শিবরাত্রি পূজা । চেতনের লীলা। (মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় উক্ত উপদেশ। শ্রীমতী সরলাদেবী চৌধুরাণীর দ্বারা লিপিবদ্ধ।)

 

শ্রীগুরু বিজয়কৃষ্ণ দেবশর্ম্মা অনুষ্ঠিত 

শিবরাত্রি পূজা। 


                                   চেতনের লীলা। 

শ্রীমতী সরলাদেবী বিলিখিত।

(শ্রীমতী সরলাদেবী চৌধুরাণী দ্বারা বিলিখিত।)

-------------------------------------------------------------

প্রকাশকের নিবেদন।

এই অলেখ্যটি মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের শিবরাত্রির বিষয়ে একটি উপদেশ। তাঁর প্রধান শিষ্যা শ্রীমতী সরলা দেবী চৌধুরানী শ্রুতি-লিখনের দ্বারা এইটি লিপিবদ্ধ করেন এবং একটি পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল।মহর্ষি বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ বন্ধু শ্রীনিবারণ বন্দ্যোপাধায়ের পৌত্র শ্রীচণ্ডীদাস বন্দ্যোপাধায়ের সৌজন্যে আমি এই উপদেশের অনুলিপিটি পাই। এক শিবকল্প ঋষির শিব-চৈতন্যের উপদেশ পরিবেশন করা হল। 

(দেবকুমার লাহিড়ী—debkumar.lahiri@gmail.com)

------------------------------------------------------------

                          শিবরাত্রি।

"আমার জীবনের সার জিনিষ কি ? চেতনা বা জ্ঞান।

আমার উপর পাহাড় চাপালেও তার মূল্য নেই, ফুলের বিছানায় শোয়ালেও মূল্য নেই—যদি চেতনা না থাকে,জ্ঞান না থাকে। 

আমার চেতনা বা জ্ঞানই জগৎমূর্ত্তি ধরে, সর্ব্বমূর্ত্তি ধরে। চন্দ্রের দীপ্তিও আমার জ্ঞান, সূর্য্যের দীপ্তিও আমার জ্ঞান, জ্ঞানই ত আমি। তাই আমিই প্রভাস্মি শশী সূর্য্যয়োঃ।

আসল আমি যে, সে শরীর-ছাঁটা, (minus—শরীর), শুধু জ্ঞানময় l কারণ শরীরী যে, সেই ত আমি, আর আমার শরীর আছে এই জ্ঞানই ত আমায় শরীরী বলাচ্ছে।  

এই জ্ঞান কে? যাঁর বুকে বসে নিজেকে আমি বলে, শরীরী বলে জানছি? কি ধর্ম্ম এঁর? কি ঐশ্বর্য্য এঁর? কি মহিমা এঁর?

এই জ্ঞানস্বরূপের ধর্ম্মই হল 'নিজত্ব' বা 'নিজে' এই বোধ"। 

এঁর ঐশ্বর্য্য হল ব্রহ্মাণ্ড, এঁর নিজত্বেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডত্বর সম্পদ নিহিত রয়েছে। সারা ব্রহ্মাণ্ড যাঁর নিজের মূর্ত্তি, সেই সমস্তটার জ্ঞানায়তন নিজেতে প্রজ্বলিত করে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তিনিই ব্রহ্মাণ্ডেশ্বর।"

আর আত্মকামত্ব এঁর মহিমা বা শক্তি। জ্ঞানস্বরূপ নিজের জ্ঞানস্থ ব্রহ্মাণ্ডের যখন যেটা চান নিজেতে সেটা ফোটাতে পারেন।"   

ব্রহ্মদর্শন বা ব্রহ্মের উপলব্ধি ততক্ষণ পূর্ণ হয় না, যতক্ষণ শ্রী পর্য্যন্ত, ব্রহ্মাণ্ডের বাহ্য প্রকাশটা পর্য্যন্ত সেই ব্রহ্মের অন্তর্গত না দেখা হয়।
ব্রহ্মাণ্ডের অংশীভূত এই ক্ষুদ্র আমারও আত্মা তিনিই—যিনি আমার কতকগুলো স্বভাব ও সংস্কার গ্রহণ করে নিজে আমি হয়ে ফুটেছেন।  
এই আমিতে হল তাঁর হওয়া মূর্ত্তি, আর যেখানে হওয়া শুরু করেছেন আনন্দঘনতায় সেটা তাঁর অহওয়া মূর্ত্তি। আমিতে হওয়া মূর্ত্তি, অনির্ব্বচনীয়ত্বে শমতাময় অহওয়া মূর্ত্তি; ওখানে, চেতনার ঐ স্তরে তিনি অজ আত্মা; এখানে চেতনার এই স্তরে তিনি আমি হয়ে জাত সম্ভূত আত্মা। তাই নাম হল তাঁর শম্ভু, অহওয়া + হওয়া।"

(প্রকাশকের মন্তব্য : শম্ভু = শম্‌ (শান্ত বা চাঞ্চল্য বিহীন হওয়া) +ভু (জাত হওয়া);  শান্ত/চাঞ্চল্য বিহীন= অপ্রাণ বা অব্যক্ত। সুতরাং, শম্ভু = অহওয়া + হওয়া।)" 

শ্রী হল তৃপ্তিদায়ী জিনিষ। শ্রী ভিন্ন, বাহ্য প্রকাশ ভিন্ন, জ্ঞান তৃপ্তির পূর্ণতায় যায় না। ভগবান যে অচেতন কাঠ মাটিতে নেবেছেন, তাতে যে আত্মহারা হয়েছেন, তার সার্থকতা হল তাতেই তাঁর তৃপ্তির আনন্দের পূর্ণতায়। ব্রহ্মানন্দ একদিকে শ্রীর পূর্ণতার আনন্দ, একদিকে শাম্ভবী আনন্দ। নিজের ভিতর থেকে সবকে বের করলে, প্রকাশ করলে তবে হয় তাঁর পূঁজি বা মূলধন যে নিজবোধ যে পূর্ণান্দতা তার সার্থকতা; যে নিজেতে পর নেই, যে নিজে সব। চেক না কাটলে ব্যাঙ্কে টাকা পূঁজির সার্থকতা কি? আর পূঁজি থাকলে তবেই না চেক কাটা যায়?

