাতে তৃপ্ত হচ্ছেন 'অশনা' এবং 'পিপাসা' বা অপ্‌/জল এবং 'তেজ' । যার দ্বারা তৃপ্ত হচ্ছে সে 'হবি বা অন্ন' । তেজ -জল-অন্ন, বাক্‌-প্রাণ-মন, মহেশ্বর(রুদ্র)-বিষ্ণু-ব্রহ্মা, এই তিন প্রধান দেবতার সমাসে সমগ্র সৃষ্টি রচিত হয়েছে । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৬।৩।৩ এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ের অন্যান্য অংশ দ্রষ্টব্য ।) এই হবি বা অন্নকে দেবতা অভিমুখে, এবং দেবতা থেকে আত্মাভিমুখে নিয়ে চলেছেন 'অপ্‌', আর সেই অপ্‌ বা রসে যে অন্ন একীভূত হল, তাকে দেবতা বা আত্মাভিমুখে নিয়ে চলেন তেজ বা বাক্ । এই জন্য ছান্দোগ্য উপনিষদের ৬।৮।৬ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে 'পুরুষস্য প্রয়তো বাঙ্‌ মনসি সম্পদ্যতে, মনঃ প্রাণে, প্রাণঃ তেজসি, তেজঃ পরস্যাং দেবতায়াম্‌'— এই প্রয়াত পুরুষের (প্রয়াণের সময়ে পুরুষের) বাক্য (মনের মধ্যে জাত মূর্ত্তি বা মনের রূপ সকল) মনকে পায় বা মনে বিলীন হয়, মন প্রাণেতে, প্রাণ তেজে, এবং তেজ সেই পরম দেবতায় বিলীন হয়।
তাই যেখানেই দেবতারা হবি গ্রহণ করেন, সেখানে অশনা এবং পিপাসা বা অপ্‌ এবং তেজ তৃপ্ত হন; এবং সেই হবি পুরুষ বা আত্মাতেই নিবেদিত হয়।    

ঐতরেয় উপনিষদ্‌,  প্রথম অধ্যায়, তৃতীয় খণ্ড। 

১।৩।১। 

স ঈক্ষতেমে নু লোকাশ্চ লোকপালাশ্চ । অন্নমেভ্যঃ সৃজা ইতি । 

১।৩।১-১। অন্বয় ।
স (সে-সেই আত্মা) ঈক্ষত (ঈক্ষণ করলেন) ইমে (এই সকল) নু (এখন) লোকাঃ চ লোকপালাঃ চ (লোক এবং লোক-পাল সকল) [সৃষ্টি হল] অন্নম্‌ (অন্ন) এভ্যঃ (এদের জন্য) সৃজা (সৃজন করি) ইতি । 

১।৩।১-২। অর্থ ।
সে (সেই আত্মা) ঈক্ষণ করলেন (অবলোকন করলেন এবং কামনা করলেন)— "এই সকল লোক এবং লোক-পাল সকল এখন [সৃষ্টি হল] এদের জন্য অন্ন সৃজন করি ।" 

১।৩।১-৩।  সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
ঈক্ষণ শব্দের ব্যাখ্যা ১।১।১-৩-৪  অনুচ্ছেদে এবং অন্যান্য অংশে বলা হয়েছে।
'অন্ন' শব্দের অর্থ  ১।২।১-৩-৪ অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। 

১।৩।২।
স'পো'ভ্যতপৎ তাভ্যো'ভিতপ্তাভ্য মূর্ত্তিরজায়ত । যা বৈ সা মূর্ত্তিরজায়তান্নং বৈ তৎ । 

১।৩।২-১। অন্বয় ।
সঃ (সে-সেই আত্মা) অপঃ (অপ্‌-কে /অপ্‌ সকলকে) অভ্যতাপৎ (অভিতপ্ত করলেন) তাভ্যঃ অভিতপ্তাভ্য (অভিতপ্তাভ্য তাভ্যঃ—অভিতপ্ত তার থেকে) মূর্ত্তিঃ (মূর্ত্তি) অজায়ত (জাত হল) । যা বৈ সা (যা সেই) মূর্ত্তিঃ (মূর্ত্তি) অজায়ত (জাত হল) অন্নং বৈ তৎ (তা-ই অন্ন)।

১।৩।২-২। অর্থ ।
সে-সেই আত্মা অপ্‌-কে অভিতপ্ত করলেন। অভিতপ্ত তার থেকে (অভিতপ্ত যে অপ্‌ তার থেকে) মূর্ত্তি জাত হল। যা সেই মূর্ত্তি জাত হল, তা-ই অন্ন ।

১।৩।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
আমরা আগে বলেছি যে অপ্‌ থেকে বা দৈব-জল থেকে, এই মূর্ত্ত বা ভৌতিক বিশ্ব জাত হয়েছে। এই যে মূর্ত্ত বিশ্ব, তার থেকেই প্রাণের বা সোমের ধারা  আমাদের মধ্যে অনবরত প্রবিষ্ট হচ্ছে। চেতনার জল/অপ্‌ বা সোম থেকেই মূর্ত্ত বিশ্ব বা অন্ন হয়েছে, আর সেই মূর্ত্ত চিন্ময় আত্মা, যিনি অন্ন-স্বরূপ, তিনি-ই প্রাণ হয়ে সোম হয়ে আমাদের রসময় এবং তেজোময় করছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদে উক্ত হয়েছে, সোম-ই অন্ন এবং অগ্নি (প্রাণাগ্নি) অন্নাদ ( অন্ন অত্তা, অন্ন ভোক্তা)— সোম এব অন্নম্‌ অগ্নিঃ অন্নাদঃ। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।৪।৬ দ্রষ্টব্য । ) 

১।৩।৩।
তদেতদভিসৃষ্টং পরাঙত্যজিঘাংসৎ । তদবাচাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোদ্বাচা গ্রহীতুম্‌ । স যদ্ধৈনদ্বাচাগ্রহৈষ্যদভিব্যাহৃত্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।। 

১।৩।৩-১। অন্বয় ।
তৎ (সেই) এতৎ (এই) অভিসৃষ্টং (সৃষ্ট—সৃষ্ট অন্ন) পরাঙ্‌ (পশ্চাৎ; বিপরীত) অতি (অতিক্রম করতে গেল) অজিঘাংসৎ (হনন করার ইচ্ছা থেকে/হিংসা বা ভক্ষণ করার ইচ্ছা থেকে )* । তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) বাচা (বাক্যের দ্বারা/বাগিন্দ্রিয়ের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন) তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সমর্থ হলেন না) বাচা (বাক্যের দ্বারা) গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) বাচা (বাক্যের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) অভিব্যাহৃত্য হ এব অন্নম্‌ (অন্ন উচ্চারণ করেই—অন্নের বিষয়ে কথা বলেই) অত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।। 
(*'অজিঘাংসৎ; শব্দটি 'হন্‌' ধাতু থেকে হয়েছে। হন্ অর্থে 'হনন করা'।)

১।৩।৩-২। অর্থ । 
সেই এই সৃষ্টি (সৃষ্ট অন্ন)পশ্চাৎ (বিপরীত) দিকে ধাবিত হল (স্রষ্টার ভক্ষণ করার ইচ্ছা থেকে পরিত্রাণ পেতে )। তাকে (সৃষ্ট অন্নকে) বাক্যের দ্বারা (বাগিন্দ্রিয়ের দ্বারা) গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে (সৃষ্ট অন্নকে) গ্রহণ করতে সমর্থ হলেন না । তিনি যদি একে (এই অন্নকে) বাক্যের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] উচ্চারণ করেই (অন্নের বিষয়ে কথা বলেই) তৃপ্ত হতেন । 

১।৩।৪ 
তৎ প্রাণেনাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোৎ প্রাণেন গ্রহীতুম্‌ । স যদ্ধৈনৎ প্রাণেনাগ্রহৈষ্যদভিপ্রাণ্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।। 

১।৩।৪-১। অন্বয় ।
তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) প্রাণেন (প্রাণ অর্থাৎ আঘ্রাণের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন)তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) প্রাণেন (আঘ্রাণের দ্বারা) গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে)। সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) প্রাণেন (আঘ্রাণের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) অভিপ্রাণ্য হ এব অন্নম্‌ (অন্নকে আঘ্রাণ করেই) ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।। 

১।৩।৪-২। অর্থ ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, আঘ্রাণের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে আঘ্রাণের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে আঘ্রাণের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে আঘ্রাণ করেই তৃপ্ত হতেন ।
১।৩।৫ 

তচ্চক্ষুষা'জিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোচক্ষুষা গ্রহীতুম্‌ । স যদ্ধৈনচ্চক্ষুষা'গ্রহৈষ্যদ্‌ দৃষ্ট্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।

১।৩।৫-১। অন্বয় ।

তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) চক্ষুষা ( চক্ষুর দ্বারা) জিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন)তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) চক্ষুষাঃ ( চক্ষুর দ্বারা)  গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) চক্ষুষা ( চক্ষুর দ্বারা)  অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) দৃষ্ট্বা হ এব অন্নম্‌ (অন্নকে দর্শন করেই) ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।। 

১।৩।৫-২। অর্থ ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, চক্ষুর দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে চক্ষুর দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে চক্ষুর দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে দর্শন করেই তৃপ্ত হতেন।

১।৩।৬ 
তচ্ছ্রোত্রেণাজিঘৃক্ষৎ, তন্নাশক্নোচ্ছ্রোত্রেণ গ্রহীতুম্‌ । স যদ্ধৈনচ্ছ্রোত্রেণাগ্রহৈষ্যচ্ছ্রুত্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।

১।৩।৬-১ ।  অন্বয় ।
তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) শ্রোত্রেণ ( শ্রোত্রের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ  (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন) তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) শ্রোত্রেণ ( শ্রোত্রের দ্বারা)  গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) শ্রোত্রেণ ( শ্রোত্রের দ্বারা) অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) শ্রুত্বা  হ এব অন্নম্‌ (অন্নকে শ্রবণ করেই) ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।। 

১।৩।৬-২ ।  অর্থ।
তাকেসৃষ্ট অন্নকে শ্রোত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে শ্রোত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে শ্রোত্রের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে শ্রবণ করেই তৃপ্ত হতেন । 

১।৩।৭
তত্ত্বচাজিঘৃক্ষৎ  তন্নাশক্নোৎ ত্বচা  গ্রহীতুম্‌ । স যদ্ধৈনৎ ত্বচা গ্রহৈষ্যৎ স্পৃষ্ট্বা  হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।

১।৩।৭-১ ।  অন্বয় ।
তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) ত্বচা ( ত্বকের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন)তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) ত্বচা ( ত্বকের দ্বারা)  গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) ত্বচা ( ত্বকের দ্বারা)  অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) স্পৃষ্ট্বা হ এব অন্নম্‌ (অন্নকে স্পর্শ করেই) ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।

১।৩।৭-2 ।  অর্থ ।
তাকেসৃষ্ট অন্নকে, ত্বকের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে ত্বকের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে ত্বকের দ্বারা  গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে স্পর্শ করেই তৃপ্ত হতেন 

১।৩।৮।
তন্মনসাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোন্মনসা গ্রহীতুম্‌ ।স যদ্ধৈনন্মনসাগ্রহৈষ্যদ্‌ ধ্যাত্বা হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।।

১।৩।৮-১ ।  অন্বয় ।
তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) মনসা ( মনের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ  (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন)তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) মনসা ( মনের দ্বারা)  গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) মনসা ( মনের দ্বারা)  অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) ধ্যাত্বা হ এব অন্নম্‌ (অন্নকে ধ্যান করেই) ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।

১।৩।৮-২ ।  অর্থ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে,মনের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে মনের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না) । তিনি যদি একে—এই অন্নকে, মনের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে ধ্যান করেই (অন্নের কথা মনে করেই) তৃপ্ত হতেন ।

১।৩।৯ । 
তচ্ছিশ্নেনাজিঘৃক্ষৎ তন্নাশক্নোচ্ছিশ্নেন গ্রহীতুম্‌ ।স যদ্ধৈনচ্ছিশ্নেনাগ্রহৈষ্যদ্‌ বিসৃজ্য হৈবান্নমত্রপ্স্যৎ ।

১।৩।৯-১ ।  অন্বয় ।
তৎ (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) শিশ্নেন ( শিশ্নের দ্বারা) জিঘৃক্ষৎ  (গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন)তৎ (তাকে) ন অশক্নোৎ (সক্ষম হলেন না) শিশ্নেন ( শিশ্নের দ্বারা  গ্রহীতুম্‌ (গ্রহণ করতে) । সঃ যৎ (তিনি যদি) হ এনৎ (একে—এই অন্নকে) শিশ্নেন ( শিশ্নের দ্বারা)  অগ্রহৈষ্যৎ (গ্রহণ করতে পারতেন) বিসৃজ্য  হ এব (সিঞ্চন করেই; বীর্য্য স্খলন করেই) অন্নম্‌ (অন্নকে) ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতেন) ।।

১।৩।৯-২ ।  অর্থ।
তাকে—সৃষ্ট অন্নকে, শিশ্নের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন; তাকে শিশ্নের দ্বারা গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না । তিনি যদি একে—এই অন্নকে, শিশ্নের দ্বারা গ্রহণ করতে পারতেন, [তা'হলে] অন্নকে স্খলন করেই তৃপ্ত হতেন ।

১।৩।১০।
তদপানেনাজিঘৃক্ষৎ  তদাবয়ৎ । সৈষো'ন্নস্য গ্রহো যদ্বায়ুঃ । অন্নায়ুর্ব্বা এষঃ যদ্বায়ুঃ । 

১।৩।১০-১ ।  অন্বয়।
তৎ  (তাকেসৃষ্ট অন্নকে) অপানেন (অপানের দ্বারা) অজিঘৃক্ষৎ গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেন) তৎ (তাকে) আবয়ৎ (নিজেতে বইয়ে দিলেন; তাকে নিজেতে গ্রহণ করলেন) । সঃ এষঃ  অন্নস্য (এষঃ [এই]  অন্নস্য [অন্নের] সঃ [সে] )  গ্রহঃ (গ্রহ) যৎ (যা) বায়ুঃ (বায়ু) । অন্নায়ুঃ (অন্নায়ু) বৈ এষঃ (ইনি-ই)  যৎ (যা) বায়ুঃ (বায়ু) । 

১।৩।১০-২।  অর্থ।

তাকেসৃষ্ট অন্নকে অপানের দ্বারা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করলেনতাকে নিজেতে বইয়ে দিলেন— তাকে নিজেতে গ্রহণ করলেন ।  এই অন্নের সে গ্রহ যা বায়ু । (যে এই বায়ু [অপান], তা এই অন্নের গ্রহ/গ্রাহক।) ইনি-ই অন্নায়ু, যা বায়ু । 

১।৩।(৩-১০)-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।

যা কিছু অন্ন সৃষ্টি হল, তা এই প্রত্যক্ষ সৃষ্টি । সেই সৃষ্ট অন্ন সকল, স্রষ্টার থেকে পিছন ফিরে (পরাঙ্‌) পলায়ন করতে লাগল—বহির্মুখী হয়ে স্রষ্টার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল।  
আত্মস্বরূপ যে স্রষ্টা, তাঁর থেকে দূরে যাওয়া মানেই, 'অনাত্ম' হওয়া, মৃত্যুদ্বারা আবিষ্ট হওয়া বা মূর্ত্ত হওয়া । এই উপনিষদের ঋষি বলেছেন, যে অভিতপ্ত অপ্‌ থেকে যে মূর্ত্তি জাত হল, তার নাম অন্ন । 
স্রষ্টা যখন পুরুষকে মূর্ত্ত করেছিলেন, তখন প্রথমে মুখ, মুখ থেকে বাক্‌, এবং বাক্‌ থেকে অগ্নি উৎপন্ন হয়েছিলেন। আবার যখন অগ্নি দেবতা পুরুষে অনুপ্রবিষ্ট হলেন, বা প্রতিষ্ঠিত হলেন, তখন অগ্নি প্রথমে বাক্‌ রূপে সেই পুরুষের মুখ-স্থ হলেন । এক-ই ভাবে প্রাণ (গন্ধ/নাসিকা), চক্ষু, শ্রোত্র ইত্যাদি রূপে, অন্যান্য দেবতারা পুরুষে প্রতিষ্ঠিত হলেন । এই বিষয়ে পূর্ব্বে বর্ণনা করা হয়েছে।  তার পর, যখন অন্ন সৃষ্টি হল, পুরুষ তখন ইন্দ্রিয় দেবগণের দ্বারা, বা বাক্‌, নাসিকা, চক্ষু ইত্যাদির দ্বারা অন্নকে (পুষ্টি দাত্রী প্রাণকে) গ্রহণ করতে গেলেন । কিন্তু তাঁরা কেউ অন্নকে গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন না। প্রাণ যতক্ষণ না গ্রহণ করেন, ততক্ষণ আর কেউ গ্রহণ করতে পারে না ।  আগে প্রাণ-রূপী আত্মা দেখেন; আমাদের দর্শন সেই দেখার অন্তর্গত । প্রাণের যে দেখা, তার থেকে দ্রষ্টা, দৃশ্য এবং র্শন বা দর্শন-শক্তি প্রকাশ পায়। তিনি স্বাধীন ভাবে নিজের থেকে এই দর্শন ক্রিয়াকে প্রকাশ করে, নিজেতেই আবার তাকে সমাপ্ত করেন । আমাদের সকল অনুভূতি, ভোগ্য বা অন্ন এই ভাবেই আমরা ভোগ করি । 
সমস্ত দেবতারা বা ইন্দ্রিয় দেবগণরা যখন অন্নকে গ্রহণ করতে পারলেন না, তখন পুরুষ প্রাণের অপান রূপ মহিমার দ্বারা সেই অন্যকে গ্রহণ করলেন।যা আমাতে গৃহীত হয়, তা প্রাণের-ই 'গ্রহ' রূপ মহিমার দ্বারা । প্রাণের যে 'অপান' নামক স্বরূপ তার দ্বারা এই 'গ্রহণ' রূপ কর্ম্ম সাধিত হয় । নিজেতে প্রাপ্তি না হলে, গৃহীত হয় না,আপ্তি হয় না । এই আপ্তি-রূপ চেতনা বা প্রাণ-ই অপ্‌ । অপ্‌ থেকেই আপ্তি হয়, তাই প্রাণের এই মহিমার নাম অপান (অপ্‌/অপ+ অন) । 

'অত্রপ্স্যৎ' এবং 'আবয়ৎ' । পিতৃ তর্পণ । অবনী । 
উপরে, ১।৩।৩ মন্ত্রে এবং তার পরবর্ত্তী মন্ত্রগুলিতে 'ত্রপ্স্যৎ (তৃপ্ত হতে পারতেন)', এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে । 'ত্রপ্স্যৎ' শব্দটি 'তৃপ্‌' ধাতু থেকে হয়েছে। 'তৃপ্‌' অর্থে 'তৃপ্ত হওয়া' বা 'তৃপ্ত করা' । 'ত' অর্থে যা মর্ত্ত বা মূর্ত্ত;  'ঋ' অক্ষরটিতে 'গতি' বোঝায়; 'প' অর্থে যা 'পয়স্‌' বা 'পেয়' বা যা 'অপ্‌'; সুতরাং, 'তৃপ্‌' অর্থে মর্ত্তকে বা মূর্ত্ত অন্নকে অপ্‌-এ, জলে বা প্রাণে নিয়ে যাওয়া । এতে তৃপ্তি হয় । (এতে, অপের অন্তরে যে তেজ আছে তা প্রকাশ পায়; তাই পিতৃগণকে যে জল দেওয়া হয়, তাতে এই তেজ বা সোম প্রকাশ পায়—এই জন্য বলা হয় 'তর্পণ' বা পিতৃ-তর্পণ ।)
এই যে অপানের দ্বারা অন্ন গৃহীত হল, তাকে ঋষি, 'আবয়ৎ' শব্দের দ্বারা বর্ণনা করলেন। আবয়ৎ শব্দটি 'অব্‌' ধাতুর থেকে হয়েছে। 'অব্‌' ধাতুর অর্থ, 'ত্রাণার্থে গ্রহণ করা, বা ' ত্রাণার্থে কাউকে নিজের মধ্যে নিয়ে নেওয়া।' 
[এই জন্য 'অবন' শব্দের একটি অর্থ 'রক্ষা করা' ।আবার 'অবনী' শব্দের অর্থ 'পৃথিবী'— পৃথিব্যাং যা দেবতা সা পুরুষস্যাপানমবষ্টভ্য—পৃথিবীতে যে দেবতা (দেবী) তিনি পুরুষের অপানকে অবশ করে (বশীভূত) রেখেছেন ।" (প্রশ্নোপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৮) । ]

অন্ন এবং অন্নায়ু । 
এই ভাবে অপানের দ্বারা অন্ন মূর্ত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হল। এই ভাবে প্রতি পুরুষে, প্রতি সত্তায় অন্ন প্রতিষ্ঠিত হল। আমরা একে অপরের অন্ন । আমি যেমন কোন দৃশ্য দেখে, দর্শনাত্মক অন্নের ভোক্তা হচ্ছি, তেমনি অন্য কেউ আমাকে দেখে একটি অনুভূতি বা অন্নের ভোক্তা হচ্ছে। তাই আগে আমরা বলেছি যে অন্নের বৈশিষ্ঠ্য হল, 'অন্ বা প্রাণ অন্‌-এ বা প্রাণেই প্রতিষ্ঠিত ।' এর নাম  'অন্নায়ু'।  প্রাণ, যিনি বাহিরে 'বায়ু', তিনি প্রতি সত্তায় 'আয়ু' বা প্রাণ প্রবাহ । 
প্রাণ যেভাবে অন্নময় হয়েছেন, বা যে প্রকার অন্ন হয়েছেন, সেই রকমই পৃথিবী, বা সেই রকমই প্রতক্ষ্যতার ক্ষেত্র বা ভৌতিক ক্ষেত্র রচিত হয়েছে; সেই রকমই তার বায়ুমণ্ডল, সেই রকমই সেখানকার পদার্থ, সেখানকার প্রাণীরা । পৃথিবী মানে শুধু আমাদের বসুন্ধরাই নয়, অন্য বৈচিত্র্যে প্রাণ অপান হয়ে, মূর্ত্তি সকলকে বা মূর্ত্ত বিশ্ব সকলকে, ভৌতিক ক্ষেত্র সকলকে ধারণ করেছেন, ধরিত্রী হয়েছেন । আমরা মূর্ত্ত হলেও, দৃশ্যমান হলেও, অনেকের কাছে আবার অমূর্ত্ত, অদৃশ্য । আবার যারা আমাদের প্রত্যক্ষতার বাহিরে, তারা তাদের অপান ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছে  প্রত্যক্ষ, মূর্ত্ত ।
পৃথিবীর বায়ু মণ্ডল এমন একটি বিশেষ পরিবেশ বা আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে, যা সমগ্র পার্থিব প্রাণীর অনুকূল, যার জন্য তারা পৃথিবীতে বেঁচে আছে;  প্রাণ, অপান-রূপে, নিজেকে অর্থাৎ বায়ু বা প্রাণকে এমন ভাবে গ্রহণ করেছেন, যে এই পৃথিবীর সকল কিছু, আমাদের জীবন ধারণের অনুকূল । এই জন্য এই অপানের নাম 'অন্নায়ু' । 

