গুরু এবং অগ্নি। (মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের উপদেশাবলী থেকে সংগৃহীত। ) (A sermon by the Great Seer Shri. Bijoy Krishna Chattopadhyaya in Bengali language.)

                                                     গুরু এবং অগ্নি।


ভূমিকা।

মহর্ষি শ্রী বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের উপদেশাবলীর একটি বৃহদাংশ বেদবাণী নামক গ্রন্থগুলিতে প্রকাশিত হয়েছিল। সম্প্রতি এই বইগুলি আর মুদ্রিত হয়নি। 

বেদবাণীর একটি উপদেশ এই প্রকাশনটিতে পরিবেশিত হল। বন্ধুপ্রবর শ্রী চণ্ডীদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে এই উপদেশটির একটি অনুলিপি আমি পাই।

পরম-আত্মস্বরূপ যিনিতিনি গুরু, এবং তিনি স্বয়ংশক্তি এবং স্বয়ংপ্রকাশ। এই শক্তির নাম বাক্‌ স্বয়ংপ্রকাশ আত্মার যে প্রকাশাত্মক স্বরূপ, তাঁর নাম প্রাণ বা প্রাণাগ্নি। সকল চাঞ্চল্যের অগ্রে, সৃষ্টি-স্থিতি-লয়াত্মক যে কোনো ক্রিয়ার অগ্রে যিনি থাকেন, যাঁর থেকে সব কিছু সূচিত হয়, যিনি অগ্রণী, তিনি অগ্নি। যিনি প্রথমঅন’, তিনি প্রাণ বা প্রাণাগ্নি। অগ্নিঅগ্‌+নি (নী)—যিনি অগ্রবর্ত্তী হয়ে সবাইকে নিয়ে চলেন।

ছান্দোগ্য উপনিষদের ১।১।৫ মন্ত্রে উক্ত হয়েছে : বাক্‌- ঋক্‌, প্রাণ- সাম, এই ওঁ-অক্ষর (অক্ষর আত্মা) উদ্গীথ। তাএই মিথুন, যা বাক্‌ প্রাণ, যা ঋক্‌ সাম। 

যিনি একান্ত গুহ্য, তিনি চির অব্যক্ত থেকেও নিজেকে অনন্ত রূপে প্রকাশ করছেন। যা কিছু রূপময় হয়ে জাত হয়েছে, তা এই বাক্‌ এবং প্রাণের মিথুন সঞ্জাত।  স্বয়ংপ্রকাশ, স্বয়ংশক্তি আত্মাই এই মিথুন। তাই ছান্দোগ্য উপনিষদের পরবর্ত্তী মন্ত্রে বলা হয়েছেযা এই মিথুন তা,  ওঁ এই অক্ষরে বা অক্ষর আত্মায় সংযুক্ত।

এই বাক্‌, বাগাম্ভৃণীসকলের ভ্রুণকে গর্ভে ধারণ করে বিশ্বকে প্রসব করেছেন।  ঋক্‌ বেদে আত্মস্তুতিময় বাক্‌ নিজের উদ্দেশ্যে বলেছেন—'চিকিতুষী প্রথমা যজ্ঞিয়ানাম্‌'—(আমি) চেতনা রূপে প্রজ্বলিত এবং (আমি) যা যজ্ঞীয় তার মধ্যে প্রথম। এই গুরুশক্তি গৌরী বা বাকের বিষয়ে মহর্ষি ব্যাখ্যা করেছেন।

যিনি ঋক্‌, অর্থাৎ গতিশীল এবং ব্যঞ্জনময়, যাঁর বেদনই এই গতিময় এবং রূপময় বিশ্ব হয়ে প্রকাশ পেয়েছে, তাঁকে দেখার যে উপলব্ধি, তা ঋক্‌বেদ নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