বিষয়ে মোজ না—কিসে মোজব তবে? খুব মোজব, তবে চোরের মতো নয়, বিষয়ীকে সঙ্গে নিয়ে। চল ভাই তোমার শব্দ কেমন স্পর্শ কেমন দেখে আসি। 
ব্রহ্মাণ্ডেশ্বরী ভগবতী চাক্ষুষ না? এই সব রূপে রসে গন্ধে স্পর্শে হৃদয়ে তিনি ভরা না? যাঁর ফোটাটা হল হৃদয় বা ভালোবাসারই মূর্ত্তি, যাঁর নিজের ভিতর থেকে খানিকটা বাহির হয়ে পড়ার, ফুটে বেরবার উচ্ছ্বাসটার নামই 'মমত্ব'।ভিতর থেকে যে বাইরে বেরল সে হল সমগ্র নিজত্বটির বহু স্যাম হওয়া। আত্মা বহু হন—এ কথাটার মানে কি? কাঠের টুকরো টুকরোর মতো করে বহু হওয়া? না, এটি চেতনার একটি রসতত্ত্ব—প্রাণতত্ত্ব? আত্মার বহু হওয়া মানেই প্রাণ লীলায়ন করা, চেতনার বহু হওয়ার গতিটার নামই প্রাণ। কে কোথায় গেছে প্রাণকে বিস্তার না করে—সুখে দুঃখে, গন্ধে শব্দে, শত্রুতে মিত্রে, স্ত্রীতে পুত্রে?"     

ইঁট পাথর যদি তোমার কাছে আত্মজ্ঞানের মূর্ত্তি না হয় এরা গায়ে ঘর্ষণ দেবে। আর যদি এরা ভূমা চেতনার, চিন্ময়ের ভগবানের মূর্ত্তি, তাঁরই বাহ্যরূপ, সুতরাং ভগবান নিজে ছাড়া আর কিছু নয় বলে দেখতে শেখ, গুরুলাভ হবে। তখন এরাই গায়ে আলিঙ্গন দেবে।
  
বড় কষ্ট সংসারে! বড় দুঃখ। বড় তিক্ত!—এ সব কথা কার হবে? যে ক্ষুদ্র নিজত্ব ব্রহ্মনিজত্বে মিলিত করে নিজত্বের প্রতি চূর্ণে চূর্ণে ব্রহ্মত্বের আনন্দ না অনুভব করবে! তা যদি করে, যদি গুরুলাভ হয়, তবে সে বলবে—"হে আনন্দময়, এই ইঁট পাথর মূর্ত্তি, এই দুঃখ মূর্ত্তি তুমিই, তুমি-বোধে আমায় আরো চেপে ধর, আরও চেপে ধর। 
 
সে দেখবে দিকে দিকে আত্মা ফুটছে বহু হয়ে। দিকে দিকে ছুটছে আত্মার উচ্ছ্বাস, প্রাণ প্রবাহ, হৃদয়, হ্রীং; দিকে দিকে হচ্ছে আত্মপ্রকাশ শ্রীং। যদি গুরুলাভ হয়, যদি আত্মা বা জ্ঞানকে সর্ব্বত্র দেখতে থাকে কমিনিট বাকী থাকবে ভিতরটা আর বাইরেটা একসা হতে? তুমি নিজেও ভিতর থেকে বাইরে ছুটছ—ছোট। কোথায় গিয়ে ঠেকলে?—আকাশে,পাতালে, জলে?
সেই শম্ভুতে? যিনি বলছেন—অহং ব্রহ্মাস্মি।যিনি হয়েছেন ব্রহ্মাণ্ড—তাঁতেই পড়লে?

*******************************************
পূজার সময় এইরকমে প্রতি পদে পদে জ্ঞানতত্ত্বকে অর্থাৎ অনুভূতিকে জাগ্রত না করলে, প্রতি পদে পদে স্থূল ভূত থেকে তোমার ভূতের অনুভূতিকে বা জ্ঞানকে দেখা অভ্যেস না করলে ভৌতিক ভাবে পূজা করার কোন ফল নেই, স্থূল কার্য্যের কোন দাম নেই।

সাত্ত্বিক বোধের কাযে মানুষকে তামসিক করে না, উৎসাহ, ধৃতি, ধৈর্য্য বাড়িয়ে দেয়! সাত্ত্বিকতা কর্ম্মজীবনে বাধা দেয় না, বরং তাতে ডুবলেই দেখতে পাবে, তোমার কর্ম্মটা তোমার আত্মারই জ্ঞানবিলাস, প্রাণবিলাস, তার উপড়ের ছালটা মাত্র ভৌতিক বিলাস।তাতে দেখবে বিশ্বের, তোমার, আমার, সকলের কর্ম্ম ভগবৎ কর্ম্ম, তুমি নির্দায়ী হবে।

কর্ম্মী তুমি কর্ম্ম করতে করতে, যেতে যেতে তাঁকে বল—"তুমি না গেলে আমার যাওয়াও হয় না, তুমি না খেলে আমার খাওয়াও হয় না। হে ভূমা চেতন পুরুষ, তুমি খাওয়া হও তাই আমি খাওয়াকে ভোগ করি; তুমি চলা হও তাই আমি চলি, তোমার কর্ম্মাধীন আমার কর্ম্ম, তোমার ইচ্ছাধীন আমার ইচ্ছা। তুমি ছাড়া আর কাউকে পাচ্ছি নে।"  

ও পাশে পরমেশ্বরের জ্ঞানবিলাস, এ পাশে স্থূল কর্ম্ম। এই রূপে যে কর্ম্মের উৎপত্তি—যাতে এখন একটা জিনিষ দেখা আমাদের দোরস্ত আছে, সেই কর্ম্মে সদ্যোজাত পুরুষকে দেখা হল জাতবেদ পুরুষ হওয়ার লক্ষ্মণ। জাতবেদ মানে যার দ্বারা জন্ম বেদিত হচ্ছে। যে নিজেকে জানতে জানতে জন্মাচ্ছে।

এই যে বাক্য উচ্চারণ করছি তাতে একটি ভাব উৎপন্ন হল আমার, জ্ঞানের একটি আয়তন তৈরী হল—মানে, এক জ্ঞানময় পুরুষ আমি সেই ভাবের তলায় রইলাম, আমি নিজেকে জানতে জানতে সেই ভাব হয়ে জন্মগ্রহণ করলাম। কোন কথাটি বলার উদেশ্যই হল এমনি ভাবে জন্মাতে চলেছি। ফল খেতে চলেছি, বল্লুম 'ফল', তাতে ফল দেখে তার তলায় ফলমূর্ত্তি আত্মা-পুরুষকে দেখলাম। 