প্রাণ-ব্যান-অপান—আহবনীয়-দক্ষিণ-গার্হপত্য অগ্নি । 
এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে প্রশ্নোপনিষদে, অপানকে 'গার্হপত্য' বা 'গৃহপতি' অগ্নি বলা হয়েছে— 'গার্হপত্যো হ বা এষ'পানো---- এই অপানই গার্হপত্য। (প্রশ্নোপনিষদ মন্ত্র ৪।৩। ) ।' যে অগ্নি, বা প্রাণের যে মহিমার দ্বারা আমরা আমাদের সংস্কার অনুযায়ী কর্ম্ম করি, ঘড় সংসার করি, তিনি গৃহপতি বা গার্হপত্য অগ্নি । সুতরাং, এই পার্থিব জীবন যাঁর অধিকারে তিনি গার্হপত্য অগ্নি । তাই ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে, আদিত্যের অন্তরে যে পুরুষ রয়েছেন তিনি ঐ গার্হপত্য অগ্নি। পৃথিবী, অগ্নি , অন্ন এবং আদিত্য, — এই চার হল এঁর চারটি তনু । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।১১।১। দ্রষ্টব্য।) এখানে অগ্নি অর্থে, পৃথিবীর বা মূর্ত্তির অন্তরে বা শরীরের অন্তরে  যিনি প্রাণ বা প্রাণাগ্নি; অনাদি অনন্ত বিশ্ব এঁর শরীর; ইনি বৈশ্বানর । যে প্রাণ মুক্ত, অসীম, অশরীরী, তিনি-ই মূর্ত্ত হয়েছেন । এই অসীম মুক্ত প্রাণ-ই আহবনীয় অগ্নি, যিনি আমাদের সবাইকে আবাহন করছেন, নিজেতে ফিরিয়ে নেবার জন্য ডাকছেন, আকর্ষণ করছেন । যা  কিছু আহুত হয়, তা যে দেবতাতেই হোক,  তা আহবনীয়তেই নিবেদিত হয় । প্রাণের যে ব্যান-রূপ মহিমা, তার দ্বারা সকল পাচন-ক্রিয়া সম্পন্ন হয়; আমরা যে খাদ্য হজম করি, তা এই ব্যানের দ্বারা হয় । এই জন্য এই অগ্নির নাম অন্ব-আহার্য-পচন অগ্নি; —অর্থাৎ আহার্য বা যা আমরা আহার করি, তার পাচন বা তা কিভাবে আমাদের সাথে এক হবে, কিরকম ফলপ্রসূ হবে, তা ব্যান রূপ প্রাণের অনুশাসনে হয়; এঁকে 'দক্ষিণাগ্নি-ও বলা হয় । ((ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।১১।১, ৪।১২।১, ৪।১৩।১ মন্ত্র  দ্রষ্টব্য । ) তাই এই প্রাণাগ্নি, যাঁর নাম ব্যান বা ব্যান বায়ু, তিনিই আমাদের অন্তরে অন্নরসকে সর্ব্বত্র সঞ্চালিত করেন, যার দ্বারা সবাই, সর্ব্বাঙ্গ তৃপ্ত হয় । এই জন্য-ও বলা হল :" সৈষো'ন্নস্য গ্রহো যদ্বায়ুঃ । অন্নায়ুর্ব্বা এষঃ যদ্বায়ুঃ—সে এই অন্নের  গ্রহ, যা বায়ু । ইনি-ই অন্নায়ু, যা বায়ু ।"

বায়ু। ব্যষ্টি এবং সমষ্টি । 
আহবনীয় অগ্নির একটি তনু 'দ্যু' বা 'দ্যুলোক', এবং একটি তনু 'প্রাণ' ।  প্রাণ বা দ্যু-ই, এই অপান-রূপে ভূ-তে (পৃথিবীতে) প্রতিষ্ঠিত । আর এই যে প্রাণ, তিনি সর্ব্বত্র, সবাইকে আত্মসূত্রে যুক্ত করে রেখেছেন, ইনি ব্যান, এবং এঁকে বায়ু এবং সূত্রাত্মা বলা হয়। ( বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৭।২ দ্রষ্টব্য । )
প্রাণ হলেন দ্যু, অপান হলেন ভূ (মর্ত্ত);  বায়ু বা ব্যান হলেন, প্রাণ এবং অপানের, বা দ্যু এবং ভূ-এর সংযোজক বা সন্ধি । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।৩।৩। দ্রষ্টব্য । ) তাই বায়ুর লোক হল  অন্তরীক্ষ, যা দ্যু এবং ভূ-র মধ্যে বা অন্তরে; অন্তরীক্ষের মধ্য দিয়ে, এই প্রাণ স্বরূপ বায়ু সবাইকে একই সূত্রের দ্বারা যুক্ত করে রেখেছেন । 
আমাদের শরীরে যে অনবরত অসংখ্য ক্রিয়া সংঘবদ্ধ হয়ে সম্পন্ন হচ্ছে, তা এই ব্যানের দ্বারা । সংযুক্ততা, সংঘবদ্ধ-ক্রিয়া (coordinated actions), লক্ষ্যাভিমুখে চালনা করা, সংমিশ্রণ (মন্থন) করা ইত্যাদি সকল-ই ব্যানের ধর্ম্ম  এবং সকল বিশ্বের সকল কর্ম্মে তা প্রযুক্ত হয়েছে ।  (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।৩।৫ দ্রষ্টব্য । )   
ছান্দোগ্য উপনিষদের চতুর্থ অধ্যায়ের তৃতীয় খণ্ডে, বায়ু এবং প্রাণকে সংবর্গ  বলা হয়েছে । বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ৩।৩।২) বায়ুকে ব্যষ্টি এবং সমষ্টি বলা হয়েছে। উপনিষদে, সংবর্গ শব্দের অর্থ 'সংবৃ' বলা হয়েছে। 'সংবৃ' অর্থে 'নিজের মধ্যে আবৃত করে রাখা'। এই প্রাণ, অপান রূপে, আমাদের আত্মগত করেছেন, নিজেতে ধারণ করেছেন ; এই হল ধরিত্রীর 'ধাতৃত্ব' । পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আচ্ছাদন হয়ে, আমাদের অনবরত রক্ষা করছেন, প্রাণবন্ত করছেন। 
বর্গ শব্দের একটি অর্থ 'প্রজাতি' (species)। নিজের থেকে নিজের অনুরূপ বা প্রতিরূপ সৃষ্টি করা প্রাণেরই ধর্ম্ম , কেননা প্রাণ, প্রাণকেই সৃষ্টি করেন । তাই সৃষ্টি তে সবসময় 'প্রজাতি' বা 'সমষ্টি' দৃষ্ট হয়। আবার প্রাণই ব্যষ্টি, বা প্রতিটি স্বতন্ত্র সত্তা ।
 
১।৩।১১
স ঈক্ষত কথং ন্বিদং মদৃতে স্যাদিতি । স ঈক্ষত কতরেণ প্রপদ্যা ইতি । স ঈক্ষত যদি বাচাভিব্যাহৃতং যদি প্রাণেনাভিপ্রাণিতং যদি চক্ষুষা দৃষ্টং যদি শ্রোত্রেণ শ্রুতং যদি ত্বচা পৃষ্টং যদি মনসা ধ্যাতং যদ্যপানেনাভ্যপানিতং যদি শিশ্নেন বিসৃষ্টমথ কো'হমিতি । 

১।৩।১১-১ ।  অন্বয় ।
সঃ (তিনি)  ঈক্ষত (অবলোকন করলেন; পর্যালোচনা করলেন)  কথং নু (কি ভাবে)  ইদং (এই—সৃষ্টি; এই সৃষ্ট দেবতারা এবং অন্ন— এই দ্যু এবং ভূ-তে যা কিছু আছে তা ) মৎ ঋতে (আমাকে ছাড়া) স্যাৎ (থাকতে পারবে)  ইতি । সঃ (তিনি)  ঈক্ষত (অবলোকন করলেন; পর্যালোচনা করলেন) কতরেণ (কোনটি)  প্রপদ্যা (অবলম্বন করি) ইতি । সঃ (তিনি)  ঈক্ষত (অবলোকন করলেন) যদি বাচা (যদি বাকের দ্বারা) অভিব্যাহৃতম্‌ (বাক্য উচ্চারিত হয়), যদি প্রাণেন (যদি আঘ্রাণের দ্বারা) অভিপ্রাণিতম্‌ (আঘ্রাত হয়), যদি চক্ষুষা (যদি চক্ষুর দ্বারা) দৃষ্টম্‌ (দৃষ্ট হয়), যদি শ্রোত্রেণ (যদি শ্রোত্রের দ্বারা ) শ্রুতম্‌ (শ্রুত হয়), যদি ত্বচা (যদি ত্বকের দ্বারা ) পৃষ্টম্‌ (স্পৃষ্ট হয়),  যদি মনসা (যদি মনের দ্বারা) ধ্যাতম্‌  (ধ্যাত হয়), যদি অপানেন (যদি অপানের দ্বারা) অভ্যপানিতম্‌* (অপান-কৃত হয়), যদি শিশ্নেন (শিশ্নের দ্বারা) বিসৃষ্টম্‌ (বিসর্জ্জন /স্খলন হয়),  অথ (অনন্তর; তাহলে) কঃ (কে) অহম্‌ (আমি) ইতি । 
(*  'অভি' এবং 'অপ' এই দুইটি উপসর্গ 'অন্‌' ধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে 'অভি+অপ+√অন্‌' ধাতুটি হয় । 'অভ্যপানিতম্‌' শব্দটি  'অভি+অপ+√অন্‌' ধাতুর থেকে হয়েছে । 'অভি' শব্দের দ্বারা 'অভিমুখ' বোঝায়, এবং 'অপ' শব্দটির দ্বারা 'অপহরণ', 'নিয়ে নেওয়া', 'অপ বা 'অধোমুখ', 'অপান-সংক্রান্ত',  ইত্যাদি বোঝায়। 'অন্' ধাতুর অর্থ, 'প্রাণময় হওয়া', 'নিশ্বাস নেওয়া' ইত্যাদি। 'অভ্যপানিতম্‌' শব্দটির অর্থ,—অপানের অধিকারে যে কর্ম্ম সকল সাধিত হয়। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী 'অভ্যপানিতম্‌' শব্দটি  'ভূতে-কৃদন্ত' শ্রেণীর শব্দ । )

১।৩।১১-২ ।  অর্থ।
তিনি অবলোকন করলেন/পর্যালোচনা করলেন: "কি ভাবে এই সৃষ্ট দেবতারা এবং অন্ন (অর্থাৎ এই দ্যু এবং ভূ-তে যা কিছু আছে ) তা আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে!"  
তিনি অবলোকন করলেন/ পর্যালোচনা করলেন, —"কোনটি  অবলম্বন করি! 
তিনি অবলোকন করলেন/পর্যালোচনা করলেন, —যদি বাকের দ্বারা বাক্য উচ্চারিত হয়,  যদি আঘ্রাণের দ্বারা আঘ্রাত হয়,  যদি চক্ষুর দ্বারা দৃষ্ট হয়, যদি শ্রোত্রের দ্বারা শ্রুত হয়, যদি ত্বকের দ্বারা স্পৃষ্ট হয়, যদি মনের দ্বারা ধ্যাত হয় , যদি অপানের দ্বারা অপান-কৃত হয়, যদি শিশ্নের দ্বারা বিসর্জ্জন /স্খলন হয়,  তাহলে কে আমি ?" 
১।৩।১১-৩।   সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
মূর্ত্তিতে বা আয়তনে দেবতারা প্রতিষ্ঠিত হলেন এবং অন্ন গৃহীত হল । অগ্নি দেবতা বাক্‌ হয়ে মুখে, বায়ু দেবতা ঘ্রাণ হয়ে নাসিকাতে, আদিত্য দৃষ্টি হয়ে চক্ষুতে, এবং এই ভাবে সকল দেবগণ প্রতিষ্ঠা পেলেন। মুখ, নাসিকা, চক্ষু ইত্যাদিরা দ্বার; এই দ্বার সকলের মধ্য দিয়ে দ্যুলোক বা দেবতারা, ভূ-তে বা মূর্ত্তিতে প্রবেশ করলেন; এবং অন্ন বা মূর্ত্ত বিশ্ব অপানের দ্বারা দেবক্ষেত্রে গৃহীত হল । 
যে কোন প্রকাশ-ই বোধ বা জ্ঞান প্রকাশ । এই বোধ বা জ্ঞান প্রকাশের সাধারণ নাম হল, 'ঈক্ষণ' বা 'দেখা—দর্শন করা'। মূলে আত্মবোধ বা নিজবোধ না থাকলে জ্ঞান প্রকাশ বা 'দেখা' হয় না । তাই পুরুষ বা আত্মাই দ্রষ্টা, অর্থাৎ সকল বোধ প্রকাশের জ্ঞাতা বা ভোক্তা । এই প্রকাশের আদিতে আছেন দেবতারা,— চিন্ময় আত্মার প্রকাশাত্মক ব্যক্তিত্ব সকল । আর আত্মাই মূল দ্রষ্টা বা ইন্দ্র,—ইদং দ্রষ্টা । সুতরাং, দেবতাদের সাথে আত্মাও যদি আয়তনে অনুপ্রবিষ্ট না হন, তাহলে মূর্ত্তি, বা আত্মস্বরূপের মূর্ত্ত অভিব্যক্তি সম্ভবিত হতে পারে না । এই জন্য ঐ আত্মপুরুষ বোধ করলেন বা ঈক্ষণ করলেন: "কতরেণ প্রপদ্যা — "কোনটি  অবলম্বন করি — কোন দ্বার দিয়ে অনুপ্রবিষ্ট হব, আয়তনে প্রবেশ করব !"
প্রথমে আত্মবোধ; সেই আত্মবোধের বুকে সর্ব্বজ্ঞান প্রকাশ পাচ্ছে । জ্ঞান প্রকাশ পেল মানেই, আত্মবোধ 'অহং' এই বোধে জাগ্রত হয়ে, যে জ্ঞান বা বোধ প্রকাশ পেল, তার সাথে লিপ্ত হন । আবার, আত্মবোধ বা নিজবোধ রূপে তিনি নির্লিপ্ত বা অসঙ্গই থাকেন। যতক্ষণ এইটি না হয়, ততক্ষণ, জ্ঞান বা বোধ একটি সুনির্দিষ্ট রূপ হয়ে, বা মূর্ত্ত হয়ে প্রকাশ পায় না। এই জন্য বলা হল: " যদি বাকের দ্বারা বাক্য উচ্চারিত হয়,  যদি আঘ্রাণের দ্বারা আঘ্রাত হয়,  যদি চক্ষুর দ্বারা দৃষ্ট হয়.....,—তাহলে কে আমি (কো'হমিতি) ?" 

১।৩।১২।
স এতমেব সীমানং বিদার্যৈতয়া দ্বারা প্রাপদ্যত । সৈষা বিদৃতির্নাম দ্বাঃ; তদেতদান্নান্দনম্‌ । তস্য ত্রয় আবাসথাস্ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ । অয়মাবসথো'য়মাবসথো'য়মাবসথ ইতি । 
 
১।৩।১২-১ ।  অন্বয় ।
সঃ (তিনি-সেই আত্মা)  এতম্‌ এব (এই সেই)  সীমানং (সীমাকে)  বিদার্য (বিদারণ করে) এতয়া দ্বারা (এই দ্বার দিয়ে) প্রাপদ্যত (প্রবেশ করলেন) । সা* (সে -সেই [দেবী]) এষা (এই) বিদৃতিঃ (বিদৃতি) নাম (নামক) দ্বাঃ (দ্বার);  তৎ (সে) এতৎ (এই) নান্দনম্‌ (আনন্দ ক্ষেত্র) । তস্য (তার-সেই আত্মার) ত্রয়ঃ (তিনটি) আবাসথাঃ (আবাস)  ত্রয়ঃ (তিনটি) স্বপ্নাঃ (স্বপ্ন) । অয়ম্‌ (এই) আবসথঃ (আবাস) অয়ম্‌ (এই) আবসথঃ (আবাস) অয়ম্‌ (এই) আবসথঃ (আবাস) ইতি । 
( * সা = সে (স্ত্রীলিঙ্গ) । )

১।৩।১২-২ ।  অর্থ ।
তিনি ( সেই আত্মা ), এই সেই সীমাকে বিদারণ করে, এই দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেন । সে (সেই (দেবী ), এই বিদৃতি নামক দ্বার; সে এই আনন্দ ক্ষেত্র । তার-সেই আত্মার, তিনটি আবাস, তিনটি স্বপ্ন । এই আবাস, এই আবাস, এই আবাস !

১।৩।১২-৩।   সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
দ্যু এবং ভূ, অমৃত এবং মর্ত্ত, যাঁতে বা যে আত্মাতে সকল সংজ্ঞা হারিয়ে, আত্মত্বে একীভূত হয়ে থাকে, তিনিই 'দ্বি' বা 'দুই' হয়ে ফুটে ওঠেন । এই আত্মা দ্বিধা না হলে, সৃষ্টি হয় না । এই যে এঁর দ্বিধা হওয়ার প্রথম বা আদি রূপ, তাই 'বিদৃতি' নামক দ্বার। এই বিদৃতি নামক দ্বারকে সীমা বলা হয়েছে ।
যিনি একান্ত এক এবং স্বাধীন আত্মস্বরূপ, তিনি যখন দ্বিধা হন, তখন বাক্‌ ও প্রাণ প্রকাশ পায় । ১।২।১-৩-২ অনুচ্ছেদে আমরা এই বিষয়ে উল্লেখ করেছি । আত্মশক্তি বাক্‌, আত্মস্বরূপ প্রাণকে আলিঙ্গন করেন;  দ্বিতীয় হবার যে প্রথম ভূমি তা এই বাক্‌ ও প্রাণের মিথুন । ছান্দোগ্য উপনিষদের দুইটি মন্ত্র উদ্ধৃত করলাম:  " বাক্‌ এব ঋক্‌ প্রাণ সাম ওম্‌ ইতি এতৎ অক্ষরম্‌ উদ্গীথঃ 
তৎ বা এতৎ মিথুনম্‌ যৎ বাক্‌ চ প্রাণ চ ঋক্‌ চ সাম চ—বাক্‌-ই ঋক্‌, প্রাণ সাম, এই অক্ষর ওম্‌ হলেন উদ্গীথ । সেই এই মিথুন যা বাক্‌ এবং প্রাণ, [বা] ঋক্‌ এবং সাম ।" ( ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।১।৫।)
"তৎ এতৎ মিথুনম্‌ ওম্‌ ইতি এতস্মিন্‌ অক্ষরে সংসৃজ্যতে যদা বৈ মিথুনম্‌ সমাগচ্ছত আপয়তো হ বৈ তৌ অন্যোন্যস্য কামম্‌ —সেই এই মিথুন ওম্‌ এই অক্ষরে (অক্ষর আত্মায়) সংযুক্ত হল; যখনই মিথুন-যুগল সম্মিলিত হয়, (তখনই) একে অন্যের কাম্যকে প্রাপ্ত করায়।"( ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।১।৬।)
এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৪।৩ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে যে, আদিতে এই এক অদ্বিতীয় আত্মা, অদ্বিতীয়তা হেতু,  রমণ বা আনন্দ-সম্ভোগ করেননি; তাই একাকী কেউ রমণ করেনা । তিনি  নিজের থেকে দ্বিতীয় হতে ইচ্ছা করলেন । (তখন) স্ত্রী এবং পুরুষ যেমন সম্পৃক্ত হয়, এই রকমই ছিলেন—অর্থাৎ আত্মা এবং তাঁর শক্তি একে ওপরে রত, বা রতিময় হয়ে ছিলেন  । তিনি নিজেকে দ্বিধা করলেন এবং তার থকে পতি এবং পত্নী হলেন,  যেন 'অর্দ্ধ-বৃগল' (অর্ধ-বিদল)। অর্দ্ধ-বৃগল (অর্ধ-বৃগল) বা  অর্দ্ধ-বিদল (অর্ধ-বিদল) অর্থে 'একটি শাখা যদি দুই ভাগে বিভক্ত হয়, তার প্রত্যেকটি একটি ' অর্দ্ধ-বৃগল (অর্ধ-বৃগল) বা  অর্দ্ধ-বিদল (অর্ধ-বিদল')। সুতরাং ঐতরেয় উপনিষদের এই মন্ত্রে যে  উক্ত হয়েছে 'এই বিদৃতি নামক দ্বার; সে এই আনন্দ ক্ষেত্র ', তা নিশ্চয়-ই ঐ 'আত্মা এবং আত্মশক্তির সম্পৃক্ত অবস্থা  ।
বিদৃতি দ্বার ।       
দ্বার শব্দের একটি অর্থ— দ্বি/দ্বা রত—যেখানে একজন অপরে 'রত' । 
বিদৃতি শব্দের অর্থ— 'যা বিদারণ শক্তি সম্পন্ন ।' যে জ্ঞান বা চিৎ শক্তি, অনাত্মবোধকে, জড়ত্বকে, বা মর্ত্তকে বিদীর্ণ করে আত্ম-দ্যুতিকে প্রকাশ করে, পুরের অন্তরস্থ আত্ম-পুরুষকে প্রকাশ করেন, তিনি 'বাক্‌'। এই জন্য বাক্‌-ই বিদ্যুৎ। "বিদানাৎ বিদ্যুৎ...বিদ্যতি এনম্‌ পাপম্‌নঃ য এবং বেদঃ----বিদীর্ণ করেন, তাই "বিদ্যুৎ"; যে এই রকম [বিদ্যুৎকে] জানে, সে পাপকে [ মর্ত্ত বা মৃত্যুকে] বিদীর্ণ করে ।' (বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৫।৭।১ মন্ত্র দ্রষ্টব্য । )

[ 'দ' অক্ষরটিকে উপনিষদ্‌ 'দৈবী বাক্‌' এবং 'স্তনয়িত্নু' বলেছেন। (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৫।১, ৫।২ এবং ৫।৩ দ্রষ্টব্য ।)  'দ' অক্ষরের দ্বারা 'বাক্‌' বা বাকের প্রকাশকে বোঝায়।
পুরুষের রস 'বাক্‌'—পুরুষস্য বাক্‌ রসো (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌, মন্ত্র ১।১।২।)।] 
এই যে পরম আত্মস্বরূপ, যিনি সবার আত্মা, তিনি সকল কিছুতে যে পুরুষ হয়ে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে সব হয়েছেন, তার প্রবেশ-দ্বার ঐ 'বিদৃতি', এবং তিনি প্রকাশিত হয়েছেন আত্মশক্তি বাকের দ্বারা, বিদ্যুতের দ্বারা। এই হল বিদ্যমানতার, বেদনের, জানার উৎকৃষ্ট অবস্থা (বিৎ+উৎ) । 
বাক্‌ যাঁকে এই ভাবে অনুগৃহীত করেন,— এই ভাবে পুরুষকে / নিজেকে যাঁর কাছে প্রকাশ করেন, তিনি 'দৃত' বা 'আদৃত' । 

তদেতদান্নান্দনম্‌ — সে এই আনন্দ ক্ষেত্র। 
এই  বিদৃতি নামক দ্বার যেখানে আছে তা 'নান্দন' বা 'আনন্দক্ষেত্র'। কেননা  এখানে আত্মা এবং আত্মশক্তি সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছেন ।  এইখান থেকে 'অর্দ্ধ বৃগল (অর্ধ বৃগল)' রূপে, বা পুরুষ এবং প্রকৃতি রূপে, পৃথক হয়ে প্রকাশ পান। এই জন্য  বিবাহিত হিন্দু মহিলারা সিঁথিতে সিন্দূর পরেন; তাঁদের নাম 'সীমন্তিনী'। উল্লেখযোগ্য যে এই মন্ত্রে 'সীমা' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।  

নান্দন । 
'নান্দন' শব্দটির সাধারণ অর্থ 'আনন্দক্ষেত্র'  বা 'আনন্দনিকেতন' । মূল শব্দ 'নন্দ্‌'।  'নন্দ্‌' অর্থে 'আনন্দ করা', এবং 'নন্দ' অর্থে 'আনন্দ'। 
'ন' অর্থে 'নাস্তি' বা 'আত্মা ব্যতীত আর কিছু নেই'-----নিজেই সব।' 'দ' অর্থে বাক্‌ বা আত্মশক্তি। 'ন্দ' অর্থে  'শক্তি যুক্ত আত্মা'। আমরা আগে উল্লেখ করেছি আত্মা এবং আত্মশক্তির সম্পৃক্ত অবস্থা । এই জন্য ছান্দোগ্য উপনিষদে একটি বিখ্যাত উক্তি আছে : স্বে মহিন্মি যদি বা ন মহিন্মীতি—স্বয়ম্‌ বা নিজেতেই মহিমা (শক্তি), যদি (বলা হয় যে) (তিনি তাঁর) মহিমা(শক্তি) নন ( ছান্দোগ্য  উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৭।২৪।১ দ্রষ্টব্য ।) 
অদ্বিতীয়তা ও দ্বিতীয়তার কুহেলিকায় আচ্ছন্ন এই রহস্যময় স্বয়ংশক্তি-আত্মাকে ঋষিরা এইভাবেই বর্ণনা করেছেন ।   