এই জন্য ঋক্‌ বেদের প্রথম মন্ত্রে অগ্নিরই বন্দনা করা হয়েছে। এই মন্ত্রটির ব্যাখ্যা এই উপদেশে করা হয়েছে।  


মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের কিছু উপদেশ যা 'বেদবানী'-প্রথম খণ্ডে সংগৃহীত রয়েছে, তা Internetএর  এই linkটিতে পাওয়া যাবে : https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.456960

ছাড়া, ১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দে মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ-দ্বারা কৃত শ্রীশ্রী বিশ্বমাতা পূজা এবং শ্রীশ্রী দুর্গা পূজার বিবরণ এবং উপদেশ নিম্নলিখিত link দুইটিতে, যথাক্রমে পাওয়া যাবে :

https://www.slideshare.net/slideshow/worship-of-aditi-ama-vishvamaataa-universal-mother-goddess-of/283937516

https://www.slideshare.net/slideshow/durgapuja-by-rishi-bijoykrishna-chattopadhaya/266375763

সম্প্রতিপ্রাচী প্রকাশন (প্রাচী পাবলিকেশনস্‌), মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণের কিছু উপদেশশ্রী শ্রী গুরুবাণীনামে পুস্তকাকারে প্রকাশিত করেছেন।


(DEBKUMAR.LAHIRI@GMAIL.COM)

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------



                         শ্রীমৎগুরু বিজয়কৃষ্ণ দেবশর্মা- উপদেশাবলী।

                                                  বেদবাণী।

                 ২১শে ফাল্গুন, ১৩৫০, ৫ই মার্চ্চ, ১৯৪৪, রবিবার, প্রাতে।


শুশ্রুবাংসঃ অনূচানা উপলভন্তে। শুশ্রুষাবান্‌ গুরুপরায়ণ শিষ্য মাকে উপলব্ধি করতে পারে, এই অপূর্ব্ব ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করতে পারে। গুরুসেবা মানেগুরুশক্তি গৌরীর বা বাঙ্‌ময়ীর সেবা বাক্‌ বলতে তোমাদের সাধারণ ভাব এসে যায়তোমরা দার্শনিক শব্দে পড়ে যাও। তাই বাক্‌ কে দেবী বলে গ্রহণ করতে হয়। বাঙ্‌ময়ী মানে গৌরী, আর গৌরী মানে অগ্নিময়ী। বাঙ্‌ময়ীর সেবা করলে গুরু প্রসন্ন হন। কেননা, গুরুই তো বাঙ্‌ময়ী রূপে প্রকাশ পান। 

গুরু মানে কি ? ‘গু' মানে গুহা, অর্থাৎ যেটির কথা কিছু জানা যায় না; যেটাতে পৌঁছলে, যে জানবে, সে আর থাকে নাতাঁতেই পৌঁছে যায়। সুতরাং গুরু চিরকাল গুহায় রয়ে গেলেন। কারণ, যে জানবে, সে তাই হয়ে যায়। দ্বিতীয় বোধ যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ জানা ব্যাপারটা চলতে থাকে। যত্র অদ্বৈতো ভবতি, তত্র এক একং বিজানাতি; যত্র দ্বৈতো ভবতি, তত্র ইতর ইতরং বিজানাতি পশ্যতি, শৃণোতি। যেখানে অদ্বৈত বোধ, সেখানে কে কাকে জানবে ? আর, যেখানে দ্বৈত বোধ, সেখানে একজন আর একজনকে জানছে। বিজ্ঞাতারং অরে কেন বিজানীয়াৎ !  যিনি জানেন, তাঁকে আবার কি দিয়ে জানবে?  আপনি আপনাকে জানাটা সেখানে স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার ? সেইটির কথা এখন বলছি না। তা হলেগু' হল অনির্ব্বচনীয় ক্ষেত্র। 