আমি নাইতে চলেছি। আত্মা পুরুষ আমি, জ্ঞানাশ্রয়ী পুরুষ আমি ভূতের জলে নাই না, জ্ঞানের রাজ্যে জ্ঞানের জলে নাইছি। আমার স্নান করার মানে জলের জ্ঞানময় হওয়া বা নিজে জল হওয়া। পূজার সময় দেবতার মহাস্নানকল্পী পুরুষ নিজের জ্ঞানে নিজে জল প্রকাশ করে তাতে উপাস্য দেবতা-নিজত্বে তন্ময় নিজেকে অভিস্নাত করাই। সদ্যোজাত পুরুষ হই। 

অ-জাতবেদ পুরুষের কাছে বাইরে থেকে জল এল, তবে তার জল জ্ঞান হল। আর জাতবেদ পুরুষ আমি বললাম 'জল', জল হল। তাতে নিজেকে অনুপ্রবিষ্ট দেখলাম, নিজে জল হলাম ও সেই জলে নিজের স্নান অনুভব করলাম। এইরূপে সদ্যোজাত পুরুষ হলাম।   

যে এইরকম হওয়াটা পুনঃ পুনঃ দর্শন করবে, অর্থহীন শক্তিহীন বাক্য আর তার থেকে বেরোবে না, তেজোবীর্য্য নিয়ে তার বাক্য বেরোতে থাকবে। মাটির দরকার, জলের দরকার, টাকার দরকার, সব নিজেতেই করে নেবে। 

ভগবান বলছি চলেছি ভগবান দেখতে; ক্ষিদে পেয়েছে বলছি চলেছি খেতে; চাই বলছি চলেছি গ্রহণ করতে—মানে নিজের জ্ঞান শরীরে নিজেই ভগবৎমূর্ত্তি একজন, অন্নমূর্ত্তি একজন, গ্রহীতা মূর্ত্তি একজন হয়েছি। এইভাবে পরমাত্মা থেকে বহু বহু আত্মা সন্ততিত হচ্ছে, সন্তানরূপে জাত হচ্ছেন। 
ভূত থেকে ভূতের জ্ঞান, ও জ্ঞান থেকে আত্মজ্ঞান—এইটুকুর উপর পূজার সমগ্র সার্থকতা নির্ভর করছে। 

আত্মত্ব—কি ভয়ংকর কথা! কি শব্দ! যে আত্মত্ব অভয়ং, অপারং , অনন্তং ব্রহ্ম—যে সে কথা। আত্মা বলব আর এই একটা জীবনের সীমার সংস্কার তার গায়ে ছাপ মারা থাকবে—এই আত্মা বলা হল? কত জীবনের কত স্রোত তোমাতে ভেসে গেছে, আত্মা বলে এই দীন দরিদ্র নিজবোধে, এই বিচ্ছিন্ন (isolated) স্বতন্ত্র কুঁড়ে ঘরে এঁর বসে থাকবে? খালি এই জীবনের হিসাবটা নিয়ে বলবে শম্ভু? এঁর স্মরণেতে তোমার সংকীর্ণ ইহকালটা একেবারে গাঝাড়া দিয়ে ফেলে দাঁড়াতে পারবে না?

কাতে বসে আছ? ভূমা নিজবোধস্বরূপা দেবতা পুরুষে? কোথায় বাস করতে চাও? তোমার ঐ কুঁড়েতে না ঐ দেবতার ঘরে? বাস ত করছই ওখানে  সদাসর্ব্বদা, শুধু বাস করলে হবে না, সজ্ঞানে করতে হবে। 

চিন্ময় পরমাত্মা যখন বহু হওয়ার কামনাময় হলেন, দুটি মেরু (pole) রচনা হল, এক মেরুতে বা 'pole'এ স্বয়ং রইলেন অক্ষর নিষ্কল নির্গুণ হয়ে, আর এক 'pole'এ হলেন ত্রিগুণময়ী আত্মপ্রকৃতি। আত্মতত্ত্ব বা  চেতনতত্ত্ব হল এক সীমা, অনাত্মতত্ত্ব অচেতনতত্ত্ব জগৎতত্ত্ব হল আর এক সীমা—এই দুই এর মাঝে জীব আমি—চেতন অচেতনে মিশ্র—ছুটাছুটি করছি।   

আত্মা negative pole, প্রকৃতি postive pole, দুটি শক্তির ক্রিয়া চলেছে এই সীমার মধ্যে। গতিশক্তি প্রকৃতির postiveএ ছোটাচ্ছে আমায়, বহির্মুখে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে; ধৃতি শক্তি বা চুম্বিনীশক্তি আত্মাভিমুখী করছে, আত্মত্বে ফেরাচ্ছে।    

প্রকৃতি সত্ত্ব, রজ, তম এই ত্রিগুণের অনাদ্যনন্তময় ভগবদ্ধর্ম্ম। সেইটি যখন শান্ত* সসীম হয়ে জীবকে আশ্রয় করে, আদি অন্তবান্‌ হয় তার নাম স্বভাব। 

(প্রকাশকের মন্তব্য: *উপড়ে উল্লিখিত "শান্ত' শব্দটি হয়তো আসলে 'সান্ত', যার অর্থ 'সীমাবদ্ধ'। যেহেতু ঋষির উপদেশ সরলাদেবী শ্রুতিলিখনের দ্বারা লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাই হয়ত, মূল পুস্তকে 'সান্ত'-র বদলে 'শান্ত' মুদ্রিত হয়েছে। এইটি আমার অনুমান। )   

জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মারই দুই aspect অক্ষরপুরুষ ও অব্যক্ত প্রকৃতি—জ্ঞ ও অন্। জ্ঞ বা আত্মার সাথে অন্ এর বা আত্মপ্রকৃতির সংস্পর্শ হলেই, আত্মপ্রকৃতি ক্রিয়াশীল হয়, নয়ত প্রকৃতির ক্রিয়াশীলতা অব্যক্ত হয়ে থাকে আর জ্ঞর অন্‌ জ্ঞানও অব্যক্ত হয়।