আনন্দ।
আনন্দ =আনন+দ; 'আনন', অর্থে  'মুখ'। যিনি মহাপ্রাণ, মৃত্যুহীন প্রাণ, যিনি সকলকে মৃত্যুর পরপারে নিয়ে যান, উপনিষদ্‌ তাঁকে মুখ্য প্রাণ এবং আয়াস্য প্রাণ বলে বন্দনা করেছেন। আয়াস্য অর্থে  'আস্যাদ্‌ যৎ অয়তে'—যিনি আস্য বা মুখ থেকে নির্গত হন।  (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।২।১২ দ্রষ্টব্য।) 
যিনি শব্দ বা বাক্য আকারে নির্গত হচ্ছেন তিনি বাক্‌-স্বরূপা এবং আমাদের  চেতনা বা প্রাণ। সুতরাং, 'আনন' অর্থে প্রাণ বা প্রাণের প্রকাশ; তাই আনন-ই আমাদের প্রত্যেকের পরিচয়। আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়, আনন বা মুখেই প্রতিষ্ঠিত। 
'দ' অর্থে বাক্‌ বা আত্মশক্তি । সুতরাং 'আনন্দ' শব্দে. প্রাণ এবং বাকের মিথুনকেই বোঝায়। আমাদের যখন আনন্দ হয়, আমরা হেসে ফেলি, এই আনন বিকশিত হয় । 
বৃহদারণ্যক উপনিষদে উক্ত হয়েছে যে, এই আত্মার আনন্দের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে বা অংশকে, নিখিল বিশ্ব আনন্দময় হয়ে ভোগ করছে । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৪।৩।৩৩ দ্রষ্টব্য । )

বিদৃতি দ্বার এবং মূর্ধা (মূর্ধন্ ) ।
মূর্ধা অর্থে মস্তক । মূর্ধা শব্দের নিরুক্তি-গত অর্থ হল যেখানে আমরা ঊর্ধ্ব দিকে ধৃত হয়ে থাকি । 'মূ' ধাতুর অর্থ 'ধরে থাকা'। আমাদের শরীরে দ্যুলোকের স্থান এই মূর্ধায় বা মস্তকে । এই বিদৃতি দ্বারের ভৌতিক বা শরীরগত অবস্থান আমাদের মস্তক-শীর্ষে (হস্রা-ক্ষেত্রে)— যার অন্য নাম 'ব্রহ্মরন্ধ্র' সহস্রার শব্দের একটি অর্থ : সহস্র অর—যেখান থেকে সহস্র সহস্র অর বা প্রজ্ঞা-জ্যোতিরেখা বা চিৎ-রশ্মি বিকীর্ণ হচ্ছে । এই মূর্ধা/মস্তক বা সহস্রার-ই ঊর্ধ্ব-হৃদয়,— যেখান থেকে  স্বাধীন স্বয়ংশক্তি আত্মা সকল কিছু প্রকাশ করছেন;  অনুচ্ছেদ  ১।১।৪-৩-১০ অংশে এই বিষয়ে উক্ত হয়েছে । 
সহস্রার শব্দের আর একটি অর্থ হল : যত্র আত্মনা সহ স্রবতি —যেখানে আত্মা সহ প্রবাহিত হচ্ছেন,—যাই প্রকাশ পাচ্ছে তা আত্মা সহ । 'সহ' শব্দের অর্থ 'সহিত' বা 'মিথুন'। আত্মা এবং আত্মশক্তি একত্রে প্রকাশ পাচ্ছেন, বা স্বয়ংশক্তি আত্মা প্রকাশ পাচ্ছেন। এই জন্য এই সহস্রার দ্যুতিময়, বা বিদ্যুন্ময় । 

তস্য ত্রয় আবাসথাস্ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ —তার-সেই আত্মার, তিনটি আবাস, তিনটি স্বপ্ন । 
বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৫।৪ মন্ত্রে বলা হয়েছে : ত্রয়ো লোকা এত এব বাগেবায়ং লোকো মনো'ন্তরিক্ষ লোকঃ প্রাণো'সৌ লোকঃ । 
ত্রয়ো লোকা এত এব—এই সমুদয়ই তিন লোক । 
বাগেবায়ং লোকো—বাক্‌-ই এই লোক—বাক্-ই 'এই' অর্থাৎ 'ইদং' বা সাক্ষাৎ ভাবে প্রত্যক্ষ লোক ।  
মনো'ন্তরিক্ষ লোকঃ— মন অন্তরীক্ষ লোক । 
প্রাণো'সৌ লোকঃ— প্রাণ ঐ লোক— প্রাণ দ্যুলোক । 
বেদে 'অসৌ' বা 'ঐ' শব্দের দ্বারা দ্যুলোককে বোঝায়, এবং 'অয়ম্‌ / ইয়ং' অর্থাৎ 'এই' শব্দের দ্বারা পৃথিবী বা 'ইহ' লোককে বোঝায় ।  
সুতরাং বাক্‌ যিনি সবাইকে মূর্ত্ত করেছেন, তিনি-ই পৃথিবী বা এই মূর্ত্ত বিশ্ব। 
মন-ই অন্তরীক্ষ লোক । আমাদের সবার অন্তরে যিনি চক্ষু-স্বরূপ, যে চক্ষু থেকে মান-সম্পন্ন, দৃশ্যমান বিশ্ব আমাদের চেতনায় প্রত্যক্ষ হচ্ছে তা মন। 
প্রাণ,—যাঁর থেকে সবাই জাত হয়, তিনি মান সম্পন্ন হয়ে পরিমাপ যোগ্য হয়ে এই মন থেকে প্রকাশ পাচ্ছেন। আর প্রাণের এই মূর্ত্ত হবার যে সক্ষমতা বা শক্তি, তা বাক্‌ । তাই যা কিছু মূর্ত্ত হয়েছে , তা বাক্‌-ই।
এই জন্য বৃহদারণ্যক উপনিষদে (মন্ত্র ১।৫।৮) বলা হয়েছে:

যৎ কিঞ্চ বিজ্ঞাতম্‌ বাচঃ তদ্‌ রূপম্‌ — যা কিছু বিজ্ঞাত হয়েছে, তা বাকের-ই রূপ । অর্থাৎ যা কিছু আত্মার  জ্ঞান বা বোধক্রিয়ার থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তা বাকের-ই রূপ।
বাক্‌ হি বিজ্ঞাতা— বাক্‌ ই বিজ্ঞাতা; বাক্‌-ই জ্ঞানশক্তি স্বরূপ, যাঁর জানা থেকে সবাই মূর্ত্ত হয়েছে । আবার যা কিছু মূর্ত্ত হয়েছে, সেই মূর্ত্ত বিশ্ব, আমাদের মধ্যে 'কথা' বা শব্দের আকারে বিদ্যমান থেকে আমাদের সঞ্জীবিত করছে। 
বাক্‌ এনম্‌ তৎ ভূত্বা অবতি — বাক্‌ সেই হয়ে  (সেই রূপ,সেই মুর্ত্তি বা সেই অন্ন) হয়ে একে (এই সৃষ্টিকে) পালন করেন । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ (মন্ত্র ১।৫।৮। দ্রষ্টব্য । )
এই যে লোক এ অতীতকালের লোক, কেননা যা মূর্ত্ত হয়েছে বা যা হয়ে গেছে, তাই এর রূপ। 

যৎ কিঞ্চ বিজিজ্ঞাস্যম্‌ মনসঃ তদ্‌ রূপম্‌ — যা কিছু বিজিজ্ঞাস্য (যা বিজ্ঞাত হবে) তা মনের-ই রূপ। 
মনঃ এব তৎ ভূত্বা অবতি— মন-ই সেই হয়ে (সেই রূপ হয়ে) একে (এই সৃষ্টিকে) পালন করেন । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ (মন্ত্র ১।৫।৯। দ্রষ্টব্য । )
এই যে লোক এ ভবিষ্যৎকালের লোক, কেননা যা মূর্ত্ত হবে তাই এর রূপ। যে সব কর্ম্ম আমরা ভবিষ্যতে করবো, তা মনে সংকল্প আকারে থাকে, এবং পরে তা ক্রমধারায় বাস্তবায়িত হয় ।  

যৎ কিঞ্চ অবিজজ্ঞাতম্‌ প্রাণস্য তদ্‌ রূপম্‌ — যা কিছু অবিজ্ঞাত তা প্রাণেরই রূপ। 
প্রাণঃ এনম্‌ তৎ ভূত্বা অবতি ভূত্বা অবতি—প্রাণ-ই এই হয়ে (সেই রূপ হয়ে) একে (এই সৃষ্টিকে) পালন করেন । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ মন্ত্র ১।৫।১০। দ্রষ্টব্য । )
প্রাণ-ই সব হয়েছেন এবং হয়েও চির-অবিজ্ঞাত । এই প্রাণ বা আত্মা নিজেকে নিজের দ্বারা জেনে সব হন, তাই তাঁকে কেউ জানতে পারে না। আর সকলে তাঁর-ই জানার রূপ। তাই এই প্রাণ-ই বর্ত্তমানতা;—এবং চির বর্ত্তমানতা; এবং নিত্য নবীন— কেননা ইনি চির অবিজ্ঞাত। ইনি 'বর্ত্তমানতা', কেননা ইনি থাকলে সবাই থাকে, এবং ইনি উৎক্রমণ করলে সবাই এঁর সাথেই উৎক্রমণ করে ।
এঁকে জানা যায় না, কেননা যে জানবে, সে একজন স্বতন্ত্র বিজ্ঞাতা হয়ে যাবে । জানতে গেলেই, সে স্বতন্ত্র বিজ্ঞাতা হয়ে, এই প্রাণের থেকে জাত হয়। তাই এঁর সাথে 'এক হতে হয়'; তাই ইনি আহবনীয়—আহ্বান করছেন, ডাকছেন, আকর্ষণ করছেন,— এক হতে বলছেন ; তাই ইনি মহা-পূর্ব্বা।

সুতরাং উপরে যা বলা হল তা তিনটি লোক, এবং সেই তিনলোকের তিনটি কাল । 
ঐতরেয় উপনিষদের এই মন্ত্রে লোক শব্দের পরিবর্ত্তে 'আবাসথ'  অর্থাৎ বাসস্থান শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে । প্রাণ-ই 'বসু', অর্থাৎ প্রাণের দ্বারাই সবাই বাস করে । এই প্রাণ বা চিন্ময় আত্মা-ই  প্রাণ-মূলক দ্যুলোক রূপে, মন-মূলক অন্তরীক্ষ লোক রূপে এবং ভৌতিকতা-মূলক পৃথিবী বা ভৌতিক বিশ্ব রূপে নিজেই বিদ্যমান, নিজেই নিজের আবাস বা সকলের আবাস । 

ত্রয়ঃ স্বপ্নাঃ —তিনটি স্বপ্ন ।
স্বপ্ন শব্দের অর্থ 'স্বয়ম্‌ আপ্নোতি—নিজেতেই আপ্ত করেন—নিজেতেই সম্ভবিত করেন ।'
বৃহদারণ্যক উপনিষদের ৪।৩।৯ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে : এই যে স্বপস্থান তা সন্ধিস্থান । সেই সন্ধিস্থান থেকে তিনি যা আনন্দক্ষেত্র, যেখানে আমরা অজ্ঞানতা বশতঃ ঘুমিয়ে পড়ি, সেই লোক (সুষুপ্তি স্থান/পরলোক) এবং যা মরলোক (ইহলোক), এই উভয় লোককেই দর্শন করেন বা ভোগ করেন। স্বপ্নকালে সকল লোকের যা কিছু মাত্রা তাকে গ্রহণ করে, এই আত্মা নিজের ভা এবং নিজের জ্যোতি দ্বারা, স্বয়ং সকল কিছু বিনাশ এবং নির্ম্মাণ করেন। এই আত্মা স্বয়ংজ্যোতি। 
সুতরাং ঐ যে তিন আবাস—দ্যু, অন্তরীক্ষ এবং পৃথিবী (ভূ), তা এই স্বাধীন , স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার স্বীয় 'ভা' এবং স্বীয় জ্যোতির দ্বার নির্ম্মিত । যা গর্ভ বা অব্যক্ত থেকে প্রকাশ পাচ্ছে তা ভর্গ বা  'ভা' ; আর সেই ভা-ই যে আকার বা রূপ নেয়, তাকে জ্যোতি বলে । যে কোন রূপ বা আকার-ই আলো দিয়ে নির্ম্মিত, অর্থাৎ জ্যোতি; তবে এই জ্যোতি স্বয়ং-জ্যোতি, এই জ্যোতি চিন্ময় এবং ইনি সবাইকে 'স্বয়ং' বা 'নিজে' বলেই জানেন । 
এই স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা, স্বয়ংজ্যোতির্ম্ময় হয়ে দ্যুলোক হয়েছেন, এবং তাঁর সেই স্বয়ংজ্যোতির্ম্ময় স্বরূপের নাম আহবনীয় অগ্নি; তিনি স্বয়ংজ্যোতির্ম্ময় হয়ে অন্তরীক্ষ হয়েছেন, এবং তাঁর সেই স্বয়ংজ্যোতির্ম্ময় স্বরূপের নাম দক্ষিণাগ্নি অগ্নি (অন্ব-আহার্য-পচন অগ্নি)তিনি স্বয়ংজ্যোতির্ম্ময় হয়ে পৃথবী বা ভূ হয়েছেন, এবং তাঁর সেই স্বয়ংজ্যোতির্ম্ময় স্বরূপের নাম গার্হপত্য (গৃহপতি) অগ্নি । এই তাঁর তিনটি স্বপ্ন; সকল বিশ্বভূবন তাঁর স্বপ্নে।  

১।৩।১৩। 
স জাতো ভূতান্যভিব্যৈক্ষৎ কিমিহান্যং বাবদিষদিতি । স এতমেব পুরুষং ব্রহ্ম তততমমপশ্যদিদমদর্শমিতীঁ ।  

১।৩।১৩-১ ।  অন্বয় । 
সঃ জাতঃ (তিনি জাত হয়ে) ভূতানি (ভূত সমূহকে) অভিব্যৈক্ষৎ (অভি+বি+ঐক্ষৎ—বিশেষ ভাবে, বা প্রত্যেকটি জাত ভূতকে বা জাত সত্তাকে ঈক্ষণ করলেন/জানলেন ) । কিম্‌ (কি) ইহ (এখানে—এই ভৌতিক প্রকাশভূমিতে) অন্যং (অন্যকে—নিজে ব্যতীত দ্বিতীয়কে) বাবদিষৎ (বলতে ইচ্ছা করেছিলেন) ইতি । সঃ (সে—তিনি) এতম্‌ (এই) এব পুরুষং (পুরুষকেই-অনুপ্রবিষ্ট নিজেকেই ) ব্রহ্ম (ব্রহ্ম) তততমম্‌ (তত-তম—তত= ব্যাপ্ত, তততম= ব্যাপ্ততম; তততমম্‌— ব্যাপ্ততমকে ) অপশ্যৎ (দর্শন করলেন) ইদম্‌ (ইহা-ইনি) অদর্শম-ইতীঁ (আমি দেখলাম...দেখলাম !)

১।৩।১৩-২ । অর্থ।
তিনি (আত্মা) জাত হয়ে (অনুপ্রবিষ্ট পুরুষ হয়ে) ভূত সমূহকে বিশেষ বিশেষ ভাবে ঈক্ষণ করলেন, বা প্রত্যেককে স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভাবে জানলেন । (আত্মা অনুপ্রবিষ্ট পুরুষ হলেন মানেই ভূত সকল জাত হল) । এখানে (এই ভৌতিক প্রকাশভূমিতে) কি অন্যকে (নিজে ব্যতীত দ্বিতীয়কে—নিজে ব্যতীত দ্বিতীয় কারোর কথা) বলেছিলেন—নিজে ব্যতীত দ্বিতীয়কে কি জেনেছিলেন ? তিনি এই পুরুষকেই (অনুপ্রবিষ্ট নিজেকেই) — ব্যাপ্ততম ব্রহ্মরূপে দর্শন করলেন ।
ইহাঁকে আমি দেখলাম...দেখলাম !

১।৩।১৩-৩ ।  সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
এই যে পরমআত্মস্বরূপ, দেবগণের সাথে পুরুষে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে অন্নকে গ্রহণ করলেন, তাতে ভূত সকল সৃষ্টি হল । এর নাম—আত্মা নিজেকে  অনুপ্রবিষ্ট জীব বা সত্তা সকলের আকারে জাত করলেন। এই জন্য বলা হল—স জাতো ভূতান্যভিব্যৈক্ষ্যৎ—তিনি জাত হয়ে ভূত সমূহকে বা নিজের ভৌতিক রূপসমূহের প্রত্যেকটিকে জানলনে বা নিজে বলে অনুভব করলেন । তিনি সৃষ্টি কে নিজে থেকে অন্য বলে অনুভব করেননি।
'কিমিহান্যং বাবদিষদিতি—এখানে (এই ভৌতিক প্রকাশভূমিতে) কি অন্যকে ( নিজে ব্যতীত দ্বিতীয়কে ) বলতে চেয়েছিলেন /জানতে চেয়েছিলেন —নিজে ব্যতীত দ্বিতীয়কে কি জেনেছিলেন ?' এই উক্তির অর্থ— স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা থেকে যা কিছু জাত হল, যা কিছু ভূত, অর্থাৎ জীব এবং সত্তা সকল প্রকাশিত হল, তাতে এই আত্মাই অনুপ্রবিষ্ট, সেই সকল সৃষ্টি তিনি নিজেই । সুতরাং যা কিছু জাত হল—ব্যাখ্যাত হল, যত কিছু বলা হল, যত কিছু তাঁর ঈক্ষণ থেকে—দেখা থেকে রূপময় হয়ে সৃষ্টি হল, তা এই আত্মা ভিন্ন অন্য কেউ নয়
তাই এই পুরুষরূপী অনুপ্রবিষ্ট আত্মা নিজেকেই ব্যাপ্ততম ব্রহ্ম (যিনি বর্ধিত হয়ে সকলকে অতিক্রম করেছেন ) রূপে দর্শন করলেন । 

১।৩।১৪ ।
তস্মাদিদন্দ্রো নাম ইদন্দ্রো হ বৈ নাম তমিদন্দ্রং সন্তমিন্দ্র ইত্যাচক্ষতে পরোক্ষণ। পরোক্ষপ্রিয়া ইব হি দেবাঃ । পরোক্ষপ্রিয়াঃ ইব হি দেবাঃ ।।

১।৩।১৪-১ । অন্বয় । 
তস্মাৎ (সেই জন্য) ইদন্দ্রঃ (ইদন্দ্র) নাম (নাম); ইদন্দ্রঃ (ইদন্দ্র)  হ বৈ (অবশ্যই) নাম (নাম) । তম্‌ (তাঁকে) ইদন্দ্রং সন্তম্‌ ( ইদন্দ্র হলেও) ইন্দ্রম্‌ ইতি (ইন্দ্র বলেই) আচক্ষতে ( দর্শন করে /মনে করে) পরোক্ষণ (পরোক্ষতা দ্বারা; পরোক্ষতা হেতু;), পরোক্ষপ্রিয়াঃ  ইব হি দেবাঃ (হি —কারণ; দেবাঃ—দেবগণ; ইব—যেন; পরোক্ষপ্রিয়াঃ—পরোক্ষপ্রিয় ) পরোক্ষপ্রিয়াঃ  ইব হি দেবাঃ (হি —কারণ; দেবাঃ—দেবগণ; ইব—যেন;পরোক্ষপ্রিয়াঃ—পরোক্ষপ্রিয় ) 

১।৩।১৪-২ । অর্থ । 
সেই জন্য ইদন্দ্র নাম;  ইদন্দ্র অবশ্যই (এঁর) নাম ।পরোক্ষতা-হেতু, ইদন্দ্র হলেও তাঁকে ইন্দ্র বলেই দর্শন করে, ( বা মনে করে ) ।কারণ দেবগণ যেন পরোক্ষপ্রিয়, কারণ, দেবগণ যেন পরোক্ষপ্রিয় । 

১।৩।১৪-৩ ।  সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
প্রত্যক্ষ ।
দুইটি অক্ষ আছে,—একটি প্রত্যক্ষ এবং অন্যটি পরোক্ষ। অক্ষ শব্দের একটি অর্থ—'যা  চক্রের বা চক্রাকার গতির অক্ষ ।'  যেখান থেকে কালগতি  বা কালচক্র প্রকাশ পাচ্ছে, তা অক্ষ এবং তা অক্ষর বা অক্ষয়, তা কালের দ্বারা প্রভাবিত নয় । এই অক্ষয়, অক্ষর আত্মা নিষ্কল । প্রতি সত্তায়, প্রতি পুরুষে এই অক্ষর আত্মাই অনুপ্রবিষ্ট হয়েছেন, এইটি প্রত্যক্ষতা । প্রতি পুরুষে, ইনিই দ্রষ্টা বা ভোক্তা, ইনিই নিয়ন্তা । আমাদের দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি এই আত্মারই দর্শন, শ্রবণাদির অংশ । প্রতি ভূতে, প্রতি জীবে, প্রতি সত্তায়, প্রতি ইদংয়ে —প্রতি 'এটা, ওটা, সেটায়' এই আত্মাই দ্রষ্টা রূপে স্থিত, এবং ইনিই সকল ইদং-এর দ্রষ্টা। ইনি সকল কিছুর আত্মা এবং নিজবোধ স্বরূপ এবং প্রত্যেকেকে দেখছেন, প্রত্যেকেকে ভোগ করছেন; ইনি 'ইদং-দ্র' বা 'ইদন্দ্র' । 
তাই এই অনুপ্রবিষ্ট পুরুষ বা আত্মার নাম 'প্রত্যগাত্মা ' । প্রত্যগাত্মা = প্রত্যক্‌ +আত্মা ; প্রত্যক্‌ = প্রতি + অক্‌ ; এখানে 'অক্‌' অর্থে 'দিক'। 'অক্‌'  ধাতুর অর্থ, এঁকে বেঁকে চলা, বা দিক পরিবর্ত্তন করতে করতে চলা । সুতরাং প্রত্যগাত্মা অর্থে, যে আত্মা প্রতি দিকে দৃষ্ট হচ্ছেন, বা প্রতি বোধের মূলে বা পশ্চাতে যিনি দৃষ্ট হচ্ছেন । এই জন্য প্রত্যক্‌ শব্দের একটি  অর্থ  'পশ্চিম'।   উপনিষদে এবং গীতায়, প্রতি বোধ , বা প্রতি অনুভূতির মূলে বা পশ্চাতে যিনি রয়েছেন তাঁকে বা এই প্রত্যক্‌ আত্মাকে দেখতে বলা হয়েছে। নিজ বা স্বয়ং বোধের উপর সর্ব্ববোধ প্রকাশ পায় । বোধ বা অনুভূতির প্লাবনের মধ্যে এই স্বয়ংবোধে বা নিজবোধ বা প্রত্যক্‌ আত্মা সদাস্থির, নির্লিপ্ত, অবিচল হয়ে থাকেন। ইনি নির্লিপ্ত বা অসঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও, ইনি দ্রষ্টা । আমি বা অহং বোধ এঁর থেকেই প্রকাশ পায়, এবং নিদ্রা বা মৃত্যুতেে এঁতেই বিলীন হয়। এঁকে দেখার থেকে 'আত্মজ্ঞানের সূত্রপাত হয়। এই জন্য কেনোপনিষদে (মন্ত্র ২।৪।) উক্ত হয়েছে :  প্রতিবোধো বিদিতং মতম্‌মৃতত্বং হি বিন্দতে ।আত্মনা বিন্দতে বীর্য্যং বিদ্যয়া বিন্দতে'মৃতম্‌ — প্রতি বোধে বিদিত (প্রতি অনুভূতিতে এই আত্মা আছেন), এই রকম মতি হলে (এই ভাবে জানলে) অব্যশ্যই অমৃতত্ব লাভ করে । আত্মজ্ঞানের দ্বারা বীর্য্য লব্ধ হয় এবং বিদ্যার দ্বারা অমৃত লব্ধ হয় । 