'রু' হল প্রকাশক্ষেত্র।' হল অগ্নিবীজ, ‘রু' মানে রব। যখন রোহতি, অর্থাৎ, আপনা হতে রবের আকারে ফুটে ওঠেন তখন জানা হয়। যে পরমতত্ত্ব আপনি আপনাকে জানেন, তিনি বিশ্বের গুহাস্বরূপ, সকল বিশ্ব যাঁতে স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে একীভূত হয়ে যায়, তিনি যখনরুহয়ে, অগ্নিময়ী হয়ে ফুটে ওঠেন, তখন তাঁকে আমরা জানতে থাকি, শুনতে থাকি। এইরুরূপে, রব রূপে, অগ্নি রূপে ফুটে ইনি আপনি আপনাকে প্রকাশ করতে করতে, সেবা করতে করতে, পরিতৃপ্ত করতে করতে চলেছেন। এই সেবার নাম যজ্ঞ এই বাঙ্‌ময়ী, আপনার যে আত্মা, সেই আত্মত্বের সেবার জন্য 'জ্ঞ' হয়ে বা জানতে জানতে, আপনাকে' বা গতিশীলা করে ফুটিয়ে তোলেন। এর নাম বিশ্বপ্রকাশতোমার জন্ম, আমার জন্ম। সুতরাং এই অগ্নিকে চেনা, পাওয়া বা অগ্নিময় হওয়া হল জীবের ধর্ম্ম। এই হল ব্রহ্মসেবা, ব্রহ্মগতি। সকল প্রকাশের অগ্র প্রকাশ হল এই অগ্নি। তাই বেদনামীয় শাস্ত্রের প্রথম আবাহনের দেবতা হলেন অগ্নিদেবতা। সুতরাং তিনি হলেন অগ্রবর্ত্তী দেবতা। যিনি সকল প্রথম মূর্ত্তিতে ফোটেন, যিনি অগ্রণী, তাঁর নামই অগ্নি। এই অগ্নিকে অবলম্বন করে যত বেদনের খেলা, প্রাণের খেলা, বিশ্বের খেলা চলেছে। এই অগ্নিতে রূপ, রব রস আছে। রূপ কাকে বলে ? এটা হল রব রসের পরিণতি এই জন্য এঁর নাম জাতবেদা। এঁর চলা মানেইরব, রস রূপ ফুটছে এই তিনটি ফোটাতে ফোটাতে যিনি চলেছেন, সেই রব, রস, রূপময়ী বা অগ্নিময়ী মাকে আমরা দেখছি যেখানেই চেতনার উন্মেষ হচ্ছে, তা সে একটা কীট হোক, বা আমি হই, সেখানেই অগ্নি ফোটে, এবং তাতে যে রব, রূপ, রস আছে, এই নিয়ে চিন্ময়ী গুহাভিমুখে চলেছেন এই অগ্নিকেইঅগ্নিমীলে পুরোহিতং' বলে ডাকছি


পুরোহিতংযেখানে যা কিছু unit দেখছি, তা সে একটি ফরিং হোক বা গাছ হোক বা মাটি হোক, সেটির নাম একটি পুর। সেটি হল রব, রস, রূপের পুর। এই অগ্নি তার ভিতর হল রব, রস, রূপ নিয়ে  হিতম্‌ বা নিহিত আছে   পুরে পুরে যিনি রব, রস, রূপের আকারে, অথবা তেজ-জল-অন্নের আকারে অথবা বাক্‌-প্রাণ-মনের আকারে নিহিত, সেই অগ্নিকেই আমিপুরোহিতবললাম। 