"জ্ঞ বা নিজজ্ঞানের নাম পরাপ্রকৃতি, অন্ বা পরজ্ঞানের নাম অপরাপ্রকৃতি,শক্তি বা জ্ঞানক্রিয়া। এই জ্ঞ ও অন্‌কে, জ্ঞান ও জ্ঞানক্রিয়াকে ব্যক্ত করা বা না করার নিয়ন্তা পরমাত্মা নিজেই। 

মাত্র অনির্ব্বচনীয় পরমাত্মাই অনন্ত, অসীম, অপরিমেয়। বচনীয় হলেই, বাক্যে আনলেই, জ্ঞানস্বরূপ সীমাযুক্ত পরিমিত হয়ে গেলেন। তাই অক্ষর আত্মত্ব আর ক্ষর জীবত্ব এ দুটোই চেতনার একটা সীমাবদ্ধতা limitation, অক্ষর বা নির্গুণ বললেই সেই রকম জ্ঞানের একটি আয়তন রচিত হয়ে গেল। আর জীবত্ব গঠিত হল মানে আত্মার জীবভাবীয় বন্ধন ও মুক্তি রচিত হল।  

প্রতি জীবের ভিতরে যে সসীম ত্রিগুণ শক্তির ক্রিয়ায় তার স্বভাব ব্যক্ত হচ্ছে সে ক্রিয়াও চালিত করাচ্ছেন আর এক মহাশক্তিমান্। ব্যবহার একটা কর্ম্ম করতে করতে সেইটেই স্বভাব হয়ে যায় এবং স্বভাবটাই সংস্কারে দাঁড়িয়ে যায়; তখন সেই সংস্কারটি বা সম্পূর্ণরূপে কৃত কর্ম্মটি ঘুরে ঘুরে আসে। সুযোগ পেলেই ও সময় হলে স্বভাব থেকেই স্বভাবোচিত কর্ম্ম বের হয়, তাই স্বভাবকে বদলাতে হলে কর্ম্মকে অন্য রাস্তায় নিয়ে যেতে হবে। ক্রতুময় অয়ং পুরুষঃ। 

এখন তোমার স্বভাব পর্য্যন্ত দেখতে পাচ্ছ তুমি, তার আগে যে ত্রিগুণময়ী প্রকৃতি, তার আগে ও যে অক্ষর ভূমা, তার আগে যে পরমাত্মা আছেন, তাকে দেখছনা । যদি স্বভাব, সংস্কার, অদৃষ্ট, বা কর্ম্মফল পরিবর্ত্তন করতে হয়, তবে যে স্বভাব থেকে তোমার স্বভাবোচিত কর্ম্ম বেরোচ্ছে তাকে দেখলে হবে না। স্বভাবের গোড়ায় যিনি, কর্ম্মের দ্বারা তাঁকে ধর। যেমন নায়েবকে ধরলে চলবে না, একেবারে জমিদারকে ধরতে হবে। 

স্বভাব স্বাতন্ত্র্য তৈরী করছে। আমি কর্ত্তা এই জ্ঞানজাল বিস্তার করছে। যতক্ষণ 'কর্ত্তাহং মন্যে', ততক্ষণ 'আমিই কর্ত্তা' এই জ্ঞান ও কর্ম্মের ফলাফলের জন্য দায়িত্ব থাকবে। জ্ঞানের যেমন যেমন ক্রিয়া হবে তেমনি তেমনি সংস্কার বা অদৃষ্ট দাঁড়িয়ে যাবে। যখন ভগবদাধীন কর্ম্ম তোমার দেখবে—"তুমি যে! তুমি যে! আমার কর্ম্মময় চেহারাও তুমিই ধরেছ!"

এই চোখ যেই জ্বলতে থাকবে, নির্দায়ী হবে, সংস্কার বা অদৃষ্ট বদলে যাবে। এইটে যত দেখবে স্বভাব আর তোমার থাকবে না, স্বভাব তাঁরই হবে। "আমি আমি করছি কেননা তোমার লীলায় ঐ স্বভাবটা তৈরী হয়েছে।আমার এ কর্ম্মও যে তুমিই, এ কায তোমারই"—এমনি করে করে দেখে দেখে কর্ত্তৃত্ব তাঁকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

যারা সুবর্ণরেখার স্রোতে সোনার কুচো খুঁজে সংগ্রহ করে দিনান্তে দুই এক টাকা রোজগার করে, তাদের চোখ জলে নয়, শ্যাওলায় নয়, ম্যালেরিয়াতে নয়—শুধু সোনার কুচিতে। তেমনি এই আমিটাকে ছাড়িয়ে তোমায় আত্মদ্রষ্টা হয়ে কায করতে হবে। যে আত্মা বা পরমাত্মা, যে ভূমা চেতনাই দ্রষ্টা,শ্রোতা, মন্তা, কর্ত্তা, যিনি তোমাকে দেখছেন, কর্ম্মময় তুমি রূপে নিজেকে জানছেন। 

প্রথমে জ্ঞানস্বরূপকে গুরুকে দেখবে দুইভাগে কেমন রয়েছেন, তোমার ভিতরে আত্মজ্ঞান ও সর্ব্বজ্ঞান। আবার কিভাবে পরিচালিত করছেন তোমায়, তোমার স্বভাব ও সংস্কার অনুসারে, কালেতে পরিপক্ব কর্ম্মফল অনুসারে, কখন রাগ কখন প্রেম, কখন দুঃখবোধ কখনও সুখ দিয়ে। প্রথমে গুরুকে দেখে দুই বিভাগ অবলম্বিত করে সব মীমাংসিত করবে। এইটে যতক্ষণ করতে করতে স্বভাব না হবে, কিছু হবে না। 

যে জ্ঞান নিয়ে ডাল ভাত খাওয়ায় ব্যবহার করছি, সেইটেরই ব্যবহার ভগবানে লাগানো, আর কিছু নয়। এই সম্বন্ধটা বজায় রেখে, ভৌতিক কাযটা শরীরের স্বভাব ধর্ম্মে শরীরকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হল বাহ্য পূজার সার্থকতা। পূজায় বসে ভূত থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে আত্মা এইটে দর্শনে সিদ্ধ হওয়ার উপর সমগ্র জীবনের স্বভাব পরিবর্ত্তন নির্ভর করছে।