পরোক্ষ, পরোক্ষপ্রিয় দেবগণ । 
প্রত্যক্ষতার কথা আমরা আগের অনুচ্ছেদে বর্ণনা করেছি। প্রতি জীবে, প্রতি সত্তায় আত্মা অনুপ্রবিষ্ট হয়ে তার অন্তরে দ্রষ্টা, ভোক্তা । আমাদের দর্শন, শ্রবণ, ইত্যাদি এঁর দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদির অংশ । এইভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেককে (প্রত্যক্‌ আত্মা, প্রত্যক্‌ আত্মাকে) দর্শন করছেন । এর নাম 'প্রতিচক্ষণ' বা 'প্রতিদর্শন'। এই  প্রতিচক্ষণের  বা প্রতিদর্শনের বিষয়ে ঋক্‌ বেদের  ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে একটি মন্ত্র, আমরা পরে উল্লেখ করব ।
প্রতি ইদং-এ, প্রতি ভূতে, প্রতি অনুভূতিতে এই আত্মা দৃষ্ট হচ্ছেন। প্রতি বোধের মূলে ইনি প্রত্যক্ষ । তাই ইনি প্রত্যক্ষ আত্মা, সদা বর্ত্তমান ।  আবার প্রতি ইদং বা প্রতি ভূতের অন্তরে ইনি দ্রষ্টা, এবং এই দ্রষ্টার দ্বারাই প্রত্যেকে প্রকাশিত, চেতায়িত, প্রত্যক্ষ। ইনি ছাড়া আর কিছু নেই—এইটি প্রত্যক্ষতা । 
তাই ইনি প্রত্যক্ষ আত্মা, ইদং-দ্র—ইদন্দ্র ।
যা প্রত্যক্ষর বিপরীত, তা পরোক্ষ । নিজের প্রত্যক্ষতাকে প্রচ্ছন্ন করে এই স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা 'পর' বা দ্বিতীয় হন । অক্ষর, বা অক্ষয় আত্মার যে অক্ষি বা চক্ষু, তা থেকে কাল প্রকাশ হচ্ছে । অক্ষি = অক্ষ + ই (গতি) । ( কাল, ঈক্ষণ এবং দর্শনের বিষয়ে  আমরা আগে বলেছি । ) যে কাল গতিতে বা বেদন-চক্রে ইনি দ্বিতীয় হয়ে বিশ্ব ভূবন রচনা করছেন, সেই কাল যেখান থেকে প্রকাশ পাচ্ছে তার নাম 'পরোক্ষ'। এই দ্বিতীয়তা প্রকাশ করতে গিয়ে, স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা দেবশক্তিকে প্রকাশ করেন বা অনন্ত দেবতা হয়ে দ্যুলোককে প্রকাশ করেন এক এক দেবতা, এই পরম আত্মস্বরূপের এক একটি অন্তবিহীন বা অনন্ত মহিমা যেমনজল' দেবতা অর্থে সেই চিন্ময় পুরুষ, যিনি জলের যতরকম মহিমা, বা বৈচিত্র্য হতে পারে সর্ব্বকালে এবং সর্ব্বলোকে, তিনি সেই মহিমা প্রকাশ করে সবাইকে অনুগ্রহ করেন বা করছেন 

আমরা গ্রহণধর্ম্মী; এবং এই দেবতাদের থেকে যা প্রকাশ পাচ্ছে, তার দ্বারা আমরা চেতায়িত হচ্ছি, জীবিত রয়েছি প্রকাশ করাই দেবতাদের ধর্ম্ম, এবং এই দৈব প্রকাশের দ্বারা অনুগৃহীত হওয়াই আমাদের ধর্ম্ম, এবং এই জন্য আমরা ওঁদের অধীনস্থ  এই জন্য আমরা যখন মুক্তির পথে অগ্রসর হই, দৈবাধীন অবস্থা থেকে স্বাধীন অবস্থার দিকে যেতে থাকি, দেবতারা তার প্রতিকূল হন, যেহেতু অধীনস্থ প্রজারা আর অধীন থাকবে না  । এই জন্য এঁরা পরোক্ষপ্রিয়; অর্থাৎে এঁরা 'পর' বা দ্বিতীয়তাকে পোষণ করেন এবং প্রত্যক্ষতার বিরোধী—আত্মদর্শনের জন্য যারা আকাঙ্ক্ষিত তাদের আত্ম-প্রত্যক্ষতাকে এই দেবতারা অবরোধ করার চেষ্টা করেন। সৃষ্টিকে স্থায়ী করার জন্য এই পরোক্ষপ্রিয়তার প্রয়োজন । 

যতক্ষণ আমরা অনাত্মজ্ঞ থাকি, ততক্ষণ আমরা দেবতাদের পশু স্বরূপ; পালিত পশুরা যেমন পশুপালকের সেবা করে বা তার স্বার্থপূরণ করে, অনাত্মজ্ঞ আমরা সেইরকমই । এই বিষয়ে বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।৪।১০ মন্ত্রটি উদ্ধৃত করলাম :
ব্রহ্ম বা ইদম্‌ অগ্র আসীৎ তৎ আত্মানম্‌ এব অবেৎ অহং ব্রহ্মাস্মি : ইদম্‌ বা সৃষ্টির অগ্রে ব্রহ্মই ছিলেন; তিনি আত্মাকে (নিজেকে) জেনেছিলেন — আমি-ই ব্রহ্ম ।
 তস্মাৎ তৎ সর্ব্বম্‌ অভবৎ : তাঁর থেকে (সেই ব্রহ্ম থেকে) তখন সকল কিছু সৃষ্ট হল ।
যো যো দেবানাং প্রতি অবুধ্যত স এব তৎ অভবৎ তথা ঋষীণাং তথা মনুষ্যাণাং : যে যে দেবতাদের মধ্যে প্রতি-বোধ করেছিলেন (যে দেবতাদের প্রতি যা বোধ করেছিলেন), সেই দেবতা তাই হয়েছিল, সেই রকম-ই ঋষিদের ক্ষেত্রে, সেই রকম-ই মনুষ্যদের দের ক্ষেত্রে ।
তৎ হ এতৎ পশ্যন্‌  ঋষিঃ বামদেবঃ  প্রতিপেদেঃ অহং মনুঃ অভবম্‌ সূর্য্যশ্চ ইতি
তাই, এইটি দেখে ঋষি বামদেব প্রতিপন্ন করেছিলেন— আমি মনু হয়েছিলাম, এবং সূর্য্য-ও (সূর্য-ও) 
তৎ ইদম্‌ অপি এতর্হি য এবং বেদ অহং ব্রহ্মাস্মীতি স ইদং সর্ব্বং ভবতি : তাই আজ অব্দিও যিনি এই ভাবে জানেন যে 'আমিই ব্রহ্ম', তিনি এই সকল কিছুই হন ।
তস্য হ ন দেবাশ্চন অভূত্যৈ ঈশতে : কোন দেবতাই তাঁর 'অভূতিকে' (নিজেকে সম্ভূত করার অক্ষমতাকে—নিজেকে সম্ভূত না করতে পারার বিষয়ে ) শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না । 
আত্মা হি এষাম্‌ সঃ ভবতি : তিনি (এই প্রকার বিজ্ঞাতা) এই সকলের আত্মা হন :  তিনি (এই প্রকার বিজ্ঞাতা) এই সকলের যিনি আত্মা তাঁর সাথে একীভূত হন । 
অথ যঃ অন্যাম্‌ দেবতাম্‌ উপাস্তে অন্যঃ অসৌ অন্য অহম্‌ অস্মি ইতি ন স বেদ  : আর যে 'অন্য' দেবতার উপাসনা করে —অন্য ঐ (দেবতা), অন্য আমি—সে জানে না ।
যথা পশুঃ এবম্‌ সঃ দেবানাং : যেমন পশু (যেমন মানবের অধীনস্থ পশু), এই রকম-ই সে দেবগণের মধ্যে ।  
যথা হ বৈ বহবঃ পশবো মনুষ্যং ভুঞ্জ্যুঃ এবম্‌ এব এক একঃ পুরুষো দেবান্‌ ভুনক্তি : যেমন বহু পশু (পালিত পশু) মনুষ্যকে সেবা করে, এই রকম-ই এক এক পুরুষ (প্রত্যেক পুরুষ / ব্যক্তি) দেবতাকে সেবা করে । 
একস্মিন্‌  এব পশৌ অদীয়মানে অপ্রিয়ঃ ভবতি কিম্‌ উ বহুষু : একটি পশুতেও অপ্রিয়তা (দুঃখ) হয় (যদি পশুটিকে) না দেয় (একটি পশুতেও দুঃখ হয় যদি পশুটিকে হরণ করে ), বহু পশুকে নিয়ে গেলে আর কি !
তস্মাদ্‌ এষাম্‌ তৎ ন প্রিয়ম্‌ যৎ এতৎ মনুষ্যাঃ বিদ্যুঃ : সেইজন্য এঁদের তা প্রিয় হয় না, যে এই (আত্মজ্ঞান—আত্মা এবং আত্মার ব্রহ্মত্ব) মনুষ্যরা বিদিত হবে :  ইদম্‌ বা সৃষ্টির অগ্রে ব্রহ্মই ছিলেন; তিনি আত্মাকে (নিজেকে) জেনেছিলেন — আমি-ই ব্রহ্ম—(সৃষ্টির মূলে ব্রহ্মরূপ আত্মা ছিলেন / রয়েছেন) । তাঁর থেকে (সেই ব্রহ্ম থেকে) তখন সকল কিছু সৃষ্ট হল ।
যে যে দেবতাদের মধ্যে (প্রতি) বোধ করেছিলেন (যে দেবতাদের প্রতি যা বোধ করেছিলেন), সেই দেবতা তাই হয়েছিল, সেই রকম-ই ঋষিদের ক্ষেত্রে, সেই রকম-ই মনুষ্যদের ক্ষেত্রে ।
তাই এইটি দেখে (জেনে), ঋষি বামদেব প্রতিপন্ন করেছিলেন— আমি মনু হয়েছিলাম, এবং সূর্য্য-ও (
 সূর্য-ও)  তাই আজ অব্দিও যিনি এই ভাবে জানেন যে 'আমিই ব্রহ্ম', তিনি এই সকল কিছুই হন ।কোন দেবতাই তাঁর 'অভূতিকে' ('নিজেকে সম্ভূত করতে পারবেন না' এই বিষয়টিকে) শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না (অর্থাৎ কোন দেবতাই তাঁর সম্ভূতি বা নিজেকে সকল কিছু করে সৃষ্টি করার সক্ষমতাকে রোধ করতে পারেন না)।  তিনি (এই প্রকার বিজ্ঞাতা) এই সকলের আত্মা হন (এই প্রকার বিজ্ঞাতা এই সকলের যিনি আত্মা তাঁর সাথে একীভূত হন )। 
আর যে 'অন্য' দেবতার উপাসনা করে —অন্য ঐ (দেবতা), অন্য আমি—সে জানে না । যেমন পশু (যেমন মানবের অধীনস্থ পশু), এই রকম-ই সে দেবগণের মধ্যে । যেমন বহু পশু (পালিত পশু) মনুষ্যকে সেবা করে, এই রকম-ই এক এক পুরুষ (প্রত্যেক পুরুষ / ব্যক্তি) দেবতাকে সেবা করে।একটি পশুতেও অপ্রিয়তা (দুঃখ) হয় (যদি পশুটিকে) না দেয় (একটি পশুতেও দুঃখ হয় যদি পশুটিকে হরণ করে ), বহু পশুকে নিয়ে গেলে আর কি ! সেইজন্য এঁদের তা প্রিয় হয় না, যে এই (আত্মজ্ঞান—আত্মা এবং আত্মার ব্রহ্মত্ব) মনুষ্যরা বিদিত হবে । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৪।১০ মন্ত্র।)
আত্মার ব্রহ্মত্ব বিদিত হলে, সেই বিজ্ঞাতা আর দেবগণের অধীনে থাকেন না। তাই  দেবগণ প্রত্যক্ষতাকে দ্বেষ করেন, এবং তাঁরা পরোক্ষপ্রিয়;  'পর', বা যা  একীভূত অবস্থার  বিপরীত, তা তাঁদের প্রিয়। (পরোক্ষপ্রিয়ঃ হি দেবাঃ প্রত্যক্ষদ্বিষাঃ — বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ৪।২।২ মন্ত্র দ্রষ্টব্য।)

দেবযান। 
দেবগণ প্রত্যক্ষতাকে দ্বেষ করেন; যারা পর বা দ্বিতীয় হয়ে জাত হয়েছে, তারা পর বা দ্বিতীয় হয়েই থেকে যায় এবং তাঁদের মহিমার দ্বারা অনুগৃহীত হয়ে থাকে, এইটিই দেবতাদের অভিলাষ; এবং এইটি 'পরোক্ষপ্রিয়তা' । তত্রাচ, দেবতাদের না জানলে, বা আত্মার দেবত্ব না জানলে, আত্মজ্ঞান হয় না; অর্থাৎ, আত্মা এবং তাঁর ব্রহ্মত্ব বা ঈশিত্ব বিদিত হওয়া যায়না । 
স্বয়ংপ্রকাশ স্বয়ংশক্তি আত্মার যে আনন্ত্য, বা অনন্তে অনন্তে নিজেকে প্রকাশ করার যে মহিমা বা শক্তি, তাই দ্যুলোক বা দেবতাদের আকারে প্রকাশ পেয়েছে। এই জন্য বলা হয়েছে :
সত্যমেব জয়তে নানৃতং
সত্যেন পন্থা বিততো দেবযানঃ ।
যেনাক্রমন্ত্যৃষয়ো হ্যাপ্তকামা
যত্র তৎ সত্যস্য পরমং নিধানম্‌ ।। (মুণ্ডক উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।১।৬।)


অর্থ : সত্যই জয়যুক্ত হয়, অনৃত (মিথ্যা) নয় । 
         সত্যের দ্বারাই দেবযানের পথ আস্তীর্ণ। 
         যে পথ দিয়ে আপ্তকাম ঋষিরা ক্রমণ করেন (গমন করেন) (সেইখানে),           যেখানে সেই সত্যের পরম আশ্রয় (বর্ত্তমান) । 

রূপ ও প্রতিরূপ, পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ এবং ইন্দ্র । 

বিষ্ণু বা প্রাণের যে ঈক্ষণ বা দর্শন, তার থেকে সর্ব্বরূপ প্রকাশ পাচ্ছে । এই দর্শনের যে কেন্দ্র বা চক্ষু, তার থেকে রূপ এবং গতি (কাল) একত্রে প্রকাশ পাচ্ছে । এই কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ প্রকাশ হল আমাদের বহিরাকাশের 'সূর্য্য  (সূর্য), যাঁর থেকে আলো বা রূপ (চক্ষু), এবং কাল (পা/পদ/গতি),  বর্ষ, ঋতু, দিন-রাত্রি ইত্যাদির আকারে প্রকাশ পাচ্ছে ; পদ থেকে পদান্তরে, পদ-সঞ্চারে, প্রাণ চলেছেন। তাই এই চক্ষু-ই বিষ্ণুর পরম-পদ, আর যে পদের অর্থ হল 'পদার্থ' সমূহ । ঋক্‌ বেদে উক্ত হয়েছে যে, 'এই বিষ্ণুর পরম-পদকে দেবগণ সদা দর্শন করেন, এই পদ দ্যুলোকের মত সর্ব্বব্যাপী চক্ষু ।' (ঋক্‌বেদ মন্ত্র ১।২২।২০ দ্রষ্টব্য।)
এই যে ঈক্ষণ বা প্রাণের গতি বা দেখা, তার একটি স্বরূপ পরোক্ষতা—যার দ্বারা তিনি বহু বা পর হচ্ছেন; এবং অন্যটি প্রত্যক্ষতা যার দ্বারা তাঁর পর বা দ্বিতীয় হওয়া প্রতিটি সত্তাকে নিজেতে তিনি ফিরিয়ে নিচ্ছেন । পরোক্ষতায় যা রূপ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে (সম্ভূত হচ্ছে),  প্রত্যক্ষতায় তাই প্রতিরূপ হয়ে অনুভূত হচ্ছে । 
বাইরে যে একটি বৃক্ষ, সে সবার মধ্যে বৃক্ষের অনুভূতি ফোটাচ্ছে । বাইরের বা  বহিরাকাশের বৃক্ষটি 'রূপ' বা স্বয়ং প্রকাশ চেতনার সম্ভূতি—তিনি নিজেই নিজেকে বৃক্ষ রূপে বোধ করে বৃক্ষ হয়েছেন; এর নাম সম্ভূতি—সম্যক রূপে ভূত হওয়া, মূর্ত্ত হওয়া । আর, বৃক্ষের যে বোধ আমাদের মধ্যে হচ্ছে, তা হল 'অনুভূতি' বা 'প্রতিরূপ'। আত্মাই রূপ-সকল, এবং ঐ এক আত্মাই অনন্ত হয়ে, সেই রূপ সকলকে প্রতিবোধ বা অনুভব করছেন। একই বৃক্ষ, বা একই রূপ, কিন্তু তার অনুভূতি এক এক সত্তায় (এক এক দ্রষ্টায়) এক-এক রকম, অর্থাৎ স্বতন্ত্র। এই বিষয়ে ঋক্‌ বেদে একটি উক্তি আছে :  

" রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব
তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায় ৷
ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে
যুক্তা হ্যস্য হরয়াঃ শতা দশ ৷৷" (ঋক্‌ বেদ ৬।৪৭।১৮, বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ২।৫।১৯।)
রূপে রূপে প্রতিরূপ হয়েছেন । এই রূপকে প্রতিদর্শন (প্রতিবোধ) করার জন্য, ইন্দ্র মায়ার দ্বারা (মাত্রা শক্তির দ্বারা, শক্তির মাত্রার তারতম্যের দ্বারা) বহু (পুরু)-রূপ হয়ে গমন করছেন (এবং প্রকাশ পাচ্ছেন)। শত-দশ (সহস্র) হরি নামক অশ্ব (হরয়ঃ ) তাঁতে (সেই গতিবান্‌ ইন্দ্রে; ইন্দ্রের রথে) যুক্ত।
ইন্দ্রের অশ্বদের নাম 'হরি'। এই যে আত্মা প্রাণরূপে আমাদের মধ্যে গতিশীল, ক্রিয়াময়, তাকে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় বলে অনুভব করছি । এই জন্য উপনিষদে 'প্রাণ' অর্থে ইন্দ্রিয়-ও বোঝায় । অশ্ব অর্থে প্রাণ গতি, বা এই প্রাণ, যে আমাদেরকে রূপে,রসে,গন্ধে,স্পর্শে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে। এই অশ্বদের নাম 'হরি', এদের বর্ণ হরিৎ । ঐ রূপ সকল থেকে, বাইরের ঐ বিশ্ব থেকে বেদন বা অনুভূতি গুলিকে হরণ করে, ঐ হরি-অশ্বরা হৃদয় বা ভোগক্ষেত্রের দিকে ছুটছে, যেখানে আমরা অনুভব করছি, যেখানে আমাদের মর্ম্ম, যেখানে আত্মা 'প্রতিরূপময়' হচ্ছেন ।
সহস্র শব্দের অর্থ 'আত্মনা সহ স্রবতি' — 'আত্মা সহ প্রবাহিত হচ্ছেন; এই রকম যে সংখ্যাতি, সংখ্যা, বা সম্যক-আখ্যা—তার নাম 'সহস্র' । এই রকম-ই এই সহস্র-লোচন ইন্দ্র, এই মহাদ্রষ্টা,—মহেন্দ্র। 

ঐতরেয় উপনিষদ্‌,  দ্বিতীয় অধ্যায়, প্রথম  খণ্ড। 

২।১।১।
পুরুষে হ বা অয়মাদিতো গর্ভ ভবতি যদেতদ্রেস্তদেৎ সর্ব্বেভ্যো'ঙ্গেভ্যস্তেজঃ সম্ভূতমাত্মন্যেবাত্মানং বিভর্ত্তি । তদ্যথা স্ত্রিয়াং সিঞ্চত্যথৈনজ্জনয়তি তদস্য প্রথমং জন্মং । 

২।১।১-১। অন্বয়।
পুরুষে হ বা (পুরুষে অবশ্যই) অয়ম্‌ (এই—এই জীব) আদিতঃ (প্রথমতঃ ) গর্ভঃ ভবতি (গর্ভ  হয়; গর্ভ সৃজিত হয়) ।  যৎ এতৎ (যা এই) রেতঃ (রেত)  তৎ এতৎ (তা এই) সর্ব্বেভ্যঃ অঙ্গেভ্যঃ (সকল অঙ্গ থেকে) তেজঃ (তেজ) সম্ভূতম্‌ (সম্ভূত) । আত্মনি এব (আত্মাতেই ) আত্মানং (আত্মাকে) বিভর্ত্তি (ভরণ করে) । তৎ (তাকে) যথা (যখন) স্ত্রিয়াং (স্ত্রীতে) সিঞ্চতি (সিঞ্চন করে) অথ (তখন) এনৎ (একে) জনয়তি (জাত করে) তৎ অস্য (তা এর) প্রথমং জন্মং (প্রথম জন্ম) । 

২।১।১-২। অর্থ।
আদিতে (প্রথমে) অবশ্যই পুরুষে এই গর্ভ (সম্ভবিত হয়);  যা এই রেত, তা এই সকল অঙ্গ থেকে সম্ভূত তেজ;  আত্মাতেই আত্মাকে ভরণ করে । তাকে (রেতকে) যখন স্ত্রীতে সিঞ্চন করে, (এবং) তখন একে (জীবকে) জাত করে; তা এর প্রথম জন্ম । 

২।১।১-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
প্রতি পুরুষ থেকে কিভাবে আবার পুরুষ-ই জাত হয়, মূর্ত্ত হয়, এখানে সে কথা বলা হচ্ছে। যেহেতু ইনি নিজেই নিজেকে বহু করেন, তাই গর্ভ পুরুষেই উৎপন্ন হয় ।
আমরা, অর্থাৎ যারা কর্ম্মের দ্বারা অনুশাসিত জীব, তারা  যেখান থেকে নিজের সংস্কার-নিয়ে বা চরিত্র নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে, সেই লোকের নাম 'পিতৃলোক' । জন্মের আগে আমরা এইখানে পিতৃগণের সাথে এক হয়ে থাকি । চেতনা বা প্রাণ আমাদের নিজেতে (স্ব) ধারণ (ধা) করেন বলে, দৈব-পিতৃগণের শক্তি হলেন 'স্বধা' ।শাস্ত্রে সাত-জন দৈব-পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে । আমরা যতবার যতভাবেই জন্মাই তা এই দৈব-পিতৃগণের মধ্য দিয়েই হয় ।
মৃত্যুর পর পিতৃলোক থেকে আমরা চন্দ্রমায় উপনীত হই । সেই চন্দ্রমাতে বিদেহ অবস্থায় আমরা কর্ম্মফলানুসারে সুখ -দুঃখাদি ভোগ করে, পুনরায় যে পথ দিয়ে গিয়েছিলাম, সেই পথ দিয়েই এবং নানা অবস্থান্তরের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে প্রতাবর্ত্তন করি, এবং ভৌতিক-শরীরী জীব হয়ে জন্মাই। সাধারণতঃ, শস্য, ফল ইত্যাদি খাদ্যের মধ্য দিয়ে, পূর্ব্ব -কর্ম্ম অনুসারে আমরা পুরুষের বা পিতার শরীরে আশ্রয় নিই — এইটি হল গর্ভ ।(বৃহদারণ্যক উপনিষদ ষষ্ঠ অধ্যায় দ্বিতীয় ব্রাহ্মণ, মন্ত্র ৬।২।১৫ দ্রষ্টব্য ।)
প্রাণ যখনও বিকশিত হয়নি, যখন বিকশিত হবার আদি পর্যায়ে, সেই অব্যক্ত-অবস্থার নাম 'গর্ভ'। এই সময়ে, জীব পিতার সাথে একাত্ম হয়ে থাকে । এই জন্য বলা হল : আত্মনি এব আত্মানং বিভর্ত্তি—আত্মাতেই আত্মাকে ভরণ করে । নিজেকে নিজেতে ধারণ বা ভরণ যে আত্মশক্তির দ্বারা হয়, তাঁর নাম 'স্বধা' । এই যে নিজেতেই  নিজে 'রত', এর নাম 'রেত' ।  এইটি 'বীজ'— 'জীব' হয়ে প্রকাশ হওয়ার উৎস । 