বাক্‌ই সর্ব্বস্ব' কথার মানে কি ? পদার্থের সঙ্গে বাক্‌স্বরূপ জ্ঞান বা জ্ঞান স্বরূপ বাক্‌ identified হয়ে যাচ্ছে। বই বলতে আমার জ্ঞান বইয়ের মূর্ত্তি নিলে, অর্থাৎ যেন জ্ঞানের বই পেলাম। বিশ্ব জ্ঞানময় দেখলে তোমার দ্বৈতবোধ ঘুচল না ; সেটা পুরোমাত্রায় রইল। যে বইখানা বাইরে দেখলাম আর যেটা জ্ঞানের বইএই দুটায় ভেদ থেকেই গেল। জ্ঞানের বই দেখছিখালি consolation রইল। তোমায় যে বিদ্যা শেখান হচ্ছে, সেই বিদ্যারূপিণী মা বলছেন যে বইখানা পড়ে রইল, সেইটা আমিআমি পুরোহিত। এই বাক্‌ই রব, রস, রূপময় হয়ে, একেবারে বইটা হয়ে যায়। বইটা আর কিছু নয়অগ্নিময়ী বাক্‌ আমিই  রব, রস, রূপএই ত্রিবৃৎ হয়ে বইমূর্ত্তি ধরেছি। এখন মনে হচ্ছে, জলের কাছে গিয়ে, আমি জলের মত ভোগ দিচ্ছি মত' নয়, আমি নিজেই তদাকার হয়েছি। প্রতি পুরের ভিতর আমি নিজেই নিজের আধার হয়েছি, নিজেই নিজেকে দোহন 'রে পুর রচনা করছি তাই অগ্নিকে পুরোহিত বলে দর্শন করলাম। আমার বাইরে যে সব পুর রয়েছে, তাতে ভোগ পেয়ে আমার তৃপ্তি নেই। আমার অদ্বৈতবোধে কিন্তু এটা আসছে না। জ্ঞানময় ভোগ পাচ্ছি, কিন্তু জ্ঞানময় ভোগ্য পাচ্ছি নাপ্রকৃতপক্ষে একদমবই'টাকে পাচ্ছি না যে গুরু আপ্তকাম, এই অগ্নিবিদ্যাই যাঁর সর্ব্বস্ব, তিনি বুকে বসিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, আমি আর কোথাও জাত নইওঁরই বুকে। আমার স্বরূপও যা, ওঁর স্বরূপও তা সুতরাং আমি যদি ওঁর রূপান্তর হই, তা হলে আমার পক্ষে আপ্তকাম হওয়া তো বিচিত্র নয়। কিন্তু আমার আটকাচ্ছে যে, আমি পুরকে বিদীর্ণ করে পুরন্দর ইন্দ্র হয়ে উঠতে পারছি না। এটা যতক্ষণ না হবে, আমি যে তোমারই অংশ, তুমি যে আমি সেজেছ, সেটা ধরতে পারব না। 

এই যে আমার শরীর,এটা আমার পুর। আমিই নিজেকে এর ভিতর জ্ঞানময় দেখছি। গুরুকৃপায় দেখতে শিখেছি যে আমি জ্ঞানে জাত, জ্ঞানে বিলীন হচ্ছি কিন্তু এই যে পুর বেষ্টনী, এটা ভেদ করতে পারছি না। তাই এই পুরভেদের জন্য পুরোহিত দেখতে হবে এই বাঙ্‌ময়ীই যে পুর রচনা 'রে রয়েছেন, এটা দেখতে হবে; নয় , আমার পুরন্দরত্ব আসবে না ওগো বাঙ্‌ময়ি, আমাকে পুর ফাটাতে শিখিয়ে দাও। পুরং দীর্য্যতি, অর্থাৎ পুরবোধকে যিনি বিদারণ করেন, তিনি পুরন্দর। তোমাতে শুশ্রুষাবান্‌ হবার জন্য আমাকে  তুমি উপদেশ দিয়েছ। আমি পুনঃ পুনঃ তোমার সেবা, তোমার আবাহন করছি। যদি কারও গায়ে হাত বুলালে জানতে পারি যে সে পরিতৃপ্ত হচ্ছে, তা হলে আমিও অনুতৃপ্ত হই। আমার সেবায় তুমি তৃপ্ত হচ্ছ, এটা যদি বুঝতে না পারি, তা হলে আমার অনুতৃপ্তি আসবে না এই পুরের ভিতর যে  রব, রস, রূপ আছে, এই তিনটা যদি একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, তবেই তোমার পরিতৃপ্তিতে আমার অনুতৃপ্তি আসবে যদি দেখিবইখানা ফেটে গেল, আর তার ভিতর থেকে তুমি রব রসে রূপময়ী হয়ে দাঁড়িয়ে বলে ওঠ—‘এই যে বাবাতবেই আমি অনুতৃপ্ত হব। যদি তোমার রব না শুনি, যদি তোমার রসে না ভরে যাই, রূপময়ী তোমাকে না দেখি, তাতে আমার কাল্পনিক সুখ হতে পারে, কিন্তু তাতে  আমার অনুতৃপ্তি হবে না। তুমি বলেছ, শুশ্রুবাংসঃ অনূচানা উপলভন্তে। তাই আমি বলছিঅগ্নিমীলে পুরোহিতং  