এই ভূমিতে দাঁড়ানর জন্য মেরুজ্ঞানে যেতে হবে। শক্তি তত্ত্ব জগতে কোথাও খেলা করতে গেলে Positive Negative দুই অংশ রচনা না করে খেলে না। তেমনি চিন্ময়তত্ত্ব মেরু রচনা করে আমায় বিধারণ করেছেন। নিজে হয়েছেন একটি প্রান্ত, আমাকে করেছেন একটি প্রান্ত। তাতে আমি একপ্রান্তে রয়েছি সর্ব্ব বিষয়ে অভাবগ্রস্ত ভিখারী, তিনি অপর প্রান্তে রয়েছেন নিজেই সর্ব্ব ও সর্ব্ব সুখের দাতা; তিনি পূর্ণ, আমি অপূর্ণ। তিনি মহান, আমি ক্ষুদ্র; তিনি শান্তি সমূদ্র, আমি ক্ষুব্ধ চঞ্চল তরঙ্গ। অথচ আমি তাতে যুক্ত আছি।

নদী যেমন সমূদ্রে যুক্ত থাকে, ঢেউ যেমন জলে যুক্ত থাকে—ঐ পরম ঈশান আত্মত্বে, ঐ বিপরীত প্রান্তে আমি তেমনি সংযুক্ত রয়েছি।আছে নিজত্ব দুয়েতেই, নিজবোধ বলে একটি সমান ধর্ম্ম দুজনেরই আছে, সেইটি দুইয়ের মাঝে সেতু। সেই সেতু অবলম্বন করে এই নিজত্ব থেকে ঐ নিজত্বে পড়লে দেখা যায় এই খানে এই ক্ষর নিজত্বে সমাচ্ছন্ন রয়েছে মাটি, জল, কাঠ। আর ওখানে ঐ অক্ষরপুরুষ, যিনি আমার সমগ্রের ধর্ত্তা, তাঁর নিজত্বে আছে কেবল জ্ঞান।

ঐ ক্ষরণহীন, স্থির নিজজ্ঞানময় চিন্ময় মেরু প্রান্তে অবস্থান করছেন, নিজনামীয় অক্ষরপুরুষ, আর এই চেতন অচেতনপূর্ণ ক্ষর চঞ্চল প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নিজনামীয় চিন্ময়ের জীবভূতা এক পরমা প্রকৃতি। এই দুটো নিজদর্শনের চোখাচোখি হলে, চোখ আর ঊর্ধ্ব অধঃ বলে চারিদিকে এক দিকচক্র রচনা করবে—না নিজ বলেই এক বিরাটকে রচনা করবে যে নিজ আপনাতে আপনি বিভোর। 

নদী যেমন সমূদ্রে যুক্ত থাকে, ঢেউ যেমন জলে যুক্ত থাকে—ঐ পরম ঈশান আত্মত্বে, ঐ বিপরীত প্রান্তে আমি তেমনি সংযুক্ত রয়েছি।আছে নিজত্ব দুয়েতেই, নিজবোধ বলে একটি সমান ধর্ম্ম দুজনেরই আছে, সেইটি দুইয়ের মাঝে সেতু। সেই সেতু অবলম্বন করে এই নিজত্ব থেকে ঐ নিজত্বে পড়লে দেখা যায় এই খানে এই ক্ষর নিজত্বে সমাচ্ছন্ন রয়েছে মাটি, জল, কাঠ। আর ওখানে ঐ অক্ষরপুরুষ, যিনি আমার সমগ্রের ধর্ত্তা, তাঁর নিজত্বে আছে কেবল জ্ঞান।

ঐ ক্ষরণহীন, স্থির নিজজ্ঞানময় চিন্ময় মেরু প্রান্তে অবস্থান করছেন, নিজনামীয় অক্ষরপুরুষ, আর এই চেতন অচেতনপূর্ণ ক্ষর চঞ্চল প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নিজনামীয় চিন্ময়ের জীবভূতা এক পরমা প্রকৃতি। এই দুটো নিজদর্শনের চোখাচোখি হলে, চোখ আর ঊর্ধ্ব অধঃ বলে চারিদিকে এক দিকচক্র রচনা করবে—না নিজ বলেই এক বিরাটকে রচনা করবে যে নিজ আপনাতে আপনি বিভোর। 

আর যেখানে যত ক্ষর আত্মা ছিল, কেউ আর ক্ষরত্বের পরিচয় দেবে—না এক অক্ষরে প্রলীন হয়ে যাবে? আমার খণ্ড বিখণ্ড বহু নিজকে যে দিগদিগন্তে বিলিয়ে দিয়েছি, কেউ রূপাভিমানী, কেউ রসাভিমানী—সেই সব নিজগুলো একসঙ্গে জরো হয়ে একটি নিজত্বে, জ্যান্ত একজনে পর্য্যবসিত হবে না? এর নাম হল শিব দর্শন, শম্ভু দর্শন। 

আর সেই যে সব শিবলিঙ্গগুলি বা আত্মার টুকরোগুলি ছিল, যারা সবাই গুড়িয়ে এই একটি নিজে হয়ে গেল, তারা আগে যাতে যাতে ছিল, সে সব জ্ঞানের আয়তনগুলি কোথায় গেল? অব্যক্ত হল, ব্যক্ততার আর পরিচয় পেলে না তাদের, তারা তমসাচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

এইরূপে জ্ঞানের সব আয়তনকে রাত্রিতে পর্য্যবসিত করে, এক ভূমা নিজজ্ঞানে, শিবজ্ঞানে বসে থাকা মানে শিবরাত্রির ব্রত করা।    

'নিজে' 'নিজে' 'নিজে'! এঁকেই খুঁজছিলাম আকাশে পাতালে! নিজেএই ভাষায় যে সর্ব্বাপেক্ষা ভাস্বর মূর্ত্তি বিধৃত হয়ে রয়েছেন—সেই প্রত্যক্ষ ভগবানকে। এঁকে খোঁজা ছাড়া ধর্ম্ম হতে পারে না। কার তৃপ্তি অন্বেষণ করেছি! নিজের! কি ভয়ংকর শব্দ এটি! একেবারে খাঁটি আমাকে বোঝাল, অথচ সে খাঁটি আমি, এই ব্যবহারশীল আমি থেকে কত দূরে? 