স্ত্রী ।
আত্মনি এব  আত্মানং বিভর্ত্তি । তৎ (তাকে) যথা (যখন) স্ত্রিয়াং (স্ত্রীতে) সিঞ্চতি (সিঞ্চন করে) তৎ অস্য (তা এর) প্রথমং জন্মং (প্রথম জন্ম) আত্মাতেই আত্মাকে ভরণ করে । তাকে যখন স্ত্রীতে সিঞ্চন করে তা এর প্রথম জন্ম । 
আত্মশক্তি নিজেকে (আত্মাকে) ত্রিধা বিভক্ত করে তেজ (বাক্‌), অপ্‌/জল (প্রাণ) এবং অন্ন (মন) হয়ে সবাইকে নির্মাণ করেছেন; তেজ (বাক্‌), জল/অপ্‌ (প্রাণ) এবং অন্ন (মন),—এই তিনের সমাসে সবাই রচিত । এই তিনজন হলেন প্রধান দেবত্রয় । এই তিন দেবতার তিনিটি রূপ : তেজ হলেন 'লোহিত', জল হলেন 'শুক্ল', এবং অন্ন হলেন 'কৃষ্ণ'। সা ত্রায়তে ত্রয়ী রূপেণ  — তিনটি রূপের দ্বারা এই আত্মশক্তি 'গর্ভ' থেকে ত্রাণ করেন, পুরুষকে রেত থেকে মূর্ত্ত করেন; এই জন্য এঁর নাম 'স্ত্রী' । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ ষষ্ঠ অধ্যায়, তৃতীয় খণ্ড দ্রষ্টব্য।)
যখন এই বীজ বা রেত, স্ত্রীতে গমন করে, তখন অব্যক্ত বা গর্ভাবস্থা থেকে তার মূর্ত্ত হওয়া আরম্ভ হয়; এই জন্য মাতৃ জঠরে যখন রেত প্রতিষ্ঠিত হয়, সেইটি জীবের প্রথম জন্ম । 

ৎ এতৎ রেতঃ তৎ এতৎ সর্ব্বেভ্যো অঙ্গেভ্যঃ তেজঃ সম্ভূতম্‌  —যা এই রেত তা এই সকল অঙ্গ থেকে ) সম্ভূত তেজ ।
ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়, তৃতীয় খণ্ডে উক্ত হয়েছে, সর্ব্ব ভূতের-ই, তিনপ্রকার বীজাবস্থা রয়েছে —অণ্ডজ, জীবজ, উদ্ভিজ্জ । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৬।৩।১  দ্রষ্টব্য । ) 
এই যে প্রথম অবস্থা (অণ্ডজ) , তা তেজের অন্তর্গত । 'অম্‌' অর্থে 'তেজ'। অণ্ডজ = অম্‌ +ড+জ। অম্‌ (তেজ) অনুসারে (ড) জাত (জ) যে অবস্থা, তা অণ্ডজ । (একটা বিষয় অনুধাবন করতে হবে যে এখানে নিখিল ভূত সকলের, বা সত্তা সকলের সৃষ্টির কথা হচ্ছে; এখানে 'অণ্ডজ' অর্থে মাত্র  'পক্ষী শাবক' নয় । ) 
সেই তেজ, আত্ম-তেজ, পুরুষের থেকেই নিঃসৃত । অম্‌ বা তেজের গতি বা প্রবাহের নাম 'অঙ্গ'। এই জন্য বলে হয়েছে —যা এই রেত তা এই সকল অঙ্গ থেকে ) সম্ভূত তেজ । 

২।১।২।
তৎ স্ত্রিয়া আত্মভূয়ং গচ্ছতি যথা স্বমঙ্গম্‌ তথা । তস্মাদেনাং ন হিনস্তি  সাস্যৈতমাত্মানমত্র গতং ভাবয়তি ।। 

২।১।২-১। অন্বয়।
তৎ (তা-সেই রেত) স্ত্রিয়া (স্ত্রীর দ্বারা—আত্মশক্তির দ্বারা) আত্মভূয়ং (আত্মভূয় অবস্থায় —নিজেরই সত্তা, এই অবস্থায়) গচ্ছতি (গমন করে), যথা (যেমন) স্বম্‌ (নিজের) অঙ্গম্‌ (অঙ্গ ) তথা (সেই রকম) । তস্মাৎ ( সেই জন্য ) এনাং (একে—এই স্ত্রীকে) ন হিনস্তি (হিংসা করে না) । সা (সে —সেই স্ত্রী) অস্য (এর —এই পুরুষের) এতম্‌ (এই) আত্মানম্‌ (আত্মাকে—রেত বাহিত বীজ বা শুক্রকে, বা পুরুষের প্রতিরূপকে) অত্র গতং (এইখানে গত—স্ত্রীতে গত, জঠরস্থ) ভাবয়তি (ভাবনা করেন, গঠন করেন, রূপায়িত করেন) । 

২।১।২-২। অর্থ । 
সেই রেত, স্ত্রীর দ্বারা (আত্মশক্তির দ্বারা) আত্মভূয় অবস্থায় (নিজেতেই ভূত হচ্ছে বা সৃষ্ট হচ্ছে, ঐ স্ত্রীর-ই সত্তার সাথে এক হয়ে সৃষ্ট হচ্ছে—এই অবস্থায়) গমন করে,— যেমন নিজের অঙ্গ সেই রকম । সেই জন্য একে (এই স্ত্রীকে) হিংসা করে না (এই রেত হিংসিত হয় না, আহত বা হত হয় না ) । সেই স্ত্রী, এর (এই পুরুষের) এই আত্মাকে (রেত বাহিত বীজকে, বা শুক্রকে, বা পুরুষের প্রতিরূপকে) এইখানে গত-কে (এই স্ত্রীতে গত শুক্রকে বা জঠরস্থ ভ্রুণকে ) গঠন করেন (ভাবনা করেন বা রূপায়িত করেন) ।

২।১।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা স্বয়ংশক্তিময় এবং স্বয়ং-উৎপন্ন; যেখানে যা কিছু সৃষ্টি হচ্ছে, তা এই আত্মা নিজেই নিজের দ্বারা নিজেকে জাত করছেন এবং নিজেই তদ্রূপ-সকল হয়ে উৎপন্ন হচ্ছেন। ইনি যা জানেন তাই হন ।চেতনার ধর্ম্ম-ই হল, জানা এবং হওয়া; আর সকল জানা বা বোধক্রিয়ার মূলে থাকে অপরিণামী আত্মবোধ বা নিজবোধ । 
এই যে বিজ্ঞান, তা একটি সন্তান যখন পিতা-মাতার মিলনে জন্মায়, তার মূলেও আছে; উপরে যে মন্ত্রের অর্থ বর্ণিত হয়েছে, তাতে এইটি স্পষ্ট । 
প্রথম যখন পিতাতে গর্ভ হল, তা অণ্ডজ বা তেজোময় অবস্থা; একথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি । তারপর যখন সে মাতৃ জঠরে গেল, তা 'জীবজ' বা অপোময় অবস্থা । আর যখন সে ভূমিষ্ঠ হয়, পৃথিবীর অধিকারে আসে, সেইটি 'উদ্ভিজ্জ' অবস্থা— অব্যক্তকে উদভিন্ন করে, স্বতন্ত্র হয়ে মূর্ত্ত হওয়া । এই তিন অবস্থা—যা তেজোময়, অপোময়, এবং অন্নময় বা বাঙ্‌ময়, প্রাণময়, এবং মনোময়, তাকেই ছান্দোগ্য উপনিষদের ৬।৩।১ এবং পরবর্ত্তী মন্ত্র সকলে উক্ত হয়েছে ।

এই মাতৃ-স্বরূপা আত্মশক্তির জ্ঞান বা বোধক্রিয়ার দ্বারা, বা তিনি যে ভাবে ভাবময় বা তপস্যাময় হন জাতকের প্রতি—তার দ্বারা, সেই ভাবেই তার সকল কিছু মাতৃ জঠরে গঠিত হয় । 

স্বামী ।
এই যে আত্মশক্তি, এঁর প্রভাবে পুরুষ থেকে সিঞ্চিত রেত, স্ত্রীতে আত্মগত হয় (আত্মভূয় হয়) । কি ভাবে ? —যথা স্বম্‌ অঙ্গম্‌ তথা— যেমন নিজের অঙ্গ সেই রকম । এই জন্য এই রেত স্ত্রীতে প্রবেশ করলেও, সেই স্ত্রীর কোনও ক্ষতি হয় না । 'স্বম্‌ অঙ্গম্‌' (নিজের-ই অঙ্গ) এই জন্য এই পুরুষের নাম হয় 'স্বামী' ।
    
২।১।৩।
সা ভাবয়িত্রী ভাবয়িতব্যা ভবতি তং স্ত্রী গর্ভং বিভর্ত্তি  সো'গ্র এব কুমারং জন্মনো'গ্রেধি'ভাবয়তি । স যৎ কুমারং জন্মনো'গ্রেধি'ভাবয়ত্যাত্মানমেব তদ্ভাবয়ত্যেষাং লোকানাং সন্তত্যা এবং সন্ততা হীমে লোকাস্তদস্য দ্বিতীয়ং জন্ম।। 

২।১।৩-১। অন্বয়। 
সা (সেই) ভাবয়িত্রী (ভাবনাকারিণী) ভাবয়িতব্যা (ভাবনার বিষয়, প্রতিপালনীয়া) ভবতি (হন) । তং (তাকে) স্ত্রী (স্ত্রী) গর্ভং ( গর্ভে ) বিভর্ত্তি (ভরণ করে) । সঃ (তিনি—সেই পুরুষ) অগ্র এব (অগ্রেই) কুমারং জন্মনঃ (কুমারের জন্মের) অগ্রে (অগ্রে) অধি (পরে) ভাবয়তি (ভাবনা করেন; গঠন করেন) । সঃ (তিনি) যৎ (যখন) কুমারং জন্মনঃ (কুমারের জন্মের) অগ্রে (অগ্রে) অধি (পরে) ভাবয়তি (ভাবনা করেন; গঠন করেন)  আত্মানম্‌ এব (নিজেকেই) তৎ (সে ) ভাবয়তি (ভাবনা করেন; গঠন করেন)  এষাং (এই) লোকানাং (লোক সকলের) সন্তত্যা (প্রসারণের জন্য) এবং সন্ততা হি (এই ভাবেই প্রসারিত হয়) ইমে লোকাঃ (এই লোক সকল) । তৎ (তা-এই কুমারের মাতৃ গর্ভ থেকে জন্ম) অস্য (পুরুষের) দ্বিতীয়ং (দ্বিতীয়) জন্ম (জন্ম) । 

২।১।৩-২। অর্থ। 
সেই গঠণকারিণী (ভাবনাকারিণী) নিজেই ভাবনার বা পালনের বিষয় হন — আত্মস্বরূপ আত্মশক্তি নিজেকেই নিজে পালন করেন । তাকে স্ত্রী গর্ভে ভরণ করেন । সেই (পুরুষ) অগ্রেই (পূর্ব্বেই) কুমারের জন্মের অগ্রে  (এবং) পরে (যা কিছু হবে তা) ভাবনা করেন (গঠন করেন) । তিনি যখন কুমারের জন্মের অগ্রে এবং পরে (যা কিছু হবে তা) ভাবনা করেন (গঠন করেন), তা তিনি নিজেকেই  ভাবনা করেন (গঠন করেন)— এই লোক সকলের প্রসারণের জন্য (সন্ততির জন্য), এবং এই ভাবেই প্রসারিত হয় (সন্ততিত হয়) এই লোক সকল । তা (এই কুমারের মাতৃ গর্ভ থেকে জন্ম) পুরুষের দ্বিতীয় জন্ম ।

২।১।৩-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
আত্মা বা পুরুষ নিজেই নিজের শক্তি । ইনি নিজেই নিজেকে পালন বা গঠন করেন; তাই ইনি নিজেই পালন-কর্ত্তী (ভাবয়ত্রী) এবং পালনীয়া (ভাবয়িতব্যা) । 'ভাবয়তি' , 'ভাবয়ত্রী', 'ভাবয়িতব্যা' —এই শব্দগুলি যে উক্ত হয়েছে, তা 'ভূ' ধাতু সম্পন্ন। ভূ অর্থে 'হওয়া', 'গঠন করা', 'সৃজন করা', 'সৃজিত করা'  ইত্যাদি। যা কিছু 'হয়', তা ঐ আত্মাতেই বা চেতনাতেই হয় । চেতনায় 'হওয়া' মানেই 'জানা'। আমরা জানছি বা অনুভব করছি মানে, —তাই হচ্ছি; যা বোধ করছি, নিজেতে বা অন্তরে তাই হচ্ছি । এই জন্য যে, যে রকম জ্ঞান বা অনুভূতি সকলের দ্বারা পরিচালিত হয়, তার পরিণতি এবং ভবিষ্যৎ সেইরকম হয়। এই জ্ঞান বা বোধক্রিয়ার  নাম 'ভাবনা' । এই ভাবনার 'ভা'-ই জ্যোতি, যে জ্যোতির দ্বারা  'রূপ' বা চেহারা নির্ম্মিত হয় । আত্মা এবং আত্মশক্তি একই জ্ঞানস্বরূপ চেতনা । এই  আত্মা, যিনি একান্ত শান্ত, অপরিণামী, তিনিই নিজেতে  নিজেকে পরিণমিত করেন,  আয়তনময় হন, নিজেই কাল হয়ে নিজের থেকে জাত অনন্ত অনন্ত সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, আবার  শান্ত, অপরিণামী, নিজমাত্র স্বরূপ হয়ে বিরাজ করছেন। উপনিষদে এই অপরিণামী, অদ্বৈত স্বরূপকে 'আত্মা, এবং তাঁর সক্রিয় পরিবর্ত্তন-সক্ষম,  নিয়ন্ত্রণকারী স্বরূপকে 'শক্তি' ('বাক্‌') বলা হয়েছে। আত্মার ক্ষেত্রে 'স/সঃ' এই পুংলিঙ্গাত্মক সর্ব্বনাম, এবং শক্তির ক্ষেত্রে স্ত্রীলিঙ্গাত্মক সর্ব্বনাম 'সা'  ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু আত্মা এবং শক্তি অভিন্ন, এইজন্য উপনিষদে অনেক সময়ে, পুংলিঙ্গাত্মক নামের  উদ্দেশ্যে 'সা' সর্ব্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে । 
যেমন : (১) পুরুষান্ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরা গতি—পুরুষের থেকে অন্য কিছুই পর (শ্রেষ্ঠ) নয় । তিনি পরাকাষ্ঠা, তিনি পরম-গতি। (কঠোপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।৩।১১ থেকে উদ্ধৃত ।) 
এখানে 'পুরুষ' এই নাম বা শব্দের উদেশ্যে স্ত্রীলিঙ্গাত্মক  'সা' সর্ব্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে ।  
সুতরাং যখন আদিতে পুরুষে গর্ভ হয়, তা এই আত্মা বা আত্মশক্তির দ্বারা, বা এঁর জানা/বোধক্রিয়ার দ্বারাই হয়; যখন সেই গর্ভস্থ বীজ বা রেত স্ত্রীতে সিঞ্চিত হয়, তাও আত্মা বা আত্মশক্তির দ্বারা হয়, এবং এই আত্মা নিজেই নিজেকে নিজেতে সিঞ্চন করেন । ইনি স্ত্রীর গর্ভে যে পালিত হন, তাও আত্মা বা আত্মশক্তির দ্বারা; সেই স্ত্রী, আত্মা বা আত্মশক্তি-ই । এই আত্মশক্তির দ্বারাই ইনি (আত্মা) জীবরূপে ভূমিষ্ঠ হন, যা এঁর দ্বিতীয় জন্ম ।  আত্মশক্তি মানে আত্মার জ্ঞানশক্তি বা 'স্বাধীন ভাবে জানা, বোধ করার সক্ষমতা' । 
এই যে আত্মবিস্তার, পুরুষ থেকে স্ত্রীতে, স্ত্রীর থেকে ধরিত্রীতে, এর নাম 'সন্ততিত' হওয়া, তনয় বা তনয়াকে জাত করা। সন্তান, বা তনয়/তনয়া শব্দগুলি তন্‌ ধাতু থেকে হয়েছে । তন্‌ ধাতুর অর্থ 'বিস্তৃত হওয়া', তনু প্রকাশ করা । যিনি অতনু, তাঁর আত্মতনুর বিস্তারই এই জীব সমূহ, লোক সমূহ । আপন আনন্দে  ইনি সন্ততিত হচ্ছেন, এই প্রসারণের মধ্যে জন্ম এবং মরণ, দুইই আছে, এবং তা পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলে হয়েছে । 
এই আত্মায়, সকল ক্রম অক্রমে ধরা থাকে; তাই 'কুমারের' জন্মের আগে এবং জন্মের পরে যা কিছু ঘটবে, তার ভাবনা, তার নির্ম্মাণ, তা অগ্রেই হয়ে থাকে । 

কুমার
কুমার অর্থে যে 'কু' কে মারে বা ধ্বংস করে (কু মারয়তি) । আমরা যে প্রতি মুহূর্ত্তে প্রাণময়, চিন্ময়, প্রকাশময়,— এর অর্থ আমরা বাঙ্‌ময়, আমরা 'কথা বলছি'। যেমন আগুন থেকে স্ফুলিঙ্গ স্ফুরিত হয়, সেই রকম আমরা শব্দ বা বাক্যের আকারে অনবরত আমাদের অন্তরে বা অন্তরাকাশে স্ফুরিত হচ্ছি । কিন্তু এই স্ফুরণ মৃত্যু বা পাপের দ্বারা মলিন, কেননা আমরা মিথ্যা বা অনৃতকে দর্শন করছি । আমার দেখছি না যে, যে প্রাণ অন্তহীন, মৃত্যুর পরপারে, সেই প্রাণ-ই আমাদের মধ্যে ক্রিয়াময়, নর্ত্তন করছেন। প্রাণের বা বাকের নাচনকে না দেখা ,—নৃত্যকে না দেখা হল অ-নৃত (অনৃত) দর্শন । এই পাপগ্রস্ত, অনৃত-বোধের দ্বারা আচ্ছন্ন বাক্‌ প্রকাশই 'কু'। সত্যকে, বা যিনি আমাদের মূল, তাঁকে  দেখা যচ্ছে না; তাই কুতঃ (কোথা হতে), কুত্র (কোথায়), এই শব্দ দুইটি 'কু' শব্দ থেকে উৎপন্ন । নিজেরই প্রতিরূপ, বা নিজেই,—আত্মা বা নিজবোধ স্বরূপই প্রকাশ পাচ্ছেন প্রতি বোধে, প্রতি কর্ম্মে । তাই সন্তান পিতার প্রতিরূপ বা আত্মপ্রকাশ বলে, তার নাম 'কুমার' । এই জন্য কুমার বা কুমারীকে পুত্র বা পুত্রী বলা হয়। পুত্র বা পুত্রী শব্দের অর্থ, —যে পুনরাবর্ত্তন থেকে ত্রাণ করে । আত্মা বা যিনি নিজবোধ স্বরূপ, তিনি সর্ব্বরূপে জাত হচ্ছেন, এই দর্শনে দ্বিতীয় বোধ বা মৃত্যু দূর হয়, এবং বাধ্যতামূলক যে পুনঃপুনঃ জন্ম-মৃত্যুর আবর্ত্তন, তার থেকে অব্যহতি পাওয়া যায় । এই আত্মবিস্তার-ই সন্ততিত হওয়া । 
এই যে পুরুষ ইনি পূর্ব্বেই সকল পাপকে দগ্ধ করেছিলেন,—এ কথা আমরা, অনুচ্ছেদ ১।২।৩-৩ এ উল্লেখ করেছি ।  তাই এই পুরুষই কুমার। 

২।১।৪। 
সো'স্যায়মাত্মা পূণেভ্যঃ কর্ম্মভ্যঃ প্রতিধীয়তে । অথাস্যায়মিতর আত্মা কৃতকৃত্যো বয়োগতঃ প্রৈতি । স ইতঃ প্রয়ন্নেব পুনর্জ্জায়তে তদস্য তৃতীয়ং জন্ম।।

২।১।৪-১। অন্বয় ।
সঃ (সে) অস্য (এঁর—এই পুরুষের) অয়ম্‌ আত্মা (এই আত্মা—যে কুমার হয়ে জাত হল) পূণেভ্যঃ কর্ম্মেভ্য প্রতিধীয়তে (পূণ্য কর্ম্মের প্রতি ধ্যানময় বা কামময় হয়)। অথ (আর) অস্য (এঁর—এই পুরুষের) অয়ম্‌ (এই) ইতর আত্মা (ইতর= ভিন্ন;  ইতর=ই+তরতি = ইদম্‌ তরতি= ইহলোক থেকে পার হয়ে পরলোকে যায়) কৃতকৃত্যো (কৃত্যো = যা করণীয়; কৃত =সম্পন্ন, কৃতকৃত্যো—যা করণীয় তা সম্পন্ন করে)  বয়োগত (বয়ো-গত— বয়স বা আয়ু গত হলে বা সম্পূর্ণ হলে) প্রৈতি (প্রয়াণ করেন )  । স (তিনি) ইতঃ (এখান থেকে; ইহলোক থেকে) প্রয়ন্ (প্রয়াণ করে) এব (এই ভাবে—পূর্ব্বোক্ত যে জন্মক্রম উক্ত হয়েছে তদনুসারে)  পুনঃ জায়তে (পুনরায় জাত হন) । তদ্‌  (তাহা-ই) অস্য (এঁর তৃতীয়ং জন্ম (তৃতীয় জন্ম) । 

২।১।8-২।অর্থ । 
এঁর—এই পুরুষের এই আত্মা—যে কুমার হয়ে জাত হল, সে কর্ম্মের প্রতি ধ্যানময় বা কামময় হয়; আর এঁর (এই পুরুষের) এই ইতর আত্মা, অন্য যে আত্মা বা স্বরূপ (যিনি ইহলোক থেকে পার হয়ে পরলোকে চলেছেন ) (তিনি) কৃতকৃত্য হয়ে (সকল কর্ত্তব্য সমাপন করে) (অর্থাৎ) বয়োগত হলে ( বয়স বা আয়ু গত হলে বা সম্পূর্ন হলে) প্রয়াণ করেন । তিনি এখান থেকে (ইহলোক থেকে) প্রয়াণ করে, এই ভাবেই—পূর্ব্বোক্ত যে জন্মক্রম উক্ত হয়েছে তদনুসারেই পুনরায় জাত হন । তাহা-ই এঁর তৃতীয় জন্ম । 