শুধু সেবা, বর নিয়ে চলে যাব, এর জন্য তোমাকে আবাহন করছি না। তুমি যেযজ্ঞস্য দেবঃ’—যজ্ঞরূপী দেবতা, এইটা আমায় দেখাতে হবে যদি দেখি তুমি আমায়গু' থেকেরুতে এবংরু'থেকেগু' থেকে নিয়ে যাচ্ছ, তা হলে আমার আর প্রচেষ্টা থাকবে না। যেমনি এই পুর (প্রতীক বা unit) ফোটাতে পারবে, অমনি এই যজ্ঞমূর্ত্তি দেবতা আপনি আপনাকে যজ্ঞময় বা গতিশীল করে, তোমায় বহন করে নিয়ে চলতে থাকবেন।তখন আর তোমার কোন প্রচেষ্টা নেই। এইখানে যেমনি তোমাকে যা কিছুতে ফোটাব, অমনি তুমি আমাকে বুকে করে চলতে থাকবে, এটা যেন আমি দেখতে পাই। 

তোমাদের দেব বেদ বুঝিয়েছি দেবতার retroversion তো বেদ ? দেবত্ব ফুটলে, তবে বেদত্ব ফোটে, অর্থাৎ দেবতা বা প্রকাশ দেখতে পেলে, তবেই তো আমি বেদময় বা যজ্ঞময় হব যেখান থেকে ফোটে, সেখানে ফিরে যাওয়া হল দেবত্বের ধর্ম্ম।যজ্ঞস্য দেবংমানে যজ্ঞের দেবতা নয়এর মানেযজ্ঞরূপী  দেবতা। এখানে অভেদে ষষ্টী ব্যবহার হয়েছে যেমনরাহু' বলতে মাথাটাই বোঝায়, তত্রাচ বলা হয়রাহোঃ শিরঃ। তুমি যজ্ঞরূপী হলে, আমায় তুমি যজ্ঞময় করে তুলবে। আবার যজ্ঞময় হওয়া মানে ব্রহ্মময় হওয়া। কারণ, ব্রহ্মই বা সেই গুহাস্বরূপ দেবতাই যজ্ঞময় (বেদময়) দেবময় হয়েছেন। সুতরাং আমার যজ্ঞময় হওয়া মানেই ব্রহ্মময় হওয়া ব্রহ্মস্বরূপে প্রবেশ করা। হে যজ্ঞরূপিণী, তুমি প্রজ্বলিত হলে, আমি তোমার পরমব্রহ্মস্বরূপে ঢুকব, তোমার পরম আলোকে আলোকিত হব। 