সে আমিকে যখন দেখি, এ আমি তখন গ্রাহ্য নয়। সে আমি ভূমা—প্রতি অণুতে অণুতে বিরাজ করছেন যে একজন সে একজনকে আমি বলে পেলে, এ আমি যে সরে গেলুম, ফুরিয়ে গেলুম—তাতে বিন্দুমাত্র শোক হয় কি ? এক পরম মহিম, পরম ঐশ্বর্য্যের সাথে একসা হয়ে গেছি যখন—তখন আর এই মর্ত্ত্য আমি কোন মূল্য ধরতে পারে আমার চোখে?  

এই আমিটে যে বেরিয়ে গেল আনায়াসে ও ভগবানে একীভূত হল অনায়াসে, সে যদি আবার চীৎকার করে, কোন বাক্য উচ্চারণ করবে?—অহং ব্রহ্মাস্মি। এ ছাড়া আর কোন ছোট পরিচয় দিতে পারবে? 

এই যে কোন নরক থেকে কোন স্বর্গে গেলাম, কোথায় দাসানুদাস ভিখারী, কোথায় অনন্তশক্তি একছত্র সম্রাট। এরই ভিতর অত্র মর্ত্ত্য অমৃতো ভবতি অত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে! অত্র! এই নিজেতে!

এইটি পেয়ে তবে উপলব্ধিতে এল এই নিজে সকল শক্তির ধর্ত্তা, পাতা।তাহলে আমার ক্ষুদ্র যে মাত্র একটি চোখ ছিল সে এই ভূমায় মিশিয়ে হয়ে গেল অনন্ত দর্শনাভিমানী দর্শনশক্তি; আমাতে যে শুধু একটি কান ছিল সে হল অনন্ত শ্রবণাভিমানী শ্রবণশক্তি। সকল ইন্দ্রিয়ই অনন্তত্বের আধার বলে উপলব্ধি আসতে লাগল। 

পরমাত্মাই গেলেন শরীরী হয়ে, প্রাণময় হয়ে। সেই পুরুষের নাম হল সহস্রশীর্ষ পুরুষ, সহস্রার মধ্যবর্ত্তী পুরুষ। এই সমস্ত বিশ্বভুবন হয়ে গেল এই মহীয়সী শক্তির জ্যোতির প্লাবন খালি। সেই প্লাবনে যতকিছু ছটা বেড়িয়েছে তার মূলে, তার অন্তরে অন্তরে কাকে দেখলে? নিজেকে? বর্ণ আকারীয় ছটায় যে নিজে বলছে আমি সর্ব্ব বর্ণময়। শব্দ, স্পর্শ, রস, গন্ধ আকারীয় ছটায় বলছেন আমিই সর্ব্বশব্দ,স্পর্শ, রস, গন্ধময়।

সর্ব্ব গন্ধময়, সর্ব্ব রূপময়, সর্ব্ব মনোময়, সর্ব্ব প্রাণময়, আনন্দময় আমি ছাড়া আর কেউ নেই। এই হল ভাষা।এই আনন্দের সঙ্গে আর জগতের কাদা ধূলা হাড়মাস নিংড়ানো আনন্দের তুলনা হয়? এমন সুপেয় জল খেয়ে আর সে কাদাছেঁচা জল খেতে ইচ্ছে হবে? বলবে না হে জীবনের জীবন, হে প্রত্যক্ষ আত্মা আমার, তোমার ভূমা আনন্দময় নিজেতে আমার এই দৈন্যময় নিজেকে ঢেলে দিলাম। এই ক্ষুদ্র নিজত্বে যে সুখ তৃপ্তি তা ঐখানে পাইয়ে দাও। তৃপ্তির ভরম্ভর পড়ে আছে আমার ডালে, ভাতে, চচ্চড়িতে, একটু রসে, একটু গন্ধে, একটু স্পর্শে।এগুলো যে তোমারই চিন্ময়ীরই চেতনারই ধর্ম্ম তাই দেখিয়ে দিয়ে এই সব সঙ্গে করে নিয়ে যাও তোমার কাছে। তুমি এস! আমাতে এমনি করে তুমি নাম। হয়ে যাক্‌ খেতে গেলুম অন্ন, পেয়ে গেলুম অন্নপূর্ণা। খেতে গেলুম রস, পেয়ে গেলুম রসময়ী। এমনি করে নেমে আমার ইন্দ্রিয়দের পূর্ণ সার্থকতা দাও।দেখাও তুমি আমাকে চারিদিক থেকে বেষ্টন করছ মা! তুমিই করছ সব—আমাকে তোলাও তুমিই করবে, আমি করব না। তুমিই করছ! তুমিই কর।

********************************এই যে ভগবতী, এই যে ভূমা চেতনা, পরম পুরুষ যিনি ফুটলেন এই ভাষায়, দেখা দিলেন এই আকারে, এঁর দিকে যখন চাইলে, চাওয়াটা খালি চোখে চোখে হল? না— প্রাণে প্রাণে মনে মনে ইন্দ্রিয়ে ইন্দ্রিয়ে ঠেকাঠেকি হয়ে এই কথা হল? আমার নিজত্বে আমি যতদূর প্রসৃত আছি ততদূর যদি হয়, সেই হবে চরম ঠেকা। তোমার প্রাণে তাঁর প্রাণ, চোখে তাঁর চোখ, হাতে তাঁর হাত। এখন নিজে বলতে যতটা জড়িয়ে থাকে মাটিতে জলে, ভূমা নিজেতে মিলতে গিয়ে সেইগুল খুঁজে নাও তাঁতেই, এদিককার খণ্ড নিজগুল তমসাচ্ছন্ন হয়ে যাক, অব্যক্ত হোক। জ্ঞানের আয়তনগুলি রাত্রিতে পর্য্যবসিত করে শিবজ্ঞানে বিচরণ কর। শরীরকে অভুক্ত রাখলেই উপবাস হয় না। প্রকৃত উপবাস হল ভগবানের সমীপে বাস। তাঁর সঙ্গে তাদাত্ম্য সাধনা, তাঁতে একাত্মতার উপভোগই হল উপবাস।   