২।১।8-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
পিতার সাথে (আত্মার সাথে) একীভূত অবস্থা থেকে মাতৃ গর্ভে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বা আত্মশক্তির মাত্রার দ্বারা পালিত হওয়া, অর্থাৎ মাতৃকার অধিকারে যাওয়া হল 'প্রথম জন্ম'। প্রাণ-ই প্রথম, সর্ব্বাগ্রে । তাই প্রাণ 'অবিজ্ঞাত'। আমরা আগে বলেছি : যৎ কিঞ্চ অবিজজ্ঞাতম্‌ প্রাণস্য তদ্‌ রূপম্‌  (যা কিছু অবিজ্ঞাত তা প্রাণেরই রূপ)। প্রাণঃ এনম্‌ তৎ ভূত্বা অবতি ভূত্বা অবতি (প্রাণ-ই এই হয়ে (সেই রূপ হয়ে) একে (এই সৃষ্টিকে) পালন করেন ) । (বৃহদারণ্যক উপনিষদ মন্ত্র ১।৫।৯। দ্রষ্টব্য ।) এই আত্মা, মাত্রা শক্তির দ্বারাই অব্যক্তকে ব্যক্ত করেন।
তারপর, কুমার মাতৃ গর্ভ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে, সন্ততিত হতে থাকেন। এই আত্মাই তনু বিস্তার করেন । এইটি দ্বিতীয় জন্ম—বহুরূপে সন্ততিত হওয়া, নিজেকে বহুরূপে অনুভব করা । প্রতি কর্ম্মে, প্রতি বোধে আমরা সন্ততিত হচ্ছি, নিজেতে নিজে তদাকারে জাত হয়ে তাকে বোধ করছি—নিজের থেকে, আত্মত্ব থেকে দ্বিতীয় হয়ে জন্মাচ্ছি । এই বোধক্রিয়া সর্ব্বদা আমাদের অনুভূতির জগতে চলেছে ।
প্রতি বোধ বা অনুভূতি অনুভূত হবার পর, তা যেখান থকে ফুটেছিল, সেখানেই ফিরে যায়। যেখানে ফেরে, সেই 'নিজবোধ' আত্মা যেমন, তেমন-ই থাকেন, নিজমাত্র স্বরূপ । একটি অবস্থা বা একটি অনুভূতি থেকে ত্রাণ পেয়ে আমরা বিদ্যুৎ গতিতে পরবর্ত্তী অনুভূতিতে যাচ্ছি । প্রতি অনুভূতির ভোক্তা একটি স্বতন্ত্র পুরুষ, মূলে একই 'নিজবোধ' । প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র ভোক্তা পুরুষ (অনুভোক্তা আত্মা) নিজেতে— মূলেতে ফিরে চলেছে,—এইটি ফিরে যাওয়া বা প্রয়াণ ।
আবার, সামগ্রিক ভাবে, আমরা জীবনের শেষে, এই আত্মায় ফিরে যাই। আত্মস্বরূপ প্রাণ, আমাদেরকে নিয়ে উৎক্রমণ করেন এবং নানা অবস্থার মধ্যদিয়ে আমরা পিতৃলোক যাই, সেখান থেকে চন্দ্রমায় গতি হয়। সেই চন্দ্রের অধিকারে কর্ম্মানুসারে বসবাস করে, পুনরায় যে পথ (পিতৃযান) দিয়ে এসেছিলাম সেই পথ দিয়ে ফিরে এসে পিতায় প্রবেশ করে পুনরায় জন্মাই । সাধারণতঃ, শস্য, ফলমূল ইত্যাদিই খাদ্যের মধ্য দিয়ে, বা অন্নকে অবলম্বন করে, যে যে-রকম, সে সেই রকম পুরুষে বা পিতায় প্রবেশ করেন। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌,পঞ্চম অধ্যায়, দশম খণ্ড দ্রষ্টব্য ।) এই পুনর্জন্ম এবং প্রয়াণ বাধ্যতামূলক, এবং এইটি পিতৃযানের বৈশিষ্ট ।
যাঁরা আত্মজ্ঞ, যাঁরা আত্মাকে এবং আত্মার ব্রহ্মত্বকে বিদিত হয়েছেন, তাঁরা প্রয়াণের পর, চন্দ্রমার থেকে মর্ত্তে বাধ্যতামূলক ভাবে প্রত্যাবর্ত্তন করেন না । তাঁরা চন্দ্রমার থেকে ঊর্ধ্বতন লোক সকলে গমন করেন, এবং তাঁদের প্রত্যাবর্ত্তন তাঁদের ইচ্ছাধীন । এইটি দেবযানের বৈশিষ্ট । (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ পঞ্চম অধ্যায়, দশম খণ্ড দ্রষ্টব্য, বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ষষ্ঠ অধ্যায়, দ্বিতীয় খণ্ড দ্রষ্টব্য ।) যিনি আত্মজ্ঞ, ব্রহ্মজ্ঞ, তিনি তাঁর বার্দ্ধক্যকে নিজের বা মহাপ্রাণের বর্ধন (বৃদ্ধি) বলেই দর্শন করেন । এই বর্ধন-ই সন্ততিত হওয়া এবং এই বর্ধনের অন্তে যা হয়, তাই তৃতীয় জন্ম । তিনি যদি প্রত্যাবর্ত্তনও করেন, তিনি দেখেন যে তিনি নবীন হয়ে ফিরেছেন । এইটি নব-বর্ষ, নিত্য নবীনতায় আবর্ত্তন । এই রকম যে জন্ম যা মৃত্যু-তীর্ণ, মৃত্যু-উত্তীর্ণ, তা তৃতীয় জন্ম । তৃতীয় হল তৃ>ত্রি>ত্র>ত্রাণ শব্দাত্মক ।

২।১।৫।
তদুক্তমৃষিণা ।
গর্ভে নু সন্নন্বেষামবেদমহং দেবানাং জনিমানি বিশ্বাঃ।
শতং মা পুর আয়সীররক্ষন্নধঃ শ্যেনো জবসা নিরদীয়মিতি ।
গর্ভে এবৈতচ্ছয়ানো বামদেব এবমুবাচ ।।

২।১।৫-১। অন্বয়।
তৎ (ইহা) উক্তম (উক্ত হয়েছে) ঋষিণা (ঋষির দ্বারা)— গর্ভে নু সন্ (গর্ভে অবস্থান কালেই) অনু (যথাযথ ভাবে) এষাম্‌ (এই সকল) অবেদম্‌ (জেনেছিলাম) অহং (আমি) দেবানাম্‌ জনিমানি (দেবগণের জন্মসকল) বিশ্বাঃ (বিশ্বানি—নিখিল) ।
শতং (শত সংখ্যক) মা (আমাকে) পুরঃ (পুরী সকলে) আয়সীঃ (লৌহময়) অররক্ষন্‌ (রক্ষিত করা হয়েছিল—অবরোধ করা হয়েছিল)
অধঃ (অধে) শ্যেনো (শ্যেনের ন্যায়) জবসা (বেগের সাথে) নিরদীয়ম্‌ (উড়ে গিয়েছি) ইতি।
গর্ভে এব এতচ্ছয়ান বামদেবো এবমুবাচ—এতৎ (এই ) গর্ভে এব শয়ান (গর্ভে শায়িত থেকেই) বামদেবঃ (বামদেব) এবম্‌ (এই ভাবে) উবাচ (বলেছিলেন) ।

২।১।৫-২। অর্থ।
ঋষির দ্বারা ইহা উক্ত হয়েছে — "গর্ভে অবস্থান কালেই আমি এই সকল নিখিল দেবগণের জন্মসকল যথাযথ ভাবে জেনেছিলাম ।
আমাকে, অধে (নীচে), শত লৌহময় পুরীতে রক্ষিত (অবরোধ) করা হয়েছিল ।
শ্যেনের ন্যায় বেগের সাথে উড়ে গিয়েছি (মুক্ত হয়েছি)।" গর্ভে শায়িত থেকেই বামদেব এইভাবে বলেছিলেন ।

২।১।৫-৩-১। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।

"শতং (শত সংখ্যক) মা (আমাকে) পুরঃ (পুরী সকলে) আয়সীঃ (লৌহময়) অররক্ষন্‌ অধঃ (রক্ষিত করা হয়েছিল—অবরোধ করা হয়েছিল) : "আমাকে, অধে (নীচে), শত লৌহময় পুরীতে রক্ষিত (অবরোধ) করা হয়েছিল।"
'অধ' অর্থে, 'অয়ম্‌ ধারয়তি' ,—এই যিনি ধারণ করেছেন । আমরা আগে বলেছি যে, চিন্ময় আত্মা বা প্রাণ, অপান রূপে আমাদেরকে এই ভৌতিকতায় ধারণ করেছেন, এবং যুগপৎ প্রাণ রূপে আমাদেরকে দ্যুলোকে, বা মৃত্যুর ঊর্ধ্বে ধারণ করেছেন । আমরা মর্ত্তাভিলাষী বলে নিজেদের মরণশীল স্থিতিকেই ভোগ করছি । এই মর্ত্তাধীন অবস্থার উদেশ্যে বলা হয়েছে যে,— " আমাকে, অধে, শত লৌহময় পুরীতে রক্ষিত (অবরোধ) করা হয়েছিল।"
এই মন্ত্রে, 'আয়সীঃ' শব্দটি 'আয়সী' শব্দের দ্বিতীয়া বিভক্তির বহুবচন, এবং মূল শব্দ হল 'অয়স্‌'। যা আয়াস-সাধ্য বা কঠিন, তা 'আয়সী' বা 'লৌহময়', লোহার মত কঠিন। ভৌতিকতার বেষ্টন, বা দেহাত্ম-বোধকে (নিজকে শরীরের সাথে এক মনে করাকে) এবং স্থূল বিশ্বের দ্বারা অভিভূত অবস্থাকে, ভৌতিক শরীরী অবস্থাকে, লৌহময় পুর-সকল বলা হয়েছে। বারবার জন্ম-মৃত্যুর আবর্ত্তে, এই লৌহময় পুরীতে (কংসের কারাগারে) আমরা অবরুদ্ধ হচ্ছি; আমাদের সব কিছু সীমিত, ক্ষয়িষ্ণু, এবং আমরা অভাবের দ্বারা তাড়িত। এই বদ্ধতাকে, অর্থাৎ লৌহময় (আয়সী) কারাগারের অবরোধকে বিদীর্ণ করা আয়াস-সাধ্য। যে দেবশক্তির মধ্য দিয়ে আমরা জাত হয়েছি—সেই দেবকী, এবং যে দেবশক্তির দ্বারা আমরা বস-বাস করি— সেই বসু-দেবগণের প্রতীক বাসুদেব, ততক্ষণ কংসের কারাগারে বন্দী থাকেন, যতক্ষণ না এই আত্মজ্ঞানের বা পরম আকর্ষণময় পুরুষের, অর্থাৎ কৃষ্ণের আবির্ভাব হয় ।
এই যে প্রাণ এবং অপান, এই উভয়কেই যিনি দেখছেন, তিনি মহর্ষি বামদেব । যা কিছু অপানের আধিকারে আসছে, যা কিছু পৃথিবীতে, বা ভৌতিক বিশ্বে আমার পাচ্ছি বা ভোগ করছি, তা ঐ দ্যুলোক বা প্রাণ থেকেই আসছে, যিনি অন্তহীন। আমরা এইটি জানিনা । যিনি জানেন, তিনি বামদেব, বা তিনি আত্মার বামদেবত্ব দর্শন করেছেন । 'আবাম্‌' অর্থে 'আমরা দুইজন ', তাই বামদেব অর্থে যিনি দ্যুঃ এবং ভূ, প্রাণ এবং অপান এই উভয়ই । যখন স্বর্গ এবং মর্ত্ত একসা হয়, তখন যা বাম বা অতি-সুন্দর তা প্রকাশ পায়। 'বাম' শব্দের একটি অর্থ , 'যা শোভন, যা সুন্দর '। এই প্রসঙ্গে, কঠোপনিষদের একটি মন্ত্র উদ্ধৃত করলাম :
ঊর্ধ্বম্‌ প্রাণমুন্নয়ত্যপানম্‌ প্রত্যগস্যতি ।
মধ্যে বামনমাসীনম্ বিশ্বে দেবা উপাসতে ।। (কঠোপনিষদ্‌, ৫ম বল্লী, ২য় মন্ত্র / কঠোপনিষদ্‌ মন্ত্র ২।২।৩।)

অর্থ : (এই আত্মা) ঊর্ধ্বে প্রাণকে উন্নয়ন করেন (ঊর্ধ্বে নিয়ে চলেন -উৎ নয়তি), অপানকে প্রত্যক্‌ (বা অধঃ) দিকে ক্ষেপণ করেন । মধ্যে বামন আসীন (মধ্যে বামনরূপে আসীন ); সকল দেবতারা উপাসনা করেন ।
এই বামদেব-রূপ আত্মাকে যিনি দেখেন, তিনি ঋষি (দ্রষ্টা) বামদেব। তিনি শ্যেন পক্ষীর ন্যায় এই মর্ত্ত বন্ধনকে নিরাকৃত করে ঊর্ধ্বে উৎক্রমণ করেন ।

শ্যেন ।
'শি' অর্থে 'প্রেরণ করা', ' আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা । শিরোদেশ, বা দ্যুলোক, বা প্রাণ থেকে, আমাদের নিয়ন্ত্রণ এবং ভোগের জন্য যে অনুভূতি সকল, এবং নিয়ন্ত্রণমূলক অনুশাসন প্রেরিত হচ্ছে, তা 'শি'।'আশীর্ব্বাদ' কথাটি 'শি' ধাতু থেকে হয়েছে । শ্যেন অর্থে 'শি+ এনম্‌' — 'এনম্‌' অর্থে 'এইটি'। দ্যু (স্বর্গ) থেকে, অর্থাৎ চেতনার স্বাধীন, অন্তহীন স্বরূপ থেকে তীব্র গতিতে যে বেদন সকল আসছে, এইটি 'শ্যেন' বাহিত; প্রাণের বা অনের 'শি' নামক ক্রিয়া বা শ্যেন-ক্রিয়া । বামদেব-রূপ আত্মাকে দর্শন করে, ঋষি বামদেব শ্যেন গতিতেই দ্যুলোকে গিয়েছিলেন।

গর্ভ, মাতা এবং পিতা ।
গর্ভে (গর্ভে অবস্থান কালেই) অনু (যথাযথ ভাবে) এষাম্‌ (এই সকল) অবেদম্‌ (জেনেছিলাম) অহং (আমি) দেবানাম্‌ জনিমানি (দেবগণের জন্মসকল) বিশ্বা (নিখিল)—গর্ভে অবস্থান কালেই আমি এই সকল নিখিল দেবগণের জন্মসকল যথাযথ ভাবে জেনেছিলাম ।
গর্ভে এব শয়ান (গর্ভে শায়িত থেকেই) বামদেবঃ (বামদেব) এবম্‌ (এই ভাবে) উবাচ (বলেছিলেন)— গর্ভে শায়িত থেকেই বামদেব এইভাবে বলেছিলেন
যখন প্রথম গর্ভ পিতাতে সম্ভবিত হয়, তখন সেই বীজ-রূপ জীব পিতাতে গৃহীত হয়ে একাত্ম হয় । এই জন্য পিতা হলেন গৃহপতি অগ্নি । বিরাটে বা অধিদৈবে যে সংস্কারক্ষেত্র, তার নাম পিতৃলোক । আমার যা করি, যা কর্ম্ম করি, তার থেকে সংস্কার নির্মাণ হয়; এবং সেই সংস্কারগুলি বীজাকারে, বিরাটে বা অধিদৈবে যেখানে বিধৃত থাকে, তার নাম পিতৃলোকে । এই পিতৃলোক-ই গৃহ ।

গর্ভ— গ (গচ্ছয়তি) + র (রঞ্জয়তি) + ভ (ভাতি) —মাতৃকাতে বা মাতাতে গমন করা, মাতার দ্বারা 'রঞ্জিত' হওয়া, বর্ণময় হওয়া, এবং সেই বর্ণসকলের দ্বারা 'প্রতিভাত বা রূপময় হওয়া ।
রঞ্জিত হওয়া অর্থে, আমাদের যে অজস্র জীবনের থেকে সঞ্চিত হওয়া সংস্কার-রাশি, তার যে-গুলি এই জীবনে ব্যক্ত বা ক্রিয়াশীল হবে, সেই গুলিকে উদ্বুদ্ধ করা, সেই অব্যক্ত সংস্কারগুলিকে ব্যক্ত করা; এর দ্বারা আমাদের 'বর্ণ' নির্দিষ্ট হয় ।
এই গর্ভকে রূপময় করে আকার দেন মাতা বা মাতৃশক্তি । আত্মা-ই পিতা, আত্মা-ই মাতা  যিনি মাত্রা দিয়ে, আমাদের পরিমাপ যোগ্য করেন, সুনির্দিষ্ট করেন, যাঁর মাত্রার দ্বারা আমাদের মুখ, হাত, পা, অর্থাৎ ইন্দ্রিয় সকল আকার ন্যায়, যিনি আমাদের নাম-রূপময় করে স্বতন্ত্র করেন, তিনি মাতা ।আবার আমাদের সংস্কার যে পরিবর্ত্তিত হয়, আমাদের যে অভ্যুদয় হয়, তাও এই মাতৃশক্তির দ্বারা । এই দাক্ষিণ্যময় স্বয়ংপ্রকাশ আত্মা-ই মাতা, এবং ইনি দক্ষিণাগ্নি নামে বিদিত, এঁর দ্বারা আমরা নির্ম্মিত হই, পরিবর্ত্তিত হই । (১।১।৪-৩-১১ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য ।)
তাই এই উপনিষদ্‌, এই মা-কে ভাবয়িত্রী বলে সম্বোধন করেছেন । 
যে বিশ্বমাতৃকা থেকে সর্ব্বদেবগণ, সমগ্র বিশ্ব জাত হয়েছে, মাতৃ-গর্ভস্থ বামদেব ঋষি, সেই বিশ্ব-প্রসূতা আত্মশক্তিকে জেনেছিলেন; তাই তিনি সর্ব্বদেবগণের জন্ম-রহস্য বিজ্ঞাত হয়েছিলেন ।

২।১।৬।
স এবং বিদ্বানস্মাচ্ছরীরভেদাদূর্ধ্ব উৎক্রম্যামুষ্মিন্‌ স্বর্গে লোকে সর্ব্বান্‌ কামানাপ্‌ত্বামৃতঃ সমভবৎ সমভবৎ । 

২।১।৬-১। অন্বয় ।
সঃ (সে) এবং (এই প্রকারে) বিদ্বান্‌ (বিদিত হয়ে) অস্মাৎ (এই ) শরীরভেদাৎ (শরীর ভেদ করে) ঊর্ধ্বঃ উৎক্রম্য ( ঊর্ধ্বে উৎক্রমণ করে)  অমুষ্মিন্‌ (ঐ)  স্বর্গে লোকে (স্বর্গ লোকে) সর্ব্বান্‌ কামান্‌ (সকল কাম্যকে) আপ্‌ত্বা (আপ্ত হয়ে)  অমৃতঃ (অমৃত)  সমভবৎ (হয়েছিলেন) [অমৃতঃ] সমভবৎ ( হয়েছিলেন) । 

২।১।৬-২। অর্থ ।
এই প্রকারে বিদিত হয়ে, এই শরীর ভেদ করে, ঊর্ধ্বে উৎক্রমণ করে ঐ স্বর্গ লোকে সকল কাম্যকে আপ্ত হয়ে অমৃত হয়েছিলেনঅমৃত হয়েছিলেন ।

২।১।৬-৩।  সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।

আগের মন্ত্রে বামদেব ঋষি যে স্বগতোক্তি করেছিলেন, তা বিবৃত করা হয়েছে। তার-ই পুনরাবৃত্তি এই মন্ত্রে করা হয়েছে। শরীর ভেদ করার অর্থ,—দেহাত্মবোধ থেকে মুক্ত হওয়া ।

ঊর্ধ্বঃ উৎক্রম্য — ঊর্ধ্বে উৎক্রমণ করে : যিনি ঊর্ধ্বে, তিনি প্রাণ; এ কথা আমরা আগে বলেছি । প্রাণ যখন শরীর থেকে উৎক্রমণ করেন, তখন যারা অনাত্মজ্ঞ, তারা মনে করে যে তারা যেন 'অপ্রাণ' হচ্ছে, তাই তারা মৃত্যু দর্শন করে । যিনি আত্মজ্ঞ, তিনি প্রাণের সাথে একাত্মবোধে শরীর থেকে উৎক্রমণ করেন, তাঁর উৎক্রমণের বোধ-ই হয় না । 

স্বর্গে লোকে (স্বর্গ লোকে) সর্ব্বান্‌ কামান্‌ (সকল কাম্যকে) আপ্‌ত্বা (আপ্ত হয়ে)  অমৃতঃ (অমৃত) সমভবৎ (হয়েছিলেন) — স্বর্গ লোকে) সকল কাম্যকে আপ্ত হয়ে অমৃত হয়েছিলেন :  স্বর্গ অর্থে  'সু + ঋক্‌' । ঋক্‌ অর্থে যা 'ঋ' অর্থাৎ 'গতিশীল', এবং যা 'ক' অর্থাৎ 'ব্যঞ্জনময়' বা  বর্ণময়' । এই বিশ্বের প্রতিটি সত্তার মূলে রয়েছে, ঋক্‌ সকল,—ঋক্ মন্ত্র সকল । চিন্ময় আত্মার গতিশীল বা ক্রিয়াময়, এবং ব্যঞ্জনময় বা প্রকাশাত্মক যে দৈব ব্যক্তিত্ব সকল, তাঁরা ঋক্‌ । বাইরের যে একটি বৃক্ষ দৃষ্ট হচ্ছে, তা এই ঋক্‌ এর রূপ; এই ঋক্‌টির নাম 'বৃক্ষ দেবতা' ।  যাঁরা ব্যবহারের দিকে দেবতা বলে আচরিত হন, তাঁরা আত্মবেদনের বা প্রাণের এক একটি মহিমা। এক-পৃষ্ঠে বেদ, অপর-পৃষ্ঠে দেব ।এক এক দেবতা এক এক অন্তহীন বেদনের মহিমার ব্যব্যহারময় প্রকাশ । অনাদি অনন্ত বিশ্বে, সর্ব্বকালে, যতরকম যত রকম বৃক্ষ ছিল, আছে, এবং থাকবে, তা এই বৃক্ষদেবতার-ই অংশ । স্বর্গলোকে গিয়ে সর্ব্ব কাম আপ্ত হওয়া,  বা আপ্তকাম হওয়ার অর্থ হল, এই দেবগণের সাথে এক হয়ে নিজেকে পাওয়া, নিজেকে অনন্তে অনন্তে নিজেতেই পাওয়া । 
এই জন্য বলা হয়েছে : ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্‌  যস্মিন্‌ দেবা অধিবিশ্বে নিষেদুঃ । যস্তন্ন বেদ কিমৃচা করিষ্যতি য ইত্তদ্বিুস্ত ইমে সমাসতে । (ঋক্‌ বেদ ১।১৬৪।৩৯) ।
অর্থ : অক্ষর (আত্মার যে পরম ব্যোম-রূপ (বপু), তাতে ঋক্‌ মন্ত্র সকল (স্থিত), যাতে বিশ্বের দেবতারা আসীন । যে তা না জানে, ঋক্‌ মন্ত্র সকল নিয়ে কি করবে ? যে তা জানে, অবশ্যই, এই সকল তাতে সমাসিত হয় (অক্ষর আত্মার সাথে অদ্বয় জ্ঞানের জন্য, এই ঋক্‌ এবং দেবতারা তাঁতে সমাসিত, তাঁতে প্রতিষ্ঠিত হয়) । 
 
ঐতরেয় উপনিষদ্‌,  তৃতীয় অধ্যায়, প্রথম  খণ্ড। 

৩।১।১
কো'য়মাত্মেতি বয়মুপাস্মহে  কতরঃ স আত্মা । যেন বা রূপং পশ্যতি  যেন বা শব্দং শৃণোতি যেন বা গন্ধানাজিঘ্রতি যেন বাচং ব্যাকরোতি  যেন বা স্বাদু চাস্বাদু চ বিজানাতি ।।  

৩।১।১-১ ।  অন্বয় ।
কঃ (কে) অয়ম্‌ (এই) আত্মা ( আত্মা) ইতি (এই ভাবে ) বয়ম্‌ (আমরা) উপাস্মহে (উপাসনা করি )? কতরঃ সঃ আত্মাঃ (কোনটি সেই আত্মা)—যেন (যাঁর দ্বারা) বা রূপং পশ্যতি (রূপম্‌ পশ্যতি বা —রূপকে দেখে, অথবা) যেন (যাঁর দ্বারা ) বা শব্দং শৃণোতি (শব্দং শৃণোতি বা —শব্দকে শ্রবণ করে অথবা), যেন (যাঁর দ্বারা) বা গন্ধানাজিঘ্রতি ( গন্ধান্‌ আজিঘ্রতি বা —গন্ধকে আঘ্রাণ করে অথবা) যেন (যাঁর দ্বারা) বাচং (বাক্যকে) ব্যাকরোতি (ব্যক্ত করে), যেন (যাঁর দ্বারা) স্বাদু চ অস্বাদু চ (স্বাদু এবং অস্বাদু) বিজানাতি (জানে /বোধ করে) ?