ঋত্বিজংযিনি এইরকম ঋক্‌মন্ত্র নিয়ে যজ্ঞাদি করতে বসে যান, তাঁর নাম হল ঋত্বিক্‌। তো 'আমি' এই পুরুষটিএই জীবটি, সর্ব্বদাই বাক্যময়। তুমি জ্বললে, আমার প্রতি বাক্য মন্ত্র হয়ে যাবে। তুমি যজ্ঞ সাজলে, তোমার বেদনে আমিও বাঙ্‌ময় হয়ে যাব, ঋত্বিক্‌ হয়ে যাব বাঙ্‌ময়ী মা নিজেই ঋঙ্‌ময়ী তিনি যখন নিজেইযজ্ঞস্য দেবঃহবেন, তখন আমি যথার্থ ঋত্বিক্‌ হব বাক্‌কে যদি একজন দেবতা বা বাঙ্‌ময়ী বলে দেখ, তো কে কাকে আহুতি দিচ্ছে ? মা- ঋত্বিক্‌ হয়ে আত্মসুখের জন্য নিজেকে আহুতি দিচ্ছেন।এর মানে, আমি শুদ্ধ ঋঙ্‌ময়, মন্ত্রময় হয়ে যাব। মননাৎ ত্রায়তে বা ত্রিধা ভূত্বা ত্রায়তে, অর্থাৎ ত্রিবৃৎ হয়ে ত্রাণ করে, তাই এর নাম মন্ত্র। যখনবই' বললেই সঙ্গে সঙ্গে রব-রস-রূপ বা বাক্‌-প্রাণ-মন ত্রিধা হয়ে ফুটবে, তখনই মন্ত্র বলা ঠিক হবে যতক্ষণ 'জ্ঞানের বই'— এইরূপ ভাব থাকবে, ততক্ষণ সেটা বাক্যই থেকে যাবে। যতক্ষণ না ইনি ত্রিধা ভূত্বা ত্রায়তে, ততক্ষণ যতই তাতে সুর বা মর্ম্মবেদনা ঢাল না কেন সে ভাবের খেলাভবখেলাই হবে। এই বিশ্ব তুমি কি করে ফুটিয়েছ মা ? ত্রিধা ভূত্বারব, রস রূপ, এই তিনটা তাল নিয়ে সমাস করে। যচ্চ কিঞ্চিৎ বিজ্ঞাতমবিজ্ঞাতং বা সর্ব্বমেতৎ ত্রয়াণাং সমাসঃ এই তিনটা একসা করা ছাড়া কিছু প্রকাশ হয় না যা কিছু দেখছ, এই তিন দেবতার বা তিন মহিমার সমাস। তিনটা মহিমাকে একসা করলে তবে বস্তু গড়া হয়। যদি দেখ, আমার চেতনা রবময় (বাঙ্ময়), রসময় (প্রাণময়) রূপময় (মনোময়), তা হলে তোমার কথামন্ত্র' হবে। চেতন কি ? চেতন বললেই বলতে হবেযিনি একঃ সন্‌ ত্রিধা ভবতি এক থেকেই এই তিনটা হবার capacity যাঁর আছে, সেই আমার চেতন মা না হলে মাপে মাপে গড়া যায় না আর এটা দেখলে, আমি আপ্তকাম হব, নিজের মতন করে হাতে গড়া পুতুলের মত মাকে গড়ে ছেড়ে দেব

তো আমার এই মাকেএই দেবতাকে কি বলে ডাকলাম ? ঋত্বিজং হোতারং রত্নধাতমম্‌ যে ঋক্‌ পড়ে,  সে হল ঋত্বিক্‌ হোতা মানে অধ্বর্য্যু, অর্থাৎ অধ্বে বা পথে যে যোগ করে দেয়   ঋত্বিক্ রূপে তুমি রব, হোতা বা অধ্বর্য্যুরূপে তুমি পথ চলার রস বা প্রাণগতি তুমি নিজে মন্ত্র, আবার তুমি অধ্বর্য্যু হয়ে প্রাণগতিতেরসপ্রবাহে আপনি নাচতে নাচতে চলেছ তুমি আবার রত্নধা, অর্থাৎ আমি যে রত্ন চাই, তা সে সোণা দানা, বা ভগবান্‌ হোক না কেন, তুমি সেই রূপ ধারণ করবে। তা হলে রব, রস, আর রূপ হলঋত্বিক্‌, হোতা রত্নধা