*****************************************
কিন্তু জীব এতদূর পারে না। ক্ষুদ্র আত্মত্বের অনুগামী ক্ষুদ্র জীব কূটস্থ আত্মা বলে অক্ষর পুরুষের দর্শনে বহু ব্যাপা অংশই এক হল দেখলেও, অক্ষর বলে একজন দ্বিতীয়কেই উপলব্ধিতে পেলে, এই ক্ষুদ্র নিজেকে তার উপাসক মনে হল। এই নিজত্ব পূর্ণমাত্রায় সেই নিজত্বে ডুবল না। ক্ষরত্বর প্রাধান্য এখনো রইল, অক্ষর দ্বিতীয় রইলেন। অনন্ত অনন্ত আত্মা নিয়ে যিনি আত্মময় সেই রাশি সমষ্টি শিবের পূজাকামী আমি এই ভাব এল। ক্ষুদ্র ক্ষরত্ব অনুত্ব ভূমা অক্ষরত্বে দাঁড়াতে পারছি নে, ক্ষরত্ব হারিয়ে রাশিত্বে আমি যেতে পারছি নে। তাই, তিনি আমার উপাস্য, পূজ্য, এই অনুভূতির সাথে তাঁকে পূজা করার তীব্র আকাঙ্খা জাগল। 

এখন আমার দিকদিগন্তে অক্ষর আত্মা দেখতে দেখতে তাঁতে লয় হবার মানে হল আত্মার দ্বারা আত্মার পূজা করা। এখন দিক দেশ কাল অন্ধকার করে শম্ভু দাঁড়িয়েছেন বটে, নিজবোধ ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাচ্ছিনে, তাই জগৎবোধ আড়াল হয়েছে ঠিক, কিন্তু অক্ষরত্বে পূর্ণমাত্রায় নিজেকে ভুলতে পারছিনে। আমায় করতে হবে অক্ষরত্বের উপাসনা, শিবরাত্রিতে শিব পূজা, আত্মা দিয়ে আত্মার পূজা, গঙ্গাজল দিয়ে গঙ্গার পূজা। 

শিবরাত্রির পূজায় ঋষিদের ব্যবস্থা ছিল, তাঁকে চারমূর্ত্তিতে পূজা করা—ঈশানায় অঘোরায় বামদেবায় সদ্যোজাতায় নমঃ। ঈশানরূপে ঈশ্বর বোধে ঐ নিজস্বরূপকে আগে দর্শন কর—নম ঈশানায়। এতস্য অক্ষরস্য প্রশাসনে চন্দ্রসূর্যৌ বিধৃতৌ তিষ্ঠতৌ। ঈশ্বরবোধ জাগাও নিজের দিকে দিকে।    

তার পরে পূজা দেবে অঘোরায়। নিষ্কল, শুভ্র, নিরঞ্জন! আঃ জুড়িয়ে গেলাম! ঈশান অথচ নিরীহ শান্ত নিজ।

তার পর পূজা কর বামদেবায়! সমগ্র বাহ্য সিদ্ধি সমস্ত বামাশক্তির দাতা। ঐ যে সব আয়তনগুলি রাত্রি হয়ে গেছে, তমসাচ্ছন্ন হয়েছে, অব্যক্ত হয়েছে, তাদের দিবা করে ফুটিয়ে তোলার নিয়ন্তা। বহির্মুখের যত সিদ্ধি যে শক্তির দ্বারা জাগ্রত হয়, আত্মার যে শক্তির নাম বামাকালী সেই শক্তিতে ক্রিয়াশীল যিনি, বামদেবের পূজা তাঁর পূজা।

তোমার অনেক সংস্কার ঐ রাত্রে লুকন আছে কিন্তু তারা এখন টলছে। এখন বলছে যুদ্ধ করব না—আবার এখনই কোমর বেঁধে দাঁড়াবে। কতখানি অহং কর্ত্তৃত্বের স্বাতন্ত্র্যর সংস্কার এখনও খেলা করছে— যেমন একটু নোল দেব— যে যার ছুটবে। ত সেইগুলো শুদ্ধ করতে হবে, সেইখানে সেইখানে, সেই সব সংস্কারে সংস্কারে , ঈশানের হাত, ঈশানত্ব দেখতে হবে,তাই তাঁকে বলছি—নমো বামদেবায়—যিনি সংস্কাররূপে সিদ্ধ হয়েছেন নিজে।  

তারপর সেই বামভূমিতে কি কৌশলে সদ্যোজাত হয়ে যান তিনি তাই দেখি। প্রতি খণ্ডে খণ্ডে ঢুকছেন নিজেকে জানতে জানতে। নিজে তাই হয়ে, আত্মজ্ঞানে জেগে থেকে জন্মাচ্ছেন জেনে জেনে। এই চার তত্ত্ব দেখলে তবে না শিবপূজা ঠিক হল! এইরূপ জ্ঞান নিয়ে শিবপূজা করতে হবে।  

যখন টেলিফোন আসবে ছুটব যে, সে তুমিই ছুটবে ক্ষর আত্মা হয়ে—ঐ রাত্রিকে দিবা করে ছুটলে। তুমিই বহু আত্মা হয়ে বিশ্বকে জাগিয়ে তুলছ। এর নাম তৎ নামীয় পুরুষের দর্শন—শিবের নাম তৎপুরুষ। ওঁ তৎসৎ। তৎ মানে তনুতে, যিনি সন্ততিত হন, বিস্তারিত হন।

শিব রাত্রি পূজার বিধানে, বিভিন্ন বিভিন্ন নামকরণের বিভিন্ন বিভিন্ন গুঢ়ার্থ (significance) আছে দেখলে। তা দেখে পূজা না করলে ঠিক পূজা করা হয় না। ঈশানায় নমঃ অঘোরায় নমঃ বামদেবায় নমঃ সদ্যোজাতায় নমঃ।

ঈশান হলেন অক্ষর পরমেশ্বর, অব্যক্ত তেজ বা সংস্কারে বেষ্টিত—লিঙ্গ শরীর, রুদ্র— দ্রুতং স্বরূপং উপলভ্যতে। নিজত্ব এখানে প্রধান। অব্যক্ত তেজ এখানে ভরে আছে, যেমনি ছেড়ে দেবেন, সাঁ করে নেমে আসবে। যত ফোটাটা এখান থেকেই ফোটে, যা যা অব্যক্ত ভাবে আছে। যা কিছু ফুটবে, আত্মচৈতন্যের প্রকাশ ভিন্ন, আত্মতত্ত্বের নিয়ন্ত্রণে ছাড়া ফুটবে না।