৩।১।১-২ ।  অর্থ
কে এই আত্মা, এই ভাবে আমরা (যাঁর) উপাসনা করি ? কে সেই আত্মা যাঁর দ্বারা রূপকে দেখে অথবা যাঁর দ্বারা শব্দ শ্রবণ করে অথবা           যাঁর দ্বারা গন্ধকে আঘ্রাণ করে অথবা যাঁর দ্বারা বাক্যকে ব্যক্ত করে, যাঁর দ্বারা স্বাদু এবং অস্বাদু-কে জানে (বোধ করে) ? 

৩।১।১-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
ই যে আত্মা, যাঁর থেকে সকল দেবতা, সকল জীব, সকল সত্তা, ভূত-সমূহ সৃষ্টি হয়েছে, যিনি সকল, কিছুতে অনুপ্রবিষ্ট, যিনি সকল রূপ এবং প্রতিরূপের দ্রষ্টা ইন্দ্র, ইনি আমাদের উপাস্য । ইনি কে ?
কে সেই আত্মা যাঁর দ্বারা আমরা দেখি, শুনি, আঘ্রাণ করি, আস্বাদন করি ?

এখানে আত্মাতে আসীন হতে হলে, তাঁতে প্রবিষ্ট হতে হলে, কিভাবে তাঁর    সান্নিধ্য পেতে হয়,  কি ভাবে উপাসনা, অর্থাৎ তাঁর নিকটে (উপ) আসীন   হতে হয়, সেই বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে ।  

৩।১।২
যদেতদ্ধৃদয়ং মনশ্চৈতৎ সংজ্ঞানমাজ্ঞানম্‌ বিজ্ঞানম্‌ প্রজ্ঞানম্‌ মেধা দৃষ্টির্ধৃতির্মনীষা জূতিঃ স্মৃতিঃ সঙ্কল্পঃ ক্রতুরসুঃ কামো বশ ইতি সর্বাণ্যেবৈতানি প্রজ্ঞানস্য নামধেয়ানি ভবন্তি । 

৩।১।২-১। অন্বয় ।
যৎ (যা) এতৎ (এই) হৃদয়ং মনঃ চ (হৃদয় এবং মন) এতৎ (এইটি—এই হৃদয় এবং মন-ই) সংজ্ঞানম্‌ (সম-জ্ঞান) আজ্ঞানম্‌ (আ-জ্ঞান) বিজ্ঞানম্‌ (বি-জ্ঞান) প্রজ্ঞানম্‌ (প্র-জ্ঞান) মেধাঃ (মেধা) দৃষ্টিঃ (দৃষ্টি) ধৃতিঃ (ধৃতি) মনীষা (মনীষা) জূতিঃ (জূতি) স্মৃতিঃ (স্মৃতি) সঙ্কল্পঃ (সঙ্কল্প) ক্রতুঃ (ক্রতু) অসু (অসু) কামঃ (কাম) বশঃ (বশ) ইতি সর্বাণি এব এতানি ( ইতি এতানি—এই সব; এব সর্বাণি—সকল-ই)  প্রজ্ঞানস্য (প্রজ্ঞানের) নামধেয়ানি ( নাম এবং ধেয় সমূহ—নাম এবং রূপ সকল) ভবন্তি (হয়) । 

৩।১।২-২। অর্থ ।
যা এই হৃদয় এবং মন, এইটি (এই হৃদয় এবং মন-ই) সম-জ্ঞান, আ-জ্ঞান বিজ্ঞান (বি-জ্ঞান), প্রজ্ঞান (প্র-জ্ঞান), মেধা, দৃষ্টি,  ধৃতি, মনীষা, জূতি, স্মৃতি, সঙ্কল্প, ক্রতু, অসু, কাম, বশ,—এই সব সকল-ই হল প্রজ্ঞানের নাম এবং ধেয় সমূহ (নাম এবং রূপ সকল) । 

৩।১।২-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
আমরা আমাদের বোধের বা অনুভূতির বা জ্ঞানের জগতে বেঁচে আছি । যা কিছু আমরা দেখি, শুনি, আস্বাদন করি, স্পর্শ করি, আঘ্রাণ করি, তা আমাদের বোধ বা জ্ঞানের-ই রূপ । কোন একটি রূপ দেখা মানে, সেই রূপটিকে নিজের অন্তরে জানা বা বোধ করা । জ্ঞান, বোধ বা চেতনাই সেই রূপ হন, আর তার সাথে যে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে তা হল 'আমি' বা অহং বোধ। কোন কিছু জানা মানে,— নিজে তাই হয়ে সেইটিকে জানা । এইটি চেতনা বা বোধের ধর্ম্ম । নিজে বা স্বয়ং এই বোধের উপরে, সর্ব্ব বোধ ফুটে ওঠে । মূলে নিজবোধ বা আত্মবোধ না থাকলে, অন্য কোন বোধ থাকতে পারে না । ইনি যখন-ই কোন বোধ প্রকাশ করেন, তখন-ই 'আমি দেখছি', 'আমি শুনছি' ইত্যাদি হন, এবং এইভাবেই স্বয়ং বা নিজবোধ থেকে 'অহং', বা 'আমি' অনবরত জন্মাচ্ছে ।
এই যে স্বয়ং বা নিজবোধ, ইনি সদা স্থির, নিজবোমাত্র বা স্বয়ং মাত্র, অথচ ইনি-ই সর্ব্ব বোধের আকারে নিজেকে প্রকাশ করছেন । এই যে স্থির, নিজবোধ-স্বরূপ আত্মা, এঁতেই জ্ঞান বা বোধের যতরকম রূপ বা আকার হতে পারে, সে সব নিজ বা আত্মত্বে এক হয় থাকে, কেননা তারা আত্মস্বরূপ আত্মা-ই । আর সেই আত্মস্বরূপের যে নিজের থেকে দ্বিতীয় হয়ে প্রকাশ হওয়া, তার নাম 'অনাত্ম' হওয়া, আত্মার 'অন' বা প্রাণ হওয়া। প্রাণ মানেই বহু হবার ক্ষেত্র এবং বেদন বা ভোগের ক্ষেত্র । আমরা সুখ , দুঃখ, ভালবাসা, ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা, সংযোগ, বিয়োগ, মোহ, তৃপ্তি, ইত্যাদি সব যখানে বোধ বা অনুভব করি, সেই চিন্ময়-ক্ষেত্রের নাম হৃদয় । হৃদয়েই আমরা সর্ব্বদা কামময় হয়ে রয়েছি,— শব্দ, স্পর্শাদি অনুভব করবার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি; এই উন্মুখতা, প্রাণের তেজ থেকেই সঞ্জাত হয়, এবং আমরা আমাদের বোধে বা চেতনায় নানাভাবে রূপান্তরিত হই, বা বহু হই । 'প্র' মানেই প্রাণ (প্র+অন) বা হৃদয়, যিনি প্রকাশাত্মক । প্রাণের কামনা অনুসারে মন সংকল্প' করে, এবং তদনুসারে আমরা কর্ম্মময় হই । যা প্রাণে বা হৃদয়ে সূক্ষ্ম, তা মনে সুনির্দিষ্ট আকার বা আয়তন নেয় (সুস্পষ্ট বাক্য বা নামের আকারে ফুটে ওঠে), কর্ম্মাকারে পরিণত হয়, এবং শরীরকে পরিচালনা করে, ভৌতিকতা বা বাস্তবতায় পরিণত হয় । বহিঃ এবং অন্তর, এই দুই-ও জ্ঞানের দুই মূর্ত্তি ।
পূর্ব্ববর্ত্তী মন্ত্র ৩।১।১-এ উক্ত হয়েছে —"কে সেই আত্মা যাঁর দ্বারা রূপকে দেখে অথবা যাঁর দ্বারা শব্দ শ্রবণ করে অথবা যাঁর দ্বারা গন্ধকে আঘ্রাণ করে অথবা যাঁর দ্বারা বাক্যকে ব্যক্ত করে, যাঁর দ্বারা স্বাদু এবং অস্বাদু-কে জানে (বোধ করে) ?" এর অর্থ, এই আত্মার দ্বারাই আমরা দর্শন করি, শ্রবণ করি, ইত্যাদি । জ্ঞান-ই দেখেন, জ্ঞান-ই স্পর্শ করেন, জ্ঞান-ই আস্বাদন করেন, জ্ঞান-ই শ্রবণ করেন, জ্ঞান-ই আঘ্রাণ করেন। আমরা জ্ঞান-স্বরূপ, বোধ বা চেতনা দিয়ে নির্ম্মিত, তাঁর-ই জ্ঞানমূর্ত্তি ।  

সংজ্ঞানম্‌ (সম-জ্ঞান) আজ্ঞানম্‌ (আ-জ্ঞান) বিজ্ঞানম্‌ (বি-জ্ঞান) প্রজ্ঞানম্‌ (প্র-জ্ঞান) ।
সংজ্ঞানম্‌ : সম+জ্ঞানম্ = সম জ্ঞান । জ্ঞান বা বোধ স্বরূপে আমরা যে সাম্যতায় থাকি, সেই সাম্যতা-রূপ চেতনা বা জ্ঞানের নাম সংজ্ঞান । যা কিছু আমরা বোধ বা অনুভব করছি, তার সাথে যদি সাম্য বা সমতা না হয়, তবে তা ভোগ্য হয় না; অনন্ত বৈচিত্র্যময় আমাদের ভোগক্ষেত্র, এবং আমরা প্রতিমূহুর্ত্তে পরিবর্ত্তিত হচ্ছি, কিন্তু তার মধ্যে এই প্রাণ বা বোধের দ্বারা সাম্যতা বজায় থাকে । চিন্ময় আত্মার এই সংজ্ঞান রূপ মহিমা সমান নামে প্রসিদ্ধ । উপনিষদে উক্ত হয়েছে, 'অন্তরের যে আকাশ, তাই সমান' । (প্রশ্নোপ্নিষদ্‌ মন্ত্র ৩।৫ এবং ৪।৪ দ্রষ্টব্য । )

আজ্ঞানম্‌ : আ+জ্ঞানম্‌ = আজ্ঞান > জ্ঞা । যে বেদন বা বোধ-ক্রিয়ার দ্বারা আমরা কোন এক দিকে পরিচালিত হই , তা 'আজ্ঞা'। যে ভাবে চেতনায় আজ্ঞা প্রকাশ পায়, তদনুযায়ী আমরা সঙ্কল্প করি । মনের ধর্ম্ম  হল সঙ্কল্প এবং বিকল্প করা । 
ছান্দোগ্য উপনিষদে এই 'আজ্ঞা'কে ' অনুজ্ঞা অক্ষর' বলা হয়েছে ;  বলা হয়েছে যে ওংকার-ই অনুজ্ঞা অক্ষর । সকল ক্রিয়ার মূলে আছে 'ওঁ' বা 'অনুজ্ঞা' যিনি অনুমতি দেন বা জ্ঞাপন করেন। (ছান্দোগ্য উপনিষদ্‌ মন্ত্র ১।১।৮ দ্রষ্টব্য । )

বিজ্ঞানম্‌ : বি+জ্ঞানম্‌ = বিজ্ঞান । চিন্ময় বোধ স্বরূপ আত্মা যে নিজেকে 'বি' বা বিভিন্ন করে, বিভক্ত করে, সর্ব্বদিকে যে বিস্তৃত হন, তা তাঁর বিজ্ঞানময়তা । যা কিছু আমাদের উপলব্ধিতে আসে তা এঁর বিজ্ঞানময়তা, নিজেকে তদ্‌-বিষয়ে নিজেই জানছেন ।  যেমন একটি 'ফুল' , এইটি একটি 'বিজ্ঞান', চিন্ময় আত্মস্বরূপের বিজ্ঞানময় মূর্ত্তি; এই বিজ্ঞানে, 'ফুলের বিষয়ে যা কিছু জ্ঞাতব্য তা নিহিত আছে । 

প্রজ্ঞানম্‌ :প্র+জ্ঞান = প্রজ্ঞান । প্রজ্ঞান মানেই প্রাণ। এই চিন্ময় আত্মা প্রকাশ করবার জন্য,—প্রকাশ হবার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন; তাই এই আত্মস্বরূপের একটি নাম 'চেতোমুখ'। কৌষিতকী উপনিষদে ইন্দ্রের দ্বারা উক্ত হয়েছে, "যো বৈ প্রাণঃ সা প্রজ্ঞা যা বা প্রজ্ঞা স প্রাণঃ" । (কৌষিতকি উপনিষদ্‌ মন্ত্র ৩।১৬ থেকে উদ্ধৃত ।)
যিনি জ্ঞান বা বোধাকারে অনবরত প্রকাশ পাচ্ছেন, তাঁর সেই প্রকাশের দ্বারা বা বোধক্রিয়ার দ্বারা আমরা বেঁচে আছি, প্রাণময় হয়েছি, ইন্দিয়ময় হয়েছি । এই আত্মার ক্রিয়াই প্রাণ, যে প্রাণ হৃদয়ময়, বেদনময়, যে প্রাণ সকল কিছুর দ্রষ্টা, শ্রোতা ইত্যাদি। যাঁর দর্শন, শ্রবণ ইত্যদির অনুভোক্তা আমরা । ইনিই (আত্মা বা প্রাণ-ই) জানছেন, অর্থাৎ ইনিই 'জ্ঞ', যাঁর সেই জানাই প্রজ্ঞার আকারে, সর্ব্ব অনুভূতি, সর্ব্ব বেদন হয়ে সবার মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে ।

মেধাঃ (মেধা) দৃষ্টিঃ (দৃষ্টি) ধৃতিঃ (ধৃতি) মনীষা (মনীষা) জূতিঃ (জূতি) স্মৃতিঃ (স্মৃতি) সঙ্কল্পঃ (সঙ্কল্প) ক্রতুঃ (ক্রতু) অসু (অসু) কামঃ (কাম) বশঃ (বশ)।

মেধা : মে (আমার) + ধা (ধাতা) । যা কিছু আমাদের প্রজ্ঞানে বা বোধে ফুটছে, যা কিছু আমরা অনুভব করছি, তার দ্বারা আমরা গঠিত হচ্ছি । আমাদের বুদ্ধি, সংস্কার সেই ভাবে পরিণত হচ্ছে, আমাদের প্রকৃতি গঠিত হচ্ছে । এই প্রাণই অশ্ব বা প্রাণগতি, বা ইন্দ্রিয় সকল, এবং এই প্রাণগতিতে বা এই ইন্দ্রিয় সকলের দ্বারা যা কিছু আমাদের মধ্যে আহৃত হচ্ছে, আমাদেরকে চেতায়িত করছে, তা মেধ্য, তা আমাদের উপাদান হয়ে আমাদের সত্তার সাথে মিশে আমাদের সমৃদ্ধ করছে । 

দৃষ্টি : যে বোধক্রিয়ার দ্বারা আমরা সত্য বোধময় হয়ে রয়েছি, তার নাম দৃষ্টি বা 'দেখা'। *অধ্যাত্মে সত্যবোধ প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিতে, এবং অধিদৈবে সূর্যে ।  এই যে রূপময় বিশ্ব, যা অস্তিত্ব-বোধ উদ্রেক করে, যে বোধ আমাদের সদা প্রার্থিত, তার উৎস হল তাই যা আমাদের মধ্যে চক্ষু বা চেতনার দৃষ্টি-রূপ মহিমা, এবং বহিরাকাশে যা সূর্য । এই প্রার্থিত, কাম্য, অস্তিত্ব বোধকে জাগিয়ে দেন বলে এই সূর্যের একটি বৈদিক নাম 'মিত্র' । 
(*বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ দ্বিতীয় অধ্যায়, তৃতীয় ব্রাহ্মণ দ্রষ্টব্য ।)

ধৃতি : যে জ্ঞান শক্তির দ্বারা নানা অবস্থার মধ্যেও আমাদের আত্মবিচ্যুতি ঘটে না, তাঁর নাম ধৃতি । আমরা যে জ্ঞানে বা বোধেই রয়েছি, এবং ইনিই  স্বয়ংবোধ রূপে আমাদের অবিনশ্বর আত্মা এবং নিয়ন্তা, এই বোধটি হারায় না । 

মনীষা : মন+ঈষ্‌+আ । মনের দ্বারা অন্বেষণ করার যে শক্তি, তার নাম 'মনীষা'। জ্ঞানই মনীষা । 

জূতি : জ + ঊতি (উন্নয়ন) — যে জ্ঞান শক্তি আমাদের ঊর্ধ্ব দিকে জাত করে, বা আমাদের ঊর্ধ্বে যাবার মত সক্ষমতার জন্ম দেয় ।  

স্মৃতি : এই প্রজ্ঞাতেই আমরা স্মরণ এবং বিস্মরণময় হই । যা মৃত আবার সোমময় হয়, তার নাম 'স্মৃতি' । যা ছিল অব্যক্তে, প্রজ্ঞানের অব্যক্ততায়, তাই আবার মনে পরে গেল, আবার সেই বিষয়ের যে অনুভূতি বা  সোমধারা, তা বইতে লাগল !

সঙ্কল্প : প্রজ্ঞানের বা বোধস্বরূপের যে সঙ্কল্প-বিকল্পময় ব্যক্তিত্ব, তাই মন। 
কাম বা কামনা থেকে, সংকল্প হয়, এবং সঙ্কল্পের দ্বারা মন থেকে ইন্দ্রিয়রা পরিচালিত হয়, যার নাম কর্ম্ম; কর্ম্ম মানেই কাল প্রকাশ । কলনের বা কালক্রিয়ার যা বীর্য (পয়স্‌) তার নাম 'কল্প' ।কল্+পয়স্‌ = কল্প । সম্যক কল্প = সংকল্প । 

ক্রতু : সঙ্কল্প থেকে যা জাত হয়, তা ক্রতু । কর্ম্মের যে ক্রম বা পরম্পরা সেই গুলি ক্রতু । সেই ক্রতুগুলি সম্পূর্ণ হলে যা হয়, তা কৃত । এই জন্য ঈশোপনিষদে প্রয়াত আত্মার উদেশ্যে বলা হয়েছে— ক্রতো স্মর কৃতম্‌ স্মর । (যা তোমার ক্রতু আর যা কৃত, তা স্মরণ কর—ঈশোপনিষদ, ১৭ মন্ত্র দ্রষ্টব্য।) এই প্রসঙ্গে বৃহদারণ্যক উপনিষদের ৪।৪।৫ মন্ত্রটির থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করলাম : কামময়ঃ এব অয়ম্‌ পুরুষঃ ইতি ; সঃ যথাকামো ভবতি তৎ ক্রতুর্ভবতি, যৎ ক্রতুর্ভবতি তৎ কর্ম্ম কুরুতে, যৎ কর্ম্ম কুরুতে তৎ অভিসম্পদ্যতে—এই পুরুষ কামময়; সে যে-প্রকার কামনাময় হয়, সেই প্রকার ক্রতু হয়, যে প্রকার ক্রতু হয় সেই প্রকারে কর্ম্ম করে, যে প্রকার কর্ম্ম করে, সেই প্রকার হয় ( সেই প্রকার তার পরিণতি হয় ।) যে অনুভূতি নিয়ে আমরা আছি, বা আমরা কর্ম্ম করি, তদনুযায়ী আমাদের গতি বা পরিবর্ত্তন হয় ।

অসু : 'সু' ধাতুর অর্থ সোম-কে পেষণ করে নিষ্কাশন করা । এই বিশ্বরূপ ওষধি-কে থেৎলে, পেষণ করে যে সোম, অনুভূতির রস স্রাবিত হচ্ছে, আমরা তা পান করে বিশ্ব ব্যাপারে মত্ত হয়ে রয়েছি । এইটি অসু । আর এই অসু-র রঞ্জনার দ্বারা রঞ্জিত এবং অভিভূত হবার জন্য এবং যারা আত্মমুখী নয়, যারা সেই অসুর উৎসকে স্বীকার করেনা, তারা অসুর ।

কাম : কাম থেকে ক্রতু, ক্রতু থেকে কর্ম্ম, কর্ম্ম থেকে পরিণতি এবং বিবর্ত্তন হচ্ছে ; অহর্নিশ আমরা বিবর্ত্তিত হচ্ছি । ক্রতু থেকে কর্ম্ম কৃত হচ্ছে, কৃত কর্ম্মানুসারে পুনরায় কাম (কামনা-সকল) সৃষ্টি হচ্ছে ।

বশ : প্রজ্ঞায় বা বোধে যে কামনা সকল ফুটছে, সেই কামনা পূরণের আবশ্যকতার দ্বারা আমরা বশীভূত হই । আত্মজ্ঞপুরুষ আবশ্যকতার দ্বারা চালিত হননা, কেননা তিনি আপ্তকাম, সকল কামনার প্রাপ্তি তাঁতে হয়েছে; তিনি যা কিছু করেন, তার মূলে রয়েছে, আনন্দ বা ব্রহ্মানন্দ,— নিজের সব হবার আনন্দ।
এই যা কিছু যা হৃদয় এবং মন, এই যা কিছু যার নাম সংজ্ঞান, আজ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রজ্ঞান, মেধা, দৃষ্টি, ধৃতি, মনীষা, জূতি, স্মৃতি, সঙ্কল্প, ক্রতু, অসু, কাম, বশ,— এই সকল-ই আত্মা, যিনি আমাদের মধ্যে এবং সকলের মধ্যে চেতনা, জ্ঞান, বোধ, বা প্রজ্ঞা রূপে প্রতিভাত হচ্ছেন; এ সব এঁরই রূপ । ইনি প্রাণ, ইনি প্রজ্ঞা, ইনি নিজবোধ স্বরূপ আত্মা; এঁর প্রকাশই হৃদয় এবং মন, প্রাণ এবং প্রজ্ঞা । 

৩।১।৩।
এষ ব্রহ্মৈষ ইন্দ্র এষ প্রজাপতিরেতে সর্ব্বে দেবাঃ ইমানি চ পঞ্চ মহাভূতানি পৃথিবী বায়ুরাকাশ আপো জ্যোতীংষীত্যেতানীমানি চ ক্ষুদ্রমিশ্রাণীব বীজানীতরাণি চেতরাণি চাণ্ডজানি চ জারুজানি চ স্বেদজানি চোদ্ভিজ্জানি চাশ্বা গাবঃ পুরুষা হস্তিনো যৎ কিঞ্চেদং প্রাণি জঙ্গমং চ পতত্রি চ যচ্চ স্থাবরম্‌ সর্ব্বং তৎ প্রজ্ঞানেত্রং প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিতং প্রজ্ঞানেত্রোলোকঃ প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম ।   

৩।১।৩-১। অন্বয় ।
এষঃ (এই—এই প্রজ্ঞাত্মাই) ব্রহ্মা (ব্রহ্মা), এষঃ ইন্দ্রঃ (এই প্রজ্ঞাত্মাই ইন্দ্র), এষঃ (এই প্রজ্ঞাত্মাই) প্রজাপতিঃ (প্রজাপতি), এতে সর্ব্বে (এই সব) দেবাঃ ( দেবগণ), ইমানি চ (এবং এই) পঞ্চ (পঞ্চ) মহাভূতানি (মহাভূতসমূহ)—পৃথিবীঃ (পৃথিবী) বায়ুঃ (বায়ু) আকাশঃ (আকাশ) আপঃ (অপ্‌) জ্যোতীংষি (জ্যোতিসকল) ইতি এতানি (এই সকল), ইমানি চ (এবং এই সকল) ক্ষুদ্র মিশ্রাণি ইব (ক্ষুদ্র মিশ্র সকল) বীজানি (বীজ সকল), ইতরাণি চ ইতরাণি চ (ভিন্ন এবং ভিন্ন), অণ্ডজানি চ (এবং অণ্ডজ-সকল) জারুজানি  (এবং জরায়ুজ-সকল ) স্বেদজানি চ (এবং স্বেদজ-সকল) উদ্ভিজ্জানি চ (এবং উদ্ভিদ সকল), অশ্বাঃ (অশ্ব সকল), গাবঃ (গো সকল), পুরুষাঃ (পুরুষ সকল), হস্তিনঃ (হস্তি সকল), যৎকিঞ্চ (যা কিছু) ইদং প্রাণি (এই প্রাণী/প্রাণবন্ত), জঙ্গমং চ (এবং জঙ্গম), পতত্রি চ (এবং পতত্রি; পতত্রি= যে পতন থেকে ত্রাণ পেয়েছে; যে উড়তে পারে), যৎ চ (এবং যা) স্থাবরম্ (স্থাবর),— সর্ব্বং তৎ (সেই সর্ব্ব; সেই সকল) প্রজ্ঞানেত্রঃ (প্রজ্ঞানেত্র) প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিতঃ (প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত) প্রজ্ঞানেত্র লোকঃ (লোক প্রজ্ঞানেত্রপ্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা (প্রজ্ঞাই প্রতিষ্ঠা) প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম (প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম) ।   