তা হলে শুধু বাক্‌ বললে, বা বেশ বুঝেছি লে কোমর বেঁধে বসে গেলে হবে না যতক্ষণ গুরু এই পুরবিদারণটা দেখিয়ে না দেন, ততক্ষণ জ্ঞানমুক্তি পেতে পার, কিন্তু  রাগমুক্তি লাভ করতে পারবে না জ্ঞানকে দেখছি, এইটা হল জ্ঞানমুক্তি   এটা মুক্তির first stage কিন্তু যতক্ষণ পুরটা ফাটাতে না পার, ততক্ষণ রাগমুক্তি হবে না, ততক্ষণ বাহ্য আকর্ষণ থেকে মুক্তি পাবে না, ততক্ষণ যে যত বৈরাগী হও না কেন, মরবার সময় ইন্দ্রিয়াদি হারাচ্ছি বলে একটা মর্ম্মন্তুদ কান্না আসবেই সুতরাং ইন্দ্রিয়ের জন্য টান মানে বিষয়ের প্রতি টান সুতরাং ইন্দ্রিয়াদিকে যতক্ষণ তাদের দেবত্ব দেখিয়ে না দাও, ততক্ষণ রাগমুক্তি হবে নাততক্ষণ এদের হারাবার ভয় থাকবে আমি সর্ব্বস্বত্যাগী হয়েছি, কিন্তু গায়ে একটা মশা বসলেই সর্ব্বনাশ

অগ্নিতত্ত্ব যে ভাবে বর্ণনা করলাম,এতে প্রাণে তৃপ্তি পেলে ? ওঁ অগ্নিমীলে পুরোহিতম্‌ যজ্ঞস্য দেবং ঋত্বিজং‌ হোতারং রত্নধাতমম্‌ এই পুরবিদারিণী মহাশক্তি তোমাকে আমাকে যে বিদ্যা দিয়ে পুরবিদারণ করবেন বলে এই পুর সেজে বসে আছেন, সেই বিদ্যার প্রথম স্তর পেলাম। অগ্নি, সোম, সূর্য্যএই তিনটা বিদ্যা শিখাব, তখন পুর ফাটান শিখবে, ব্রহ্মবিদ্যায় প্রবিষ্ট হবে খালি জ্ঞানী হবার জন্য এই বিদ্যা দিচ্ছি না খালি গুরুসেবার কেরামতি শেখাচ্ছি


——————————————————————————

Comments

Popular posts from this blog

ঈশোপনিষদ্‌ (ঈশ উপনিষদ্‌) --মূল মন্ত্র, অর্থ, নিরুক্ত এবং ব্যাখ্যা সহ। (Ishopanishad --Isha Upanishad in Bengali language with original texts, annotaions, meanings, etymolgies and explanation.)

শ্রী শ্রী বিশ্বমাতা পূজা । আচার্য্য শ্রীমদ্ বিজয়কৃষ্ণ কৃত শ্রী শ্রী বিশ্বমাতা (অমা/অদিতি) পূজা। মূর্ত্তি পূজা রহস্য এবং বেদ। ( ১৯৪১ সাল/ সন ১৩৪৮, শ্রীমতী সরলা দেবী চৌধুরাণী কর্ত্তৃক সঙ্কলিত।) (Worship of Aditi/Ama—Vishvamaataa/Universal Mother Goddess of the year 1941 in Bengali language--Performed by Rishi Bijoykrishna Chattopadhaya and recorded by Sarala Devi Chowdhurani.)

ঐতরেয় উপনিষদ্‌। (Aitareya Upanishad in Bengali/Bangla language, with the original texts, word-word meanings, etymologies, and brief explanations.)