শিবরাত্রিতে জাগা মানে হল অব্যক্ত ভূমিতে জাগা। শিবরাত্রি মানে যেখানে শিব ও রাত্রি দেখা যায়—অব্যক্ত ভূমি, যেখানে ঘুমোই, মরি। নিজের শরীরে কোন্‌খানে ঘুমাও? Brain এ, সহস্রারে। ঐখানেই সমস্ত ব্যক্ততার ভেতর থকে তোমায় টেনে তুলে নেওয়া হচ্ছে, কিছু তোমায় দেখতে দেওয়া হচ্ছে না—brain এ না কোথায়? ঐখানেই পূর্ণে পূর্ণে প্রচুরে প্রচুরে যত কিছু এক একটি cell ধরে রয়েছে। তোমায় ঘুম পারাতে হলে ঐখানে নিয়ে যাওয়া হয়? এই মস্তিষ্ক, এতে অজ্ঞান পুরুষ গিয়ে পায় ঘুম, মৃত্যু। জ্ঞানী পুরুষ গিয়ে পায় অমৃত, মৃত্যুঞ্জয় শিব! অজ্ঞানী পুরুষের ক্রিয়া ওখানে বন্ধ হয়ে গেল। যে আত্মবোধ নিয়ে ওখানে গেল সে পেলে অপূর্ব্ব আনন্দ, জ্যোতি। এই তফাৎ।  

সত্যলোকে দুই দিকে যাওয়া যায়। ঘুমেতে সেই ব্রহ্মতত্ত্বেই পড়লুম হয়ে গেলুম মূড়; আত্মবোধেও সেইখানে গিয়ে পেলুম সত্যং জ্ঞানং অনন্তং। এক রাস্তায় কালো অন্ধকার, এক রাস্তায় বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডময় আলো তাতে। একজনই আলো ও অন্ধকার দুই হয়েছেন— এই অনুমেয়। ঐখানেই অক্ষর পুরুষ রয়েছেন? ঐ অব্যক্ত ভূমি সত্যলোক Cerebellum?  আর ওরই পাশে Cerebrum পরিচালন ভূমি তপলোক, ওখান থেকে পরিচালনা করেন অঘোর—নিজ নামীয় মহা এক চেতনা। ঐ অক্ষরেরই দুটো স্তর দেখলে? ঈশান ও অঘোর। অঘোর—ভূমা অক্ষর মূর্ত্তি। বামদেব সকল সিদ্ধি ফোটান, মনুষ্যত্ব, বৃক্ষ, জীবন মরণ যা প্রাপ্য প্রত্যেক সিদ্ধি। বামদেব হলেন যিনি প্রত্যক্‌ আত্মত্ব জীবাত্মায় সিদ্ধি নিয়ে বসে আছেন।এখন মনুষ্য আত্মারূপে যে বসে আছেন সেইটে, বা যখন যে সিদ্ধিটা নিজেকে দেবেন। এই হলেন বামদেব।   

বামনের বিশেষত্ব লক্ষ্য না রাখলে পরমদেবতার মহিমা ধারণায় আসে না। বামদেব সিদ্ধিদাতা মানে সমস্ত সিদ্ধি দিচ্ছেন। তাঁতে ও অঘোরে কি তফাৎ হল ? অঘোর হলেন তিনি, যাঁর আত্মবোধে একান্ত অসঙ্গভাব এবং নিয়ন্ত্রণত্ব প্রধান। আর বামদেব পরিচালক নিয়ন্তা বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেতে সঙ্গতা গ্রহণ করেন। এই জন্য বামদেবের উপাসনায়—ন কাঞ্চ পরিহরেৎ। অঘোরের ধর্ম্ম হল অসঙ্গতা, সব ত্যাগ, সব পরিহরণ—নিজের থেকে সব ছাড়ান। আর বামদেবরূপী আত্মার ধর্ম্ম হল কাউকেও ছাড়বেন না। যা কিছু ফুটছে তোমার নিজেতেই, তুমিই।"

তার পরে ভোগময়তা।সদ্যোজাত নিজেই মরা নিজেই জ্যান্ত সাজছেন।  একস্তরে একদম কাটা, ছাড়ান; একস্তরে একবারে জড়ান, একে বারে ঢোকা তাতে। যিনি একস্তরে একান্ত স্বাধীন নিয়ন্তা, আর একস্তরে তিনিই একান্ত অধীন নিজবোধে। অনুভূতি আত্মক যখন আমি, তখন যা অনুভব করছি, তাই হয়ে গেছি। আর যখন অনুভূতি লব্ধ বিষয় ছাড়া চলে না, তখন ভোগময় চেতনা, বিষয় বদ্ধ চেতনা হয়ে গেল। 

বামদেব একপিঠে সিদ্ধি, একপিঠে মুক্তি। একপিঠে সিদ্ধি না থাকলে সে পিঠে জীব হয় না। আমি মনুষ্য—এই মনুষ্যত্বে আবদ্ধতার জ্ঞানে পূর্ণ আমার নিজবোধ। বামদেব আমাতে মনুষ্যতার সিদ্ধি নিয়েছেন।    

কেমন স্তরগুলি দেখ; চারটিই আত্মতত্ত্বে বসে কথা। 

চিন্ময়ং ব্যাপৃতং সর্ব্বং ত্রৈলোক্যং সচরাচরং—

ঐং শ্রীগুরবে নমঃ।"

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------




















Comments

Popular posts from this blog

ঈশোপনিষদ্‌ (ঈশ উপনিষদ্‌) --মূল মন্ত্র, অর্থ, নিরুক্ত এবং ব্যাখ্যা সহ। (Ishopanishad --Isha Upanishad in Bengali language with original texts, annotaions, meanings, etymolgies and explanation.)

ঐতরেয় উপনিষদ্‌। (Aitareya Upanishad in Bengali/Bangla language, with the original texts, word-word meanings, etymologies, and brief explanations.)

শ্রী শ্রী বিশ্বমাতা পূজা । আচার্য্য শ্রীমদ্ বিজয়কৃষ্ণ কৃত শ্রী শ্রী বিশ্বমাতা (অমা/অদিতি) পূজা। মূর্ত্তি পূজা রহস্য এবং বেদ। ( ১৯৪১ সাল/ সন ১৩৪৮, শ্রীমতী সরলা দেবী চৌধুরাণী কর্ত্তৃক সঙ্কলিত।) (Worship of Aditi/Ama—Vishvamaataa/Universal Mother Goddess of the year 1941 in Bengali language--Performed by Rishi Bijoykrishna Chattopadhaya and recorded by Sarala Devi Chowdhurani.)