৩।১।৩-২। অর্থ ।
এই প্রজ্ঞাত্মাই ব্রহ্মা,  এই প্রজ্ঞাত্মাই ইন্দ্র,  এই প্রজ্ঞাত্মাই প্রজাপতি,  এই সব দেবগণ, এবং এই মহাভূতসমূহ—পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, অপ্‌, জ্যোতি—এই সকল; এবং এই সকল যা ক্ষুদ্র-মিশ্র, বীজ, ভিন্ন এবং ভিন্ন (নানা এবং নানা), এবং অণ্ডজ-সকল, এবং জরায়ুজ-সকল, এবং স্বেদজ-সকল, এবং উদ্ভিদ সকল; অশ্ব সকল, গো সকল, পুরুষ সকল, হস্তি সকল, —যা কিছু এই প্রাণী (প্রাণবন্ত), (যা) জঙ্গম, এবং পতত্রি (যারা উড়তে পারে),  এবং যা কিছু স্থাবর), — তা সর্ব্ব প্রজ্ঞানেত্র, প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত, লোক প্রজ্ঞানেত্র, প্রজ্ঞাই প্রতিষ্ঠা, প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম ।

৩।১।৩-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
এই প্রজ্ঞা-ই ব্রহ্মা, ইনি ভিন্ন আর কোথাও কিছু নেই । ইনি প্রাণ অর্থাৎ বোধক্রিয়াময়। ইনি আমাদের মধ্যে স্বয়ং বোধ এবং সকল বোধ । ইনি এঁর বোধক্রিয়ার দ্বারাই, সকলকে নিয়ন্ত্রণ করেন । এঁর বোধের থেকেই আমাদের অনুভূতি হচ্ছে, বা আমাদের মধ্যে ইনিই বোধ স্বরূপ, আমাদের অনুভূতি-সকল এঁরই মূর্ত্তি । ইনি 'জানেন' এবং 'হন' । ইনি যা জানেন, তাই হন, এবং যা হন, নিজেকে তদাকারে জানতে থাকেন । তাই  আমরা যা কিছু অনুভব করি, আমরা নিজের অন্তরে বা বোধে তাই হই । এই জন্য কর্ম্ম অনুসারে ফল হয়; কর্ম্ম অর্থে 'অনুভূতি', বা যে অনুভূতি সকল নিয়ে কর্ম্মটি কৃত হয় । জানা এবং হওয়া-ময় এই জ্ঞান-স্বরূপের নাম 'জাতবেদা (জাতবেদস্‌) । জাত = হওয়া, জন্মানো/প্রকাশ পাওয়া; বেদ = জানা, বেদনময় হওয়া ।
এই প্রজ্ঞা, অর্থাৎ জ্ঞান-স্বরূপ আত্মাই ব্রহ্মা, অর্থাৎ এই ব্রহ্মের-আকার; আকার সম্পন্ন, নাম-রূপময় যে বিশ্ব, ব্রহ্মা তাঁর স্রষ্টা । দৈব মন-ই ব্রহ্মা ।
এই প্রজ্ঞাত্মাই ইন্দ্র । ইন্দ্র সর্ব্ব-দ্রষ্টা, সর্ব্ব-ভোক্তা একথা আমরা আগে বলেছি । ব্রহ্মার ভোক্তৃত্ব -ই 'ইন্দ্র' ।
এই প্রজ্ঞাত্মাই প্রজাপতি,—সকল প্রজার জনক এবং পালক ।এই প্রজ্ঞাত্মাই সকল দেবতা; এঁর এক এক মহিমা এবং সেই মহিমার আনন্ত্য, এক এক দেবতায় প্রতিষ্ঠিত; প্রতি দেবতার মধ্য দিয়ে তাঁর এক-একটি মহিমা অনন্তে অনন্তে প্রকাশ পাচ্ছে ।
এই প্রজ্ঞাত্মাই পঞ্চমহাভূত,— পৃথিবী (ক্ষিতি),অপ্‌, জ্যোতি(তেজ), বায়ু (মরুৎ), আকাশ (ব্যোম) । এই ব্যোম থেকে ক্রমান্বয়ে, বায়ু, তেজ, অপ্‌, এবং ভৌতিকতার শেষ স্তর, যার নাম পৃথিবী, তা সৃষ্টি হয়েছে । এই সব,  প্রজ্ঞাত্মা থেকে সৃষ্টি হয়েছে; প্রজ্ঞাত্মা,— যিনি জাতবেদা । 

এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণি চ ।
খং বায়ুজ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী ।। (মুণ্ডক উপনিষদ্‌, মন্ত্র ২।১।৩। )
অর্থ : এঁর (এই আত্মার) থেকে জাত হয় প্রাণ, মন, সর্ব্বেন্দ্রিয়, খ(ব্যোম), বায়ু, জ্যোতি, অপ্‌, এবং সবার ধাত্রীস্বরূপা পৃথিবী ।

এই  প্রজ্ঞাত্মাই সকল ক্ষুদ্র-মিশ্র সত্তা, বীজ-সকল, ভিন্ন এবং ভিন্ন (নানা এবং নানা), এবং অণ্ডজ-সকল (অণ্ড থেকে জাত জীবেরা ), এবং জরায়ুজ-সকল (মাতৃ জঠর থেকে জাত জীবেরা) , এবং স্বেদজ-সকল (অপ্‌ এবং তাপ থেকে জাত যারা),  এবং উদ্ভিদ সকল, অশ্ব সকল, গো সকল, পুরুষ সকল, হস্তি সকল, —যা কিছু এই প্রাণী (প্রাণবন্ত), (যা) জঙ্গম, এবং পতত্রি (যারা উড়তে পারে),  এবং যা কিছু স্থাবর, — তারা  সবাই প্রজ্ঞানেত্র, প্রজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত; লোক প্রজ্ঞানেত্র, প্রজ্ঞাই প্রতিষ্ঠা। 
যারা ক্ষুদ্র-মিশ্রিত, তারা ক্ষণিক, তারা ক্ষরণের দ্বারা উদ্রিক্ত,  যে সব জীব অতি-ক্ষণস্থায়ী,—বাঁচে আর মরে, তারাও এই প্রজ্ঞাত্মার রূপ । এই ক্ষুদ্ররা— মিশ্রিত; অর্থাৎ নানা-প্রকার গুণ মিশ্রণ সম্পন্ন, তার কারণ এদের জীবত্ব সেই ভাবে এখনও পরিস্ফুট হয় নি, এখনো অতি প্রাথমিক স্তরে রয়েছে । 

প্রজ্ঞানেত্র। 
প্রজ্ঞাই দৃষ্টি বা দর্শন,  প্রজ্ঞার দ্বারাই দৃষ্টি বা দর্শন পরিচালিত হয়। নেত্র শব্দটি 'নী' ধাতু থেকে হয়েছে । 'নী' অর্থে 'নিয়ে চলা'। এই প্রজ্ঞাই আমাদের তিনটি (ত্র) অবস্থাতে নিয়ে চলেন, পরিচালনা করেন; জাগ্রত, স্বপ্ন, এবং সুষুপ্তি, এই তিন ভূমিতেই ইনি আমাদের নেতা, পরিচালক। 

প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠা—প্রজ্ঞাই প্রতিষ্ঠা ।
যা কিছু আমরা জানছি, বা বোধ করছি, তার দ্বারা আমরা চেতায়িত হচ্ছি, বা নিজের অস্তিত্বকে বোধ করছি। তাই প্রতি বোধ, প্রতি অনুভূতিটি, আমার প্রতিষ্ঠার একটি রূপ, বা আমার প্রত্যেকটি স্থিতির একটি রূপ । তাই প্রজ্ঞাই প্রতিষ্ঠা ।এই প্রজ্ঞাত্মাই সৃষ্টির প্রতিটি সত্তার প্রতি মুহূর্ত্তের বর্ত্তমানতা ।
এই প্রজ্ঞাত্মা 'প্রতিষ্ঠা', এবং ইনি 'অতিষ্ঠা', বা স্থিতির ঊর্ধ্বে । 'অস্মিতা', বা 'আমি রয়েছি' এই বোধটি এঁরই রূপ। ইনি যেখানে 'জ্ঞ', স্বয়ং বা নিজবোধ স্বরূপ, সেখানে 'অস্মিতা' স্বয়ং বা নিজেতে হারিয়ে যায় !
৩।১।৪
স এতেন প্রজ্ঞেনাত্মনাস্মাল্লোকাদুৎক্রম্যামুস্মিন্‌ স্বর্গে লোকে সর্ব্বান্‌ কামানাপ্‌ত্বামৃতঃ সমভবৎ সমভবৎ ।

৩।১।৪-১। অন্বয় ।
সঃ (তিনি-সেই বিজ্ঞাতা) এতেন প্রজ্ঞেন আত্মনা (এই প্রজ্ঞ-আত্মার দ্বারা) অস্মাৎ লোকাৎ উৎক্রম্য (এই লোক থেকে উৎক্রমণ করে) অমুস্মিন্‌ (ঐ) স্বর্গে লোকে (স্বর্গ লোকে) সর্ব্বান্‌ কামান্‌ (সকল কাম্যকে) আপ্‌ত্বা (আপ্ত হয়ে) অমৃতঃ (অমৃত) সমভবৎ (হয়েছিলেন) সমভবৎ (হয়েছিলেন) ।

 ৩।১।৪-২। অর্থ ।  
তিনি (সেই বিজ্ঞাতা/বামদেবের ন্যায় বিজ্ঞাতা) এই প্রজ্ঞাত্মার দ্বারা এই লোক থেকে উৎক্রমণ করে ঐ স্বর্গ লোকে সকল কাম্যকে আপ্ত হয়ে অমৃত হয়েছিলেন, (অমৃত) হয়েছিলেন । 

৩।১।৪-৩। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং নিরুক্তি ।
এই প্রজ্ঞাত্মাই নিয়ন্তা । এঁর জ্ঞান বা বোধক্রিয়ার দ্বারা সবাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, যা কিছু আছে আর যা কিছু নেই, সকলেই এঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । তাই এই প্রজ্ঞাত্মার দ্বারাই আমরা নিয়ন্ত্রিত হয়ে জন্ম-জন্মান্তরের মধ্য দিয়ে মনুষ্য হই, বা বিশ্বের যে মন্ত্রময়তা, বা মনোময় বিশ্বের ঈষৎ আভাস অনুভব করবার অধিকার লাভ করি । এই জন্য আমরা মনুর সন্তান বলে পরিচিত,—মনু+ঈষৎ । এই অবস্থা, বা প্রজ্ঞার/বোধের এই ভূমি থেকে, এই আত্মস্বরূপ ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণের দ্বারা, আমরা ক্রমশঃ নিজের বিষয়ে, নিজের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যের বিষয়ে, নিজের জন্ম-মৃত্যুর বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠি; এই অবস্থার থেকে ধীরে ধীরে আমরা আত্ম-অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠি, আত্মজ্ঞতার পথে অগ্রসর হই; এসব আমাদের বিবর্ত্তনের ক্রম সকল,— প্রজ্ঞাত্মার আকর্ষণ-সঞ্জাত পরিবর্ত্তন, এবং আত্মজ্ঞতায় জাগরণ। 
(স্ব্বর্গ লোকে সকল কাম্যকে আপ্ত হবার অর্থ আমরা ২।১।৬-৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি।)
------------------------------------------------------------
শান্তিপাঠ ।

ওঁ বাঙ্‌ মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা । 

মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্‌ ।

আবিরাবীর্ম্ম এধি।

বেদস্য ম আণীস্থঃ ।

শ্রুতম্‌ মে মা প্রহাসীঃ ।

অনেনাধীতেনাহোরাত্রান্‌  সংদধামি ।

ঋতং বদিষ্যামি ।

সত্যং বদিষ্যামি ।

তন্মামবতু ।

তদ্বক্তারমবতু ।

অবতু মাম্‌  অবতু বক্তারম্‌ অবতু বক্তারম্‌ ।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ । 

(শান্তি মন্ত্রের অর্থ এই উপনিষদের প্রারম্ভে উক্ত হয়েছে ।)

-------------------------------------------------------------------------------

পরিশিষ্ট-১।

এই প্রজ্ঞাত্মাই গুরু। এই গুরুর বিষয়ে মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের  কোন একদিনের একটি উপদেশের অংশ উদ্ধৃত করলাম। 
'এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণি চ ।
খং বায়ুজ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী ।।
খং মানে বিশ্বম্‌ । কেননা, আকাশ জন্মালেই বায়ু, অগ্নি, ইত্যাদি জন্মাবে । অগ্নি থেকে যেমন রশ্মি বেরোয়, কিন্তু অগ্নি তা গ্রাহ্য করেনা; রশ্মি বেরুচ্ছে ত বেরুচ্ছে, তেমনি এই যে স্বয়ংপ্রকাশ, এঁ থেকে প্রাণ বেরুচ্ছে; কিন্তু ইনি প্রাণপ্রবাহকে গ্রাহ্যই করেন না । 
কি চাও ? কাকে পেতে চাও ? নিজেকে ? কেন ? ওই পরম সুখ, এর চেয়ে সুখ আর নেই । নিজেকে পাওয়াই সুখ । যচ্চ অস্তি, যচ্চ নাস্তি, এই সুখের ভিতরেই আছে । এই জন্য ঋষি বলেছেন, '' আত্মকামো আপ্তকামো বা । " নিজেকে পাওয়া মানেই, একেবারে সত্য সত্য সবকে পাওয়া, তাই নিজবোধ স্বরূপ পরম দেবতাই ব্রহ্ম । কারণ, ইনিই সব হয়েছেন । ইনি সত্য সত্য সোনা হয়েছেন, হীরা হয়েছেন, আয়ু হয়েছেন, যশ হয়েছেন । তাই নিজেকে পেলে, এসব পাওয়া যায় । হুং শিবায় নমঃ । 
জ্ঞানশক্তিসমারূঢ়স্তত্ত্বমালাবিভূষিতঃ ।
ভুক্তিমুক্তিপ্রদাতা চ তস্মৈ শ্রীগুড়বে নমঃ ।। 

কার পায়ে পড়ছ ? তবে এমন কেন ? এমন নিজস্বরূপ দেবতাকে স্পর্শ করেও যেমন তেমনি রয়েছ ? বিদ্যুৎ স্পর্শ করেও কাঁপছ না ? এর কারণ, ঐ ভগবানের বাস্তবতা এখনও তোমাতে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই ।  
জ্ঞানশক্তি মানে বোধশক্তি । বোধশক্তিসমারূঢ় মানে আপনি আপনার বোধশক্তি । যা কিছু তোমার জ্ঞানে আবির্ভূত হয়, সবই বোধস্বরূপ । মাটি, জল, আগুন, দেবতা, পশু, মানুষ, সব বোধশক্তি। তা হলে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড হল বোধশক্তি, বোধস্বরূপ । এমনি ভাবে যে বোধ স্বাধীন, তাতে সমারূঢ়, তার অধীন নয় । ইচ্ছা করলে তিনি জগৎ প্রকাশ করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে এটা গুটিয়ে নিতে পারেন ।  
তুমি কি ? এই বোধশক্তিসমারূঢ় দেবতার একটা কুঁচি অর্থাৎ জন্মাদ্যস্য যতঃ, তাঁর একটা কুঁচি । ঐ দেবতাই আমাকে বোধ করে ফুটিয়েছেন । 
''তত্ত্বমালাবিভূষিতঃ'' মানে কি ? —ঐ তৎপুরুষের আত্মক্রীড়ার পৌনঃপুনিক আনন্ত্য । এ চলল—চলল—চলল । যখন সূর্য্য বললাম—তখন এ সূর্য্য—সূর্য্য—সূর্য্য— অনন্ত সূর্য্য; দেবতা বললে—দেবতা—দেবতা—দেবতা—অনন্ত দেবতা ফুটছে বিনা প্রচেষ্টায় । খালি আজকের জগতে নয়; ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমান, সকল ব্রহ্মক্রীড়াই আনন্ত্যে ভরা। কেন এমন করে চলে ? আত্মতত্ত্ব শক্তিকে বাধা দেয় না, প্রতিহত করেনা, তাই । এরই বুকে আমি বসে আছি । সাপের গায়ে ঢিল পড়লে সে যেমন ফণা ধরে ওঠে, তেমনি করে এ ফণা ধরে ওঠে । বল শিব শঙ্কর ! 
এই সব উপদেশ বহন করার মত ধাত যদি না পাও, তা হলে বেশী দিলে তোমরা পাগল হয়ে যাবে । তখন আমি শুনব না, যদি বল ও পাগল হল কেন ? খালি শুনে শুনে ধাতগত হও, উপদেশ ধরবার বীর্য্য লাভ কর ।একেবারে রিক্তের ঘর থেকে পূর্ণের ঘরে চলেছ ।'       
    
পরিশিষ্ট-২।
বৃহদারণ্যক উপনিষদের ১।২।১ এবং ১।২।২ মন্ত্রে স্রষ্টা থেকে মন, অপ্‌ এবং পৃথিবীর উৎপত্তির বিষয়ে বলা হয়েছে। স্রষ্টা, যিনি এই মূর্ত্ত বিশ্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন, তাঁকে মৃত্যু বলা হয়েছে। মৃত্যু মানে মূর্ত্ত হওয়া, সসীম হওয়া । মৃত্যুকে 'অশনা' বা 'ভোজনেচ্ছা' বলা হয়েছে, কেননা,এই আত্মা আমাদের সৃষ্টি করে ভক্ষণ করছেন; নিজের সাথে একসা করা; এর নাম বিবর্ত্তন, বা জন্ম-জন্মান্তরের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথে অভ্যুদয় । বৃহদারণ্যকের মন্ত্র দুটি উদ্ধৃত করলাম । 

বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ১।২।১।
নৈবেহ (ন ইব ইহ—ইহলোকে অবশ্যই না) কিংচন (কিছুই) আসীৎ(ছিল) —ইহ লোকে অবশ্যই কিছুই ছিল না । 
মৃত্যুনা (মৃত্যুর দ্বারাই ) এব (এই ভাবে) ইদম্‌ (ইহ; যা কিছু ইহ-পদ বাচ্য) আবৃতম্‌ (আবৃত) আসীৎ (হয়ে ছিল) — মৃত্যুর দ্বারাই (অব্যক্ততার দ্বারাই), এই ভাবে, ইহলোক আবৃত হয়ে ছিল । 
অশনায়য়া (ভোজনেচ্ছা) অশনায় হি (ভোজনেচ্ছাই) মৃত্যু —ভোজনেচ্ছা,—ভোজনেচ্ছাই মৃত্যু (ভক্ষণ-কামী আত্মাই মৃত্যু) । 
 
তৎ (তখন) মনঃ (মনকে) অকুরত (করলেন, সৃষ্টি করলেন) আত্মন্বী (আত্মবান্‌ ) স্যাৎ (হই) ইতি — তখন মনকে সৃষ্টি করলেন,—'আত্মবান্‌ হই' (এই রকম কামনা করে ) ।
সঃ (তিনি) অর্চ্চনন্‌ (অর্চ্চনাময় হয়ে) অচরৎ (বিচরণ করেছিলেন) তস্য (তাঁর) অর্চ্চতঃ (অর্চ্চনা থেকে) আপঃ (অপ্‌ সকল ) অজায়ন্তঃ (জাত হয়েছিল ) —  তিনি অর্চ্চনাময় হয়ে বিচরণ করেছিলেন; তাঁর অর্চ্চনা থেকে অপ্‌ (জল) সকল জাত হয়েছিল ।  
অর্চ্চতে (অর্চ্চনাকারী) বৈ মে (আমাতে) কম্‌ (কমনীয়তা; সর্ব্ব কাম আপ্তির যে সুখ) অভূৎ (হয়েছিল)—(মৃত্যুরূপ স্রষ্টার উক্তি—) অর্চ্চনাকারী আমাতে কম্‌ (কমনীয়তা; সর্ব্ব কাম আপ্তির যে সুখ) অনুভূত হয়েছিল ।  
তৎ এব (তাই-ই; সেই কম্‌-ই ) অর্কস্য (অর্কের /সুর্য্যের) অর্কত্বম্‌ (অর্কত্ব) — তাই-ই (সেই কম্‌-ই ) অর্কের (সূর্য্যের) অর্কত্ব । 
কং হ বা (অবশ্যই কম্‌) অস্মৈ (এঁতে) ভবতি (হয়) যঃ (যিনি) এবম্‌ (এই ভাবে) এতদ্‌ (এই) অর্কস্য (অর্কের /সুর্য্যের) অর্কত্বম্‌ (অর্কত্ব) বেদ —  যিনি এই অর্কের* (সূর্য্যের) অর্কত্বকে জানেন, তাঁতে অবশ্যই কম্‌ (সুখ) হয় । 

(*অর্ক = অ+ঋক্‌— যাঁর থেকে ঋক্‌বেদ, আত্মার ঋক্‌ নামীয় বেদন, যা রূপ (ক-ব্যঞ্জনা) এবং গতি/কাল (ঋ) হয়ে প্রকাশ পাচ্ছেন, তিনি অর্ক। রূপ এবং কাল সূর্য্যের থেকে প্রকাশ পাচ্ছে, একথা আমরা আগে বলেছি।) 
 
বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ১।২।২ মন্ত্রের প্রথমাংশ ।  
আপঃ বা (অপ্‌-ই ) অর্কঃ (অর্ক) তৎ যৎ (সেই যে) অপাং (অপের) শরঃ (শর; শরবৎ অংশ) আসীৎ (ছিল) তৎ (তা) সমহন্যত ( সম্যক রূপে হত হয়েছিল— সম্যক রূপে কঠিন হয়েছিল )— প্‌ই অর্ক। সেই যে অপের শরবৎ অংশ ছিল তা সম্যক রূপে কঠিন হয়েছিল। 

সুতরাং 'আত্মন্বী' বা নিজেকে বর্ধিত করবার জন্য তিনি 'মন' কে সৃজন করলেন বা মনোময় হলেন। সেই এই  মন, যিনি সংকল্পময় পুরুষ বা ব্রহ্মা। হৃদয় বা বিষ্ণুভূমি থেকে ব্রহ্মা প্রকাশ পান। কামনা অনুসারে মন সংকল্পময় হয় । ব্রহ্মা বা দৈব মন থেকেই ভৌতিক বিশ্ব প্রকাশ পেয়েছে, যার নাম পৃথিবী বা ভৌতিক বিশ্ব। 
-------------------------------------------------------------















 

 












Comments

Popular posts from this blog

ঈশোপনিষদ্‌ (ঈশ উপনিষদ্‌) --মূল মন্ত্র, অর্থ, নিরুক্ত এবং ব্যাখ্যা সহ। (Ishopanishad --Isha Upanishad in Bengali language with original texts, annotaions, meanings, etymolgies and explanation.)

শ্রী শ্রী বিশ্বমাতা পূজা । আচার্য্য শ্রীমদ্ বিজয়কৃষ্ণ কৃত শ্রী শ্রী বিশ্বমাতা (অমা/অদিতি) পূজা। মূর্ত্তি পূজা রহস্য এবং বেদ। ( ১৯৪১ সাল/ সন ১৩৪৮, শ্রীমতী সরলা দেবী চৌধুরাণী কর্ত্তৃক সঙ্কলিত।) (Worship of Aditi/Ama—Vishvamaataa/Universal Mother Goddess of the year 1941 in Bengali language--Performed by Rishi Bijoykrishna Chattopadhaya and recorded by Sarala Devi Chowdhurani.)